পাঁচ মিশালী

পাহাড়ের ওপারে পাহাড়

আমীরুল হোসেন খান প্রকাশিত হয়েছে: ০৮-০৬-২০১৯ ইং ০০:৪৩:৪১ | সংবাদটি ১৮২ বার পঠিত

জাফলং বেড়াতে গেলে সীমান্ত জুড়ে উঁচু উঁচু পাহাড় কাছে ডাকত। সেই সাতচল্লিশ সালের অন্যায্য ভাগের কারণে ওপারে যাওয়ার সুযোগ নাই। অদৃশ্য দেয়াল! ব্যবসার কাজে দীর্ঘদিন জাফলংয়ে কত বিকাল সন্ধ্যা রাত কেটে গেছে দূরের পাহাড় ঝর্ণা দেখে কিন্তু মনের অবারিত তৃষ্ণা তো মিটে না। হঠাৎ করে বন্ধুদের ডাক-চল শিলং চেরাপুঞ্জি গৌহাটি ঘুরে আসি। তিনদিনে কি দেখব? এত অপেক্ষার পর মনের গহীনে সযতেœ লালন করা পাহাড়-ঝর্ণা কি এত স্বল্পসময়ে আমায় আপন করে নিবে! উত্তেজনায় রাতে ভাল ঘুম হল না। খুব সকালে তামাবিল সীমান্তে ইমিগ্রেশন সহ আনুষঙ্গিক সব কাজ শেষ করে ওপারে। নিকোলাস!
খাসিয়া ড্রাইভার কাম গাইড, খুব সুন্দর বাংলা বলে। সীমান্ত চৌকির কাছে ডাউকি বাজারে বাড়ি। রোজ পাথর কোয়ারীতে বসে দেখা সেই বাজার। ছোট্ট ছিমছাম শহরতলী। ডাউকি ব্রীজ প্রথম আশ্চর্য কোন ধরনের পিলার ছাড়া ঝুলন্ত ব্রীজ। শত বছর ধরে কেমন করে টিকে আছে কে জানে। যত সময় যাচ্ছে উপরে উঠছি এত উঁচু ঢাল। রাস্তার দু পাশে ঘন জঙ্গল বড় বড় আকাশছোয়া বৃক্ষ, আকাশ দেখার কোন সুযোগ নাই। উপরে উঠার শেষ হবে কখন! গাড়ির জানালার পাশে বসার কারণে নিতান্ত অনিচ্ছায় নীচে তাকালে বুকের ভেতর ঢাক বেজে উঠে। কোনভাবে ফসকে গেলে কয়েক হাজার ফুট নীচের গিরিখাদে। এতো আঁকাবাঁকা রাস্তা নিকোলাস নির্বিকার।ভয়ের কিছু নেই, তার অভয়বাণী খুব কাজে আসে নি। পথে যাত্রাবিরতি চা নাস্তা খাব, একটু হেঁটে গিয়ে নীচে তাকিয়ে মাথা ঘুরে উল্টে পড়ার যোগাড়। হঠাৎ করেই ঠা-া ঝেঁকে ধরল সাথে ঘন কুয়াশা। পাথরে ঢাকা হাজার হাজার পাহাড় প্রায় জায়গায় বাণিজ্যিক ভাবে উত্তোলন করা হচ্ছে তা হাজার বছরেও শেষ হবে না। পাহাড়ী ঢলে গড়িয়ে পড়া খুচরো পাথর নাফনদী হয়ে জাফলংয়ে এদিকে পাথর বনজ সম্পদ আর চুনাপাথরের সাম্রাজ্য। না দেখলে এগুলো কল্পনা করা কঠিন। মেঘালয় প্রদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য। এসব দেখে খারাপ লাগাটা বেড়ে যায়। ইতিহাস ঐতিহ্য ভাষাগত একটা অঞ্চলকে নির্মমভাবে ভাগ করে দেয়া হল।
বিশাল বিশাল পাথরের পাহাড়ের মাঝ দিয়ে পীচঢালা পথ। দুপাশে প্রকৃতির অপার লীলা উপভোগ করতে করতে ভাবনার অতলে! সাহেব আর বেশি দূরে নয় ঐ যে চেরাপুঞ্জি।এত উপরে বাড়িঘর যেন মেঘমালা ছুঁয়ে যায়। যতদূর চোখ যায় মাথার ওপরে শহর। সিলেট সীমান্তের কাছাকাছি অনেক বাগান থেকে চেরাপুঞ্জির রাতের প্রদীপ মেলা দেখেছি। সাজানো গোছানো শহর অসংখ্য রিসোর্ট গেস্ট হাউজ!পর্যটকদের ভীড়! সবাই ছুটছে এক লোকেশন থেকে অন্য লোকেশনে। আপনারা কত দেখবেন স্যার পুরো শহর তার আশপাশ সব দেখার মত জায়গা। শহরের একটু বাইরে মাওয়াসমি কেইভ। পাহাড়ের নীচ দিয়ে হাজার বছর ধরে আদি অকৃত্রিম গুহা। আলোর ব্যবস্থা না থাকলে নিশ্চিত ভয়ে কেউ ই ঢুকত না। কয়েকশ মিটার লম্বা কষ্টসাধ্য যাত্রা কোথাও কোথাও এত সরু শরীরটা টেনে নিয়ে যাওয়া কষ্টসাধ্য। রুক্ষ পাহাড়ের আদিম সৌন্দর্য!বেরিয়ে এসে হাপ ছেড়ে বাঁচা। চতুর্দিকে ই-িয়ান ফরেস্ট্রির সংরক্ষিত অনিন্দ্য সুন্দর বনাঞ্চল। বরাবরের মত অরণ্য ই কাছে টেনেছে বেশি! ওখান থেকে কাছের সেভেন সিস্টার দেখতে... বোনের মত গলাগলি করে দাঁড়িয়ে অপার বিস্ময় নিয়ে যেন দেখছে! ধ্যানী মৌন চিরসুন্দর প্রকৃতির লীলাভূমি! পাশেই ঝর্ণাধারা অনাবৃষ্টির কারণে শুকিয়ে আছে! ইস সীমান্ত থেকে কত শতবার দূরের রূপালী ঝর্ণার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে বেলা গড়িয়ে গেছে।আবার ভরা বর্ষায় আসতে হবে। বাংলাদেশ ভিউ থেকে হাজার হাজার ফুট নীচের দেশ দেখে বুকের ভিতরে নাড়ীছেড়া টান। পাশে ছবির মত ইকো পার্ক পাহাড়ের চূড়ায় চূড়ায় সাজিয়ে রাখা হয়েছে! শেষ বিকেলের আলো পেরিয়ে কখন যে সন্ধ্যার আলো আঁধারি নামল! সাহেব এইবেলা শিলং চলেন নাহলে ডাউকীতে আজ রাতে ফিরতে পারব না। হাইওয়ে ধরে সাঁ সাঁ করে ছুটছে নিকোলাস। অন্ধকারে দু চোখ যেখানে পাহাড় ঘুমিয়ে।
সেই ছেলেবেলায় বাবার কাছে কত গল্প শুনেছি! মেঘের উপরে শিলং। বর্ষাকালে হাত বাড়ালেই মেঘের নাগাল পাওয়া যায়। শিলংকে বলা হয় ‘স্কটল্যান্ড অফ দি ইস্ট’! সারাবছর হিম হিম ঠা-া। দূর থেকে পাহাড়ের উপরে আলোর ফোয়াড়া দেখেই বুঝে যাই এসে গেছি শিলং। রাত আটটা বাজে হোটেল বয় তাড়াতাড়ি খেয়ে আসেন নতুবা নটায় সব বন্ধ। কি আশ্চর্য! খাওয়া শেষ করে হেঁটে হেঁটে শহর দেখা! বেশির ভাগ খাসিয়া! খুব শান্ত শিষ্ট। হৈ চৈ চিৎকার চেঁচামেচি নাই। বাঙালি আসামী মারাঠী যারা আছে তারাও শান্ত সমাহিত। পুরো শহর জুড়ে একটা ঘুম ঘুম ভাব! পরিবেশের প্রভাব! সহযাত্রীরা সবাই ঘুমে, দিনের আলোয় শহর দেখার লোভ সামলাতে না পেরে বেড়িয়ে পড়ি। চতুর্দিকে উঁচু পাহাড়ের ওপর বা দুধারে সাজানো গোছানো শহর। পুরো শহরটাই উঁচুতে! হাঁটতে হাঁটতে এ ঠা-ায় গরম লাগছে। বেলা নটা বাজে অথচ দোকানপাট হোটেল রেস্তোরাঁ সব বন্ধ। ক্যায়া হে ভাইয়া..এখানে এমনি সবাই দেরীতে উঠবে। বাংলা বলে চমকে দিল! বাহ বেশ তো ঘুমের রাজ্যে চলে এলাম! কি করা যায়! শিলং পয়েণ্টে চা পরোটা সব্জী। ব্যস! বাকীরা প্রস্তুত। সারাদিন ঘুরব ঘুমন্ত শহরে। শহরের অনতি দূরে উমায়ম লেইক! স্থানীয় ভাষায় বড়পানি। উমায়ম নদীতে পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্র, এখান থেকে পুরো শহর সহ মেঘালয় প্রদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল আলোকিত হয়। বাঁধের উজানে বিশাল বড় পানি লেক। প্রকৃতির অনন্য সমন্বয়। অনিন্দ্য সুন্দর এ সৃষ্টি দেখতে দেখতে টুপটি করে সময় হারিয়ে যায়! ইচ্ছে করলে যে কেউ বোট রাইডিং করতে পারেন। ওখান থেকে সোজা ওয়ার্ডস লেইক। উঁচু টিলা হ্রদ আর সমতল জুড়ে ভ্রমণপিয়াসুদের জন্য সাজিয়ে রাখা! সব বয়সী লোকে লোকারণ্য।
ছুটির দিনে উপচে পড়ছে। এত ভীড় অথচ কোলাহল নাই। সবচেয়ে আশ্চর্য এত বিশাল পার্কের কোথাও একটু ময়লা আবর্জনা বাদাম চাআলা নাই, এরা মূল ফটকের বাইরে। প্রবেশ নিষিদ্ধ। শিলংয়ের আরেক বৈশিষ্ট্য হল গীর্জা। সারা শহরজুড়ে সুন্দর সুন্দর সব গীর্জা। তিন ধাপে নির্মিত ক্যাথেড্রল চার্চ এখানকার ঐতিহ্যের অংশ। নীচের প্রার্থনা কক্ষের চেয়ে উপরের অংশ আরো সুন্দর। যীশু ও মা মেরীর সুন্দর শিল্পকর্ম ছড়িয়ে আছে। উপরের বিশাল হলরুমে এত লোক কিন্তু পীনপতন নীরবতা। সবাই প্রার্থনারত! কোন শব্দবিভ্রাট না করে নিঃশব্দে বেরিয়ে আসি।পুলিশ বাজারে দুপুরের খাবার সেরে ভনভস্কো মিউজিয়ামে। পুরো শহরের জন্ম থেকে শুরু করে সব ইতিহাস ঐতিহ্যের সমন্বয় এখানে। ইতিহাস ঐতিহ্যর প্রতি যাদের আগ্রহ তারা মিউজিয়াম না দেখে গেলে ভুল করবে। বেলা গড়িয়ে যাচ্ছে বাতাসে হিম হিম ভাব বাড়ছে। সন্ধ্যা নামলে আর ঘোরা যাবে না রাতের আঁধারে প্রকৃতি অনুভব করা যায় কিন্তু দেখা হয় না।
আজ লেডী হাইড্রাপার্ক দেখে ফিরে যাব কাল যাবার পথে বাকী স্পট দেখাব। নিকোলাস ড্রাইভার হলেও বেশ ভাবুক প্রকৃতির। শেষ বিকেলের আলোয় পার্কে আলোর মেলা। উদ্যান জুড়ে সুন্দর ফুলের বাগান। কত রকমের যে ফুল। কত প্রজাতির যে পশু পাখি আলাদা আলাদা খাঁচায়।ছোট পরিসরের চিড়িয়াখানা। উদ্যানজুড়ে প্রাতঃ ভ্রমণকারী সাথে বাচ্চাদের কিচির মিচির। টিকেট কেটে এত লোক বেড়াতে আসে। হিসেব মেলাতে পারি না। সঙ্গী সাথীদের তাড়ায় ছবি তোলায় বিরতি দেই। গেটের পাশে ছোট্ট যাদুঘরে কত রকমের জীবাশ্ম। শতায়ু বৃক্ষ পশু পাখিদের জীবন পরিক্রমা। প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগের এক সমৃদ্ধ আঁধার। আর সময় নেই রাত নটার মধ্যে শপিং করব চল! শিলং পয়েন্ট পুলিশ বাজার সহ শহরের সব মার্কেট মল গিজগিজ করছে। কি এত কেনাকাটা করে কে জানে! ইতিমধ্যে সাথীদের ঢাউস ব্যাগ ভর্তি। নটার মধ্যে হোটেল বন্ধ হয়ে যাবে একেবারে খেয়ে শুতে যাব। ঠিক আছে! মনে মনে হাসি আমি আবার নামব নিশুতি রাতে শিলং দেখেই তবে ঘুমোব।
সাত সকালে চেঁচামেচি! তোকে আগেই বলেছিলাম ঘুমিয়ে পড় না তোর রাতের নগর দর্শন।
ড্রাইভার বসে আছে সবাই অপেক্ষায়। তাড়াহুড়োতে শাওয়ার লাগেজ রেডী। নাস্তা চা পরোটা আলুর দমের প্রেমে পড়ে গেলুম মনে হয়। শিলং পিক রেষ্ট্রিকটেড দেখা হল না। কখন আবার আসব কে জানে!ফিরে আসতে খারাপ লাগছে। পথে এলিফ্যাণ্ট ফলস। শুকনো মৌসুমেও প্রচুর পানি, দূর থেকে ঝরঝর কানে আসছে। উৎপত্তি থেকে এত সুন্দর সিঁড়ি কেটে রাখা হয়েছে একেবারে নীচ পর্যন্ত! হাজার ফুট তো হবেই উঠানামা দুঃসাধ্য! হাপ ধরে যায় তাও ভীড়! ডাউকি অভিমুখে ফেরার তিরিশ পঁয়ত্রিশ কিলো আগে মাওলিলং! বিশ্বজুড়ে পর্যটকদের কাছে ক্লীন ভিলেজ নামে পরিচিত। বিশ্বের সবচেয়ে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন গ্রাম। গ্রামবাসীরা স্বপ্রণোদিত হয়ে পুরো গ্রাম সাজিয়ে রেখেছে। হোটেল মোটেল রেষ্টুরেণ্ট লজ সব আছে সাথে প্রকৃতির অপরূপ সম্ভার। নীরবে নিভৃতে কোলাহলহীন কদিনের অবকাশ যাপনের জন্য এরচেয়ে ভাল জায়গা হয় না।
ফিরতে ফিরতে আবার সেই চাপা কষ্টবোধ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। পৃথিবীর সবচেয়ে বৃহৎ সমুদ্র সৈকত পাহাড় নদী হৃদ প্রকৃতির কি বিপুল ঐশ্বর্য! তাঁর কতটুকু আমরা ব্যবহার করতে পারছি! কতজন পর্যটক আকৃষ্ট করতে পারছি? এই কদিনে যতটা স্পটে গেছি প্রত্যেক জায়গায় নির্দিষ্ট পরিমাণ দর্শনী দিতে হয়! সুন্দর ব্যবস্থাপনা দেখে মনে খেদ থাকে না।কোথাও চুল পরিমাণ অসঙ্গতি নাই। কর্তৃপক্ষ থেকে শুরু করে আম নাগরিক সবার এক প্রচেষ্টা কেমন করে বিশাল সংখ্যার পর্যটকদের খুশী রাখা যায়! ধরে রাখা যায়! পক্ষান্তরে আমাদের দেশের চরম অব্যবস্থাপনা দুর্নীতি সীমাহীন স্বেচ্ছাচারীতা পর্যটন শিল্পকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছে। দেশের প্রতি নূন্যতম ভালোবাসা না থাকলে কি একটা সুন্দর দেশ গঠন করা যায়।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT