উপ সম্পাদকীয়

অনুভূতিতে ঈদ আনন্দ

এডভোকেট আনসার খান প্রকাশিত হয়েছে: ০৪-০৬-২০১৯ ইং ০১:৩৬:২৪ | সংবাদটি ৬১ বার পঠিত

আনন্দ-বেদনা, হাসি-কান্না, সুখ আর দুঃখের সম্মিলনই হলো মানুষের জীবন প্রবাহ। জীবনের এই চলমান বাস্তবতা ও প্রক্রিয়ায় মানুষ মেতে ওঠে উৎসবে-আনন্দে, জীবনকে উপভোগ করতে চায় শত শোক আর দুঃখের মাঝেও। উৎসব আর আনন্দ মানুষের জীবনকে স্বল্প সময়ের জন্য হলেও দিগন্ত বিস্তৃত এবং সৌন্দর্যমন্ডিত পৃথিবীতে বেঁচে থাকার সার্থকতা ও যথার্থতা সম্পর্কে আশাবাদী করে তুলে এবং এই চেতনাবোধ মানুষের মনোজগৎ থেকে নৈরাজ্যবাদী ধারণা ও দুঃখবোধ মুছে দিতে সহায়ক এক ভূমিকা পালন করে। উৎসব আনন্দই মানুষকে দুঃখ আর গ্লানি থেকে মুক্ত করে সজীব সচেতন রাখে। উৎসব তাই মানুষের বেঁচে থাকার, সজীবতা নিয়ে বিকশিত হওয়ার একটি অনুসঙ্গও বটে। উৎসব তাই মানব জীবনের পথ চলার একটি অংশ বিশেষ হিসেবে গণ্য হয়ে থাকে। যেখানে উৎসব, আনন্দ নেই সেখানে প্রাণও নেই বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। তাই দেখা যায় বিভিন্ন ধর্মের সাথে উৎসব-আনন্দেরও একটি যোগসূত্র রয়েছে। মানুষ তার ধর্মের নিয়মবিধিগুলো যথাযথ নিয়মে যেমন পালন করবে, তেমনি ধর্মীয় অনুশাসনের আওতায় ধর্মীয় উৎসবাদি পালনের দ্বারা মানুষ তার জীবনকে আনন্দে ভরে তুলে জীবনকে ভোগ করবে এবং পৃথিবীতে বেঁচে থাকার সার্থকতা খুঁজে পাবে। এ কারণে ধর্মের সাথে উৎসবও জুড়ে দেয়া হয়েছে বিভিন্ন ধর্মে। ইসলাম ধর্মেও আমরা দেখতে পাই ধর্মীয় নিয়ম বিধির সাথে উৎসব জুড়ে দেয়া হয়েছে। ইসলাম ধর্মের অনুসারীরা প্রতিবছর দু’টি প্রধান ধর্মীয় উৎসব পালন করার মধ্য দিয়ে জীবনকে ভোগ করার সার্থকতা অনুভব করেন। প্রতি বছরের প্রধান দু’টি ধর্মীয় উৎসব হলো ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আযহা। এই দু’টি ঈদ উৎসবই আনন্দ, আর খুশির বারতা নিয়ে হাজির হয় প্রতিটি মুসলমানদের জীবনে। উৎসবের আনন্দের ভেলায় ভেসে মানুষ ভেসে যায় অপার শান্তির এক জগতে, যেখানে থাকে না কোনো দুঃখবোধ আর গ্লানি। ভুলে যায় মানুষ তার জীবনের সকল ক্লান্তি, হতাশা আর না পাওয়ার বেদনা।আনন্দ আর উৎসবের ভেলায় ভেসে মানুষ অনুসন্ধান করে তার ভবিষ্যৎ সুখ আর প্রশান্তি।
বছর ঘুরে আবার মুসলমান সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় উৎসবের অন্যতম ঈদুল ফিতর সমাগত। উৎসবের আনন্দগত মাত্রা বিবেচনায় ঈদুল ফিতরের গুরুত্ব সর্বাধিক। ঈদুল ফিতরের উৎসবের মধ্যে যে ধরণের আনন্দধারা প্রবাহিত হয়ে থাকে, সত্যি কথা বলতে গেলে ঈদুল আজহা ঈদ উৎসবে সে ধরণের আনন্দ-উচ্ছাসের ধারা খুব একটা দেখতে পাওয়া যায় না। তবে এটি বাস্তব যে, দু’টি ঈদ উৎসবই বিশ্বের সকল মুসলমানের জীবনে খুশি আর আনন্দের ফল্গুধারা সৃষ্টি করে তেমনটি অন্য কোনো উৎসবে দেখতে পাওয়া যায় না। ধনী-গরিব, উঁচু-নিচু নির্বিশেষে প্রতিটি মুসলমানই ঈদের খুশী, ঈদের আনন্দ, নিজ নিজ সামর্থ ও অবস্থান থেকে উপভোগ করার চেষ্টা করে থাকে। যদিও বর্তমান ঝঞ্ঝা-বিক্ষুদ্ধ এবং অসমতাপূর্ণ বিশ্ব ব্যবস্থায় সকল মুসলমানের পক্ষে যথার্থ আনন্দসহকারে সমানভাবে ঈদ উৎসব পালন করা সম্ভব হচ্ছে না। পৃথিবীর কোনো না কোনো প্রান্তের মুসলমানরা আজ হত্যাকান্ডের শিকারে পরিণত, এটি যেমন নিজেদের অভ্যন্তরীণ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কোন্দলের কারণে, তেমনি অন্যান্য রাষ্ট্রীয় আগ্রাসনের কারণেও ঘটে চলেছে। আরো আছে অর্থনৈতিক, সামাজিক, নৃতাত্ত্বিক ও গোষ্ঠীগত বৈষম্য এবং অসমতা ও দ্বন্দ্ব সংঘাত। এসব কারণে সকল প্রান্তের মুসলমানদের পক্ষে সম আনন্দে ঈদ উৎসব পালন করা প্রায় অসম্ভব। আমাদের বাংলাদেশের কথাই বলি, ধনী-গরিবের যে বিভাজন, অর্থনৈতিক যে অসমতা, রাজনৈতিক যে সংঘাত তার ফলে সকল মুসলমানের পক্ষে সমান আনন্দে ঈদ উৎসব পালন করতে পারা এমনটা ভাবাই যায় না। একইভাবে যদি ফিলিস্তিনী মুসলমানদের দিকে তাকানো যায়, দেখা যাবে ইসরাইলের দমন পীড়ন আর বোমা ট্যাংকের আঘাতে সেখানকার মুসলমানদের জীবন বিপন্ন। ঈদ উৎসব পালন করা তো দূরের কথা নিজেদের জীবন সম্পত্তি এবং ভূখন্ডের অধিকার রক্ষা করাই তাদের জন্য বড় এক চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে। কাজেই বলা যায় যে, বাংলাদেশের একজন মুসলমানের নিকট আজকের দিনে ঈদের যে তাৎপর্য বহন করেছে, ফিলিস্তিন বা সিরিয়ার মুসলমানদের নিকট ঈদ উৎসব ঠিক সে ধরণের তাৎপর্যময় হিসেবে উদযাপনের সুযোগ প্রায় নেই। আর অন্য দিকে, ধনী দরিদ্র্যের অর্থনৈতিক মানদন্ডে যে অক্ষমতা এবং তারতম্য রয়েছে সেদিক থেকে দেখতে গেলে বলতেই হয় যে, ধনী এবং দরিদ্রের পক্ষে সমভাবে ঈদের আনন্দ উপভোগ করার সুযোগ সীমিত। কেননা, ঈদের আনন্দ বা ঈদের খুশি উপভোগ করার বিষয়টি শুধু মন মানসিকতার বিষয় নয়। ঈদের আনন্দ উপভোগের সাথে বেশ কিছু আনুষ্ঠানিকতাও জড়িত এবং এসকল আনুষ্ঠানিকতাগুলো প্রতিপালনের ক্ষেত্রে আর্থিক খরচাদি মেটানোর মতো সামর্থ ও সক্ষমতার বিষয়টিও জড়িত। ঈদ উৎসব শুধুমাত্র ধর্মীয় গন্ডির মধ্যে সীমিত নয়, এটি কিন্তু আনুষ্ঠানিকতা এবং আড়ম্বরপূর্ণ উৎসবের একটা অংশও বটে। এ কারণে ঈদের ময়দানে ধনী, দরিদ্র, উঁচু-নিচু সকল স্তরের মুসলমানরা এক কাতারে দাঁড়িয়ে ঈদের নামাজ আদায় করলেও, একজন মুসলমান অপর মুসলমানের ভাই হলেও আর্থিক সক্ষমতা এবং অক্ষমতার প্রশ্নে ভেদাভেদ থেকে যায় এবং সেই বৈষম্যমূলক ভেদাভেদের কারণে ঈদের ময়দানের বাইরে ঈদের আনন্দ উপভোগের যে আনুষ্ঠানিকতা সেখানেও কিন্তু ধনী-দরিদ্রের ঈদ আনন্দ উপভোগের মধ্যে বিস্তর ব্যবধান পরিলক্ষিত হয়।
জন্ম প্রক্রিয়ায় প্রতিটি মানব সন্তানের মধ্যে সমতা থাকলেও পৃথিবীতে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ, বৈষম্য এবং অসমতা সৃষ্টি হওয়ার কারণে যেকোনো উৎসব আয়োজনেও এর প্রভাব পড়ে। মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রধান দু’টি উৎসব, ঈদের আনুষ্ঠানিকতায় অসম সমাজের এবং অসম পৃথিবীর ছাপ সুস্পষ্ট। যেকোনো উৎসব আয়োজনে অর্থ ব্যয়ের প্রশ্ন জড়িত বলে স্বাভাবিকভাবেই ধনী দরিদ্র্যের পক্ষে সমভাবে উৎসবের আনন্দ উপভোগ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। যেমন কোনো কোনো মা-বাবা তার সন্তানদেরকে ভালো নতুন পোষাক কিনে দিলো, পক্ষান্তরে অনেকের পক্ষে তার সন্তানদেরকে নতুন পোষাক কিনে দেয়া সম্ভব হলো না, সেক্ষেত্রে কী ঈদের আনন্দ সমানভাবে উপভোগ করা সম্ভব হবে। এই অসমদাপূর্ণ বাস্তবতায় ঈদের সমান আনন্দ লাভের সুযোগ যে নেই সেটি বলার অপেক্ষা রাখে না। এই অসমতাপূর্ণ পৃথিবীতে শুধু ঈদ নয়, কোনো ক্ষেত্রেই সকল মানুষের পক্ষে সমানাধিকার, সমান আনন্দ বা সমতার সুযোগ লাভ করার খুব একটা সুযোগ নেই। তবে একটি বিষয় সত্য যে, আনন্দ উৎসব উপভোগ করার বিষয়টি কিন্তু আপেক্ষিক। অর্থ কড়ির সাথে আনন্দ উপভোগের বিষয়টি সকল ক্ষেত্রে সম্পর্কিত নয় বলেই বিশেষজ্ঞরা অভিমত দিয়ে থাকেন। আনন্দ উৎসবের বিষয়টি মনোজগতের সাথে সম্পর্কিত। দেখা গেছে, অনেক টাকাকড়ির মালিক। কিন্তু উৎসব, আনন্দে গরীবের চেয়েও পিছিয়ে আছে। আবার দরিদ্র পরিবারের লোকেরাও মহাধুমধামে উৎসব পালন করছে, এমনটাও দেখা গেছে। আসলে সকল মানুষই তার নিজ নিজ অবস্থান থেকে আনন্দ, সুখ, অবকাশ আর খুশির উৎসবগুলো গভীরতার সাথে পালন করে থাকে, যেমনটা সকল মুসলমানই শত অসমতা এবং শত বাধা বিপত্তি থাকা সত্ত্বেও যথাসাধ্য খুশির উচ্ছাসে আনন্দের ভেলায় ভেসে দু’টি ঈদের আনন্দ ও সৌন্দর্য গভীর পরিতৃপ্তির সাথে উপভোগ করার চেষ্টা করে থাকে। আসলে আনন্দটা হলো মনের অনুভূতির বিষয়। এই মানসিক অনুভূতির কারণেই ধনী-দরিদ্র, উঁচু-নিচু প্রতিটি লোকের নিকটই তার নিজ নিজ দৃষ্টিতে সে শতভাগ ঈদ উৎসবের আনন্দ উপভোগে সক্ষম হয়েছে বলে পরিতৃপ্তিবোধ করে। এখানেই ঈদ উৎসবের সমতা ধনী-দরিদ্র, সবাই আনন্দে-উচ্ছাসের প্লাবনে নিজেকে ভাসিয়ে দিয়ে মনের আনন্দে ঈদ উৎসব পালন করে, ঈদের এই সুখানুভূতিতে সাময়িকভাবে হলেও মানুষ ভুলে যায় ভেদাভেদের কথা, অসমতার কথা, ভুলে যায় তার সকল দুঃখ বেদনার কথা। মানুষ হিসেবে সকলেই সমান এবং একই পৃথিবীর বাসিন্দা, এই অনুভূতিই জাগ্রত হয় মানুষের মনে। এটাই ঈদের তাৎপর্যময় দিক। এভাবেই ঈদ মানুষের মধ্যে ক্ষণকালের জন্য হলেও সমতামূলক বন্ধুত্বের সেতুবন্ধন তৈরি করে দেয়, সকল মুসলমান, আন্তঃরাষ্ট্রিক সীমানা ছাড়িয়ে, সকলেই হয়ে ওঠে পরস্পরের আত্মীয়, হয়ে ওঠে পরস্পর-পরস্পরের ভাইয়ের মর্যাদায় সমমর্যাদাবান মানুষ। মনে হয় যেন, ধনী-দরিদ্রের পার্থক্যটা কৃত্রিম এবং ঈদের এই আনন্দ উচ্ছাসের প্লাবনে মনুষ্যসৃষ্ট এই ধনী-দরিদ্রের কৃত্রিম অসমতা ভেসে গিয়ে সত্যিকার অর্থেই মানুষে মানুষে সাম্য প্রতিষ্ঠিত হলো এবং এই সমতাটাই প্রকৃত সত্য। কারণ আল্লাহ তা’আলা মানুষকে সমান মর্যাদায়ই পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। আর ঈদের দিনে, ঈদের জামাতে সে সত্যটাই উদ্ভাসিত হয়ে থাকে।
বছর ঘুরে ঈদুল ফিতর সমাগত। এই ঈদুল ফিতরই সবচেয়ে আকর্ষণীয় ঈদ উৎসব। রমজানের এক মাসের সিয়াম সাধনার পরে এই ঈদ প্রতিটি মুসলমানের জন্য বিশেষ আনন্দের বার্তা নিয়ে আসে। মহান আল্লাহর সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য মানুষ সিয়াম সাধনা করে এবং এর পাশাপাশি ঈদুল ফিতরের এদিনটির জন্যও মানুষ থাকে অপেক্ষায়। কাজেই, এক দিকে সিয়াম সাধনা, অন্যদিকে সিয়াম সাধনার শেষে ঈদের আনন্দ উৎসব পালনের প্রস্তুতি, এসব কিছু মিলে যে আনন্দ আমেজ তৈরি হয় মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে তার অনুভূতি সম্ভবত লেখনিতে ফুটিয়ে তোলা প্রায় অসম্ভব। তবে সেটি যে অসাধারণ এক আনন্দ উৎসব তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ঈদের এই সাধারণ সুখানুভূতি এবং আনন্দ মানুষের জীবনে চিরবহমান থাকুক, এটিই প্রত্যাশা করি।
লেখক : কলামিস্ট।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • ভারতের জাতীয় উন্নয়ন ও ভারত মহাসাগর
  • জীবনে শৃঙ্খলাবোধের প্রয়োজনীয়তা
  • চলুক গাড়ি বিআরটিসি
  • জলবায়ু পরিবর্তন ঝুঁকি মোকাবেলায় আমাদের করণীয়
  • নির্ধারিত রিক্সাভাড়া কার্যকর হোক
  • নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা
  • খাদ্যে ভেজাল রোধে জিরো টলারেন্স দেখাতে হবে
  • মুর্তাজা তুমি জেগে রও!
  • সন্তানের জীবনে বাবার অবদান
  • এবার কুম্ভকর্ণের নিদ্রা ভংগ হোক
  • বন উন্নয়নে মনোযোগ বাড়ুক
  • একজন অধ্যক্ষের কিছু অবিস্মরণীয় প্রসঙ্গ
  • গ্রামাঞ্চলে বৃক্ষ রোপণ
  • শান্তির জন্য চাই মনুষ্যত্বের জাগরণ
  • উন্নয়ন ও জনপ্রত্যাশা পূরণের বাজেট চাই
  • মোদীর বিজয় : আমাদের ভাবনা
  • অধিক ফসলের স্বার্থে
  • টেকসই উন্নয়ন ও অভিবাসন সমস্যা ও সমাধানে করণীয়
  • সড়ক দুর্ঘটনা
  • চীনের বিশ্বশক্তির প্রত্যাশা ও ভারত মহাসাগর
  • Developed by: Sparkle IT