বিশেষ সংখ্যা

ঈদ বিনোদন : রুচি ও প্রগতির সমন্বয়

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান প্রকাশিত হয়েছে: ০৪-০৬-২০১৯ ইং ০২:০৭:১১ | সংবাদটি ৫২ বার পঠিত



ঈদ মুসলমানদের জাতীয় সাংস্কৃতিক চেতনার প্রধান উৎসব। মুসলমানগণ ঈদ উৎসবের মধ্য দিয়ে নিজেদের অস্তিত্বের প্রমাণ উপস্থাপন করে। যারা দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার দ্বারা আল্লাহ তা’য়ালার হুকুম পালনের নিমিত্তে কষ্ট স্বীকার করে তাকওয়া বা আত্মসংযমশীলতা অর্জনে সক্ষম হয়েছে মূলত তাদের জন্যই ঈদ হয়ে উঠে আনন্দ, খুশি ও ভালোবাসাবাসির উৎসব। ঈদুল ফিতরের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন এবং ঈদুল আজহার কোরবানীর মাধ্যমে ত্যাগের প্রশিক্ষণ অর্জিত হয়। ঈদ উৎসবকে একদিকে যেমন ইবাদত নামক আনুষ্ঠানিকতার কড়া শাসনের আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা হয়নি তেমনি একেবারে ইবাদতের শৃঙ্খল থেকে বিচ্ছিন্ন হবারও সুযোগ করে দেয়নি। ঈদের নামাজ, খুতবা ও আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে যে সহজবোধ্যতা আছে, তেমনি আছে সুসংঘবদ্ধতার মহান শিক্ষা। এর মাধ্যমে ধনী-গরীব, বাদশাহ-ফকির সকল শ্রেণীর মানুষকে উন্মুক্ত ময়দানে সমবেত করে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বসমূহের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়। জাতীয় ঐক্য ও সংহতি, দেশপ্রেম, মানবতাবোধ জাগানো, আভিজাত্যের মিথ্যা অহঙ্কার এবং সামাজিক ব্যবধানে কুঠারাঘাত করে মানুষে মানুষে ব্যবধান কমানো, সর্বোপরি সকল মুসলমান ভাই ভাই এ মহান মন্ত্রে উজ্জীবিত করে ঈদ উৎসবের নানাবিধ কর্মসূচী।
রমজান মাস আসে ক্ষুধা তৃষ্ণার কষ্ট অনুধাবন করার শিক্ষা নিয়ে। সমাজের গরিব, অনাথ ও কথিত নিচু শ্রেণীর মানুষের জীবনযাত্রা বিশেষত ক্ষুধা পিপাসার কষ্ট অনুভব করে তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার জন্য রোজা আসে। ঈদ উৎসবে তা পরিপূর্ণতার কথা থাকলেও বাস্তবে তা পাওয়া যাচ্ছে কি? ঈদ উপলক্ষে হাই ফাই স্টাইলে শাহিবাজার করার জন্য মাসিক বেতন কিংবা অর্জিত টাকার চেয়ে আরো বেশি কিছু চাই। সরকারীভাবে অনেকের বোনাসের ব্যবস্থা থাকলেও তা দিয়ে উদর, চোখ ও মন কিছুই ভরে না; আরো চাই, মিসেসের জন্য দামি শাড়ি, পরিবারের সদস্যদের জন্য চোখ ধাঁধানো ঈদ মার্কেট না হলেই নয়। এ ধাক্কা সামাল দিতে রোজার মাসে তাই ঈদ খরচের জন্য ঘুষ নেয়ার প্রবণতা বেড়ে যায়। ঘুষটা অবশ্য সরাসরি হাতে না নিয়ে কেউ কেউ পকেটে কিংবা টেবিলের ড্রয়ারে রেখে যেতে বলেন কিংবা পিয়ন চাপরাসি দ্বারা নেয়ার ব্যবস্থা করেন, কেননা হাজারো হলেও রোজার মাস তো। এ মাসে আত্মসংযমশীল হওয়ার কথা থাকলেও ঈদ খরচের জন্য ছিনতাই ও চাঁদাবাজিও বেড়ে যায় বহুগুণে। যারা এসব করেন তাদেরও একটি বৃহত্তম অংশ মুসলমান নামধারী এবং রোজা না রাখলেও ইফতারির টেবিলে রাজপরিবেশে ইফতার করেন।
রোজার অর্জিত ‘তাকওয়া’ পরবর্তী ১১ মাসের ট্রেনিং কোর্স হলেও তা সাধারণত রোজার প্রথম দশক পর্যন্ত লক্ষ্য করা যায়। সারা বছর নামাজ না পড়লেও রোজার সময় তারাবির নামাজের সময় মসজিদে জায়াগা পাওয়া কঠিন। এটি অত্যন্ত আশার দিক যে অন্তত রোজার প্রভাব তারাবিতে পড়েছে। কিন্তু প্রথম দশকের পর অবশ্য সে দৃশ্যের ভাটা লক্ষ্য করা যায়। এভাবে রোজার শেষ দশকে মসজিদে সাবেক চিত্রই ফুটে ওঠে। তবে ২৬ রমজান দিবাগত রাত্রে ‘ক্বদরের’ ফজিলতের উসিলায় মসজিদে উপচে পড়া ভিড় থাকে। অবশ্য ফজরের সময় সেই সাবেক চিত্র, শূন্য কাতার। এরপরে ভিড় জমে ঈদগাহের নামাজে। শুধু সুন্দর ও পরিপাটি নয় বরং বাহারি পোশাকের ভিড়ে আসল রোজাদার ঠাঁই পায় না প্রথম সারিতে। ঈদগাহ থেকে ফিরে জোহর নামাজে মসজিদে যাওয়ার সময় কোথায়! ঈদের আনন্দ, ইলেকট্রনিক ও প্রিন্টিং মিডিয়ার বদৌলতে অনুষ্ঠানের তো আর শেষ নেই। অশ্লীলতায় পরিপূর্ন বিশেষ বিশেষ অনুষ্ঠান, পত্রিকার ক্রোড়পত্র বিনোদনে অপ্সরীদের উলঙ্গ শরীর এবং সুন্দর ছবির দৃশ্য উপভোগ, মেহমানদারির ভিড় ইত্যাদিতেই সময় কাটে। সেদিন থেকেই তাকওয়ার চেতনায় কড়া মৌলবাদী গন্ধ, অতএব এটা অবশ্যই পরিত্যাজ্য।
ঐক্য শক্তি শান্তি প্রগতি তথা ভ্রাতৃত্ববোধ, বৈষয়িকতা ও আধ্যাত্মিকতার সম্মিলন ঘটানোর মাধ্যমে মানবতাবোধে উজ্জীবিত হওয়ার জন্যই ঈদ উৎসব। অথচ ঈদের কেনাকাটা থেকে শুরু করে যে কোন ঘরোয়া অনুষ্ঠানেও রোজার পরিবেশ চোখে পড়ে না। অন্যকে ঠকিয়ে নিজের পকেট ভর্তির জন্য পণ্য বিক্রির সময় গুণগত মানের ক্ষেত্রে যেমন প্রতারণা তেমনি মূল্যের ক্ষেত্রেও আকাশ পাতাল পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। সেই সাথে বেপর্দা সাজোয়া নারীদের কেনাকাটার ভিড়ে দোকানে যেমন চান্স পাওয়া কঠিন তেমনি তাদের পারফিউমের উদ্ভট ও বিচিত্রময় প্রয়োগে রোজাদারের রোজার পবিত্রতা যে কোথায় পালায় তা ভুক্তভোগী মাত্রই অবগত।
রোজা ও ঈদকে ঘিরে কিছু কিছু কালচার গড়ে উঠেছে যা বাহ্যত সত্যিই প্রশংসনীয়। বিশেষ করে ইফতার পার্টি, ঈদকার্ড বিতরণ, ঈদ পুনর্মিলনী প্রভৃতি। এ উৎসবগুলো সত্যিকারার্থে মুসলিম সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করার কথা। ইফতার পার্টির মাধ্যমে অনেক রোজাদার একত্রিত হয়ে সিয়াম সাধনার ফজিলত, তাকওয়া অর্জনের পদ্ধতি তথা নিজেকে পূর্ণাঙ্গ মুমিন হিসেবে তৈরী করার প্রশিক্ষণ পেয়ে থাকে। অনেক রোজাদার একত্রিত হয়ে সমবেত ইফতার করার মধ্য দিয়ে যেমন আত্মিক প্রশান্তি লাভ করা যায়, তেমনি ভ্রাতৃত্ববোধ ও ঈমানিয়াতে আরো মজবুতি অর্জনের সুযোগ ঘটে। কিন্তু দুঃখের বিষয় এ মাহফিলও এখন স্বার্থচরিতার্থ করার অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। সামাজিকতা রক্ষা, রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল কিংবা নিজেদের কুকর্ম আড়াল করার জন্যও এ ধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়ে থাকে। এমনও দেখা যায় যে, ইফতার মাহফিল বাস্তবায়ন কমিটির সদস্য সচিব রাজেশ মৈত্র কিংবা নগেন ঠাকুর। তখন এটাকে একটি ‘আইওয়াশ’ মূলক অনুষ্ঠান বলাই যুক্তিযুক্ত নয় কি? রমজানের লাইলাতুল ক্বদর উদযাপনও ইদানীং ঘটা করে করা হয়। উৎসবমুখর পরিবেশে রাত্রি জাগরণ ও ইবাদত করা অপরাধের কিছু নয় বরং অন্যকে উৎসাহিত করা হয় বটে। কিন্তু এতে আতশবাজি, লাইটিং কিংবা অপচয়মূলক খরচ ও আনুষ্ঠানিকতা মোটেই ইবাদত হতে পারে না। এমনকি রান্নাবান্না, হইচই আর আতশবাজির মহড়ায় ইবাদতকারীর খুশুখুজু বিনষ্ট হয়। অন্যদিকে ঈদকার্ডের মাধ্যমে কোন মুসলিমকে দাওয়াত করা কিংবা ঈদকার্ডের মাধ্যমে ঈদের আমেজকে বৃদ্ধি করাতে দোষের কিছু নেই। কিন্তু এ ঈদকার্ড বৈধস্থানে কতটা ব্যবহার করা হয় সেটাই বিবেচ্য বিষয়। মূলত এ কার্ডের মহোৎসব অবৈধ প্রেমের মিলন বন্ধনী হিসেবে কপোত-কপোতীদের মধ্যে প্রেমলীলার ক্ষেত্রে উদযাপিত হয় না কি? অথচ ঈদ স্বাভাবিক মানবীয় প্রেম, ভ্রাতৃত্ববোধ, পারিবারিক সম্পর্কের উন্নয়ন সর্বোপরি বিশ্বমুসলিমের ভ্রাতৃত্ববোধ জাগরণের জন্যই বছরে দু’বার আসে। আমরা এ ধরনের ঈদই চাই।
শেষ কথা, ঈদ মানে আনন্দ, এ আনন্দ বিশ্বাসের, এ আনন্দ তাকওয়া অর্জনের এবং ইহলৌকিক ভ্রাতৃত্ববোধ তৈরী ও পারলৌকিক মুক্তির। সুতরাং ঈদকে ঘিরে সকল উৎসবকেই ইতিবাচক হিসেবে পেতে চাই। এমনকি প্রিন্টিং মিডিয়ার সকল প্রকাশনা এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সকল আয়োজনকেই পেতে চাই ঈদের ফিতরাতের ওপর ভিত্তি করে। যেমন সাহিত্য পত্রিকা কিংবা পত্রিকার ঈদ ক্রোড়পত্রের গল্প, প্রবন্ধ, ছড়া, কবিতা, রম্য উপন্যাস সকল কিছুই ঈদের পবিত্রতা ও নির্মল আনন্দ উৎসবকে ধারণ করে লিখতে হবে। ইলেকট্রনিক মিড়িয়ায় উপস্থাপিত গান, নাটক, সিনেমা, ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান, বিচিত্রানুষ্ঠান, এমনকি ফ্যাশনশোও হতে হবে ঈদের ইমেজকে ধারণ করে। তবে যেন ঈদের মৌলিকতা এবং ঈদ আনন্দের বৈষয়িকতা ও আধ্যাত্মিকতার সীমারেখা অতিক্রম না করা হয়। অডিও, ভিডিও, সিডি, ভিসিডি প্রকাশনা কিংবা ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান, আত্মীয়তার মহোৎসব, ঈদকার্ডের ব্যবহার সবকিছুতেই যেন ঈদের মৌলিকতাকে ধারণ করে উদযাপিত হয়। মূলত মানুষকে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত অর্থাৎ পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয়, জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সভ্যতা সংস্কৃতি, অর্থনীতি, রাজনীতি, যুদ্ধ ও সন্ধিনীতি, রাষ্ট্রনীতি, পররাষ্ট্রনীতি, বিবাহ-তালাক, শিক্ষা-সাহিত্য সকল বিষযসমূহ ইসলামের সীমারেখা অনুযায়ী সম্পাদন করা ঈমানের দাবী। একজন মুসলমান যেমন ঈমানের দাবী পূরণের জন্য নামাজ, রোজা, হজ্ব, জাকাত, দান-সদকাসহ ইসলামের মৌলিক কাজগুলো সম্পাদনের মাধ্যমে সওয়াবের অধিকারী হয়, তেমনি তিনি যদি উৎসব, বিনোদন, সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, বিষাদ-আনন্দসহ জীবনের সকল ক্ষেত্রে ইসলামী চিন্তা-চেতনাকে প্রেরণার উৎস হিসেবে ধারণ করে সম্পাদন করেন তবে তিনি এ ক্ষেত্রেও ঈমানের দাবী পূরণের পাশাপাশি বিপুল সওয়াবের অংশীদার হবেন। এভাবে ঈদের সকল কর্মসূচীসহ অডিও, ভিডিও, সিডি, ভিসিডি, রেডিও, টেলিভিশনসহ স্যাটেলাইটের সকল আয়োজনে ঈমানী চেতনা ও ইসলামী সংস্থার দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবায়িত হলে তা শুধু বিনোদনই হবে না বরং সওয়াবের মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হবে। এতে নির্মাতা ও দর্শকের জন্য গুনাহের পরিবর্তে সওয়াব, অশ্লীলতার পরিবর্তে শ্লীলতা, অপসংস্কৃতির পরিবর্তে সুস্থ সংস্কৃতি, কুৎসিতের পরিবর্তে সুন্দর, দুর্গতির পরিবর্তে প্রগতি এবং পাপের পরিবর্তে সওয়াবের ব্যবস্থা হবে। এ অবস্থাতে বিনোদনও হবে সওয়াবও হবে। উভয় ক্ষেত্রে লাভজনক উৎস হিসেবে ঈদ উৎসব আমাদের ঘরে ফিরে আসুক- এ কামনা করি।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT