বিশেষ সংখ্যা

বকুর চানরাত

মাজেদা বেগম মাজু প্রকাশিত হয়েছে: ০৪-০৬-২০১৯ ইং ০১:৪৫:৩১ | সংবাদটি ৩৪ বার পঠিত

চারদিকে হৈ হুল্লোড়। সবাই আনন্দে মাতোয়ারা। কারণ আজ ঈদের দিন। ছোট-বড়, ধনী-গরীব সবার ঘরে ঘরে আজ উৎসবের আমেজ। যে যার সাধ্যিমত ঈদ উদযাপনে ব্যস্ত শুধু বকু ছাড়া। তার নিরানন্দ জীবনে আজ মা’সহ সন্তানরাও যুক্ত। নীরবে অশ্রুপাত করা ছাড়া আর কি-ই বা করার আছে ওর। গরীবের আবার ঈদ! রমজান মাসের এতো খাটাখাটুনি, বাচ্চাগুলোর সুপ্ত আশা সবই যেন একরাতে এক মিনিষে ধুলিস্যাৎ হয়ে গেল। হায়রে নিয়তি! বকু যদি বুক ফেটে চিৎকার করে কাঁদতে পারত তাহলেও হয়তো কিছুটা শান্তনা পেত। কিন্তু সে পথও যে রুদ্ধ, লোকলজ্জার ভয়ে। কারো কাছে ব্যক্ত করেও যে বুকের পুঞ্জিভূত বেদনাগুলো খানিকটা হালকা করবে সে উপায় নেই। কে শুনবে গরীবের দুঃখের কাহিনী, তা-ও আজ ওই খুশির দিনে। তাই হৃদয়ের কোণে জমাট বাঁধা কালো মেঘগুলোকে আড়াল করে ঝুপড়ি ঘরের দাওয়ায় বসে ছেলেমেয়েকে মিথ্যে শান্ত¦না দিয়ে চলে বকু।
এক মাস সিয়াম সাধনার পর রোজার শেষ দিন সূর্যাস্তের পর সরু কাস্তের মতো এক ফালি চাঁদ দর্শনের সাথে সাথেই তো শুরু হয়ে যায় ঈদের আনন্দ। ঈদের অসম্পূর্ণ কাজ সম্পূর্ণ করার মধ্য দিয়ে এই চানরাতেই চলে সবার অন্তিম প্রস্তুতি। বকুওতো এই আয়োজনে ব্যস্ত ছিল। অপেক্ষায়ই ছিল শুধু এই রাতটি সমাপনের। কিন্তু হঠাৎ করে সবকিছু কেমন যেন ওলট-পালট হয়ে গেল। এখন মনে হয় এই রাতে নিজের ইজ্জতটা যে রক্ষা করতে পেরেছে এটাই ওর বড় আনন্দ। এই আনন্দের কাছে ধীরে ধীরে ঈদের আনন্দ যেন ম্লান হয়ে আসে। ইজ্জতের বিনিময়ে কোন সুখই চায় না বকু, সেজন্যে তার যত কষ্টই হোক সে মাথা পেতে নিতে রাজি। হায়রে পাষন্ড পুরুষ! তোদেরই শুধু জয় হবে এটা কেমন কথা? চানরাতে অন্তত একজনকে শাস্তি দিতে পেরেছে ভেবে মনে মনে নিজেকে নিয়ে পাহাড় সমান গর্ববোধ করে বকু।
পঙ্গু মা ও ছেলেমেয়ে দুটো নিয়ে কষ্টের সংসার বকুর। রূপযৌবন যেন উপচে পড়ছে। সৃষ্টিকর্তা রূপের ডালি পরিপূর্ণ করে ভুলক্রমে যেন গরিবের ঘরে ওকে পাঠিয়েছিলেন। নিতান্ত দিন মজুরের ঘরে জন্ম নেয়া সুন্দরী বকুর রূপই এক সময় কাল হয়ে দাঁড়াল। পাড়ার হোমড়াচোমড়া মাস্তানটার নজর থেকে বকু নিজেকে আর কিছুকেই রক্ষা করতে পারল না। অনেক ছলচাতুরী ও মিথ্যা বাহানা দেখিয়ে অসহায় পিতামাতার কাছ থেকে এক রকম জোর করে নিয়ে বকুকে বিয়ে করে মাস্তানটা।
কিন্তু বিয়ের পর কেমন জানি আশাতীতভাবে বদলে যেতে লাগল মাস্তানটা। ওর এই পরিবর্তন লক্ষ করে বকুর নিজেকে খুব ভাগ্যবতী মনে হতে লাগল। অটোরিকশা চালিয়ে সারাদিন পরিশ্রম করে যে রোজগার করত সবই এনে তুলে দিত বকুর হাতে। সময় করে আবার বকুকে নিয় বেড়াতেও বের হতো। কোনদিন সিনেমায়, কোনদিন পার্কে কোথাও না কোথাও দু’জনে মিলে আনন্দফূর্তি করে সারাদিন কাটিয়ে দিত। আদরে সোহাগে বকুকে কানায় কানায় পরিপূর্ণ করে তুলল মাস্তানটা। সেজেগুজে স্বামীর পাশে বসে স্বামীর হাত ধরে বেড়াতে কি যে ভাল লাগত ওর। মনে হতো ওর মতো সুখী মনে হয় এই পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি নেই। বকু যেদিকেই দৃষ্টি ফেরাত সেদিকেই সুখের প্রজাপতিগুলো রঙিন পাখা মেলে পত পত করে উড়ে বেড়াত। এরই নাম বুঝি সুখ ভাবত বকু।
তার এই সুখী জীবনের সাথে অনেকে আবার ঈর্ষান্বিতও হতে লাগল। কারণ এই ধরাধামে একের সুখ যে অপরের সয়না! কিন্তু সুখ সে তো সোনার হরিণ। ইচ্ছে করলেই ওকে ধরে রাখা যায় না। তেমনি হলো বকুর ক্ষেত্রে। বিবাহিত জীবনের চার বছর ঘুরতে না ঘুরতেই বকুর কোল আলো করে ছেলেমেয়ে দুটো এলো। কিন্তু নিয়তির কি নির্মম পরিহাস। বকুর স্বামীটা আবার সেই পূর্বাবস্থায় ফিরে যেতে লাগল। সেই মাতাল অবস্থায় গভীর নিশীতে গৃহে ফেরা, একদিন রোজগার করতো তিনদিন বসে কাটায়, মাস্তানি করে ঘুরে বেড়ানো সবই আবার আগের মতো শুরু করে দিল। ‘কয়লা ধুইলে ময়লা যায়না’ বকু একথা এখন ভালভাবেই জীবন দিয়ে উপলব্ধি করতে লাগল। কোন প্রতিবাদ করতে গেলে বকুর গায়ে হাত তুলতেও কুণ্ঠাবোধ করত না মাস্তানটা। স্বামী সোহাগী, রূপবতী বকু স্বামীর অমানুষিক অত্যাচারে এবারে যেন একখন্ড খড়কুটোয় পরিণত হলো। তারপর এক সময় ঘরে আসাও কমিয়ে দিল বকুর স্বামী। এমনি করে যখন দিনের পর দিন চলতে লাগল তখন একদিন বকু জানতে পারল ও মাস্তান স্বামী অন্য আরেকটা মেয়েকে বিয়ে করে এই শহর ত্যাগ করে চিরতরে উধাও হয়ে গেছে।
মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে বকুর। সন্তানদের নিয়ে পিতৃগৃহে আশ্রয়ের কিছুদিনের মধ্যে চিকিৎসার অভাবে অসুস্থ দিনমজুর পিতাকেও হারাল বকু। বিপদ যখন আসে তখন সবদিক দিয়েই আসে। অসহায় মা একদিন ঝিয়ের কাজ সেরে বাড়ি ফেরার পথে গাড়ির ধাক্কায় কোনমতে বেঁচে গেলেও সেই থেকে পঙ্গুত্ব বরণ করে শয্যাশায়ী। চারদিকে অমানিশার ঘোর অন্ধকার দেখতে লাগল বকু।
কিন্তু জীবনটাতো আর কারো জন্য থেমে থাকে না। সে তার আপন গতিতেই চলতে থাকে। বকুকেও এক সময় সংসারের হাল ধরতে হলো। কিন্তু যেখানেই যায় সেখানেই মানবরূপী হায়েনাদের সেই একই লোলুপদৃষ্টি। যেন হিং¯্র থাবা মেলে বসে আছে, সুযোগ পেলেই নখর বসিয়ে দেবে। নিরুপায় বকু ঘুরে ফিরে অবশেষে এক বাসায় ছুটা ঝিয়ের কাজ ঠিক করল। বেগম সাহেবা বকুর মতো একজন গৃহকর্মী পেয়ে যেন বেশ আশ্বস্তবোধ করলেন। কিন্তু এখানেও সাহেবের সামনে আসতে বকুর কেমন যেন শংকাবোধ হয়। মাঝবয়সী, তিন সন্তানের জনক তারপরও সেই একই লোভাতুর চেহারা, একই কুনজর। জন্মদাতা পিতা ছাড়া পৃথিবীতে ওর দেখা পুরুষ নামক প্রাণীগুলো এমন কেন হিসেব মেলাতে পারে না বকু। মেয়ে হয়ে জন্ম নেয়ার কারণে পদে পদে শুধুই বিপদের সম্মুখীন হতে হয় ওকে। এখানেও এটা নাও, ওটা ধর, এক গ্লাস পানি দাও এরকম নানা কাজের ছুতায় বকুর হাত স্পর্শ করা, সুযোগ বুঝে কনুই দিয়ে গুতো দেয়া অথবা অকারণে মিছেমিছি গায়ে ঘেষে যাওয়া ওটা সাহেবের কেমনতর স্বভাব ভেবে পায়না বকু। তারপরও যতটুকু পারে পরনের ছিন্ন বস্ত্রখানা দিয়ে নিজেকে সবসময় ঢেকে রাখার চেষ্টা করে ও। জীবনের তাগিদে যেখানেই হোক কাজ তো করতে হবে আর এখানে বেতনও বেশ ভাল। এরকম দেখতে দেখতে এক সময রমজান মাস এসে গেল। বেগম সাহেবার কাছ থেকে রমজান মাসে আরও বাড়তি টাকা, ঈদের উপঢৌকন ইত্যাদি পাওয়ার আশ্বাসে বকুর কাজের উৎসাহ যেমন আরও দ্বিগুণ বেড়ে গেল। বকুর এতো কষ্ট দেখে চলৎশক্তিহীন মায়ের বসে বসে দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া আর কিছু করার থাকেনা। সারা মাসের পরিশ্রমের বিনিময়ে অন্তত ঈদের দিন বাচ্চা দুটোর মুখে হাসি ফুটাতে পারবে এই আশায় দিনরাত খেটে চলে বকু।
ঈদে কোন খরচাপাতি না করার জন্য বেগম সাহেবা নিষেধ করেছেন বকুকে। মায়ের শাড়ি থেকে শুরু করে বাচ্চাদের যাবতীয় খরচ, খাবার দাবার সবই বেগম সাহেবা বহন করবেন। এমন দয়ালু ফেরেশতার মতো বেগম সাহেবার স্বামীটা এমন কুস্বভাবের কেন মাঝে মাঝে ভেবে পায় না বকু। কোনমতে একটা কর্মসংস্থান যে হয়েছে সেটাই ভাল এই ভেবে এসব নিয়ে আর মাথা ঘামাতে চায় না ও। তারপর একদিন দুইদিন করে ধীরে ধীরে রমজান মাসও শেষ হয়ে এলো।
ঈদের পূর্বরাত, চানরাত। সারাদিন কাজের শেষে রাতে কি কি নাস্তা ও খাবার তৈরি করতে হবে একে একে বকুকে সবকিছু বুঝিয়ে দিলেন বেগম সাহেবা। রাতে একটু দেরী হলেও সব খাবার তৈরি করে বাড়ি ফিরবে ভাবল বকু, কারণ ঈদের দিন আরও অনেক কাজ একটুও সময় পাওয়া যাবে না। ঈদের দিন সকালে এসে বেগম সাহেবার কাছ থেকে কাপড় চোপড় নিয়ে মা ও বাচ্চাদের গোসল সেরে ওগুলো পরাতে হবে, নাস্তা খাওয়াতে হবে, তারপর আবার বেগম সাহেবার এখানে আসতে হবে। তাই ঈদের দিনের নাস্তাগুলো বেগম সাহেবার কাছ থেকে বুঝে নিয়ে দ্রুত হস্তে তৈরি করতে লেগে গেল বকু আর বেগম সাহেবাও নিশ্চিন্ত মনে ঘুমাতে চলে গেলেন।
রাত বেশ ঘনিয়ে এলো। চারদিকে সুনশান নীরবতা। মাঝে মাঝে নীরবতা ভঙ্গ করে পাশের ফ্ল্যাটগুলো থেকে জোরে জোরে মিউজিকের দ্রিম দ্রিম আওয়াজ ভেসে আসছিল সেই সাথে তরুণ তরুণীদের উল্লাস। সবাই কত আনন্দ করছে ভাবে বকু। খোলা জানালা দিয়ে মিউজিকের শব্দ শুনে শুনে কাজ করতে বেশ ভালই লাগছিল ওর। এইতো আর মাত্র কয়েক ঘন্টা। তারপর চানরাত শেষ হয়ে ভোরের আলো ফুটে ওঠার সাথে সাথেই তো শুরু হয়ে যাবে ঈদের দিনের উৎসব। শুরু হবে চারদিকে হৈচৈ আনন্দ, ঈদের খুশি। আপনমনে তৈরি সাজের পিঠাগুলো ভেজে তুলছিল বকু। হঠাৎ ঘাড়ের কাছে গরম নিঃশ্বাস অনুভূত হওয়াতে ফিরে তাকিয়ে সাহেবকে ওর গা ঘেষে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে চমকে ওঠে ও। এক নিমিষে তামাম দুনিয়া টলে ওঠে ওর। হাত থেকে খুন্তিখানা ছিটকে পড়ে উত্তপ্ত তেলের কড়াইয়ে। আপন কুবাসনা চরিতার্থ করার লক্ষ্যে লম্পট সাহেব ঝাপটে ধরে বকুকে। আত্মরক্ষা করার আপ্রাণ চেষ্টা করেও অশুরের সাথে শক্তিতে বার বার ব্যর্থ হয়ে বকু এক সময় হাতের কাছে টগবগে ফুটন্ত তেলে ডুবে থাকা খুন্তি নিয়ে ক্ষ্যপা দানবটার শরীরে আচ্ছামতো ছ্যাকা দিয়ে নিজেকে মুক্ত করে নেয়। তারপর সবকিছু ফেলে উন্মাদের মতো ছুটতে থাকে বাড়ির দিকে। পেছনে পড়ে থাকে এক মাস আপনশ্রমে গড়ে তোলা ঈদ যাপনের ছোট ছোট স্বপ্নগুলো, পড়ে থাকে দানবের গগনবিধারী চিৎকার, পড়ে থাকে মানবরূপী হায়েনার হিং¯্র পাষন্ডরূপ। সেই সাথে পড়ে থাকে চানরাতে ঘটে যাওয়া পোড় খাওয়া জীবনের আরেকটি ভয়াবহ তিক্ত কালো অধ্যায় যা হয়তো বকু কোনদিনই কারো কাছে মুখ ফুটে প্রকাশ করতে পারবে না।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT