ইতিহাস ও ঐতিহ্য

বাঙালির অলংকার

আবদুল হামিদ মানিক প্রকাশিত হয়েছে: ২৯-০৫-২০১৯ ইং ০১:২২:৫৬ | সংবাদটি ৩১৮ বার পঠিত

এমন মজা হয়না গায়ে সোনার গয়না। বুবুমনির বিয়ে হবে বাজবে কত বাজনা। বিয়ের সঙ্গে পান গান, গয়না ও বাজনার সম্পর্ক যেন অবিচ্ছিন্ন। গয়না শুধু বিয়েতে নয় সকল সময়েই নারীর জীবনে জড়িয়ে আছে। গয়নাগাঁথা বা অলংকার নারীর একান্ত সম্পদ। বিশেষজ্ঞরা বলেন, বস্ত্র ব্যবহারের আগেই অলংকারের ব্যবহার শিখেছে মানুষ। মিশরের পিরামিড, গ্রিস, এশিয়া মাইনর, মহেঞ্জোদারোতে প্রাগৌতিহাসিক যুগের গহনাসামগ্রী পাওয়া গেছে। রামায়ণ, মহাভারতেও অলংকারের বিবরণ পাওয়া যায়। এ যুগেও চালু আছে নানা আকৃতি ও ডিজাইনের অলংকার।
অলংকার বলতেই সৌন্দর্যের এবং নারীর অঙ্গসজ্জার ছবি চোখে ভেসে ওঠে। পুরুষের অলংকার পরা ব্যতিক্রমী ব্যাপার। তাই অলংকার নারীর ভূষণ হিসেবেই স্বীকৃত। সৌন্দর্য চেতনা থেকেই এর উদ্ভব ও ব্যবহার। ‘মোর প্রিয়া হবে, এসো রানী দেব খোঁপায় তারার ফুল।’ কবি কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬) শুধু মানুষের তৈরি বিচিত্র গহনায় প্রিয়াকে সাজিয়ে তুষ্ট নয়। চাঁদ তারা, জোছনা পর্যন্ত প্রিয়ার গায়ে জড়াতে চান। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮৬১-১৯৪১) কবিতায়ও পাওয়া যায় নানা গহনার সন্ধান। অলংকারবিহীন নারী কেউ কল্পনা করতে পারেননি। লোকগীতিকায় নায়িকা সুন্দরীদের দেখা যায়, চুল থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত কেবল গয়না আর গয়না। পুরুষ অলংকারহীনা নারী যেমন কল্পনা করেনি, নারীও তেমনই অলংকার ছাড়া নিজেকে পরিপূর্ণ ভাবতে পারেনি। প-িত অমূল্যচরণ বিদ্যাভূষণ প্রাচীন ঋষির বরাত দিয়ে লিখেছেন যে, নারী কোনো কিছুতেই সন্তুষ্ট নয়। কিন্তু যখন তাকে দেয়া হলো অলংকার, তখনই সে বলে উঠল-অলম মানে যথেষ্ট। এই অলম থেকে অলংকার শব্দের উৎপত্তি। আসলে নারীর দৈহিক সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলার তাগিদ থেকেই অলংকার এসেছে। এক্ষেত্রে ইতিহাস, মনস্তত্ত্ব, পুরুষের মনোরঞ্জন ইত্যাদি বিষয় এখন বিবেচ্য নয়। নারীর বা সমাজের সৌন্দর্য চেতনা, রুচি ও সাজসজ্জার প্রতি স্বাভাবিক প্রবণতার স্মারক হচ্ছে গহনা।
গহনার প্রতি নারীর দুর্বলতা সকল কালেই ছিল। সেই আদিকালে লতাপাতা, পাখির পালক, বুনো ফল ফুলকে গয়না হিসেবে পরেছে নারীরা। ধাতুর আবিষ্কার ও ব্যবহার শেখার পর আসে অলংকারের সুবর্ণ যুগ। নানা আকার আকৃতির অলংকার চালু হয়। ক্রমান্বয়ে তা প্রথা হয়ে দাঁড়ায়। আমাদের সমাজে বর্তমান
যুগেও স্বর্ণালংকার নারীর কাছে পরম প্রার্থিত বস্তু। বিয়ের সময় কে কত ভরি সোনার অলংকার পেলেন তার হিসাব করা হয় খুব গুরুত্বসহকারে। অলংকারের সঙ্গে সংস্কারও জড়িয়ে গেছে।
প্রথম ইনগেজমেন্টের আংটি এবং বিয়ের সময় স্বামীর দেয়া অলংকারকে পবিত্র সম্পদ মনে করেন নারী। এর কোনোটি হারিয়ে গেলে বড় অশুভ সংকেত বা অলক্ষুণে মনে করেন। ‘আমার মায়ের নাকের নোলক হারিয়ে গেল কই?’ কবির এ আর্তনাদের পেছনে আছে ওই লোকবিশ্বাস। এছাড়া মহিলারা স্বর্ণালংকারকে বিপদের অবলম্বন হিসেবেও গণ্য করেন।
সৌন্দর্য বাড়ায় অলংকার। সালংকরা নারী নিজেকে নিয়ে আত্মতৃপ্তি বোধ করেন। সামাজিক মর্যাদা, আভিজাত্য ঐশ্বর্যেরও প্রতীক হিসেবে অলংকারকে দেখা হয়। বাংলাদেশ ও ভারতেই নয় অন্যান্য দেশেও অলংকারের ব্যবহার আছে। বাংলা ভারতের স্বর্ণকার শিল্পীদের কারুকাজ বিদেশেও প্রশংসিত হয়ে আসছে। স্বর্ণকারের দোকান বা জুয়েলারিতে ডিজাইন বই থাকে। দেখে মহিলারা অর্ডার দেন। সূক্ষ্ম কাজ করতে হয়। এটি শিল্প হিসেবে স্বীকৃত।
গয়নার আকার আকৃতি দিনে দিনে পরিবর্তিত ও পরিশীলিত হয়েছে। অতীতের কিছু কিছু গহনা এখন হয়তো নেই। আধুনিক রমণীরা অলংকারপ্রীতি বজায় রেখেছেন তবে অতীতের খাড়ু, পায়জোড়, ঘুঙুর ইত্যাদি পরেন না। এর পরও চালু অলংকারের সংখ্যা কম নয়। এখন শুধু দোল বা ইয়ারিং এর জন্য মেয়েদের কানে একটি করে ছিদ্র বা ফুটো করা হয়। অতীতে একেকটি কানে তিন চারটি ছিদ্র করা হতো। মেয়েশিশুর নাকে ও কানে দাগা দেয়া বা ফোড় দেয়া হতো আনুষ্ঠানিকভাবে। এখন শহরে ফোড় করে দেয়া হয় আধুনিক যন্ত্রের সাহায্যে। এভাবে পরিবর্তন এলেও গহনা আছে। বানিয়া বা স্বর্ণকারদের পেশাতেও আধুনিকতার ছাপ পড়েছে। গড়ে উঠেছে ফ্যাশন দুরস্ত জুয়েলারি শপ। এগুলো শো রুম। কারখানায় কারিগররা আলাদা কাজ করেন।
আধুনিক গহনা রতœালংকার, স্বর্ণালংকার, রৌপ্যালংকার, ইমিটেশন ও পুষ্পালংকার ইত্যাদি শ্রেণীতে ভাগ করা যায়। এর মধ্যে কত বিচিত্র নাম ও নকশার অলংকার আছে, এ যুগের অনেক মহিলাও এর পুরো হিসাব মেলাতে হিমশিম খাবেন। অনেকগুলোর নাম জানা থাকলেও ছবি কেমন বলা যাবে না। দেখা যাক সিলেটের লোকগীতিকায় অলংকারের বিবরণÑ
জায় জেওরের ফরমাইশ দিয়া বানিয়া বাড়ি
তার লাগি সোনা দিলা মাপিয়া দশ ভরি।
নাকফুল কানফুল আর গজমতি হার
বাজুবন্ধ হাতের চুড়া সিতি পাতি আর
পাড়–য়া বেকী আর নেপুর রুনুঝুনি
গলায় তাবিজ দিলা বসাইয়া চুনী।
এই না ভাবে তাইয়ার করি বত্তিশ অলংকার
কাপড় চোপড় কিনতে গেলা গঞ্জের বাজার।
বত্রিশ অলংকার কথাটি লোক-জীবনে চালু আছে। এই বত্রিশটি মিলানোও খুব সহজ নয়। একেকটি এলাকায় এমনকি একেক সময়ে অভিন্ন গহনার ভিন্ন ভিন্ন নাম আছে। নাক, কান, গলা, হাত, পা, মাথা, চুল, কোমর সবখানে ব্যবহার্য গহনা ছিল। প্রচলিত কয়েকটি অলংকারের নাম- হাসুলি, নোলক, সিথি, টিকা, বেলকুড়ি, টায়রা, কানপাশা, ঝুমকা, মাকড়ি, লটকন, বালি, পাশা, বেশর, চুঙ্গি, নাকছবি, নথ, নাকফুল, গলাবন্ধ, চম্পাকলি, তারাহার, সাতনরি, পুষ্পহার, মোহনমালা, চুড়ি, বালা, কাকন, বাজুবন্ধ, মান্তাশা, তাতনচুড়, খাড়ু, পায়জোড়, বিছা, বাউটি, ঝাপটা, ব্রেসলেট, ইয়ারিং, মল, চিক, ঝুমকা ইত্যাদি। এগুলো মাথা থেকে পা পর্যন্ত এক সঙ্গে পরবার নয় তবে চুল থেকে পা পর্যন্ত এর ব্যবহার বিস্তৃত। নাকের মতো ছোট্ট অঙ্গেই দুটো নোলক এবং নাকফুল এখনো গ্রামে মেয়েদের পরতে দেখা যায়। আধুনিক নারী বিয়েশাদি সামাজিক অনুষ্ঠানেই সালংকরা, কর্মক্ষেত্র অথবা ঘরোয়া জীবনে গয়না পরেন খুব কম। তবে খুব যতেœ রাখেন নানা রকম অলংকার।
অলংকারপ্রীতি এখনো আছে। ভারতবর্ষে বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন রকম অলংকারের ব্যবহার ছিল। সমার্থক শব্দকোষ থেকে নেয়া যাক একটি তালিকাÑ
মাথার অলংকার : কলগা, কলগি, কিরিট, টোপর, তাজ, মুকুট, মোর, মৌলি, মৌর, শিরোমণি, শেখর, সিথিমৌর ইত্যাদি।
চুলের অলংকার : কুরীর, কাঁটা, গুঁচি, বাগান, বেলকুড়ি কাটা, চিরুনি ইত্যাদি।
কপালের অলংকার : টায়রা, টিকলি, তোরা, ঝাপটা, ঝাপা, ললাম ইত্যাদি।
কানের অলংকার : ইয়ারিং, কর্ণিকা, কর্ণপুর, কর্ণবেস্ট, কর্ণবেস্টন, কর্ণপালি, কর্ণদর্পণ, কর্ণকুন্তল, কর্ণমালা, কর্ণাবতংস, কানপাশা, কানবালা, চৌদানী, টাব, ঝুমকো, ঢেড়িঝুমকো, দুল, পাশা, বাউরি, বারবৌলি, মকরকু-ল, মাকড়ি ইত্যাদি।
নাকের অলংকার : বেশর, টানানথ, নথ, নাকছবি, নোলক ইত্যাদি।
গলার অলংকার : অর্ধহার ইন্দ্রচ্ছদ, একনরী, একাবলী, কণ্ঠী, গোটহার, গোপহার, গোস্তন, গুঞ্জহার, গুঞ্জমালা, গেবেয়ক, চন্দ্রহার, চারনবী, চেইন, চেইনহার, চিক, টানানথ, পদক, পাটিহার, পাঁচনরী, পঞ্চলহরি, পুঁতি, পুঁতিরমালা, প্রালম্ব, প্রালম্বক, প্রলম্বিকা, প্রেনডেন্ট, কুলোহার, বিম্বকি, বিছেহার, মঙ্গলসূত্র, মধ্যমণি, মালা, মতিহার, দমাহার, দড়াহার, ধুকধুকি, নেকলেস, রশ্মিকল্প, লকেট, শেলি, সাতনরী, সীতাহার, স্রক, হাঁসুলি, হেঁসোহার ইত্যাদি।
হাতের অলংকার : অনন্ত, অঙ্গদ, আর্মলেট, কেয়ূর, টাড়, তাবিজ, তাগা, তাড়, বাহুবন্ধ, বাজু, বাজুবন্ধ, কঙ্কন, কাঁকন, খাড়ু, চুড়, চুড়ি, বলয়, বালা, বাউটি, ব্রেসলেট, পইছা, জশম, মানতাসা, রতনচুর, প্রতিশর, নোয়া, রাখি, শাখা ইত্যাদি।
আঙুলের অলংকার : আঙুলি বা আংটি ইত্যাদি।
কোমরের অলংকার : কটিবন্ধ, কটিত্র, কটিসূত্র, কোমরবন্ধ, কিঞ্চি, কিঞ্চিনি, গোট, ঘুনসি, চন্দ্রহার, মেখলা, বিছা, টোরা, রসনা, সারসন, সপ্তকী ইত্যাদি।
পায়ের অলংকার : আঙ্গোটি, আনোট, কিঙ্কিনি, গুরবাঁধ গোড়বালা, গুজারি, গুজরিপাঞ্চম, ঘাগর, ঘুঙুর, টুটকি, তোড়া, পাদঙ্গদ, পায়জার, পাশুলি, পাষক, পাদকটক, গাড়ামল, বাঁকমল, মল, মঞ্জির, নুপূর, শিঞ্জিলী ইত্যাদি।
অন্যান্য : ব্রোচ, লেসপিন, পরচুলা, কৃত্রিম আইল্যাশ ও নখ ইত্যাদি।

 

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • বাঙালির ইতিহাসে দুঃখের দিন
  • ঐতিহ্যবাহী নকশিকাঁথা
  • সাংবাদিকদের কল্যাণে সিলেট প্রেসক্লাব
  • প্রাকৃতিক মমিতে নির্মমতার ইতিহাস
  • গৌড়-বঙ্গে মুসলিম বিজয় ও সুফি-সাধকদের কথা
  • ঐতিহ্যের তাঁত শিল্প
  • সিলেট প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠাকাল নিয়ে ভাবনা
  • খাপড়া ওয়ার্ড ট্রাজেডি
  • জাদুঘরে হরফের ফোয়ারা
  • ইতিহাস গড়া সাত শক্তিমান
  • ভেজাল খাবার প্রতিরোধের ইতিহাস
  • বর্ষাযাপন : শহর বনাম গ্রামগঞ্জ
  • বর্ষা এলো বর্ষা
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • নবীদের স্মৃতিচিহ্নে ধন্য যে জাদুঘর
  • দর্শনীয় স্থান ও পর্যটন কেন্দ্র
  • ঐতিহ্যে অম্লান গোবিন্দগঞ্জ বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়
  • বিলুপ্তির পথে গরীবের ‘শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত’ মাটির ঘর
  • হারিয়ে যাচ্ছে হিজল গাছ
  • তালের পাখা প্রাণের সখা
  • Developed by: Sparkle IT