বিশেষ সংখ্যা

ঈদের তাৎপর্য

জাহিদা চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ০৪-০৬-২০১৯ ইং ০২:০২:০৪ | সংবাদটি ৪৫ বার পঠিত

ঈদ মানে আনন্দ, ঈদ মানে খুশি। এ কথা আমরা সবাই জানি। আল্লাহ তায়ালার এই বিশাল পৃথিবীতে অনেক জাতি ও গোষ্ঠির বাস। নানা জাতির নানা রকমের জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতি লক্ষ করা যায়। তাদের রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন উৎসব বা পর্ব।
প্রতি বছরই মুসলমানদের জীবনে ফিরে আসে খুশির ঈদ। প্রথমটি উদযাপিত হয় দীর্ঘ ১ মাস সিয়াম সাধনার পর যাকে আমরা বলি ঈদুল ফিতর বা রোজার ঈদ। আর অন্যটি আত্মত্যাগের অর্থাৎ কুরবানী ঈদ বা ঈদুল আযহা। এই দুইটি ঈদ-ই হলো মুসলমানদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব।
ইসলামী সংস্কৃতির অনন্য উৎসব ঈদ। মুসলমানরা এ দিন কৃতজ্ঞচিত্তে খুৎবাসহ ঈদের দুই রাকাত নামাজ আদায় করেন। ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবাই কোলাকুলি সহ সালাম ও শুভেচ্ছার হাত বাড়িয়ে দেয়। সমাজের ধনী ও সক্ষম ব্যক্তিরা নির্দিষ্ট হারে গরিবদের ফিতরা শর্তহীন অনুদান বিতরণ করে থাকেন যা ধর্মীয় দিক থেকে ধনীদের জন্য বাধ্যতামূলক।
ঈদ এবং ঈদের উৎসব কিভাবে উদ্ভব হয়েছে তার ইতিহাস তথ্য সঠিকভাবে আজো জানা যায়নি। নানা ইতিহাস গ্রন্থ ও ঐতিহাসিক সূত্র ও তথ্য থেকে বাংলাদেশে রোজা পালন এবং ঈদুল ফিতর বা ঈদুল আযহা উদযাপনের যে ইতিহাস জানা যায় তাতে ১২০৪ খৃস্টাব্দে বঙ্গদেশ মুসলিম অধিকারে এলে ও এদেশের নামাজ, রোজা, ঈদ উৎসব প্রচলন হয়েছে তারও বেশ আগে থেকেই। বঙ্গদেশ যুদ্ধ বিগ্রহের মাধ্যমে মুসলিম অধিকারে আসার বহু আগে থেকেই মধ্য ও পশ্চিম এশিয়া থেকে মুসলিম সুফি দরবেশ সাধকরা ধর্ম প্রচারের লক্ষ্যে উত্তর ভারত হয়ে পূর্ব বাংলার আসেন।
এ বিষয়ে নানা ইতিহাস গ্রন্থ পর্যালোচনা করলে আরো দেখা যায় অষ্টম শতকের দিকেই বাংলাদেশে মুসলমানদের আগমন ঘটে। ফলে এই সুফি দরবেশ এবং তুর্ক আরব বণিকদের মাধ্যমে বর্তমান বাংলাদেশে রোজা, নামাজ ও ঈদের সূত্রপাত হয়েছে বলে মনে করা হয়। তবে তা ছিলো বহিরাগত ধর্ম সাধক ব্যবসায়ী ও ভ্রমণকারীদের ধর্মীয় কৃত্য উৎসব। এ দেশবাসীর ধর্ম সামাজিক পার্বন নয়। এ দেশে রোজা পালনের প্রথম ঐতিহাসিক বিবরণ পাওয়া যায় তাসফিয়াতুল মোলহা নামক গ্রন্থে। বঙ্গদেশ ইসলাম আগমন পূর্বকালে শাহ সুলতান রুমি নেত্রকোনা এবং বাবা আদম শহীদ বিক্রমপুরের রামপালে আস্তানা গেড়ে ইসলাম প্রচার শুরু করেন বলে জানা যায়।
শেখ উল খিদা চন্দ্র বংশীয় রাজা শ্রী চন্দ্রের শাসনকালে (৯০৫-৯৫৫) খৃস্টাব্দে বাংলায় আগমন করেন বলে অনুমান করা হয়। তবে এদের প্রভাবে পূর্ব বাংলার রোজা নামাজ ও ঈদ প্রচলিত হয়েছিলো তা বলা সমীচীন না। এরা ব্যক্তিগত জীবনে ইসলাম ধর্মীয় কৃত্য ও উৎসব পালন করতেন একথা বলাই সঙ্গত। ঢাকার ইতিহাসবিদ হাকীম হাবীবুর রহমান বলেছেন ১৬৪০ খৃস্টাব্দে বাংলার সুবেদার শাহ সুজার নির্দেশে তার প্রধান অমাত্য মীর আবুল কাশেম একটি ঈদগাহ নির্মাণ করেন।
মোগল আমলে দরবার আদালত বাজার ও সৈন্য ছাউনির কেন্দ্রে অবস্থিত ছিলো ঐ ঈদগাহ। এখানে সুবেদার নায়েবে নাজিম ও অভিজাত মোগল কর্মকর্তা এবং তাদের স্বজন বান্ধবরাই এখানে নামাজ পড়তেন। পরে ঈদগাহটি সকলের জন্য উন্মুক্ত করা হয়।
পৃথিবীর বিভিন্ন ধর্মে যে সব প্রধান ধর্মীয় উৎসব উদযাপিত হয় সে গুলোর মধ্যে ঈদুল ফিতর হচ্ছে সময়ের মাপকাঠিতে কনিষ্টতম কিন্তু আয়োজন, প্রয়োজনে ব্যাপক। ইসলামের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর মদিনাতে হিজরতের অব্যবহিত পরেই ঈদুল ফিতর উৎসব পালন শুরু হয়।
ঈদের আত্ম সামাজিক গুরুত্ব অপরিসীম। ঈদের সাথে রমজানের আত্মশুদ্ধির কথাও বলা যেতে পারে। কারণ রোজার সাথে ঈদের সম্পর্ক প্রত্যক্ষ, তাতে বদল হয়েছে ধর্মের অভিমিশ্র ও শুদ্ধ রূপেরও। মুসলমানদের জীবনে ঈদের তাৎপর্য অনেক। ঈদ অর্থ খুশি এবং ফিতর এসেছে ফিতরা থেকে। সুতরাং ঈদুল ফিতরের অর্থ দাঁড়ায় দান খয়রাতের মাধ্যমে পবিত্র ঈদের উৎসবকে আনন্দে মুখরিত করে তোলা। যাকাত ফিতরার মাধ্যমে ধনী ও গরিবের মধ্যকার ভেদাভেদ দূরীভূত হয় আর এতেই হয় মুসলিম হৃদয় উদ্বেলিত।
ঈদুল ফিতর মুসলিম জাহানের একটি অনন্য দিন। শাওয়াল মাসের প্রথম তারিখে পালিত ঈদুল ফিতর। সারা রমজান রোজা পালনের মাধ্যমে মুসলমানরা নিজেদের পাপ ও পাশবিক প্রবৃত্তি দমন করে থাকে। মহানবী (সঃ) বলেছেন ঈদুল ফিতরের দিন আল্লাহ রোজাদারদের সব গুনাহ মাফ করে দেন। স্বাভাবিক বলা যায় উৎসব পালনের মাধ্যমে মুসলমানরা আখিরাতে নাযাত পাবার প্রয়াস পায়।
হযরত সাদ বিন আওস আনসারী (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে মহানবী (সঃ) বলেছেন ঈদুল ফিতরের দিন ফেরেশতারা রাস্তার প্রতিটি গেটে দাঁড়িয়ে যান এবং মুসলমানদের ডেকে বলেন হে মুসলমানগণ তোমরা তোমাদের পরমদাতা প্রভুর দিকে চলো। যিনি নিজ কৃপায় তোমাদেরকে শান্তি ও মঙ্গলের শিক্ষা দেন তার ওপর আমল করার শক্তি দেন। অতঃপর এর উপরই তোমাদেরকে পুরষ্কৃত করেন। ঈদের দিন প্রতিদিন পুরষ্কার লাভের দিন। এ কারণে আসমানে ও এ দিনের নাম ইয়ামুল জায়িজাহ ইনাম প্রাপ্তির দিন। ঈদ উৎসব শুধু আনন্দ উৎসব নয় বরং এটি একটি তাৎপর্য পূর্ণ উৎসব বা ইবাদতের দিন। ঈদের গুরুত্ব ও মাহাত্ম অপরিসীম।
ইসলামের প্রতিটি বিধানে তাৎপর্য রয়েছে। আল্লাহ পাক তার বান্দাদের প্রশিক্ষণ ও মঙ্গলের জন্য বিভিন্ন বিধান ও অনুশাসন চালু করেছেন। ঈদ আমাদেরকে অনুপম শিক্ষা প্রদান করে। সমাজে মানুষের মধ্যে ঈদ পবিত্র সম্পর্ক গড়ে দিয়ে ঐক্য ও সংহতির শিক্ষা দেয়। পারস্পরিক দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে মানুষে মানুষে সহমর্মিতা প্রকাশের একটি মাধ্যম হলো ঈদ।
আমরা ঈদুল ফিতরের তাৎপর্য অনুধাবন করে এই উৎসব থেকে ফায়দা লাভ করতে সমর্থ হই। ঈদ আমাদের ভ্রাতৃত্ব বন্ধনকে সুদৃঢ় করে দেয়।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT