পাঁচ মিশালী

টাঙ্গুয়ার হাওরে ঘোরাঘুরি

মুকুট রায়হান খান প্রকাশিত হয়েছে: ০৮-০৬-২০১৯ ইং ০০:৩৮:০৩ | সংবাদটি ১৪০ বার পঠিত

টাঙ্গুয়ার হাওর। ১০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তীর্ণ বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মিষ্টি পানির জলাভূমিটিতে ছোট বড় ৪৬টা গ্রামের অস্তিত্ব এখানে। যা সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুর এবং ধর্মপাশা থানার আওতাভূক্ত।
জীবনের প্রতিটা মুহূর্তই এখানকার প্রকৃতির মতোই বেশ বৈচিত্র্যময়। সৌখিন পর্যটকদের জন্য এই হাওর- বর্ষা এবং শীত মৌসুমে যতোটা আকর্ষণের, ঠিক তার চাইতেও বেশি নিষ্ঠুর জীবন এখানকার স্থানীয় বাসিন্দাদের। পর্যটক হিসেবে এখানে যারা আসবেন একটু খেয়াল রাখবেন এখানকার পরিবেশ ও চলমান সমাজ যাতে নষ্ট না হয়। আপনাদের আচরণ ও পানিতে ফেলা মদের বোতল, চিপস এবং আপনাদের ব্যবহৃত বিভিন্ন উপকরণের কারণে।
যাই হোক, দিনরাত মিলিয়ে পুরো ৭২টা ঘণ্টা ট্রলারে থেকে রোদে পুড়ে তামাটে বর্ণ ধারণ করে-জল, হাওয়া, কাদা, হিজল, করচ গাছ আর দেখেছি পুনর্বার এখানকার বাসিন্দাদের যাপিত জীবন।
কিছুদিন পরেই পানিতে টইটুম্বুর হয়ে থৈথৈ করবে চারপাশ তাই এখন থেকেই ঘর গোছানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে সবাই সামর্থ্যানুযায়ী। পানির উচ্চতা যখন বেশ বেড়ে যায় তখন গরু আর মানুষে এখানে সহাবস্থান করে।
সর্বসাকুল্যে দুখানা কাপড় পড়ে বছর পার করা ঊনত্রিশ ছুঁইছুঁই পাঁচ সন্তানের জননী দারিদ্র্যতার নিষ্ঠুর কষাঘাতে জর্জরিত খোদেজা বেগমের সংসারে গিয়ে উপস্থিত যখন হলাম তখন বেলা ৩:৪৫, দশ বাই বারো বাই দশ হাত বন্দের ঘরের একমাত্র দরজা কাম জানালার সামনে বসে মাছ কুটছে এক কিশোরীÑ নাম জিগ্যেস করতেই বললো জ্যোৎস্না। আমাদের সাড়া পেয়েই ময়লা শাড়িখানা দিয়ে আব্রু ঢাকতে ঢাকতে ভেতর থেকে বের হয়ে এলো খোদেজা বেগম।
তার সাথে কথা শেষে জ্যোৎস্নাকে জিগ্যেস করলাম কোন ক্লাশে পড়ো-চোখে রাজ্যের বিষাদ নিয়ে সহাস্যে উত্তর দিলো-পড়ন ছাইড়া দিছি।
কোন পর্যন্ত পড়েছিলেÑফাইভ পাশ করছি।
কত পয়েন্ট পেয়েছিলেÑ৩:৮৯
পড়া ছাড়লে কেনোÑ‘টাকা নাই।’
সরল সত্য উত্তরটি শুনে একটা চমৎকার চপেটাঘাত খেলাম যেনো নিজের মুখের ওপরেই।
কথা আর বাড়ানোর সাহস পাইনি। ট্রলার চালক মোফাজ্জল সাহেবও বেশ তাড়া দিচ্ছেন যেতে হবে আরও দূরে।
সকলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বের হয়ে যখন ট্রলারে উঠেছি তখন ত্রিশ ঘর বাসিন্দাদের প্রায় সবাই'ই আমাদেরকে বিদায় জানাতে গ্রামের কিনারায় উপস্থিত। উৎসুক বাচ্চাদের সবার সামনে দাড়িয়ে জ্যোৎস্না। ওর চোখে চোখ পড়তেই চোখ সরিয়ে নিতে বাধ্য হলাম লজ্জায়। সামনের বছর যখন আসবো তখন হয়তো এসে দেখবো জ্যোৎস্নার কোলেই তার নিজের একটা বাচ্চা।
ট্রলার চলতে শুরু করলো। ভাবনায় এলো হাওরে গুটিকয় প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও হাইস্কুল বা কলেজের অস্তিত্ব নেই। যদিও তা থাকার কথাও নয়। আর স্থলের দূরত্ব বেশি হবার কারণে এবং সামর্থ্যরে অভাব ও চমৎকার যন্ত্রণাময় যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে বেশিরভাগকেই বঞ্চিত হতে হয় বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে।
বাকি সব অসুখের কথা বাদই দিলাম, এখানে কেউ জ্বরে পড়লে নূন্যতম জ্বরের বড়ি পাওয়ার সম্ভাবনা সে তো মহাকাশে তুমুল বেগে ছুটে চলা স্যাটেলাইটের মতোই।
এদেশে নেতৃত্ব দেয়া তথাকথিত জনদরদী নেতা নেত্রীদের সন্তানেরা বিদেশে গিয়ে বহু অর্থ ব্যয়ে শিক্ষিত হয়ে এসে যখন বংশাণুক্রমে গদিনসীন হয়, তখন তারা ভাত আর বিরিয়ানীর পার্থক্য চাক্ষুষ না জেনে বুঝেই, দেশের মানুষের মৌলিক চাহিদা পরিবর্তনের নামে বিভিন্ন নীতির যে দুর্নীতি চাপিয়ে দেয় তাতে জনগণ ও দেশের মঙ্গল কতোখানি হয় তা আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখেনা।
ঘর থাকে তো টয়লেট থাকেনা, টয়লেট থাকে তো গরুর খোঁয়াড় থাকেনা কিংবা কোনটা ঘর, কোনটা টয়লেট, কোনটা গরুর খোঁয়াড় আলাদা করতে না পারা গ্রাম আরও কয়েকটা ঘুরে চিত্র ঐ একই দেখলাম। যেখানে পান্তার যোগাড় করতে গেলে বাকি সব উপাদানেরই হদিস থাকেনা সারাবেলা। হাওর থেকে আহরিত মাছ প্রায় সবই যায় শহুরে বাবুদের জন্য।
বেপরোয়া দুটো যৌবনের জন্য শুন্য ঘরের যেকোন জায়গা যেমন বেডরুম হতে পারে তেমনই পুরো হাওরটাই এখন আমার কাছে তাই। গোধূলি হয়ে এলো এবার কোথাও নোঙ্গর করতে হবে।
ট্রলার মাঝ হাওরে নোঙ্গর করেই মোফাজ্জল সাহেব নেমে পড়লেন রান্নার যোগাড় যন্ত্র করতে। গ্রাম থেকে সংগ্রহ করা পুঁই শাক ও হাওরের গুটি কয় কৈ মাছ আজকের রাতের উপাদান।
প্রত্যেকটা জিনিসেরই একটা নিজস্ব সৌন্দর্য থাকে আর পরিবর্তিত মুহূর্তগুলো শুধু তার অলঙ্কার। চারপাশে পিনপতন নিরবতা, একটু দূরেই একটা পানকৌড়ি এখনও ডুব দিয়েই যাচ্ছে, দেখে মনে হচ্ছে সে ওভারটাইম করছে।
সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে শীতল হচ্ছে চারপাশ। দূরের গ্রামগুলোতে লন্ঠন জ্বালানো শুরু হয়েছে। অনেকের ঘরে হয়তো কেরোসিন নেই বলে বেশিক্ষণ আলোও জ্বলবেনা আজ অথবা কাল অথবা পরশু অথবা তার পরের দিন।
মুসলমানদের বড় ধর্মীয় ঈদ উৎসব কিন্তু এদের ভেতরে তা নিয়ে কোন বিকার নেই। সবদিনই সমান এদের কাছে।
চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে চারপাশ, দূরের গ্রামের ঘরগুলোতে জ্বালানো টিমটিমে আলোগুলো দেখে মনে হচ্ছে যেনো মূক্তার মালা। পুঁই শাক আর কৈ এর মিশ্রণের সুবাস নাকে এসে লাগতেই পেট জানান দিয়ে গেলো প্রচন্ড ক্ষুধার কথা।
নাম না জানা পারিজাত উড়ে যাচ্ছে। আমি চাঁদের আলোয় হারাচ্ছি, চারপাশে মন ভালো করার এতো সব উপকরণ কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে আমার কানে অনুরণন হচ্ছে ‘পড়া ছাইড়া দিছি টাকা নাই তাই’।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT