বিশেষ সংখ্যা

পীরের হাত

সৈয়দ মবনু প্রকাশিত হয়েছে: ০৪-০৬-২০১৯ ইং ০২:১৫:০৪ | সংবাদটি ৪৮ বার পঠিত

পীর ফকির মানে না বজ্জাত মাইয়াটা। হে আবার শিক্ষিতা? সুরমার বিরুদ্ধে এ অভিযোগ তার ফুফুদের। সুরমা তার ফুফুর বাসায় থেকে নেত্রকোনা কলেজে পড়ে। আজ সন্ধ্যায় এই বাসায় কোথাকার এক পীর আসবেন। সুরমার ফুফুতো ভাই শামীম থাকে সিলেটের হবিগঞ্জ। শামীম আজ রাতেই আসবে হবিগঞ্জ থেকে। শামীমের বউ কুহিনুর পীর সাবের জন্য খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থায় ব্যস্ত। সুরমা কুহিনুরকে সাহায্য করছে। আবার মনে মনে বিরক্তও। মাঝেমধ্যে কুহিনূরের কাছে সে এই বলে বিরক্তিটা প্রকাশ করছেÑ বর্তমান ডিজিটাল যুগেও তোমরা পীরের নামে এতো টাকা-পয়সা কেন যে নষ্ট করছো? ভাবি তুমি বলো, এই যুগে কি আর পীরের বেইল আছে? কুহিনুর বলেÑ বেবাক কুচিন্তা আর কুতর্ক বাদ দিয়া কাম কর। সন্ধ্যা হইয়া যাইতাছে।
দেখতে দেখতে সন্ধ্যা হয়ে যায়। বেশ কিছু ভক্তবৃন্দ নিয়ে পীর সাব আসেন। এই ভক্তবৃন্দের মধ্যে সুরমার দুই ফুফুও আছেন। তারা অন্য গ্রামে গিয়ে পীর সাবের কাফেলায় যুক্ত হয়েছিলেন। ভক্তরা পীর সাবকে ‘বাবা’ ডাকে। এই বাবা ডাকের যৌক্তিকতা সুরমা খুঁজে পায় না। সুরমার মনে খুব রাগ আসে যখন সে দেখে তার ফুফুরাও চেংড়া একটা পোলাকে বাবা ডাকছেন। তার এমনি পীরাকির প্রতি কোন মান্যতা নেই, এর মধ্যে এই পীরের বয়স খুবই কম! সে মানতেই পারছে না। বরং তার ইচ্ছে করছে এই তরুণ পীরের সাথে দুষ্টামী করতে। ফুফুদের বাবা মানে তার নানা। বাহঃ দারুণ হয়েছে। এখন নানার সাথে ইয়ার্কি মারতে আপত্তি কোথায়? সুরমার মন ধীরে ধীরে চঞ্চল হতে থাকে পীরের সাথে ইয়ার্কির জন্য। কিন্তু মানুষের প্রচুর ঝামেলা। সে কাছেই যেতে পারছে না। এদেশের মানুষদের পীর ভক্তি দেখে সে খুব কষ্ট পায়। তবু ফুফুর নির্দেশে সে একবার পীরকে ভক্তি দিয়ে আসে। ভক্তি দিতে গিয়ে সুরমার খুব ইচ্ছে হচ্ছিলো পীরের পায়ে একটা চিমটি কাটতে। কিন্তু মানুষের ঝামেলা এবং বিভিন্ন বিবেচনায় সে তা থেকে বিরত থাকে। মানুষের ঝামেলা আর কমেই না। তা ছাড়া পীরের সাথেই আছেন একঝাক জালালী কৈতর ভক্তবৃন্দ। এশার নামাজ, খাওয়া-দাওয়া, জিকিরের মাহফিল ইত্যাদির মধ্যে রাত অনুমানিক দু’টা হয়ে যায়। মাহফিল চলছেই। যেনো ফজর হয়ে যাবে।
এক সময় চলন্ত মাহফিল থেকে পীর সাব বেরিয়ে আসেন। সুরমার ফুফু তাকে পাশের রোমে নিয়ে একটা চেয়ারে বসিয়ে সুরমাকে পানের থালা আনতে বলেন। সুরমা পানের থালা নিয়ে পীর সাবের সামনে গেলে তার ফুফু পীর সাবকে উদ্দেশ্য করে বলেনÑ বাবা এই আমার ভাইজি। একটু দেখুন তো উপরি কিংবা যাদু কি না? সুরমার কাছে তার ফুফুর এই কাজ প্রথমে ভালো লাগেনি। পরে পীরের সাথে কথা বলার সুযোগ বলে বিষয়টি বিবেচিত হলে সে ফুফুকে ধন্যবাদ দিলো। ফুফু চলে গেলে সুরমা খুব গম্ভীর সুরে পীর সাবকে জিগ্যাস করেÑ আপনার নাম কি? পীর সাব বলেনÑ মুসলিম উদ্দিন। সুরমা বলে আমার নাম সুরমা। আচ্ছা হুজুর আমাকে একটু বলুন তো উপরী এবং যাদুর সত্যতা? পীর সাবের সহজ উত্তরÑ উপরী মানে জ্বীনের প্রভাব। এগুলোর সত্যতা আমি জানি না। কোরআন-হাদিসে উপরি-টুপরির কোন আলোচনা আমি পাইনি। এ সবের উৎপত্তি মূলত প্রাচীন গ্রীস কিংবা ভারতের মিথ থেকে। কোরআন-হাদিস জ্বীন জাতের অস্তিত্ব স্বীকার করলেও উপরী বা ভূত জাতীয় কিছু স্বীকার করে না। এখানে একদল তাবিজ ব্যবসায়ী তাদের ব্যবসাকে জমজমাট করতে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করেছেন। আর যাদু সম্পর্কে আমরা জানি ইহুদীরা হযরত মুহাম্মদ (স.) কেও যাদু করেছিলো। তাই যাদুর অস্তিত্ব কোরআন হাদিসে পাওয়া যায়। সুরমা আবার প্রশ্ন করেÑ আচ্ছা হুজুর! এগুলো থেকে বাঁচার জন্য কি ব্রাহ্মণ কিংবা পীরÑফকিরের প্রয়োজন আছে? পীর মুসলেম উদ্দিন চোখ উঠিয়ে সুরমার দিকে দৃষ্টিপাত করে বললেনÑ আপা, আপনি পীর-ফকির আর ব্রাহ্মণকে এক কইরা দিলেন! ব্রাহ্মণ তো হয় বংশগত আর পীর-ফকির সাধনার বিষয়। সুরমা হাসতে হাসতে বলেÑ আজকালে পীর-ফকিরও হয় বংশগত। যারা সাধক তাদের ব্যাপারে আমার কোন কথা নেই। এই যে আপনি পীর হইছেন, তা তো আপনার নানার সূত্রে? নারে আপা, না। আমার নানার সূত্রে পেতে হলে আমার মামারাতো এখনও আছেন। দীর্ঘ আটারোটি বছর আমাদের কেউ এদিকে পা দেননি। তা ছাড়া আমি তো বলছি না যে আমি পীর-দরবেশ। আমি মূলত আমার নানার ভক্তবৃন্দের কন্দনে তাদের কাছে এসে দাঁড়িয়েছি। দেখো আমি মনে করি না পীর বা তাবিজ কোন মানুষকে বিপদ থেকে বাঁচাতে পারে। আামি বিশ্বাস করিÑ মানুষের বিপদ থেকে বাঁচার জন্য কোন পীরÑফকির কিংবা তাবিজ-কবজের প্রয়োজন নেই। চার কুল-ই যথেষ্ট।
সুরমা পীরের কাছে এমন কথা শোনতে পেয়ে আশ্চর্য হয়ে চোখ তোলে এক নজর দেখে। সে এই প্রথম এমন কথা কোন পীরের কাছে শোনেছে। তার মনে একটা প্রচ- ধাক্কা লাগলেও দুষ্টামী যায় না। সে প্রশ্ন করেÑ পীর সাব আপনাকে আমি কি ডাকবো? পীর সাব বলেনÑ আমার নাম মুসলিম উদ্দিন, তাই ডাকবে। সুরমা সাথে সাথে ছিঃ ছিঃ নাউযুবিল্লা উচ্চারণের সাথে বলেÑ এইডা হইবো না পীর সাব। আপনি সকলের বাবা, আর আমি একটা ছোট মাইয়া মানুষ আপনাকে নাম ধরে ডাকবো! বরং নানা ভাই-ই ডাকি। পীর সাব বললেন- তোমার যা মনে লয় বন্ধু বলো আমারে। সুমরা হাসে। পীর সাহেবও হাসেন। সুরমা মনে মনে ভাবে পীর কি তাকে কাবু করতে এই আলতু-ফালতু কথা বলছেন? সুরমা পীর সাবকে অন্য দিকে নিয়ে যেতে জিজ্ঞাস করেÑ পীরাকি করে মাসে আপনার কতো ইনকাম হয়? পীর সাব জানিয়ে দিলেন তোমাকে নিলে চালাতে পারবো। সুরমা হাসে। পীর সাবও হাসেন। এ ভাবেই শুরু হয় সুরমার সাথে পীর সাবের কথা-বার্তা, তর্ক-বিতর্ক।
পীর বুঝতে পারেন, সুরমার যে পীর-ফকিরের প্রতি প্রচুর অনাস্তা। পীর সাবও নিজে নিজের প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করে স্পষ্ট বললেনÑ দেখুন আমি পীর-ফকির কিছুই না। আমার বড় পরিচয় মানুষ। আমি একজন বইয়ের পাঠক। আমি কিছু লেখালেখি এবং বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা করি। বর্তমানে তুমিও আমার একটি গবেষণার বস্তু। এদেশে তোমার মতো অল্প বয়সী সুন্দরীরা কিছুটা ক্লাস অগ্রসর হলেই নিজকে সুন্দর এবং শিক্ষার অহংকারে জড়িয়ে ফেলে। তুমি কি জানো তারা নিজকে যতটুক বুদ্ধিমতি মনে করে তাদের অবস্তা তা থেকেও শতগুণ নিম্নে। তুমি যে আমাকে প্রথম থেকেই অপছন্দ করো তা আমি বুঝতে পেরেছি। কিন্তু আমি তো তোমাকে প্রথম দেখায়ই ভালোবেসে ফেলেছি। কারণ, তুমি আসমানের চান্দ আর আমি সুরমা নদীর নাইয়া। পীরের কথায় সুরমা হাসতে হাসতে বলেÑ আপনি তো দেখি মানুষ পঠানোর উস্তাদ। জাগিয়া থাকা মানুষ। দারুন। পীর সাব বলেনÑ তুমি পঠানোর দেখলে কি? অপেক্ষা করো সামনে আসছে তোমায় পঠানোর পালা। এই যে ছেলেটার সাথে তুমি সময় দিচ্ছো সে তোমাকে একদিন ধোঁকা দেবে, নিশ্চিত সে একদিন তোমায় ধোঁকা দেবে। এই বলে পীর সাব উঠে গেলেন। মাহফিল শেষ করে ইতোমধ্যে সবাই ঘুমাতে যায়। সুরমার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে পীর সাবও ঘুমাতে যান। পীর মুসলিম উদ্দিন গভীর রাতে অনুভব করেন তার পায়ে হালকা উষ্ণ জল। সুরমার অজান্তেই এই জলবিন্দুগুলো ঝরে যায় পীর সাবের পায়ে। সুরমা খুব দ্রুত নিজ হাতে পীর সাবের পা মুচে দিলো। পীর সাব চেয়ে আছেন সুরমার দিকে এবং সুরমা পীর সাবের পায়ে হাত রেখে চেয়ে আছে তার হাতের দিকে। মুসলিম উদ্দিন উঠে বসেন। সুরমার হাত ধরে টেনে এনে কাছে বসিয়ে জিজ্ঞাস করেনÑ কি ব্যাপার? তোমার কি হয়েছে? সুরমা আরো কাঁদতে থাকেÑ নানা ভাই আমাকে বাঁচান। নানা ভাই আমি মরে যাচ্ছি। আমাকে বাঁচান। আপনি তো নানা ভাই সবই জানেন, সবই দেখছেন, আপনি আমাকে বাঁচান। নানাভাই আমি পীর-ফকির মানি না। হয়তো আপনার সাথে দেখা না হলে পীর-ফকিরের ব্যাপারে আমার লাল সালুর ধারনাই থাকতো। নানা ভাই আমাকে বাঁচান। পীর সাব সুরমার হাত ধরে বললেনÑ দেখ সুরমা, পীরাকি বলতে কিছু নেই। আল্লাহ সর্বশক্তিমান। আমি তাঁর কাছে পূর্ণাঙ্গ আত্মসমর্পণ করলে তিনি আমাকে যেদিকে খুশি সেদিকে নিয়ে যাচ্ছেন। আর এর নাম যদি পীরাকি হয় তা হোক। আর যদি তা হয় চোরাকি, তাতেও আমার আপত্তি নেই। তবে তা সত্য ঐ ছেলে তোমাকে চুষে নিয়ে গায়েব হয়ে যাবে। সুরমা আঁতকে উঠে। সে ঝাঁপিয়ে পরে পীর সাবের বুকেÑ নানাভাই আমাকে বাঁচান। নানাভাই আমাকে বাঁচান। আমি অনেক পীরের কাছে বাঁচার জন্য গেছি, কিন্তু ওরা শুধু টাকা জানে আর কিছুই জানে না। আমার প্রচুর টাকা নষ্ট হয়েছে। তাই এখন আর পীর-ফকির মানি না। নানাভাই আপনি একজন হক্কানি পীর। আপনি পারবেন আমাকে বাঁচাতে। সুরমার কথার প্রতিবাদ করে মুসলিম উদ্দিন বললেনÑ বাঁচায় আল্লাহ, মারেও আল্লাহ। যা বলার আল্লার কাছে বলো। ফজরের আজান হয়। সুরমা তখনও পীর সাবের পাশে বসা। পীর সাব জানতে চাইলেনÑ সুরমা তুমি কি আমার কথা মানবে? সে হ্যাঁ বললে পীর সাব বলেনÑ ড্রাগের বিরুদ্ধে এন্ট্রি ড্রাগের প্রয়োজন হয়। সুরমা তুমি যে ছেলের খপ্পরে পরেছো তার হাত থেকে বাঁচতে হলে তুমি এমন একটি হাতে হাত রাখতে হবে যে হাত তোমাকে কষ্ট দেবে না। সুরমা কিছু বুঝার আগেই পীর সাবের হাত টেনে নিয়ে চুম্বন করতে করতে বলতে থাকেÑ এই হাত থেকে আর ভালো কোন হাত আমার জানা নেই। পীর মুসলিম উদ্দিন কিংকর্তব্য বিমূঢ় হয়ে সুরমার দিকে চেয়ে থাকেন। ভক্তবৃন্দ উঠে গিয়ে নামাজের প্রস্তুতি নিলে পীর সাব সুরমাকে অজুর পানি দিতে বলে নিজে মিসওয়াক করতে থাকেন।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT