সম্পাদকীয়

নারী-শিশু পাচার

প্রকাশিত হয়েছে: ০৯-০৬-২০১৯ ইং ০০:২৬:৪০ | সংবাদটি ৩৫ বার পঠিত

নারী ও শিশু পাচারের একটি উর্বর ক্ষেত্র হচ্ছে বাংলাদেশ। এখান থেকে প্রতি বছর কমপক্ষে ১৫ হাজার নারী ও শিশু পাচার হচ্ছে বিভিন্ন দেশে। একটি আন্তর্জাতিক চক্র দীর্ঘদিন ধরে এই পাচার কাজে নিয়োজিত। এই চক্রের নেটওয়ার্ক রয়েছে দেশব্যাপী। এরা গরিব-অসহায় শিশু এবং বিধবা তরুণীদের দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সংগ্রহ করে পাচার করে দিচ্ছে বিদেশে। আর বিদেশে এদেরকে দেহব্যবসাসহ নানা অনৈতিক কাজে লিপ্ত হতে বাধ্য করা হচ্ছে। অনেককে নিয়োগ দেয়া হচ্ছে গৃহপরিচারিকার কাজে। এদেশে নারী ও শিশু পাচার বিরোধী আইন রয়েছে। তারপরেও এই অপকর্ম কমছে না। এ ব্যাপারে সবচেয়ে জরুরি হচ্ছে জনসচেতনতা। নারী ও শিশু পাচার এবং নির্যাতন সংক্রান্ত কোন তথ্য যথাস্থানে জানানো এবং সরকারি বেসরকারি কার্যক্রম জোরদার করা হলেই দেশ থেকে নারী ও শিশু পাচারের মতো জঘন্য অপকর্ম বন্ধ হবে।
একে তো নারী ও শিশু পাচার হচ্ছে বিভিন্ন দেশে অবৈধভাবে; আর এরা বিদেশে মানবেতর জীবনযাপন করছে। অপরদিকে, সরকারও বৈধভাবে বিদেশে নারী শ্রমিক পাঠাচ্ছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে সরকারিভাবে গমনকারী নারীদের পরিণতিও সুখের নয়। এরা নানাভাবে নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। প্রায় সময়ই বিদেশে কর্মরত নারীদের নির্যাতনের নানা চিত্র আসছে বিভিন্ন মিডিয়ায়। জানা গেছে, পর্যটন ভিসার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে প্রতি বছর কমপক্ষে দু’হাজার মানব পাচার হয়ে থাকে। কর্মসংস্থানের কথা বলে এদেরকে পাঠানো হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে। এর মধ্যে কমপক্ষে দশ শতাংশ নারী ও শিশু। মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ এবং কমনওয়েলথভুক্ত দেশে মানবপাচার সীমিত পর্যায়ে থাকলেও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে এর চিত্র ভিন্ন। এই অঞ্চলে প্রতি বছর দেড় লাখ নারী ও শিশু পাচার হয়। ভারত, পাকিস্তান ও মধ্যপ্রাচ্যসহ নানা দেশে পাচার হচ্ছে নারী ও শিশু। মূলত অজ্ঞতা ও দারিদ্র্যের জন্যই ঘটছে এই পাচারের ঘটনা। পাচারকারী চক্র সামান্য অর্থের লোভে অসহায় নারী ও শিশুদের অন্ধকার জীবনে ঠেলে দিচ্ছে। পাচারকৃত নারীদের বেশির ভাগই দেহব্যবসায় জড়িত হতে বাধ্য হচ্ছে। তাছাড়া, মধ্যপ্রাচ্যে উটের জকি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বাংলাদেশ থেকে পাঠানো শিশুদের। জানা গেছে ভারতের কলকাতায় যৌনকর্মীদের মধ্যে দুই শতাংশের বেশি বাংলাদেশ থেকে পাচারকৃত। নারী ও শিশু পাচারের নিরাপদ রুট হচ্ছে সীমান্ত পথ। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত ও মিয়ানমারের চার হাজার দু’শত ১২ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকা রয়েছে। তাই এই সীমান্ত পথকে সুরক্ষিত করতে হবে। বাড়াতে হবে সীমান্তে নজরদারী। তাছাড়া, বৈধভাবে নারী শ্রমিকের বিদেশ গমনের বিষয়টি নতুন করে পর্যালোচনা করা দরকার। কারণ, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বৈধভাবে যেসব নারী যাচ্ছে চাকুরী নিয়ে, তাদের বেশির ভাগই দুর্বিসহ জীবনযাপন করছে। তাদেরকে সহ্য করতে হচ্ছে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন।
নারী ও শিশু পাচার রোধে এ দেশে আইন প্রচলিত রয়েছে। ১৯৯৫ সালে প্রণয়ন করা হয় আইনটি। এই আইনের অধীনে দোষী প্রমাণিত হলে যাবজ্জীবন কারাদ-ের বিধান রাখা হয়েছে। মানব পাচার রোধে দেশের সকল বিমান ও স্থল বন্দরে কড়া নজরদারী, মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং সেল ও টাস্কফোর্স গঠন এবং দ্রুত বিচার আদালতে মামলা নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিতে হবে। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায়, প্রায় সময়ই পুলিশ, বিজিবি এবং র‌্যাব-এর প্রচেষ্টায় পাচারকারীদের হাত থেকে নারী ও শিশুদের উদ্ধার করা হচ্ছে। কিন্তু বন্ধ হচ্ছে না মানব পাচারের মতো জঘন্য অপকর্ম। এ ব্যাপারে সার্বিক সাফল্য অর্জনের জন্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সচেতনতার পাশাপাশি দরকার সর্বস্তরের মানুষের মধ্যেও সচেতনতা সৃষ্টি করা। নারী ও শিশু পাচার এবং নির্যাতন সংক্রান্ত কোন তথ্য যাতে গোপন না থাকে, সেটা নিশ্চিত করাও জরুরি।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT