বিশেষ সংখ্যা

কবিদের অলৌকিক যাত্রা

এম. আশরাফ আলী প্রকাশিত হয়েছে: ০৪-০৬-২০১৯ ইং ০২:০৪:২৬ | সংবাদটি ৪৫ বার পঠিত



স্যাটেলাইটের মাধ্যমে একটা ভিনগ্রহের সংবাদ চাউর হলো-কবিদের সে গ্রহে দাওয়াত। অবশ্য দাওয়াতটি শুধু কবিরা পাননি। বাংলাদেশে যত মোবাইল এক্টিভ ছিল প্রত্যেকেই পেল ম্যাসেজ আকারে। তবে কবিদের ম্যানশন করা দাওয়াত পত্রটি সাধারণের বেলায় প্রযোজ্য নয়। অবাক করা ব্যাপার যে-আগামী চন্দ্রমাস শুরুর আগের দিন অর্থাৎ অমাবশ্যার রাত বারটা এক মিনিটে যাত্রা শুরু করতে হবে। যাত্রার জন্য নির্ধারিত স্থান উল্লেখ থাকলেও কোন্ বাহনে যাবে তার উল্লেখ নেই। তবে ভিনগ্রহের দাওয়াতে কবিদের মধ্যে একটা সাড়া পড়ে গেল। একে অন্যকে ফোন করে বিষয়টি নিশ্চিত হলেন।
কবিদের মধ্যে ভয় ভয় ভাব থাকলেও এ বিষয়টি ছিল গর্বের। কারণ ভিনগ্রহের দাওয়াত পাওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। চিঠির ট্রেডমার্কই গর্বের কারণ। একটা ভিনগ্রহ থেকে কবি চিহ্নিত চিঠি! ওরা জানলো কী করে যে এখানে এত কবির বাস। আসলে একটা পর্যায়ে পৌঁছে গেলে সে জিনিসটি আর চাপা থাকে না। গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে পৌঁছাতে কতক্ষণ...। স্যাটেলাইটের যুগ। ভিনগ্রহীরা এ থেকেই হয়ত জেনে গেছে।
নির্ধারিত রাতে নির্ধারিত স্থানে কবিরা হাজির। মনে গভীর আগ্রহ। ভিনগ্রহ থেকে কেমন যান আসবে? কারা এর বাহক? কেমন হবে সে যাত্রা? সে লোকগুলোই বা কেমন? কৌতুহলের শেষ নেই। মৃত্যু ভয়ও আছে। উর্ধ্বলোকে যদি অক্সিজেনের অভাব হয়? আবার সাহসও হয় ওরাতো আমাদের দুশমন নয়। ভিনগ্রহের মানুষের সাথেতো কোনদিন হিচ হয়নি। ওরাতো আমাদের গুণমুগ্ধ। কাজেই নেগেটিভ চিন্তা করে লাভ নেই। এ ছাড়া ভিনগ্রহের লোক আমাদের মত অত জটিল নয়। ওরা প্যাচ পাচ বুঝে না। ওরা সত্যই বলে। মিথ্যা কখনও বলে না। তাই ওদের ভয় করে লাভ নেই। যাই হোক বিপুল সংখ্যক কবি সমবেত হয়েছেন এক অশ্বত্থ গাছের নিচে। এই গাছ ছাড়া আর আশেপাশে যতটুকু চোখ যায় শুধু ফাঁকা মাঠ। এ জায়গাটি পছন্দ করার কারণও আছে। বিশাল একটা বাহন তো নামতেই হবে। এত লোক জায়গা করার একটা স্পেসও দরকার। যাই হোক কবিদের অবস্থানের জায়গাটি বেশ পছন্দেরই। মনে মনে খুশিই হলেন কবিরা।
রাত তখন কাটায় কাটায় বারটা। হঠাৎ দেখা গেল ইশান কোণ হতে একটা আলোক পিন্ড ধেয়ে আসছে কবিদের দিকে। কবিরা বেশ উৎফুল্ল। নতুন একটা জগতের সাথে পরিচিত হতে যাচ্ছেন। এই মুহূর্তে শত শত মোবাইল ক্যামেরা তাক করে আছে ওটির দিকে। বস্তুত দৃষ্টিগোচর হওয়া মাত্রই যেন ক্লিক করা যায় আর সাথে সাথে পাবলিক মিডিয়া ফেইসবুকে চালান করে সবাইকে জানিয়ে দেয়া যায়। ঠিক বারটা এক মিনিটে একটা বিশাল আকারের রথের মত বাহন নামল অশ্বত্থ গাছের পাশে মাটিতে। সকল ক্যামেরা ক্লিক করতে গেল। কিন্তু কোন ছবি উঠল না। সবাই অবাক। কিন্তু ওরা মুহূর্তেই এই সিদ্ধান্তে এলো-এটা কোন সাধারণ বাহন নয়। পৃথিবীর যত শক্তি আছে তা এর উপর কার্যকরি নয়। ভিনগ্রহের জিনিস। ওদের মান আমাদের চাইতে বেশ উন্নত তো হবেই।
যানের পরিচালক মাত্র দু’জন। একজন ড্রাইভ করার মত কিছুতে বসা আর একজন গণনা বা শৃঙ্খলার কাজে ব্যস্ত। আশ্চর্য ব্যাপার এক মিনিটে একটা স্কেল দিয়ে লোকসংখ্যা নির্ণয় করে ফেলল লোকটি। ৯৮০১ জন।
কবিরা লোক দুটোকে বেশ পরখ করলেন। ওরা গায়ে খুব ছোট। গায়ের তুলনায় মাথা একটু বড়। চাইনিজ রেস্তোরার সামনে দায়িত্বে থাকা বামুন টাইপের লোক মনে হলো। হাঁটা চলা-হাত, পা নাড়ানো ইত্যাদি ক্রিয়া কলাপ বাংলা বামুনের মতই। কিন্তু দেহ থেকে আলো বিচ্ছুরিত হচ্ছে। মনে হলো দুই মানুষ দুটো জীবন্ত নক্ষত্র।
সবাই উঠলে কোন শব্দ ছাড়াই উপর দিকে উঠতে শুরু করল যানটি। নিমিষেই একটা স্টেশনে পৌঁছল। সাথে সাথেই অনেক বামুন এসে চতুর্দিকে ভিড় করল। হাতে মেটাল ডিক্টেটর এর মত কিছু। পরীক্ষা করতে শুরু করল প্রত্যেককে। সাফ ইংরেজীতে বলল যার বাংলা দাঁড়ায় ‘শুধুমাত্র অস্ত্রবহনকারিরাই আমাদের গ্রহে যেতে পারবে।’
কবিরা তো অবাক। আমরা তো কোন অস্ত্র আনিনি। তাহলে আমাদের কি বাদ দেবে? কথাটি মনে আসার সাথে সাথে বামুনদের সরদার চৌচাই বলল, ‘এটা আমরা বুঝক, আপনারা ব্যস্ত হবেন না। কবিদের সবাই ভাবলেন বাবারে বাবা, মনে আসার সাথে সাথেই ওরা বুঝে গেল।
মেটাল ডিক্টেটরের মাধ্যমে ১৯৮ জন পাওয়া গেল যাদের মধ্যে কোন অস্ত্র নেই (তাদের ভাষায়) অন্য একটি যানে ওদের তোলা হলো এবং নিমিষেই পাঠিয়ে দেয়া হলো যেখান থেকে ওদের নেয়া হয়েছিল। মূল যানটি আবারও যাত্রা শুরু করল। কয়েক মিনিটের মধ্যে উর্ধ্বালোকে আরেকটি স্টেশনে থামলো। আগের মত বামুন দল এসে ঘেরাও করল এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করল। ওদের প্রধান চৌবাও তৎপরতার সাথে কাজটি সমাধান করল। এখান থেকে ২৫০০জনকে পৃথিবীতে ফিরিয়ে দেয়া হয়। ওদের ভাষায় এদের কাছে অস্ত্র পায়নি।
এভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হলো আরও দুটি স্টেশনে। সর্বশেষ বৃহস্পতিতে যখন যানটি থামল তখন মোট কবি সংখ্যা ৯৯। অর্থাৎ এদের অস্ত্র সমেত গ্রেফতার দেখানো হলো। ৯৮০১ জন হতে ৯৭০২ জনকেই পৃথিবীতে ফেরত পাঠানো হলো।
এবার ৯৯ জন কবির অস্ত্র রাখার অপরাধে বিচার শুরু হলো। কবিরা অত্যন্ত ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়লেন। ব্যাপার কী? আমাদের দাওয়াত দিয়ে এনে এই অবস্থা? এই অপমান? কে বলেছে দাওয়াত দিতে আর কে বলেছে বিচার করতে? কবিদের মধ্যে একজন ভাল ইংরেজী বলতে পারতেন। তিনি অত্যন্ত প্রাঞ্জল ভাষায় একটি বক্তৃতা দিতে শুরু করলেন। যার বাংলা হলো- হে বৃহস্পতির বন্ধুরা-আমাদের বিচার প্রক্রিয়ায় নেওয়ার আগে আমাদের পক্ষে দুটি কথা বলার সুযোগ দিতে হবে। বৃহস্পতি গ্রহের বিচারিক প্রধান চৌচিয়াং বলল ‘ঠিক আছে যা বলতে চান বলুন, যতক্ষণ ইচ্ছা বলুন।’ কিন্তু বিচার প্রক্রিয়া থেকে আপনাদের বাদ দিতে পারব না। কারণ বহুদিন ধরে আমরা বিভিন্ন গ্রহে ঘুরে যে জিনিসটি লক্ষ্য করেছি সেটি হচ্ছে-অন্যান্য গ্রহের কবি বন্ধুরা সাদাসিদে ধরনের হলেও পৃথিবীর তথা বাংলাদেশের কবিরা খুব জটিল। তাদের মনে সব সময় অস্ত্রের মহড়া চলে। আমরা তা লক্ষ্য করেই মূলত আপনাদের গ্রেফতার দেখিয়েছি।
কবিদের প্রধান বলতে শুরু করলেন-দেখুন আমরা কবি মানুষ। আমরা প্রকৃতি দেখি, মানুষ দেখি, পশু-পাখি দেখি। আমরা ওদের ভালবাসি। আর ভালবাসি বলেই আমরা ওদের নিয়ে কবিতা লেখি, সাহিত্য রচনা করি। আমরা আমাদের সুখ বিবেচনা না করে ওদের ভালো দুটি কথা বলি। দেশ তথা পৃথিবী হউক শান্তির নীড়-এটাই আমরা চাই। বাংলাদেশের বেশির ভাগ কবিই অস্বচ্ছল। তথাপি ওরা কবিতার পিছেই ছুটেন। এখানে আমাদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে তা আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়। আমাদের কাছে অস্ত্র আছে এর কোন ভিত্তি নেই। এতদিন ধরে আমরা জানতাম যে ভিনগ্রহের বাসিন্দারা সত্যের উপর চলেন। কখনও মিথ্যা বলেন না। কিন্তু আজ এটা প্রতীয়মান হচ্ছে আপনারাও আমাদের মতই। আমাদের থেকে বেশ উন্নত না। যদি হতেন তাহলে এমন ডাহা মিথ্যা অভিযোগে আমাদের অভিযুক্ত করতেন না। আর যদি অস্ত্র থাকতই তাহলে আমরা আপনাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরতাম।
হা হা হা হা---- চৌচিয়াং অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন। আর বললেন দেখুন-আপনাদের অস্ত্র এই গ্রহে কোন কাজে আসবে না। কারণ এটা আপনাদের পৃথিবী নয়। এটা বৃহস্পতি। এখানে পৃথিবীর কোন অস্ত্র চলবে না। আপনি যে অভিযোগটি মিথ্যা মিথ্যা বলছেন তা কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রমাণিত হবে এবং আমরা অস্ত্র উদঘাটন করব। কারণ আমি এই মুহূর্তেও দেখতে পাচ্ছি আপনারা ৯৯ জনই অস্ত্রবহন করছেন।
ইতোমধ্যে হুঢুমিন, আইতুতাই, ইডুডং এর নেতৃত্বে বেশ ক’জন ডাক্তারকে হাজির করা হলো। মুহূর্তের মধ্যে ৯৯ জনকেই অপারেশন করে তাদের হৃদপিন্ডের গভীর থেকে বেশ বড় ধরণের ডিম্বাকৃতি বস্তু বের করে আনা হলো এবং সাথে সাথে সেলাই করে রঙের স্প্রের মত কি একটা মেশিন থেকে স্প্রে করলে সবার শরীর আগের মতই হয়ে গেল। একটু আগে যে অপারেশন করা হয়েছিল তা বুঝাই যাচ্ছে না।
কবিরা হাতড়ে হাতড়ে তাদের বুকটা দেখছিল। আর আশ্চর্য হলো যে এত বড় একটা জিনিস বহন করছিলাম অথচ টেরই পাইনি। কবি প্রধান এরই মধ্যে দেন দরবার শুরু করেছেন। তিনি বললেন মিঃ চৌচিয়াং এটাতো কোন অস্ত্র নয় এটা হচ্ছে মাংস পিন্ড। আর আপনারা অস্ত্র রাখার অপরাধে আমাদের গ্রেফতার করেছেন। আর অস্ত্র কি কেউ ভেতরে রাখে?
মাথা দুলিয়ে মিঃ চৌচিয়াং বললেন-হ্যাঁ ঠিকই বলেছেন-এটি কোন অস্ত্র নয় এটা কেবল আপনাদের কাছে। কিন্তু এটা আমাদের কাছে অস্ত্র থেকেও ভয়ঙ্কর। কবিদের কাছে এটি থাকা উচিত নয়। কবিরা হচ্ছে বিশ্বমানবতার বন্ধু। সাদা, কালো, ধনী-গরিব, শত্রু-মিত্র নির্বিশেষে সবার প্রতি সমান আচরণ করা। সবার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি এক রাখা। কোন বিশেষ ধরণের সাপ মনে পুষে বিষের কালি দিয়ে অন্যকে ছোবল মারা সঠিক নয়। আমাদের কাছে ঐ হিংসার ছোবলই পিস্তলের গুলির চেয়েও ভয়ঙ্কর। কবিদের ভালবাসায়ই পৃথিবীটা স্বর্গে পরিণত হবে, শত্রু মিত্র হবে, পর-আপন হবে। আর প্রতিশোধ পরায়ণ শত্রুরাও কবিদের উদারতায় বিমুগ্ধ হবে----।
মিঃ চৌচিয়াং এর নির্দেশে আবারও সেই যানটি নিমিষেই প্রস্তুত করা হলো। ৯৯ জন কবি দৌড়ে গিয়ে যানে উঠলেন। অল্পক্ষণেই বাংলাদেশের সেই অশ্বত্থ গাছের পাশে এসে থামল রথটি। রথটি মাটিতে একটা কেমন যেন গোত্তা খেল আর ছিটকে পড়ল সকল কবি। নাম ডাকওয়ালা কবি মন্টু হায়দার চিৎকার করে উঠলেন---- আর অমনি তার পাশে থাকা প্রিয়দর্শিনী বধূ বললেন-কি গো ওমন চিৎকার করছ কেন?
-টেবিলে রাখা পানির গ্লাস হতে এক ঢুক পানি খেলেন মন্টু হায়দার-----।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT