পাঁচ মিশালী

রবীন্দ্রনাথের বিদেশ ভ্রমণ

দুলাল শর্মা চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ০৮-০৬-২০১৯ ইং ০০:৪৪:৫০ | সংবাদটি ১৪৩ বার পঠিত

মাত্র সতেরো বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথ প্রথম বিদেশ ভ্রমণ করেন। এরপর জীবনের বিভিন্ন পর্বে তাঁকে অসংখ্য বার যেতে হয়েছে ভারতবর্ষের বাইরে। শেষবার বিদেশ যাত্রার সময় তার বয়স সত্তর পেরোলেও বার্ধক্য স্থবির মৌন করে তোলেনি। তাছাড়া ভারতের মধ্যে নানা জায়গায় যাওয়া-আসাও ছিলো অবিশ্রান্ত। স্থানীয় প্রকৃতিকে তিনি আবাল্য ভালোবেসেছেন এবং নিসর্গের মহত্ত্ব তাকে মানবিক হতে শিখিয়েছে। ভ্রমণ সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ অনন্য। এই জগৎকে তিনি কেবল কাব্য শৃঙ্খলার বাঁধনে বাঁধেন নি, দিব্য দৃষ্টির অঞ্জন পরেই তিনি জীবনকেও দেখেছিলেন বিপুল সুদূরের পিয়াসী হয়ে। রবীন্দ্রনাথ দেশে বিদেশে নানা সভ্যতা ও সংস্কৃতির তীক্ষ্ম আলোচনায় ভ্রমণ উপলক্ষে নানা সরস ধারালো গভীর ও নন্দিত রচনায় ভ্রমণ সাহিত্যকে শিল্পমাত্রার উৎকর্ষে পৌঁছে দিয়েছেন।
পশ্চিম যাত্রীর রচনাকাল ১৯২৪। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পৃথিবীময় ঘটে গেছে যেমন নানা ওলোট পালোট, তেমনি রবীন্দ্র মানসেও পরিবর্তন ঘটেছে পশ্চিমে, বিশেষত আমেরিকায় তিনি লক্ষ্য করেছেন, বাবা মায়ের সঙ্গে অধিকাংশ বয়স্ক ছেলেমেয়ের নাড়ির টান যেমন ঘুচে গেছে, তেমনি স্ত্রী পুরুষের সম্পর্কেও জটিলতা তার দৃষ্টি এড়ায়নি। আবার সন্ত্রস্ত দৃষ্টিতে উপলব্ধি করেছেন ইউরোপের দেশে দেশে রাষ্ট্রনীতির, যুদ্ধনীতির এমনকি বাণিজ্যনীতির ঘোড় দৌড় চলছে জলে স্থলে আকাশে। অথচ এই ভীষণ প্রত্যক্ষতার মধ্যেও রবীন্দ্রনাথ ভ্রমণের চিরকালীন সত্যকে ভুলেন নি। জাপানে জাভাযাত্রীর পত্র রাশিয়ার চিঠি এবং পারস্যের প্রতিটি ভ্রমণ বৃত্তান্তে দ্রষ্টার মানসপর্দা ঠেলে বেরিয়ে পড়ার চমকপ্রদ বিবরণ আছে। তিনি সেই স্বচ্ছ দৃষ্টি দেখেছেন সেদিনের জাপানের উগ্র ইউরোপীয় বেশ ও চরিত্র। অথচ প্রাচীন জাপানের চিহ্ন যে নেই তা নয়, তারা স্বভাবত শান্ত, নিরুপদ্রব ও সংযমী। রাস্তায় লোকের ভিড় আছে, কিন্তু গোলমাল একেবারে নেই। এরা যেন চেঁচাতে জানে না, লোকে বলে জাপানের ছেলেরা কাঁদেনি। আমার কাছে মনে হয়, এইটেই জাপানের শক্তির মূল কারণ। প্রাণশক্তির বাজে খরচ নেই বলে প্রয়োজনের সময় টানাটানি পড়ে না। শোকে, দুঃখে আঘাতে, উত্তেজনায় ওরা নিজেকে সংযত করতে জানে।
জাপানিরা স্বল্পবাক, প্রকাশভঙ্গি সবসময় সংযত সংক্ষিপ্তÑ সেই জন্যই এসে দেখি, রাস্তায় কেউ গান গাইছে, এ আমি দেখিনি। এ আমি শুনেনি। এদের হৃদয় ঝরনার জলের মতো শব্দ করে না, সরোবরের জলের মতো স্তব্ধ। এদের বাকসংযম নিয়ে, সংযমী হাইকু কবিতা নিয়ে পুষ্পপ্রীতি নিয়ে রবীন্দ্রনাথ বার বার মুগ্ধতা প্রকাশ করেছেন। জাপানি সংগীত তার ভালো লাগেনি, কিন্তু জাপানি নৃত্য মুগ্ধ করেছে। তার মনে হয়েছে নৃত্য দেহভঙ্গির সংগীত-সমস্ত দেহ পুষ্পিত লতার মতো একসঙ্গে দুলতে দুলতে সৌন্দর্যের পুষ্প বৃষ্টি করছে। জাপানি নাচ একেবারে পরিপূর্ণ নাচ। তিনি দেখেছেন, জাপানিরা কেবল যে শিল্পকলায় ওস্তাদ তা নয়, মানুষের জীবনযাত্রাকে এরা একটি কলাবিদ্যার মতো আয়ত্ত করেছে। সকল বিষয়ই এদের যেমন শক্তি, তেমনি নৈপুণ্য, তেমনি সৌন্দর্যবোধ।
এমনি করেই পৃথিবীর নানা প্রান্তের সার সংগ্রহে সময় ও স্থানের অমূল্য ধন সম্বন্ধে অনুসন্ধিৎসু রবীন্দ্রনাথের মন বাইরে যাবার জন্য সদা চঞ্চল, প্রমথ চৌধুরীকে এক চিঠিতে লিখেছেন, কিছু দিন থেকে মনটা একদিকে ক্লান্ত, অন্যদিকে চঞ্চল-বোধহয় একবার পারাপার করে এলে আবার কিছু কাল স্থির হয়ে বসতে পারব। (চিঠিপত্র ৫ম খন্ড)। আবার কন্যা মীরা দেবীকে লিখেছেন, আমি বার বার পরীক্ষা করে এবং চেষ্টা করে শেষকালে স্পষ্ট বুঝেছি আমাকে ইশ্বর গৃহস্থ ঘরের জন্য তৈরি করেননি। বিশ্ব আমাকে বরণ করে নিয়েছে, আমিও তাকে বরণ করে নেব (চিঠিপত্র ৪র্থ খ-)।
এরকম এক পরিস্থিতিতে তাঁর জাপান ও আমেরিকা যাত্রা শুরু ১৯১৬ সালের ৩ মে। জাপানের পথে চার দিন বাদে ব্রহ্মদেশের রাজধানী রেঙ্গুন বন্দরে জাহাজ থামলে দু’দিন ধরে শহর দেখলেন। পথে সিঙ্গাপুরেও নামলেন। বঙ্গোপসাগরে ঝড়ের কবলে পড়ে সে অভিজ্ঞতাও হলো। আবার হংকং যে জাহাজ দুই দিন রইল, কবি অবশ্য নামলেন না। বরং চিনা শ্রমিকদের কাজ দেখে মুগ্ধ সময় কাটালেন।
আমাদের দেহের বীনাযন্ত্র থেকে কাজ যেন সংগীতের মতো বেজে উঠছে। জাহাজের ঘাটে মাল তোলা নামার কাজ দেখতে যে আমার এতো আনন্দ হবে, এ কথা আমি পূর্বে মনে করতে পারতুম না। কাজের শক্তি, কাজের নৈপুন্য এবং কাজের আনন্দকে এমন পুঞ্জীভূতভাবে একত্রে দেখতে পেয়ে আমি মনে মনে বুঝতে পারলুম, এই বৃহৎজাতির মধ্যে কতোখানি ক্ষমতা দেশজুড়ে সঞ্চিত হচ্ছে। যে সাধনায় মানুষ আপনাকে আপনি ষোলো আনা ব্যবহার করবার শক্তি পায়, তার কৃপণতা ঘুচে যায়। নিজেকে নিজে কোন অংশ ফাঁকি দেয় না, সে যে মস্ত সাধনা। চীনের এই শক্তি আছে বলেই কাজের উদ্যমে সে এগিয়ে যাচ্ছে।
রাশিয়ার চিঠির সময়কাল ১৯৩০। রবীন্দ্রনাথের বয়স প্রায় সত্তর। এক নূতন সমাজ ব্যবস্থা, তার অভিনব কান্ডকারখানা দেখে বিস্মিত রবীন্দ্রনাথ। তাঁর সচেতন মন সাড়া জাগিয়ে বলে উঠল। কোনো মানুষই যাতে নিঃসহায় ও নিস্কর্মা হয়ে না থাকে এজন্য কি প্রচুর আয়োজন ও কি বিপুল উদ্যম। প্রতিদিন আমি ভারতবর্ষের সঙ্গে এখানকার তুলনা করে দেখি আর ভাবি কি হয়েছে আর কি হতে পারত। অবশ্য এই সঙ্গে এদের শিক্ষাব্যবস্থার ছাঁচে ব্যবস্থার গলদও তার দৃষ্টি এড়ায়নি। তাহলেও তিনি মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করেছেনÑ আপাতত রাশিয়ায় এসেছি না এলে এ জন্মের তীর্থ দর্শন অত্যন্ত অসমাপ্ত থাকত। জমিদারীর কাজে বাংলাদেশের চাষীদের চেহারা-চরিত্র সম্পর্কে অভিজ্ঞ রবীন্দ্রনাথ স্বচক্ষে রাশিয়ার চাষী-গোষ্ঠির উল্কা-প্রতিম অগ্রগতি দেখে বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছেন, যারা মূক ছিল তারা ভাষা পেয়েছে, যারা মূঢ় ছিল তাদের চিত্তের আবরণ উদঘাটিত, যারা অক্ষম ছিল তাদের আত্মশক্তি জাগরুক। রাশিয়া ভ্রমণে রবীন্দ্রনাথ উপলব্ধি করেছেন যে সব দেশে তিনি ঘুরেছেন, তারা সমগ্রভাবে তাঁর মনকে নাড়া দেয়নি। কিন্তু রাশিয়ার ক্ষেত্রে তিনি দেখেছেন একটা অখ- সাধনা, এক বিরাট অভিপ্রায়ের মুখে সমস্ত দেশটা এগিয়ে চলেছে।
জীবনের পড়ন্ত সীমায় পৌঁছেও রবীন্দ্রনাথ ভ্রমণে অক্লান্ত। ১৯৩২ সালে ক্লান্ত শরীর তিনি পারস্য ভ্রমণে যান। এই ভ্রমণবৃত্তান্তে প্রাচীন ইতিহাসের অনেক বিশ্লেষণ আছে যা সত্তর পরবর্তী কবির কাছে আমাদের প্রত্যাশার অতীত। শরীর জীর্ণ হলেও মন জীর্ণ হয়নি। পারস্যে ভ্রমণ কাহিনীতে তার প্রচুর চিহ্ন ছড়ানো। সে পরিচয় রবীন্দ্রনাথ দেখেছেন পারস্য রাজ্যের সঙ্গে তার সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে, তেমনি মরু-অঞ্চলে বেদুইনদের তাঁবুতে বেদুইন দলপতির সঙ্গে আলাপেও সরস আতিথ্যে মুগ্ধ হয়েছেন কবি।
রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে পৃথিবীর অসংখ্য দেশের মানুষের নিবিড় সম্পর্ক ও যোগাযোগ গড়ে উঠেছিল। তাদের অনেকেই ছিলেন বিশ্বখ্যাত। রবীন্দ্রনাথ অসংখ্যবার বিদেশ ভ্রমণ করেছেন। বিশ্ব সভ্যতার সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন ঘটেছে তার মধ্যে দিয়ে। সেই সম্বন্ধ সূত্রে তিনি হয়ে উঠেছেন বিশ্বপথিক, বিশ্বমানব।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT