উপ সম্পাদকীয়

প্রিয়াঙ্কা হত্যা এবং শিক্ষিত সমাজ

মিহির রঞ্জন তালুকদার প্রকাশিত হয়েছে: ০৮-০৬-২০১৯ ইং ০০:৪৬:১২ | সংবাদটি ১৩০ বার পঠিত

নারী নির্যাতন আমরা সাধারণত নি¤œবিত্ত,দরিদ্র, অশিক্ষিত, কুসংষ্কারাচ্ছন্ন সমাজেই প্রত্যক্ষ করে থাকি। আমরা ধরে নেই সংসারে অভাব অনটন লেগে থাকলে দু:খ, দুর্দশা কিছুটা থাকেই। আর এ থেকেই দরিদ্র পরিবারে পারিবারিক কলহ লেগেই থাকে। বর্তমানে বাংলাদেশে দারিদ্র নাই বললেই চলে। সেটা তখনই বুঝা যায় যখন আপনি গ্রামে কিংবা শহরে কাজের লোক খুঁজতে বের হবেন। একসময় ধান কাঁটার লোকের অভাব হতো না। কিন্তু এখনতো আপনারাই জানেন।
বলছিলাম নারী নির্যাতন নিয়ে। নারী নির্যাতন যে শুধু দরিদ্রতার জন্য হয় সেটাও কিন্তু নয়। অনেকেই চরম দরিদ্রতার মাঝেও সুখ খুঁজে নেয়। আবার সুশিক্ষার অভাবেও নারী নির্যাতন হয়। আমাদের সমাজে দরিদ্রতা এখন অনেকটা হ্রাস পেয়েছে, কিংবা শিক্ষা-দীক্ষায় অনেকটা এগিয়ে গেছে কিন্তু কুসংষ্কারাচ্ছন্নতা থেকে সমাজ এখনো বেরোতে পারছে না। শ্বশুর, শাশুড়ি আর ননদ সবাই মিলে ঘরের বউকে ক্রীতদাসী মনে করবে। সে যেন এক পরম্পরা। আর যদি বউ কোনো চাকুরি না করে তাহলেতো আর কথাই নেই।
গত ১২ মে সিলেট নগরীর পশ্চিম পাঠানটুলার পল্লবি ‘সি’ ব্লকের ২৫ নম্বর বাসা থেকে ডা. প্রিয়াঙ্কা তালুকদারের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরিবারের দাবি সে আতœহত্যা করেছে। আমি যখন লিখাটি লিখছি তখন আর এটাকে আতœহত্যা বলার সুযোগ নেই। প্রিয়াংকা তালুকদার শান্তাকে নিয়মিত নির্যাতন করতেন তার শ্বশুর ও শাশুড়ি। রোববার (১৯ মে) মহানগর হাকিম আদালত-১ এ রিমান্ড শেষে প্রতিবেদন দাখিল করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই আতিকুর রহমান। রিমান্ডে পুলিশের কাছে এমনি স্বীকার করেছেন তারা। কাজেই এটি একটি নির্মম হত্যাকান্ড।
মেধাবী শিক্ষার্থীরাই ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিসিএস ক্যাডার হয়। কাজেই তাদেরকে বুঝানোর প্রয়োজন নেই যে, আতœহত্যা পাপ নয়, মহাপাপ।
বিভিন্ন উৎস থেকে যতটুকু জানতে পারলাম ডা. প্রিয়াঙ্কা তালুকদার সিলেট পার্ক ভিউ মেডিকেল কলেজের প্রভাষক ছিল। তাঁর বাবা হৃষিকেশ তালুকদার সুনামগঞ্জের নতুন পাড়ার বাসিন্দা। আমার বাসা থেকে তাদের বাসার দুরত্ব বেশি না হলেও তাদের সাথে পরিচিত নই। সুনামগঞ্জ এখনো অবহেলিত শহর হিসেবেই পরিচিত। কোনো সরকারি কর্মকর্তা, কর্মচারিকে শাস্তিমূলক বদলি দিতে হলে বান্দারবন, রাঙ্গামাটির মতো সুনামগঞ্জের নাম এখনো আসে। সে হিসেবে সুনামগঞ্জের খুব কম সংখ্যকই উচ্চ শিক্ষিত, বড় চাকুরিজীবী, ফলে মোটামুটি সবাই তাদের সম্পর্কে জানেন, চিনেন। কাজেই এ বিষয়টি নিয়ে আমারো খোঁজ খবর নিতে তেমন সমস্যা হয়নি। ডা. প্রিয়াঙ্কাও ছিল সুনামগঞ্জের গর্ব। তারও ইচ্ছে ছিল বিসিএস ক্যাডার হওয়ার। একটি কোচিং সেন্টারে ভর্তিও হয়েছিল বিসিএস দেবার আশায়। আর সে কিনা করবে আতœহত্যা? তাছাড়া তাঁর তিন বছরের একটি ফুটফুটে ছেলেও রয়েছে, নাম কাব্য। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে মায়ের কোলে ছেলের মায়াময় চাহনির একটি ছবি। যা সবার হৃদয়কে বিমোহিত করছে। ছেলেকে বাঁচানো জন্য মা আতœহত্যা করতে পারে, কিন্তু ছেলেকে রেখে মায়ের আতœহত্যা? সমাজে অনেক অঘটনই ঘটে থাকে কিন্তু এমন কথা বললে সমাজে মায়েদের প্রতি চরম অন্যায় করা হবে।
বিভিন্ন জনের মন্তব্য থেকে জানা যায়- ডা. প্রিয়াঙ্কা সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে বাসার যাবতীয় কাজ, পূজা-অর্চনা, নাস্তা তৈরি করে যেতেন কলেজে। দুপুর ২ টায় কলেজ ছুটির পরই তাড়াহুড়া করে আসতেন বাসায়। আবার রান্না করতেন সবার জন্য, ঘর পরিষ্কার করতেন, বাসার সবাইকে খাওয়াতেন, তারপর নিজে খেতেন। এতো কিছুর পরও পান থেকে চুন খসলে চলতো অকথ্য মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন। বিকালবেলা ঘুমানোরও অবকাশ ছিলনা। কারণ তার একটি দুধের বাচ্চা রয়েছে তাকেও সময় দিতে হয়। তারপরও আবার মুরগি লালন- পালনের দায়িত্বও ছিল তারই উপর। বাসায় কোনো কাজের মহিলা রাখার প্রয়োজন মনে করতো না পরিবারের লোকজন। ঘটনার আগের রাত ৪ টা পর্যন্ত ঐ বাসা থেকে কান্নার আওয়াজ শুনেছেন প্রতিবেশিরা। সন্দেহ থাকল না যে তাঁর উপর নির্যাতন হয়েছিল কিনা?
উচ্চবিত্ত, উচ্চশিক্ষিত সমাজে যে নারী নির্যাতনগুলো হয় তা আমাদের চক্ষুর অন্তরালেই থেকে যায়। এর প্রধান কারণ হলো তারা শিক্ষিত, তারা ধৈর্যশীল, তারা ভাঙ্গবে তবু মচকাবে না। তারা কাঁদতে চাইলেও কাঁদতে পারে না। কি জানি পাড়া-প্রতিবেশি শুনে ফেলে? পরিবারের বদনাম হবে। তাই শিক্ষিত মেয়েগুলো নিরবে বয়ে বেড়ায় নির্যাতনের জ্বালা। কেউ কেউ এ নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে বেঁেছ নেয় আতœহত্যার মত পথ। যখন একটি মেয়ে আতœহত্যার পথ বেঁছে নেয়, তখন বুঝতে কারো বাকি থাকে না তাঁর উপর কী ধরনে শারিরীক, মানসিক, নির্যাতন হয়েছিল?
ডা. প্রিয়াঙ্কা হত্যার দোষীদের বিচারের দাবিতে সুনামগঞ্জে মানবন্ধন করেছেন সুনামগঞ্জ মহিলা পরিষদসহ বিভিন্ন নারী সংগঠনের নেতা ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিবৃন্দ। সিলেটে বিভিন্ন মেডিকেল কলেজের তাঁর সহপাঠি, সহকর্মী ও ছাত্র-ছাত্রীরাও বিচারের দাবিতে রাস্তায় নেমেছে।
আমরাও চাই দোষীদের দৃৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক। আর যেন সীতা বিসর্জনের কাহিনী শুনতে না হয়। কাব্যর মতো আর কোরো যাতে রাস্তায় দাড়িয়ে মায়ের হত্যাকারীর বিচার চাইতে না হয়। এই অমানবিক দৃশ্য আমরা দেখতে চাই না। কাব্য সৌভাগ্য নিয়েই জন্মেছিল। বাবা ইঞ্জিনিয়ার আর মা ডাক্তার। ঈশ্বর তাকে ভাল রাখুক।
লেখক : শিক্ষক।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • প্রানের শহর সিলেট
  • সম্পত্তিতে হিন্দু নারীর অধিকার
  • আশঙ্কার মধ্যে মার্কিন-চীন বাণিজ্যযুদ্ধ
  • ভিমরুলের চাকে অমিতের খোঁচা
  • মানবপাচার, অর্থপাচার সমাচার
  • আত্মনির্ভরতা
  • খাদ্যে ভেজাল : দরকার কঠোর পদক্ষেপ
  • নগরীর জলাবদ্ধতা প্রসঙ্গ
  • এম.সি কলেজে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ চাই
  • টেকনিক্যাল রোডে স্টিলের রেলিংসহ ফুটপাত চাই
  • জৈনপুর এলাকায় ড্রেন সংস্কার হোক
  • বানরের উৎপাত প্রসঙ্গ
  • শাবিতে বিবিএ অনুষদের আসন বৃদ্ধি হোক
  • প্যালেস্টাইন রাষ্ট্র : স্বপ্ন ও বাস্তবতা
  • সাক্ষরতা আন্দোলন : একটি পর্যালোচনা
  • অশান্ত বিশ্বে শান্তির সন্ধান
  • আমার পাহাড়, আমার সিলেট
  • যৌবন ফিরে পাক বিবিয়ানা নদী
  • সড়ক দুর্ঘটনা : এ শোকের শেষ কোথায়?
  • সামাজিক ব্যাধি
  • Developed by: Sparkle IT