উপ সম্পাদকীয় খোলা জানালা

সম্ভাবনাময় অর্থনীতি

অলোক আচার্য প্রকাশিত হয়েছে: ০৯-০৬-২০১৯ ইং ০০:২৫:০১ | সংবাদটি ১০৭ বার পঠিত

বর্তমানে ব্লু-ইকোনমি বা সমুদ্র অর্থনীতি বিশ্বের যে কোনো দেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। ক্রমেই সমুদ্রের জলরাশির নিচে ডুবে থাকা সম্পদের দিকে রাষ্ট্রগুলোর আগ্রহ বাড়ছে। আর এ কারণে দেখা যাচ্ছে, এক দেশ অন্য দেশের সঙ্গে সমুদ্রে আধিপত্য নিয়ে যুদ্ধ বা যুদ্ধ হুমকিতে জড়াচ্ছে। কেউ কাউকে ছাড় দিতে নারাজ। চীন বা জাপানের মতো বৃহৎ অর্থনীতির দেশগুলো আরও দুই-তিনশ বছর আগে থেকেই সমুদ্রনির্ভর কর্মকা- এগিয়ে নিয়ে গেছে। অনেক দেশের সিংহভাগ জাতীয় আয়ই আসে সমুদ্রনির্ভর অর্থনীতি থেকে। বাংলাদেশের মৎস্য সম্পদের একটি বড় অংশই সমুদ্র থেকে আসে। যদিও উপকূল থেকে মাত্র ৫০ মিটার গভীর পর্যন্ত মাছ ধরার সামর্থ্য রয়েছে বাংলাদেশের। সেই সঙ্গে সমুদ্র তীরবর্তী অঞ্চলে বসবাসরত জনগোষ্ঠীর জীবন ও জীবিকাও সমুদ্রের ওপরই সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল। বহু বছর ধরেই এসব জনগোষ্ঠী নৌকায়, ট্রলারে মাছ ধরে, জাল বুনে, মুক্তা ও চিংড়ি চাষ করে, লবণ শিল্প গড়ে তুলে আমাদের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। আমরা যদি আমাদের সমুদ্রভিত্তিক অর্থনীতিকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারি, তাহলে দেশের টেকসই খাদ্যনিরাপত্তা এবং জাতীয় আয়কে আরও সমৃদ্ধ করা যেতে পারে। কারণ আমাদের ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটারের বিশাল জলসীমায় তেল, গ্যাসসহ মূল্যবান খনিজ সম্পদ রয়েছে। যার অধিকাংশই আমরা ব্যবহার করতে পারছি না।
জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত সম্পদ ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাহিদা মেটাতে প্রয়োজন হচ্ছে। ভূখন্ডের কৃষিজমি দখল করে মাথা গোঁজার ঠাঁই খুঁজে নিচ্ছে মানুষ। বিপুলসংখ্যক মানুষ উদ্বাস্ত হচ্ছে প্রতি বছর। ফলে কৃষিজমির বাইরে খাদ্যের জন্য মানুষ অনেক আগে থেকেই সমুদ্রনির্ভর হয়েছে। সামুদ্রিক মাছ দেশের বাইরে রপ্তানি করে ও সামুদ্রি প্রাণী শিকার করে তা দেশের বাজারে বিভিন্ন উপকরণ তৈরি করে বিক্রি করে অর্থনীতির চাকা গতিশীল রাখা হচ্ছে। এখানেই ব্লু-ইকোনমির ধারণা আরও জোরদার হচ্ছে। বর্তমানে বিশ্বে ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের কর্মকা- সংঘটিত হচ্ছে সমুদ্র ঘিরে। বিশ্বের ৪৩০ কোটি মানুষের ১৫ থেকে ১৬ শতাংশ প্রোটিনের জোগান দিচ্ছে সামুদ্রিক মাছ ও উদ্ভিদ। ৩০ ভাগ জ্বালানি তেল ও গ্যাস আসছে সাগর থেকেই।
এক প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ২০৫০ সালে পৃথিবীর জনসংখ্যা হবে ৯০০ কোটি। তখন বিপুল এ জনগোষ্ঠীর খাদ্যের জোগান দিতে সমুদ্রের মুখাপেক্ষী হতেই হবে। বর্তমানেই ৪৩০ কোটি মানুষের ১৫ ভাগ প্রোটিনের জোগান দিচ্ছে সমুদ্র। ভবিষ্যতে এ সংখ্যা আরও বাড়বে সন্দেহ নেই। কারণ স্বাদু প্রাণীর মাছের সংখ্যা কমছে। কারণ জনবসতি বাড়ছে। আর এ অতিরিক্ত মানুষের জায়গা করতে গিয়ে ভরাট হচ্ছে স্বাদু পানির বিভিন্ন উৎস। ভরাট হচ্ছে নদী। বাঁধ দিয়ে নদীকে মৃত বানানো হচ্ছে। নদী ভরাট করে গড়ে উঠছে স্থাপনা। তাছাড়া পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দূষণের কারণে ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে যাচ্ছে অনেক নদী। পৃথিবীর ৩০ ভাগ গ্যাস ও জ্বালানি তেল সরবরাহ হচ্ছে সমুদ্রতলের বিভিন্ন গ্যাস ও তেলক্ষেত্র থেকে। তাই তো বিশ্বের সব দেশের নজর এখন সমুদ্রের দিকে। স্থল ও আকাশে সামরিক শক্তি বৃদ্ধির পাশাপাশি সমুদ্রে সক্ষমতা প্রমাণে উঠেপড়ে লেগেছে সব দেশ। নিজ সামুদ্রিক সীমানা দখলে রাখতে মোটা অঙ্কের বাজেট তৈরি করছে।
দেশের অর্থনৈতিক শক্তির ভবিষ্যৎ আধার সমুদ্রকে গুরুত্ব দেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। ব্লু-ইকোনমি ক্রমেই প্রতিটি দেশের কাছে জনপ্রিয় হচ্ছে। অধিকাংশ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মেলনেই ব্লু-ইকোনমি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে এর গুরুত্বই পৃথিবীর কাছে আলোচনার বিষয়বস্তু করে তুলেছে। ছোট-বড় সব দেশই এখন তাদের অর্থনীতি শক্তিশালী করতে সমুদ্রের ওপর জোর দিচ্ছে। ব্লু-ইকোনমিনির্ভর বিভিন্ন কৌশল প্রণয়ন করছে। বাংলাদেশের শক্তিশালী অর্থনীতির জন্য জনশক্তির পূর্ণ ব্যবহার করতে সমুদ্র অর্থনীতির ওপর জোরারোপ করছে। আর সমুদ্র বিজয়ের পর সে দুয়ার এখন বাংলাদেশের সামনে নতুন দিগন্ত হয়ে দেখা দিয়েছে। ভারত ও বাংলাদেশের এবং মিয়ানমার ও বাংলাদেশের সঙ্গে সমুদ্রসীমানাজনিত সমস্যা ঠিক হওয়ার পর বেড়ে গেছে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিধি। অন্যসব দেশের মতো আমাদের চিন্তাভাবনাও আবর্তিত হচ্ছে কীভাবে সমুদ্র থেকে সর্বোচ্চ সুবিধা আদায় করা যায়। স্থলভাগে প্রাপ্ত প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত দ্রুতই নিঃশেষ হয়ে আসছে। কিন্তু আমাদের শক্তির প্রধান উৎস প্রাকৃতিক গ্যাস। তাই সমুদ্র এলাকায় গ্যাসের মজুত চিহ্নিতপূর্বক গ্যাস আহরণের চেষ্টা করা হচ্ছে। যদিও প্রযুক্তি এখন পর্যন্ত আমাদের প্রধান বাধা। এরই মধ্যে বাংলাদেশ সমুদ্র অংশে কী পরিমাণ মৎস্য সম্পদ, খনিজ সম্পদ ও অন্যান্য কী ধরনের সুযোগ-সুবিধা রয়েছে, তা কর্তৃপক্ষ যাচাই করছে। আমাদের দেশের সমুদ্রনির্ভর অর্থনীতিতে ব্যাপক সম্ভাবনা থাকলেও আমাদের পর্যাপ্ত দক্ষ জনবল এবং প্রযুক্তি না থাকায় আমরা সেই বিপুল সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারছি না। এক্ষেত্রে সমন্বয়হীনতাও দায়ী। প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা এবং সে অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ এক্ষেত্রে জরুরি। সম্ভাবনাময় এ ক্ষেত্রের সঠিক ব্যবহারকে নিশ্চিত করতেই
হবে।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • প্রানের শহর সিলেট
  • সম্পত্তিতে হিন্দু নারীর অধিকার
  • আশঙ্কার মধ্যে মার্কিন-চীন বাণিজ্যযুদ্ধ
  • ভিমরুলের চাকে অমিতের খোঁচা
  • মানবপাচার, অর্থপাচার সমাচার
  • আত্মনির্ভরতা
  • খাদ্যে ভেজাল : দরকার কঠোর পদক্ষেপ
  • নগরীর জলাবদ্ধতা প্রসঙ্গ
  • এম.সি কলেজে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ চাই
  • টেকনিক্যাল রোডে স্টিলের রেলিংসহ ফুটপাত চাই
  • জৈনপুর এলাকায় ড্রেন সংস্কার হোক
  • বানরের উৎপাত প্রসঙ্গ
  • শাবিতে বিবিএ অনুষদের আসন বৃদ্ধি হোক
  • প্যালেস্টাইন রাষ্ট্র : স্বপ্ন ও বাস্তবতা
  • সাক্ষরতা আন্দোলন : একটি পর্যালোচনা
  • অশান্ত বিশ্বে শান্তির সন্ধান
  • আমার পাহাড়, আমার সিলেট
  • যৌবন ফিরে পাক বিবিয়ানা নদী
  • সড়ক দুর্ঘটনা : এ শোকের শেষ কোথায়?
  • সামাজিক ব্যাধি
  • Developed by: Sparkle IT