বিশেষ সংখ্যা

সোনালি স্মৃতি

ইছমত হানিফা চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ০৪-০৬-২০১৯ ইং ০২:০৩:৪৭ | সংবাদটি ১৫০ বার পঠিত

হারিয়ে যাওয়া বাঁকা চাঁদ। কিছুটা আলো আর কিছুটা আঁধার। আজ যা শাশ্বত, কাল তা স্মৃতি। নতুন স্মৃতির ভারে পুরনো স্মৃতি চাপা পড়ে, কিন্তু হারিয়ে যায় না। কিছু কিছু স্মৃতি অবিস্মরণীয়, অমাবস্যার অন্ধকার কাটিয়ে পূর্ণিমার চাঁদের মতো উজ্জ্বল হয়ে চোখের সামনে ভেসে উঠবেই। এখনকার ঈদের সাথে তুলনা করে যদি দেখি গত হওয়া ঈদ। ছেলেবেলার ঈদ না বলে যদি বলি এনালগ সময়ের ঈদ, তবে খুব একটা ভুল হবে না। সিলেট শহরে তখন লোকসংখ্যা অনেক কম ছিল। আমি যে সময়ের কথা বলছি তা ১৯৮৫-১৯৮৬ ইংরেজি। এই শহরের উঁচু দালানের উচ্চতা বড়জোর পাঁচতলা। শপিংমল বলতে জিন্দাবাজারের জালালাবাদ, সবুজ বিপনী, লন্ডন ম্যানশন ছিল উল্লেখযোগ্য, আধুনিক শপিংমল। ঐ সময় পুরো রমজান মাস স্কুল বন্ধ থাকতো। আমি তখন দরগা গেইট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ি। স্কুলের সামনে বিরাট মাঠ, এখনকার ভি.আই.পি রোডগুলো অনেক ছায়াঘেরা আর ছোট ছিল। স্কুলের সামনে রাস্তার পাশে বড় পানির কোয়া ছিল। তখনকার দিনে শহরের সুপেয় পানির জন্য ছোট ছোট টিলার পাশে কুয়া থাকতো। মনে আছে, গৌড়গবিন্দ টিলার পাদদেশে ছিল একটা, নরসিংটিলার কাছে ছিল একটা, মহিলা কলেজের ভিতরেও ছিল। এভাবে আরো অনেক জায়গায় ছিল। কুয়ার পানি খুব ঠান্ডা আর স্বচ্ছ ছিল। রমজান মাস আসলেই পুরো শহর এক পবিত্র সাজে সজ্জিত হয়ে থাকতো। ইফতার, সেহেরিতে সাইরেন বাজিয়ে সময় জানান দেয়ার রেওয়াজ ছিল।
যেহেতু গাড়ি সংখ্যা কম থাকায় সাইরেন এর শব্দ অনেক দূর থেকে পরিষ্কার শোনা যেত। আমাদের কাজলশাহ এলাকায় পঞ্চায়েত মিটিং-এ সবার সহযোগিতায় লোক নিয়োগ করা হত সেহেরির সময় সবার দরজায় গিয়ে ডেকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলার জন্য। আমাদের পাড়ার অর্থাৎ এখনকার কাজলশাহ-ই ব্লকের দায়িত্ব সবসময় পালন করতেন সুনু মিয়া। তিনি এমনিতেও সারা বৎসর মসজিদের মুষ্টি চাল (মুঠো চাল) তুলতেন। প্রতি সপ্তাহে মসজিদে মুঠো চাল দেয়ার রেওয়াজ এখন আর নেই। যদিও তখন অনেকের ঘরে টিএন্ডটি’র চার ডিজিটের এনালগ ফোন ছিল তবুও প্রতিবেশি সবাই একজন আরেক জনের সেহেরির সময় খবর নিতেন। সবাই এতোটাই আন্তরিক ছিলেন। পাড়ার ছেলেরা একসাথে ফজরের নামাজ পড়তে মসজিদে যেত। রকমারি ইফতারের দোকান ছিল না, যা অল্প কিছু ছিল তা বন্দরকেন্দ্রিক। একটু সৌখিনতা নিয়ে আম্বিয়া মিষ্টি ঘর এবং কাকলি মিষ্টি ঘর ছিল জিন্দাবাজারে। তবে স্থানীয় বাজারে সব পণ্যের সাথে ভূষি দিয়ে ঢাকা বরফ বিক্রি হত। সবার ঘরে ঘরে ফ্রিজ না থাকায় অনেকেই এই বরফ কিনে এনে পানি ঠান্ডা করে খেতেন।
মধুর স্মৃতি হচ্ছে বাগানের সুন্দর ফুলের মতো যা মানুষকে মাঝে মাঝে সুঘ্রাণযুক্ত ও চমৎকৃত করে। তেমনি স্মৃতি হচ্ছে আমার মায়ের কাপড় সেলাই। তখনকার সময় বিটিভি-তে রুমঝুম বলে ছোটদের একটা নাচের অনুষ্ঠান লায়লা হাসান করতেন। ঐ অনুষ্ঠানের শিশুদের পরণের কাপড় দেখে, আবার কখনো ঈদের বিশেষ সংখ্যা বেগম পত্রিকা, কিংবা কলকাতার সানন্দা ম্যাগাজিনের ভিতরের নতুন নতুন ডিজাইনের জামা থাকতো তা দেখে জামা বানিয়ে দিতেন। আমরা মায়ের সৃজনশীল চিন্তার মিশ্রনে বানানো পোষাক আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু মহলে অনেক প্রশংসা পেত। আমাদের তিন বোনের এবং কাজিনদের কাপড় বানানো শুরু হত রমজানের প্রথম রাত থেকে। আর এই কাজ চলতো চাঁদ রাত পর্যন্ত। এখনকার মতো টিউবের মেহেদি ছিল না। মেহেদি গাছের বাটা পাতা দিয়ে সবাই সাতাশ রমজানে মেহেদি মাখতাম। সারা রাত সবাই একসাথে বসে মেহেদি মাখতাম। পরিবারের বড়রা ছোটদের হাতে মেহেদি পরিয়ে দিতেন।
চাঁদ দেখার সন্ধ্যাটা ছিল খুব আবেগি। বিটিভি থাকলেও তা শুরু হত বিকাল চারটায়। লাইভ কোন কিছু ছিল না। রেডিও শোনা হত শিক্ষিত মহলে। রেডিও বিবিসি’র খুব কদর ছিল বুদ্ধিজীবী সমাজে। অতকিছুর পরও ঈদের চাঁদ দেখার খবর নিজেদের নিতে হত। উনত্রিশ রমজান ইফতার করে পাড়ার বড়-ছোট সবাই দলবেঁধে বের হতাম কখনো বাসার পাশে খোলা মাঠে, ছাদে, আবার কখনো টিলায়। আব্বা দূরবিন হাতে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতেন, আর বাকি সবাই আব্বাকে ঘিরে দাঁড়াতাম। শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা গেলে আব্বা সেখানে দাঁড়িয়ে দোয়া পরিচালনা করতেন। প্রতিবেশিরা সবাই শরীক হতেন। এমন পবিত্র দৃশ্য এখন আর দৃশ্যমান হয় না।
চাঁদ দেখার খবর শোনার পর শুরু হতো পিঠা, পুলি বানানোর উৎসব। মা-চাচিদের আদরমাখা এই রসনার আয়োজন পাড়া-প্রতিবেশীর সহযোগিতায় মুখরোচক গল্পের মধ্য দিয়ে প্রায় সারারাত চলতো।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন-নতুনকে দেখতে হলে, মনকে একটু বিশেষ করে বাতি জ্বালাতে হয়, পুরানোকে দেখতে হলে ভালো করে চোখ মেলতে হয় না। স্মৃতি সে তো দৃষ্টির সীমানায় বাস করে। ঈদের দিন সকালে-সবাই মিলে পুকুরে গোসল করে নতুন জামা-কাপড়, জুতা পরে অপেক্ষায় থাকতাম। বাবা-ভাইয়েরা নামাজ থেকে ঘরে ফিরলেই পরিবারের বড়দের সালাম করে বেরিয়ে যেতাম পাড়া-প্রতিবেশি, আত্মীয়-স্বজনকে সালাম করতে। আমার দুই ফুফুর নেতৃত্বে আমরা বেড়াতাম। তখনকার সময়ের মা-বাবা কখনোই নিরাপত্তার বিষয় এখনকার মতো এতো বেশি চিন্তিত ছিলেন না। বেশির ভাগ সময় হেঁটে হেঁটে বেড়াতাম। রাস্তায় পরিচিত কাউকে পেলে জড়িয়ে ধরে কি আনন্দ।
প্রতি ঈদে সব বন্ধুরা মিলে নতুন রিলিজ হওয়া ক্যাসেট কিনতাম। আরেকটা ব্যাপার পনের রমজান থেকে শুরু হত-তা হচ্ছে ঈদ কার্ড পোস্ট করা। কখনো আব্বা কিনে এনে দিতেন এই কার্ড, আবার কখনো আমরা নিজেরা বানাতাম। সেই কার্ড কাছাকাছি বন্ধুদের কাছে পৌঁছাতে এক বন্ধু আরেক বন্ধুর হয়ে ডাক পিয়নের কাজ করে দিতাম। পরিবারের বেশির ভাগ সদস্য দেশের বাইরে থাকায় তাদের কাছেও কার্ড পোষ্ট করতাম, আবার বিদেশ থেকেও কার্ড আসতো। ঈদের দিন বসার ঘরে সুন্দর করে এই কার্ডগুলো সাজিয়ে রাখতাম।
সারাদিন বেড়ানোর পর রাতে ঘরে ফিরে সবাই এক সঙ্গে বিটিভি’র নাটক দেখতাম। কখনো কখনো বিটিভিতে ঈদ উপলক্ষে সাদা-কালো বাংলা সিনেমা দেখানো হতো সবাই মিলে দেখতাম। আবার আনন্দমেলা নামে বিটিভি-তে আব্দুল্লাহ আবু সায়্যিদ সাহেব একটা ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান করতেন, তা দেখে খুব মজা পেতাম। স্মিত বলেছেন আজকের সাথে গতকালের পার্থক্য থাকবেই তবু আমরা স্মৃতি খুঁজবো, স্মৃতি ভালবাসবো।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT