বিশেষ সংখ্যা

মুসলিম বিশ্বে ঈদ-উল-ফিতর

আফতাব চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ০৪-০৬-২০১৯ ইং ০১:৫০:৪৩ | সংবাদটি ১১৪ বার পঠিত

ঈদ-উল-ফিতরের প্রাক-পর্বে যে একমাস সিয়াম সাধনা, -সেই কৃচ্ছসাধনাই বিশ্বমানবতার কাছে পৌঁছে দিয়ে যায় অমর্ত্য-বার্তা। কথিত আছে যে, আল্লাহ এক নাস্তিককে সাতশ বছর জাহান্নামে পুড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন-‘বলো তো আমি কে?’ নাস্তিকটি উত্তরে বলল-তুমি তুমিই, আমি আমিই।’ ¯্রষ্টাকে কোনো স্বীকৃতিই দিল না। আরো সাতশ বছর পোড়ানোর পরও নাস্তিকটি একই উত্তর দিল। এবার আল্লাহ নাস্তিককে সাতশ বছর উপোস রেখে ফের একই প্রশ্ন করলেন। এবার কিন্তু নাস্তিকটি নড়েচড়ে বসল। সে মিনতি-মাখা স্বরে বলল-‘হে আল্লাহ, সত্যিই আপনি আমার ‘রব’ আর আমি আপনার বান্দা।’
চাঁদের সৌন্দর্যে বিভোর হয়ে মানুষ যখন কল্পনার ভেলায় চড়ে নিখোঁজ হয়ে যায়, তখন ক্ষুধাতুরের কাছে সেই সৌন্দর্যবোধের অন্তর্লীন রসায়নও বড়ই নির্মম ঠেকে। বরং তাদের কাছে তা নিয়ে আসে ‘অধরা ঝলসানো রুটির দুঃসংবাদ’। এক টুকরো রুটি যাদের কাছে পরম আরাধ্য সৃষ্টিকর্তা তাদের কাছে ধর্মশিক্ষা-স্বরাজ সবকিছুই নিরর্থক। ক্ষুধার্তদের মনের অতলে অজান্তে বার বার একটি কথা ডুকরে ডুকরে কেঁদে ওঠে-‘ইয়ে ধর্ম ঝুটা হ্যায়, পেট হামার ভূঁখা হ্যায়’। ‘খাদ’ খুশ না-হলে খোদাকে যে খুশি করা যায় না-এটাই তো ক্ষুধাতুর-ধর্মচারীদের মৌলিক অথচ নির্মম জীবন-বীক্ষা। এজন্য স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন, ‘First bread than religion’। এমনকি রুটি জোগাতে ব্যর্থ ঈশ্বরকে কটাক্ষ করে স্বামীজি বলেন-‘রুটি চাই-যে ঈশ্বর কেবল স্বর্গের চিরন্তন সুখের কথা বলে অথচ রুটি জোগাতে পারে না তার প্রতি আমার কোনো শ্রদ্ধা নেই।’
ক্ষুধাতুরের তীব্র জ্বালা যে দুঃখের চরম অভিব্যক্তি- তা ভালো করেই জানে ইসলাম। এজন্য ইসলাম একমাস সিয়াম সাধনার মাধ্যমে চরম দুঃখের মধ্য দিয়ে ‘পরম পাওয়াকে’ বরণ করে নিতে নির্দেশ দিয়েছে। নিরলস এক মাস সিয়াম সাধনার শেষেই নীলাকাশের বুকে একফালি শিশু চাঁদ ঠোঁটে হাসির ঝিলিক ফুটিয়ে বিশ্বনবীর কাছে পৌঁছে দেয় ঈদ-উল-ফিতরের আমিয়-বার্তা। দানের উৎসবে আজ দান করবেন তারাই, যারা স্বানুভূতিতে অপরের চরম দুঃখকে উপলব্ধি করেছেন, জেনেছেন। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সর্বহারার এই দানের আনন্দ-উৎসবে মশুগল এবং মাতোয়ারা। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বাদশাহ-ফকির, দুশমন-দোস্ত ঈদের জামাতে সবাই একাকার। এক-শরীরী। অনেক ধর্মীয় উৎসব ধর্মীয় সংকীর্ণতার পাঁচিল-বন্দি হয়ে পড়ে। কিন্তু ঈদ-উল-ফিতর তা নয়। বিশ্বগ্রাহী ভাবনার সর্বজনীন অনুভবে তা অনুপম।
আজকের মুসলিম বিশ্ব পরাশক্তির আগ্রাসন, নিজেদের রাজতন্ত্র রক্ষা করতে সা¤্রাজ্যবাদীদের আমন্ত্রণ, সন্ত্রাস, সামন্ততান্ত্রিক রাজনীতি,অন্তর্কোন্দল ইত্যাদিতে জেরবার। বহুমুখী ষড়যন্ত্র রচনা করে মার্কিন যুুক্তরাষ্ট্র মুসলিম বিশ্বকে গ্রাস করতে চাইছে। বেশ ক’টি যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে মুসলিম দেশের ওপর। আবার বাঁকাপথে রাজতন্ত্রের পৃষ্ঠপোষকতা করে দেশের সরকার ও গণতন্ত্রকামী জনগণের মধ্যে এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আবহ তৈরি করছে। সৌদি আরব, বাহরিন, ইয়েমেন, ওমান ইত্যাদি দেশগুলো এক ভয়ঙ্কর উত্তপ্ত আগ্নেয়গিরির উপর বসে আছে। তিউনিশিয়া মিশর লিবিয়া জর্ডন সিরিয়া ইত্যাদি রাষ্ট্রগুলোর সামন্ততান্ত্রিক রাজনীতির বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছে দেশের আপামর জনগণ। সরকার ও প্রতিবাদীদের মধ্যে অহরহ প্রাণঘাতী সংঘর্ষ চলছে। পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ইরাক, বাংলাদেশ, প্যালেস্তাইন, চেঁচনিয়া, সোমালিয়া, ইন্দোনেশিয়া, লেবানন, ইরান , ভারত ইত্যাদি দেশগুলো সন্ত্রাসী কাযকলাপ ও অন্তর্কোন্দলে নাভিশ্বাস তুলছে। প্রতিটি মুহূর্তে রক্তের হোলি খেলা চলছে। গোটা বিশ্বের প্রায় সবগুলো মুসলিম দেশ-ই আজ রক্তাক্ত। যেখানে রক্তের হোলিখেলা চলছে, সেখানে যে ঈদ-উল-ফিতরের নান্দনিক ও মানবিক বার্তা পৌঁছবে না, তা বলা বাহুল্য মাত্র। আত্মঘাতী অন্তর্ঘাতী মানব-বোমার বিস্ফোরণে আজকের ঈদের জামাতও মুহূর্তে ঝলসে উঠতে পারে-এই অশনি সংকেত তো বার বার আমাদের জানান দিচ্ছে। অথচ ইসলাম-ই বিশ্বের অহিংসা মানবতারা অন্যতম প্রবক্তা। স্বল্প সময়ের মধ্যে বিশ্বব্যাপী ইসলামের অধিব্যপ্তি যেমন বিস্ময়কর,তেমনি এই বৌদ্ধিক বিকল্প অতি অল্প সময়ের মধ্যে প্রাণশক্তি হারিয়ে একেবারে নিস্প্রভ হয়ে গেল, সে প্রশ্নেও সমান বিস্ময়কর।
ধর্মীয় প্রকল্পের মধ্যে দিয়ে ইসলাম-ই প্রথম বিশ্বশান্তি সমাজ প্রতিষ্ঠার কথা ঘোষণা করেছে এবং সবাইকে ‘বিরাদরানে ইসলাম’ বলে বুকে টেনে নিয়েছে। ধর্মীয় গোঁড়ামি ও সংকীর্ণতার উর্ধ্বে ইসলাম তার অনুসন্ধানী ও বিশ্লেষণী দৃষ্টি নিয়ে সবাইকে বিচার করেছে। ইসলাম ভালো করেই জানে সর্বজনীন চেতনায় ধর্মীয় বীক্ষণ ঋদ্ধ না-হলে বৈশ্বিক ভ্রাতৃত্ববোধের মৈত্রী বন্ধন চির অ-ধরাই থাকবে। এজন্য ইসলাম সংকীর্ণতার দেয়াল-বন্দি হয়ে পড়েনি। ‘ইসলাম’ শব্দের অর্থই হচ্ছে শান্তি। যা করলে পৃথিবীতে শান্তি আসে. তার নাম-ই ইসলাম। এটাই তো বিশ্বসমাজের মৌলিক শিরোনাম। ধর্ম-বর্ণ নিবিশেষে যাঁরা শান্তিকামী, যাঁরা বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় প্রোৎসাহী, তাঁরাই-তো ইসলামের যথার্ত অনুসারী। যে ধর্ম বিশ্বগ্রাহী মানবতাকে বরণ করে প্রসারিত হয়েছে, সর্বোচ্চ মানবতার শিখরে যে ধর্মের অভিষেক, সেই ধর্মানুসারীদের একাংশরা যখন ইসলামকে মৌলবাদ চর্চার আখড়া বানিয়ে ইসলামের গায়ে কেবল খুন ঝরায়, তখন সত্যিই অবাক হতে হয়।
সকল সমস্যার মর্মমূলে যে প্রেক্ষণ রয়েছে-তা হল শান্তি স্থাপন করা। ইসলাম এই শান্তি স্থাপনের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করেছে। ঈদ-উল-ফিতরের পরশমণি ছোঁয়ায় হালফিলের মুসলিম বিশ্বের অভিষেক হতে হলে ইসলাম যে সংকট-অক্টোপাসের ঘেরাটোপে ক্ষতবিক্ষত, তা থেকে হতে হবে ইসলামের উজ্জ্বল-উদ্ধার। অশান্ত, রক্তাক্ত সমাজে ঈদ-উল-ফিতরের আনন্দঘন মর্মবাণী আমাদের ভাবনার অন্তর্লীনে পৌছায় না। কেবল দিয়ে যায় অন্ধকার আকাশে আসন্ন ঊষালোকের রক্তিম-উদ্ভাসন।
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট।

 

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT