উপ সম্পাদকীয়

বজ্রপাত এবং সতর্কতা

হিমাংশু রায় হিমেল প্রকাশিত হয়েছে: ০৯-০৬-২০১৯ ইং ০০:২৭:১২ | সংবাদটি ২৪৭ বার পঠিত

বজ্রপাত শব্দটি শুনলেই বুকের ভিতরে কিসের যেন এক ভয় দানা বাঁধে কেমন যেন গা শিউরে ওঠে। সাম্প্রতিক সময়ে আমরা লক্ষ্য করছি হঠাৎ করেই বজ্রপাতের মাত্রা বেড়ে গেছে। অকালে ঝরে পড়ছে অসংখ্য প্রাণ। আক্ষরিক অর্থেই বজ্রপাত পরিনত হয়েছে সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগে। ঘূর্ণিঝড় কিংবা জলোচ্ছ্বাসের মতো বজ্রপাতে ব্যাপক হারে অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়তো হয় না। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, বজ্রপাতে নিহত ব্যক্তি পরিবারের একমাত্র কর্মক্ষম ব্যক্তি। তাই জাতীয় অর্থনীতিতে এর সুদুর প্রসারী ফল পড়তে বাধ্য।
বজ্রপাত হয় আকাশে মেঘ জমা হবার সময় জলীয়বাম্প যখন উপরে উঠতে থাকে তখন সেই জলীয়বাস্পের ঘর্ষনের কারণে কিছু ইলেকট্রন আলাদা হয়ে নিচের মেঘগুলোর মাঝে জমা হতে থাকে। তখন স্বাভাবিকভাবেই উপরের মেঘের মাঝে ইলেকট্রনিক্স কম পড়ে এবং সেখানে পজিটিভ চার্য জমা হয়। মেঘের ভিতর যথন প্রচুর চার্য জমা হয় তখন স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসার জন্য মেঘের ভিতরে বড় স্পার্ক হয় সেটাকে আমরা বলি বিজলি চমকানো। মাঝে মাঝে আকাশের মেঘে এতবেশি চার্য জমা হয় সেগুলো বাতাসকে আয়নিত করে লক্ষ মাইল বেগে মাটিতে নেমে আসে এবং আমরা সেটাকে বলি বজ্রপাত। বজ্রপাতের সময় মেঘ থেকে বিশাল চার্য পৃথিবীতে নেমে আসে। বাতাসের ভেতর দিয়ে যাবার সময় সেটা বাতাসকে আয়নিত করে ফেলে, তখন সেখানে প্রচন্ড তাপ আর আলো আর শব্দ তৈরি হয়ে এবং বিশাল পরিমাণ চার্য যেখানে হাজির হয় সেখানে ভয়ংকর ক্ষতি হতে পারে।
আমরা জানি বায়ু মন্ডলে জলীয়বাস্প থাকে। এই জলীয়বাস্প বায়ু মন্ডলের আহিত আয়নগুলোর উপর ঘনীভূত হয়ে পানি কনার সৃষ্টি করে এবং তড়িতাহত হয়। এই ধরনের পানির কনাগুলো একত্রিত হলেই মেঘের উৎপত্তি হয়। মেঘ ধনাত্মক বা ঋণাত্মক যেকোনভাবেই আহিত হতে পারে। তড়িতাহিত দুইটি মেঘ কাছাকাছি এলেই তাদের মধ্যে তড়িৎক্ষরণ হয়, তখন বিরাট অগ্নিস্ফুলিঙ্গের সৃষ্টি হয়। একে বিদ্যুৎচমক বলে। বিদ্যুৎচমকের সময় মেঘের চার পাশের বায়ুমন্ডল হঠাৎ তাপ পেয়ে প্রসারিত হয়। হঠাৎ প্রসারণের ফলে বায়ুমন্ডলের চাপ কমে যায়। তখন আশপাশের বায়ু এসে এই প্রসারিত বায়ুকে সংকুচিত করে। খুব তাড়াতাড়ি এধরনের সংকোচন ও প্রসারণ হয় বলে প্রচন্ড শব্দের সৃষ্টি হয়। একেই বলে গর্জন। তড়িতাহিত মেঘে যদি তাড়িতাহতের পরিমাণ বেশি হয় তাহলে তড়িৎক্ষরণের মাধ্যমে পৃথিবীতে চলে আসে। একেই বলে বজ্রপাত। বজ্রপাতের সাথে সাথে যে শব্দ হয় তাকে বজ্রনাদ। বজ্রপাতের সময় লক্ষ অ্যাম্পিয়ারের মতো বিদ্যুৎ প্রবাহিত হতে পারে এবং এই বিদ্যুৎ প্রবাহের জন্য বাতাসের তাপমাত্রা ২০ থেকে ৩০ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উত্তপ্ত হয়ে যায়, সেটা সূর্য পৃষ্টের তাপমাত্রা থেকে বেশি। পুরো বিষয়টি ঘটে শব্দের গতির চাইতে তাড়াতাড়ি এবং একটি গগনবিদারী শব্দ হয়। বাতাসের গতি শব্দের চাইতে দ্রুত হলে তাকে শকওয়েভ বলে এবং বজ্রপাতের শব্দ এক ধরনের শকওয়েভ। আলোর ঝলকানি এবং শব্দ একই সাথে তৈরি হলেও আমরা আলোটিকে প্রথম দেখি আলোর গতিবেগ বেশি বলে। শব্দের গতি ৩৩০স/ং এর মতো, অর্থাৎ এক কিলোমিটার যেতে প্রায় ৩ং সময় নেয়।
বজ্রপাতের সময় যেহেতু আকাশের মেঘ থেকে বিদ্যুৎ প্রবাহ নিচে আসে তাই এটা সাধারণত উঁচু জিনিসকে সহজে আঘাত করে। তাই বজ্রপাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য উঁচু বিল্ডিংয়ের উপর ধাতব একাধিক সুচালো মুখযুক্ত শনাকা লাগানো হয়। সেটা মোটা বিদ্যুৎ সুপরিবাহী তার দিয়ে মাটির গভীরে নিয়ে যাওয়া হয়। উচু বিল্ডিং এর বজ্রশলাকা বজ্রপাত গ্রহণ করে আর বিশাল পরিমাণ চার্জকে সেই দন্ড নিরাপদে মাটির ভিতরে নিয়ে যায়। আকাশ থেকে নেমে আসা বিদ্যুৎ অনিয়ন্ত্রিতভাবে না গিয়ে এই মোটা তার দিয়ে মাটির গভীরে চলে যায়। সুচালোশলাকায় শুধু যে বজ্রপাত হয় তা নয় এইশলাকা দিয়ে বিপরীত চার্জ বের করে মেঘের মাঝে জমে থাকা চার্জকে নিস্ক্রিয় করে দিতে পারে। ফলে বজ্রপাতের আশঙ্কা অনেক কমে যায়।
তড়িৎ সব সময় পরিবাহীর মধ্য দিয়ে সংক্ষিপ্ততম পথে চলে। মেঘে মেঘে সৃষ্ট তড়িৎ উঁচুবস্তর ভিতর দিয়ে পৃথিবীতে আসতে চায়। ঝড় বৃষ্টির সময় তাই ছাতার নিচে, কোন গাছের নিচে, তড়িৎ পরিবাহি কোন খুঁটি, লোহার তৈরি কোন দন্ড বা বৈদ্যুতিক খুঁটির কাছাকাছি দাঁড়ানো ঠিক নয়।
গত কয়েক বছরে আমাদের দেশে বজ্রপাতের ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে বলতে গেলে আমাদের দেশে সাধারণত বছরে দু’বার ঝড় বৃষ্টির মৌসুম আসে। মৌসুমি বায়ু আসার সময় মার্চ-এপ্রিল-মে। আর মৌসুমি বায়ুর আগমনীতে সৃষ্ট ঝড়বৃষ্টির বজ্রপাতের পরিমাণ আনুমানিক হারে বেশি। এই বজ্রপাত সাম্প্রতিক সময়ে বেড়ে যাওয়ার কারণ পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে জলবায়ু পরিবর্তন। এক পরিসংখ্যানে জানা যায় জলবায়ুতে যে হারে কার্বনের পরিমাণ বাড়ছে তা যদি দ্বিগুণ হয়ে যায় তাহলে বজ্রপাতের পরিমাণ ৩২ শতাংশ বেড়ে যাবে। সেই সাথে দাবানলও বেড়ে যাবে। বাংলাদেশের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে ২০১৬ সালে বজ্রপাতে মৃতের সংখ্যা ছিল ৩৫১ জন। ২০১৭ সালে মৃতের সংখ্যা ২৬২ জন। ২০১৮ সালে নিহতের সংখ্যা ২০১৮ সালের প্রায় সমসংখ্যক জন। ফাঁকা মাঠে কৃষিকাজ, মাছ ধরা বা নৌকায় করে যাতায়াতের সময় বজ্রপাতে বেশির ভাগ আক্রান্ত হয়েছে বলে জানা যায়। প্রাকৃতিক দুর্যোগ এই বজ্রপাত থেকে কিভাবে রক্ষ পাওয়া যাবে সে বিষয়গুলো লক্ষণীয়:
* ঘন ঘন বজ্রপাত হলে কোন অবস্থাতেই খোলা বা উঁচু জায়গায় থাকা যাবে না। * পাকা বাড়ির নিচে আশ্রয় নেয়া ভালো * বজ্রপাত হলে উঁচু গাছ পালা ও বিদ্যুতের লাইন থেকে দূরে থাকতে হবে। * বজ্রপাতের সময় বাড়িতে থাকলে জানালার পাশাপাশি থাকা যাবে না। * জানালা বন্ধ করে দিতে হবে। * বাজ পড়া অব্যাহত থাকলে রাস্তায় বের না হওয়া ভালো। * বজ্রপাতের সময় কোন অবস্থাতেই খোলা মাঠে খেলতে যাওয়া যাবে না।
* ঘরের ভিতর সকল বৈদ্যুতিক সংযোগ বন্ধ রাখতে হবে। * নৌকায় থাকলে ছইয়ের ভিতর থাকতে হবে। * গাড়ির ভেতরে থাকলে গাড়ির ধাতব অংশ স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। * সব ধরনের ভবনে বজ্র নিরোধক দন্ড ব্যবহার করতে হবে।
তাছাড়া বাড়ির পাশে রাস্তায় খোলা জায়গায় তালগাছ রোপণ করে ভবিষ্যতের জন্য বজ্রপাত থেকে রক্ষার উপায়ের চেষ্টা করতে হবে।
লেখক : শিক্ষক, পরিবেশ কর্মী।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • প্রানের শহর সিলেট
  • সম্পত্তিতে হিন্দু নারীর অধিকার
  • আশঙ্কার মধ্যে মার্কিন-চীন বাণিজ্যযুদ্ধ
  • ভিমরুলের চাকে অমিতের খোঁচা
  • মানবপাচার, অর্থপাচার সমাচার
  • আত্মনির্ভরতা
  • খাদ্যে ভেজাল : দরকার কঠোর পদক্ষেপ
  • নগরীর জলাবদ্ধতা প্রসঙ্গ
  • এম.সি কলেজে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ চাই
  • টেকনিক্যাল রোডে স্টিলের রেলিংসহ ফুটপাত চাই
  • জৈনপুর এলাকায় ড্রেন সংস্কার হোক
  • বানরের উৎপাত প্রসঙ্গ
  • শাবিতে বিবিএ অনুষদের আসন বৃদ্ধি হোক
  • প্যালেস্টাইন রাষ্ট্র : স্বপ্ন ও বাস্তবতা
  • সাক্ষরতা আন্দোলন : একটি পর্যালোচনা
  • অশান্ত বিশ্বে শান্তির সন্ধান
  • আমার পাহাড়, আমার সিলেট
  • যৌবন ফিরে পাক বিবিয়ানা নদী
  • সড়ক দুর্ঘটনা : এ শোকের শেষ কোথায়?
  • সামাজিক ব্যাধি
  • Developed by: Sparkle IT