বিশেষ সংখ্যা

ঈদ : একাল সেকাল

আবদুল হামিদ মানিক প্রকাশিত হয়েছে: ০৪-০৬-২০১৯ ইং ০১:৪৯:৫৬ | সংবাদটি ১৩৮ বার পঠিত


ঈদ একটি আনন্দ উৎসব। মুসলমানের আন্তর্জাতিক এ উৎসব পালিত হয়ে আসছে যুগ যুগ ধরে। ঈদের আনন্দ সর্বজনীন। সর্বস্তরে ঈদ ঢেউ তোলে। ধনী-গরিব-যুবক-বৃদ্ধ, নারী-শিশু, কিশোর-কিশোরী সবাই অদৃশ্য এক অনুভূতিতে আলোড়িত হন। এ অনুভূতির রূপভেদ থাকতে পারে। মাত্রাগত পার্থক্য থাকতে পারে। কিন্তু ঈদ সবাইকে ছুঁয়ে যায়। এটা সন্দেহাতীত সত্য।
মুসলিম জাহানে খুশির সওগাত নিয়ে ঈদ আসে দু’বার। এক মাস কঠোর সিয়াম সাধনার পর আসে ঈদুল ফিতর। এটা সাধনায় সাফল্যের আনন্দ। আর জিলহজ মাসের ১০ তারিখে আসে ঈদুল আজহা। ঈদুল আজহা আসে কোরবানির বা ত্যাগের আনন্দ নিয়ে। তবে ঈদুল ফিতরেই ঘরে ঘরে সাড়া পড়ে বেশি। দীর্ঘ একটি মাস রোজা রাখার পর পশ্চিম আকাশে এক ফালি চাঁদ ওঠে। শাওয়ালের চাঁদ। দেখেই মনে পড়ে একটি মাস আল্লাহর নির্দেশ পালনে সাফল্যের কথা। আর তখনই মনের গহীনে রিন্ রিন্ করে বেজে ওঠে ঈদের খুশির ঘণ্টাধ্বনি। ঈদের এই যে আনন্দ তা ধনী-গরিব সকলের।
কিন্তু ঈদ শুধু ধর্মীয় রীতি নয়। এটি আমাদের ঐতিহ্য রূপে, সংস্কৃতির অঙ্গরূপেও গণ্য। ঈদের মূল আনন্দ ও চেতনা সকল কালে এক ও অভিন্ন। ধর্মীয় অনুষ্ঠান সব দেশে, একালে সেকালে একইভাবে পালিত হয়ে আসছে। কিন্তু সংস্কৃতির পরিবর্তন ও ভিন্নতার কারণে ঈদের সামাজিক অনুষ্ঠান দেশে দেশে, একাল ও সেকালে এক রকম নয়। ধর্মীয় অনুষ্ঠান সেই অতীতে যেমন ছিল, আজও তেমনি আছে। শাওয়ালের চাঁদ দেখা হলেই পরদিন ঈদ। ঈদের দিনে রোজা রাখা নিষিদ্ধ। ভোরে উঠেই ফজরের নামাজ শেষে গোসল সেরে পাক সাফ হয়ে ঈদগাহ সমাবেশে যাওয়া; দু’রাকাত নামাজ পড়া এবং খুৎবা শোনা; গরিব মিসকিনদের দান খয়রাত করা-ঈদের এই যে অনুষ্ঠান উদযাপন, তা সুদূর অতীতকাল থেকে আজও অপরিবর্তিত।
ঈদ ধর্মীয় এবং একই সঙ্গে সামাজিক উৎসব। তাই সমাজ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে, অর্থনৈতিক অবস্থার উত্থান-পতনের সঙ্গে সঙ্গে দেখা যায় ঈদ উদযাপনে এসেছে পরিবর্তন। আজ থেকে পঞ্চাশ ষাট বছর আগে ঈদের খুশির প্রকাশ ঘটতো যেভাবে, আজকের সঙ্গে তার অনেক ক্ষেত্রেই ফারাক আছে এবং তা প্রবীণদের চোখে সহজেই ধরা পড়ে। এজন্য ঈদ এলেই অনেকে শৈশব-কৈশোরে ফিরে যান। ঘরে-বাইরে প্রজাপতির মতো উচ্ছ্বল শিশু-কিশোরদের দেখে মনের পর্দায় ভেসে ওঠে ফেলে আসা অনেক রঙিন ঈদের চিত্র। স্মৃতির বালিশে হেলান দিয়ে অনেকে তুলনা করেন সেকাল ও একালের।
কী ছিল সেকালের ঈদে? কেমন ছিল ঈদের খুশির ধরন? হ্যাঁ, সেকালের ঈদের সবচেয়ে বড় দিক ছিল অকৃত্রিম আন্তরিকতা। জনসংখ্যা ছিল কম। গরিব লোক ছিল কিন্তু দারিদ্র্য এতো প্রকট ছিল না। মানুষে মানুষে সম্পর্ক ছিল নিখাদ নিবিড়। তাই ঈদে প্রাণ খুলে একে অন্যের সঙ্গে মিশেছে মানুষ। কিন্তু আজকের যুগে সামাজিক বাঁধন কেমন যেন শিথিল, ঢিলে। সবাই বড় আল্গা আল্গা জীবন নিয়ে ব্যস্ত। শুধু শহরে নয়, গ্রামেও এই যান্ত্রিকতা বিস্তার লাভ করেছে। সেই সঙ্গে ঈদের জমাট আনন্দ ¯্রােতেও এসেছে ভাটার টান।
শিশু-কিশোরদেরই ঈদে দেখা যায় বেশি উচ্ছ্বল। একালের মতো সেকালেও শিশু-কিশোরদের প্রধান আকর্ষণ ছিল নতুন জামাকাপড়। তবে আজকের মতো রেডিমেড গার্মেন্টস ছিল না। প্রথমে বাজার থেকে কাপড় কেনা। তারপর দর্জির দোকানে মাপজোখ দিয়ে কী দারুণ অপেক্ষা! আর মনে মনে প্রার্থনা-আমার শার্ট যেন সবচেয়ে সুন্দর হয়। মনে মনে শঙ্কা-যদি যথাসময়ে সেলাই শেষ না হয়। যারা নতুন জুতা, জামা পাচ্ছে না তাদের চলত কাপড় ধোয়ার ধুম। আজকের মতো লন্ড্রির সুলভ ব্যবস্থা ছিল না। কাপড় ধুয়ে বালিশের নিচে রেখে চলত ইস্ত্রির কাজ। ঈদের আগের রাতে উত্তেজনায় ঘুম হতো না। ভোরে উঠে কে কার আগে পুকুরে গোসল করতে যাবে। ধারণা ছিল, ঈদের দিন পুকুরের পানি জমজমের পানি হয়ে যায়। দেরি হলে তা আর জমজমের থাকে না। ভোরে উঠেই হইহুল্লুড়, গোসল সেরে সাজবার পালা। পাট করা জামা, মাথায় টুপি, চোখে সুরমা আর গায়ে সুগন্ধী আতর। তারপর দল বেঁধে ঈদগায় যাত্রা। ফিরে এসে এ বাড়ি সে বাড়ি দলে দলে গিয়ে বড়দের পায়ে ধরে সালাম করার রেওয়াজ ছিল। সব ঘরেই রকমারি খাবার তৈরি। চারদিকে খাবারের মিষ্টি সুবাস, হাসিখুশি আর আনন্দ।
আমাদের দেশে মেয়েরা ঈদের জামাতে যান না। তাই বলে ঈদ শুধু ঈদগাহ আর বৈঠকখানাতেই বন্দি নয়। ঘরের সবাই-মা বোন, দাদি, চাচি নতুন শাড়ি চুড়ি পেয়েছেন। নিজেরা মার্কেটে হয়তো যাননি। কিন্তু কারও চাহিদা অপূর্ণ থাকেনি। ঈদ এভাবে অন্দরেও ঢেউ তোলে। তবে অন্দরের আনন্দ ছিল মূলত খাবার দাবা তৈরির। ঈদের আগে চারদিক থেকে ভেসে আসত চালের গুড়ি কুটার গুড়–ম গুড়–ম শব্দ। রাইসমিল ছিল না। ঢেঁকিতে তৈরি হতো গুঁড়ি। রকমারি পিঠে বানাতেন মহিলারা। নকশি করা বিচিত্র ডিজাইনের। গুঁড়ি, নারকেল, গুড়, চিনি, দুধ, ব্যসন প্রভৃতি উপকরণের সুস্বাদু সেই পিঠে পুলি বানিয়ে এবং খাইয়ে মা বোনেরা পেতেন ঈদের পরম আনন্দ। ঘরে ঘরে চলত প্রতিযোগিতা। প্রত্যেক পরিবারই নিজেদের ফর্দ সযতেœ গোপন রাখতেন। ফিরনি, পায়েস, পোলাও সন্দেশ-এই ছিল ঈদের খাবার। কিন্তু আজকাল খাবার দাবারে এসেছে পরিবর্তন। ঘরের চাপ কমেছে, বাজারের খাবারের ওপর বেড়েছে নির্ভরতা। মিষ্টি, দই, লাচ্ছা সেমাই আর মোরগ পোলাও-আজকের ঈদের খাবার। অতীতে গরিবের ঘরে ঘরে খাবার পৌঁছিয়ে দেয়া হতো, অনেক ক্ষেত্রে গোপনে। আজ সে মানসিকতা বলতে গেলে নেই। খাবার তৈরির আনন্দের সঙ্গে সঙ্গে মহিলারা সাজগোজের আনন্দও ভোগ করতেন। তবে কসমেটিকসের বাড়াবাড়ি ছিল না। পান খেয়ে ঠোঁট লাল করা হতো সেকালে। একালে এসেছে লিপস্টিক। এসেছে সাজগোজের বিচিত্র সব উপকরণ।
শুধু সাজগোজে নয় বরং এ যুগে জীবনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অনেক উপকরণ। ঈদেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। আজকাল শহরে তোরণ নির্মিত হয়। কোথাও আলোকসজ্জা চোখে পড়ে। দর্জির দোকানের ভিড় চলে গেছে রেডিমেড পোশাকের দোকানে। খাবার তালিকায় এসেছে নতুন নতুন পদ। হাতে তৈরির ঝামেলা কমেছে। এ যুগে অনেকে ঈদের অবকাশে ঘরে বসে ডিশ অথবা ভিসিডি দেখে। বিদ্যুৎবিহীন গ্রামে ছেলেরা সিডি প্লেয়ারে শুনে গান। আগে ছেলেমেয়েরা হয় খেলার মাঠে গেছে, নয় বসিয়েছে গল্পের আসর। রাতে কোথাও পুঁথি পাঠের আসর বসেছে। স্থানে স্থানে বসেছে আড্ডা। আজকাল আর তেমন জমছে না। অভাব-অনটন এবং যান্ত্রিকতা অনেক কিছুই ম্লান করে দিয়েছে।
আগে ঈদের সময় রাস্তায়, ট্রেনে ও বাসে দেখা যেতো মনোহর সুবেশী মানুষের ঢল; নবদম্পতি যাচ্ছেন শ্বশুরবাড়ি। কেউ কেউ আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে বেড়াতে যাচ্ছেন ঈদ উপলক্ষে। এটি এখনো আছে। আছে পুরনো দিনের অনেক রীতিনীতি। কিন্তু তারপরও ঈদের সামাজিক চেহারা পাল্টাচ্ছে। একাল-সেকালের ঈদে ব্যবধান বাড়ছে। কে জানে আজ থেকে পঞ্চাশ বছর পর মিল-বেমিল কোন পর্যায় গিয়ে দাঁড়াবে।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT