বিশেষ সংখ্যা

নদী ভাঙনের রাত

মুতিউল মুরসালিন প্রকাশিত হয়েছে: ০৪-০৬-২০১৯ ইং ০২:১৫:৪৭ | সংবাদটি ৫৩ বার পঠিত

কুশিয়ারার পাড়ে মৃত্যুমুখে দাঁড়ি থাকা হাফওয়ালের টিনের ঘরের কর্তা খালেদ চাচার আমি যে কিচ্ছু না। না ভাতিজা-ভাগ্না বা দূরাত্মীয়-এটা আজনবি কেউই স্বীকার করবে না। অথচ প্রকৃত সত্য এটাই।
এক কাপ চা আর একটা পানের জন্য রোজ বিকেলে তার ছোট মেয়েকে ইংরেজি পড়াতে যেতাম। থ্রি টু নাইন। একাধারে সাত বছর। এখন আট রানিং। প্রথম দিন যেভাবে চা বিস্কুট আর পান আসত- এখনো আসে। এই রুটিনে কসুর না হওয়ার কারণ তার বড় মেয়ে জহুরা, যাকে সরাসরি দেখিনি কখনো। ছাত্রীর গড়গঠনে আন্দাজ করে নিয়েছি-সেও ওর মতোই হুরপরী।
খালেদ চাচা এখন পাহারাদারি করেন বলে রাতেও তার ঘরে থাকতে হয়। অবশ্য প্রথম থেকেই এ সুবিধাটার তুমুল কাঙাল ছিলাম আমি। মুখ খুলে কিছু না বললেও কলেকৌশলে বহুবার বোঝাতে চেয়েছি; কাজ হয়নি।
ভাগ্যের কী সুপরিবর্তন-টিউশনি মাস্টর হয়ে আসা আমি এখন লজিংমাস্টার। এই নতুন পরিচয়ের ছ'মাস গত হয়েছে মাত্র। সাবেক পরিচয় আর বর্তমান সম্পর্কে তাদের বেশ আপন হয়ে গেছি বা তারা দয়াবশত আপন করে নিয়েছেন। সুন্দর চলাফেরা, না আমার প্রতি তাদের দুর্বলতা-ঠিক কোন্ কারণে এতটা কাছের হয়ে গেছি-বলা মুশকিল। কারণ যাই হোক, আমি এখন তাদের একজন। বলতে দ্বিধা নেই, ছেলে বা ছেলের মতোই কেউ।
চাচার শরীর খারাপ করায় আজকে আর পাহারাদারিতে যাননি। আমারও মনটা বেশ ভালো না। রাত দশটা হওয়ার আগেই ঘুমিয়ে পড়ি।
‘কিতাবা, কিতা খররায়; হজাগনি। ভিতরর কোঠাত তুরা আওনে বা, তোমারে ডাকিরা তাইন!’
চাচির কথা শুনে ধড়ফড়িয়ে ওঠি। তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে পরনের পাতলা গেঞ্জিটা বদলাতেও ভুলে যাই। দেখি, উনার বন্ধ করা চোখ দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা পানি ঝরছে। মাথায় আস্তে করে হাত বুলিয়ে বললাম-‘চাচা, কিতা অইছে, শরীলে কিতা বেশ খারাপ লাগের না কিতা, ডাখতার আনতামনি?’
উত্তর দেবার বদলে চাচা আমার হাতটা আস্তে আস্তে টেনে নিয়ে তার বুকের উপর চাপ মেরে ধরেন। কতক্ষণ চলে যায় এভাবে। কিছু বলছে না তিনি। আমিও নীরব তার মুখে চেয়ে আছি। থাকতে থাকতে সহসা হাতের মাঝে অনুভব করি করুণ একটা দ্বীর্ঘশ্বাসের জন্ম এবং মৃত্যু।
‘বাবা, তোমার খাইতেপরতে, চলতেবলতে বহুত খষ্ট দিছি রে পুত। মোরে মাফ খরি দিয়ো রে বা।’
কথার পিঠে কিছু বলতে যাব আমি-সে সুযোগ না দিয়ে চাচা বললেন-
‘আসলে কোনতা অইছে না মোর। গতখাইল থাকি মনে অর...।’
আরেকটা দীর্ঘশ্বাসের ছাড়েন চাচা। তার বুকের উপর রাখা আমার হাতটাকে মৃদু নাড়িয়ে অন্ধকারে, হাওয়ায় মিশে যাওয়ার আগেই চাচা ফের বলতে শুরু করলেন। ... বলতে বলতে তিনি যখন চোখ খুলে, মাথা দিয়ে বাম দিকে ইশারা করে বললেন-‘দেখো তোমার পছন অয়নি, অইলে তোমার মাবাপরে খাইলোঔ খবরদি আনিলিমু; আমি বাছতাম নায় রে বা!’
চাচার শেষবাক্যে সান্ত¡না দেবার ইচ্ছে হলেও ওর থেকে চোখ সরাতে পারছিলাম না তখন। কাউকে কিছু না বলেই আচমকা চলে এলাম আমার রুমে। বাড়িতে জানানোর জন্য মোবাইলটা হাতে নিয়ে চরম খাবি খেলাম। দেখি, বড় ভাবি ইমুতে ওর ছবি দিয়েছে আমাকে। সাথে লেখা-
‘আম্মা-আব্বা সবার পছন্দ হয়েছে এবং সব খবরাখবরও নিয়েছেন তারা। আর আমার চয়েজের ব্যাপারে জানার আগে একটা কথা ভালো করে শুনে রাখো, যদি অমত হও তাহলে আর ভাবি ডাকবে না আমাকে।’
এভাবে, এত সহজে, চাওয়ার আগেই এতসব পেয়ে যাব, হয়ে যাবে-কল্পাও করিনি কখনো। এখন ভাবি, জহুরা পর্দায় থেকেছে ভালোই করেছে। নতুবা আমার পা পিছলে যেত হয়তো। যৌবনের তোড়ে কিংবা কান্নার ভেতর পাগলকরা ওর আজকের লাজুক হাসি, ওড়না গলিয়ে বের হয়ে আসা চুল, চাঁদধোয়া চেহারা আর পাকা টমেটোর মতো ঠোঁট দেখে দিশা হারিয়ে ফেলতাম আমি। আল্লাহ যা করেন, ভালোই করেন। কাল থেকে আর পর্দা থাকবে না। কোথাও লুকোতে পারবে না ও।... এসব ভাবতে ভাবতে, কল্পনা করতে করতে হঠাৎ কীভাবে ঘুমিয়ে পড়ি সেদিন। আসলে ঘুমিয়েছিলাম নাকি সজাগই স্বপ্নটা দেখছিলাম-মনে করতে পারছি না এখন। তবে এটা নিশ্চিত, স্বপ্নের ভেতরেই দুর্ঘটনাটা ঘটেছিল।
জ্ঞান ফেরার পর ভাবি, আমি এখানে, এই হস্পিটালে কেন? আমার ডান পা আর ওর হাতে ইস্ত্রি করা শার্টটি কই?..
এরপর আর কিছু ভাবতে পারি না। ফের জ্ঞান হারাই। ঘোরের ভেতর চোখে ভাসে হবু শ্বশুর-শাশুরি, জুমু আর তার বড় বোনের মুখ-যাকে গতকাল রাতেই প্রথম দেখেছিলাম। ভাবি, তারাও কি এভাবে হাত পা খুইয়ে অজ্ঞান বেঁচে আছে, নাকি কুশিয়ার মাতাল স্রোতে ভেসে গেছে কোথাও!

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT