পাঁচ মিশালী

পর্যটন শিল্পে বাংলাদেশ

মুশাহিদ বিন মুছাব্বির প্রকাশিত হয়েছে: ০৮-০৬-২০১৯ ইং ০০:৩৮:৫৪ | সংবাদটি ৪৯ বার পঠিত

একবিংশ শতাব্দীর দ্রুত বিকাশমান শিল্পে ‘পর্যটন’ অন্যতম। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি বাংলাদেশ পর্যটন শিল্পের এক অপার সম্ভাবনাময় দেশ। বাংলাদেশের চারপাশে ছড়িয়ে আছে নদী, উপত্যকা, ম্যানগ্রোভ বন, পাহাড়, বিশাল সমুদ্র। যা একটি পর্যটন শিল্পের জন্য অতীব প্রয়োজন। বাংলাদেশে ছোট-বড় অগণিত নৈসর্গিক সৌন্দর্য রূপী প্রাকৃতিক, প্রতœতাত্ত্বিক, ধর্মতাত্ত্বিক, নিদর্শন সহ অন্যান্য সব পর্যটন স্থাপনা রয়েছে। পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার, সেন্টমার্টিন দ্বীপ, একই স্থানে দাঁড়িয়ে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখার বিরল জায়গা কুয়াকাটা, চট্টগ্রামের পতেঙ্গা সি বীচ, পারকী সমুদ্র সৈকত, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন এবং রয়েল বেঙ্গল টাইগারের বাড়ি সুন্দরবন, হিমছড়ি ঝর্ণা, মহেশখালী দ্বীপ, ইনানী সমুদ্র সৈকত, হাতিয়ার নিঝুম দ্বীপ, ভোলার মনপুরা দ্বীপ, এশিয়ার সর্বোচ্চ ওয়াচ টাওয়ার, চর ফ্যাশন (ভোলা), সোনাদিয়া দ্বীপ, টেকনাফ, বিল-চলন বিল, হাকালুকি হাওর, রাঙামাটির কাপ্তাই লেক, বান্দরবনের নীলগীরি, খাগড়াছড়ির আলুটিলা, সোনারচর, রূপারচর সৌন্দর্যের আঁধার সিলেটের জাফলং, সারী নদীর পানি, পানির নিছে মাছের খেলা, রাজশাহীর পদ্মা নদীর তীর, পদ্মা’র ইলিশ, চাপাই’র কানসাটের আম, সবই আছে এ দেশে।
কী নেই? আছেÑ ঐতিহাসিক প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শন বগুড়ার মহাস্থানগড়, নওগার পাহাড়পুর, কুমিল্লার ময়নামতি, দিনাজপুরের কান্তজির মন্দির, রাজবাড়ী, বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদ, খানজাহান আলীর মাজার, রাজশাহীর বরেন্দ্র জাদুঘর, কুষ্টিয়ার লালন শাহের মাজার, রবীন্দ্রনাথের কুঠিবাড়ী, লালবাগ কেল্লা, আহসান মঞ্জিল ইত্যাদি। আরো আছে জাতীয় স্মৃতি সৌধ, শহীদ মিনার, বুদ্ধিজীবী স্মৃতি সৌধ, জাতীয় কবির কবর, বাহাদুর শাহ পার্ক, বলধা গার্ডেন, কার্জন হল, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, হাইকোর্ট ভবন, নাটোরের উত্তরা গণভবন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কবরস্থান, সিলেটের জৈন্তিয়া রাজার বাড়ি, ঝুলন্ত ব্রীজ, জাতীয় সংসদ ভবন, বঙ্গভবন, শাখারী বাজার, রমনা পার্ক, জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যান, ন্যাশনাল পার্ক, ঢাকার চিড়িয়াখানা, দিনাজপুরের স্বপ্নপুরী, রংপুরের ভিন্ন জগত, তিস্তা ব্যারেজ ইত্যাদি। তার সাথে ওলি আউলিয়া, ফকির দরবেশ, আউল-বাউল,কবি-সাহিত্যিক বাংলাদেশকে করেছেন গর্বিত ও সমৃদ্ধ। মোট কথা পর্যটন শিল্পের প্রায় সবগুলো উপাদানই বাংলাদেশে বিদ্যমান। যদি কোন পর্যটক পাহাড় দেখতে চায়, হাওড় দেখতে চায়, চা-বাগান দেখতে চায়, পশুপাখি দেখতে চায়, নদী দেখতে চায়, সাগর দেখতে চায়, সমুদ্র সৈকত দেখতে চায়, ঝর্ণা দেখতে চায়, সোয়াম্প ফরেস্ট এক কথায় সবই আছে। নেত্রকোনায় আছে সাদামাটির পাহাড়, সিরাজগঞ্জের হার্ড পয়েন্ট, দিনাজপুরের রামসাগর, যমুনার চর, নিঝুম দ্বীপের গাংচষা পাখি, সেন্টমার্টিন যাওয়ার পথে গাংচিল, ময়মনসিংহের গারো পাহাড়, বরিশালের গুঠিয়ার মসজিদ, হবিগঞ্জের গ্রান্ড সুলতান, দেশের প্রথম প্রজাপতি পার্ক, রওশন গার্ডেন, মিনি বাংলাদেশ, ৭ম তলার উপরে ঘূর্ণায়মান রেস্টুরেন্ট আছে। এক কথায় যা চাইবে সবই পাবে বাংলাদেশে।
এরই সাথে আরো অনেক নতুন যোগ হয়েছে এবং হচ্ছে। বলতে গেলে দেশের প্রতিটি অঞ্চল একেকটা পিকনিক স্পট। এতো কিছু আমাদের কাছে থাকার পরও পর্যটন শিল্পে অনেক পিছিয়ে। যে পরিমাণ এগিয়ে থাকার কথা ছিল, সে পরিমাণ এগুতে পারিনি। কিন্তু ইদানিং পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন ও বিকাশ নিয়ে বেশ চিন্তা ভাবনা হচ্ছে।
সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন মহলই উন্নয়ন ও সম্ভাবনা নিয়ে বেশ কথা বলছেন। আগের তুলনায় অনেক বেশি লেখালেখিও হচ্ছে। ধীরে ধীরে জনসচেতনতা তৈরী হচ্ছে। অনেকেই আশার ঘরে ভালোবাসার বাতি জ্বালিয়েছেন।
প্রতি বছরই ২৭ সেপ্টেম্বর বিশ্ব পর্যটন দিবস পালন করা হয়। সভা-সেমিনারও হয়। সুন্দর সুন্দর বুলি দিয়ে বক্তৃতাও করেন অনেকে। পর্যটন শিল্পের মাধ্যমে একটা দেশের রাজস্ব ও জিডিপি বাড়ে। আর এর সুফল ভোগ করতে হলে পর্যটন শিল্পের অবকাঠামোর জন্য প্রচুর ও পরিকল্পিত বিনিয়োগের প্রয়োজন। মূলত এ শিল্পের মাধ্যমে স্থানীয় লোকজনের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন হয়। পর্যটন শিল্পের মাধ্যমে অনেক লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। বেকারত্ব অনেকাংশেই কমে। এক তথ্যে জানা যায়-২০১১ সালে পর্যটন শিল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার ১.৮ শতাংশ লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল। আশা করা যায় ২০২৩ সালে মোট জনসংখ্যা ৪.২ শতাংশ লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
বিশ্ব পর্যটন সংস্থার জরিপে জানা যায়-২০১২ সালে বাংলাদেশের ১২ লক্ষ ৮১ হাজার ৫০০ জন মানুষ সরাসরি পর্যটন শিল্পের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। এবং এ শিল্প থেকে বাংলাদেশ আয় করেছে ১০০ মিলিয়ন ইউএস ডলার। এ সফলতার কারন হিসেবে জানা গেছে-২০১২ সালে সবচেয়ে বেশি পর্যটকের আগমন ঘটেছে আমাদের এ মহাদেশে। বর্তমানে বাংলাদেশকে সারা বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল ১০টি পর্যটন মার্কেটের ১টি ভাবা হচ্ছে। বর্তমান বিশ্বের পর্যটকের সংখ্যা ৯০ কোটির উপরে। ধরা হচ্ছে ২০২০ সালে এর সংখ্যা হবে ১৬০ কোটি।
পর্যটক বিশেষজ্ঞদের মতে, এ বিপুল সংখ্যক পর্যটকের প্রায় ৭৩ শতাংশ ভ্রমণ করবেন এশিয়ার দেশগুলোতে। এ ছাড়াও বিশ্ব পর্যটন সংস্থার মতে ২০১৮ সালের মধ্যে পর্যটন শিল্পে ২৯ কোটি ৭০ লক্ষ লোকের কর্মসংস্থান হবে। যা বিশ্ব অর্থনীতিতে অবদান রাখবে ১০.৫ ভাগ। বাংলাদেশ যদি এ বিশাল বাজার ধরে রাখতে পারে তাহলেই পর্যটনের হাত ধরেই বদলে যাবে বাংলাদেশের অর্থনীতি। পর্যটন শিল্পের যাবতীয় উপাদান বিদ্যমান থাকার পরও অব্যবস্থাপনার জন্য বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ছে। সম্ভাবনার আঁধার বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প বহুমুখী সমস্যার আবর্তে আজ সংকটাপন্ন। সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে-অপ্রতুল অবকাঠামো, অপর্যাপ্ত পর্যটন স্থাপনা, পর্যটকদের নিরাপত্তার অভাব, নিম্ন মানের যোগাযোগ ব্যবস্থা, মান সম্পন্ন আবাসন সমস্যা, উপযুক্ত বিনোদন ব্যবস্থার অভাব, সুষ্ঠ পর্যটন নীতিমালার অভাব, বিনিয়োগ বান্দব পরিবেশ না থাকা, যোগাযোগ ও অবকাঠামোগত সমস্যা, বেসরকারী উদ্যেগের অপর্যাপ্ততা, সরকারী উদ্যোগের বাস্তবায়ন সমস্যা, প্রচারের অভাব, দেশের অস্থিতিশীলতা, পর্যাপ্ত পরিমাণে দক্ষ পর্যটক ও গাইডের অভাব।
যদি পর্যটন নীতিমালাকে সময়োপযোগী করে তোলা যায়, আইনের সঠিক প্রয়োগ করা যায়, ট্রাভেল এজেন্সিগুলোকে ‘টিওএটি’র আওতায় আনা যায়, নতুন নতুন আইডিয়ার মাধ্যমে পর্যটকদের আকৃষ্ট করা যায়, স্পট গুলোকে ঝামেলা মুক্ত ও দূষণ মুক্ত করা যায় তাহলে আশা করা যায় উল্লেখযোগ্য রাজস্ব আয় হবে।
আধুনিক পর্যটন চাহিদা মোতাবেক সম্মিলিত ও পরিকল্পিতভাবে পর্যটন শিল্পের উপস্থাপনই পরিবর্তন করতে পারে বাংলাদেশের অর্থনীতি। আমরা স্বপ্ন দেখছি; পর্যটন অর্থনীতিতে স্বয়ং সম্পূর্ন এক বাংলাদেশের। যে বাংলাদেশ হবে সুষমা মন্ডিত পর্যটন অর্থনীতির দেশ। সেই দিনের প্রত্যাশায় রইলাম। পরিশেষে বলতে চাই-আসুন আমরা সকলে মিলে দেশের পর্যটন স্পটগুলোকে সংরক্ষণ করি। সকলের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলি পর্যটন শিল্পকে।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT