সাহিত্য

রক্ষা

জোবায়ের রাজু প্রকাশিত হয়েছে: ০৯-০৬-২০১৯ ইং ০০:২৯:৩৫ | সংবাদটি ১৫২ বার পঠিত

মধুমিতা পরিবহন নামের বাসটির শেষ সিটে বসে নিজেকে চোর চোর মনে হলো রনির। হেলপারের অগোচরে সে এখানে চুরি করে এসে বসেছে। এ ছাড়া যে আর উপায়ও ছিল না। ঈদের ছুটিতে আজ শহর ছেড়ে গ্রামে যাবে বলে বাস টার্মিনালে এসেছে রনি। এখানে আসার আগে মালিক তাকে মাসিক বেতন ছাড়াও ঈদ বখশিশ হিসেবে দুই হাজার টাকা বেশি দিয়েছেন। সেই টাকা মানিব্যাগে ভরে প্যান্টের পকেটে রাখে রনি। বাস কাউন্টারে টিকিট কাটতে গিয়ে দেখে পকেটে মানিব্যাগ নেই। পকেটমার কখন যে মানিব্যাগ মেরে দিয়েছে বুঝতেই পারেনি। দিশাহারা হয়ে পড়ে সে। টাকা ছাড়া কিভাবে সে এখন গন্তব্যে যাবে! এই শহরে যে তার আপন বলতে কেউ নেই।
আর দুই দিন পর ঈদ। শহর ছেড়ে মানুষ গ্রামে যাচ্ছে। রনি গ্রামে যেতে এসে এই বিপদে পড়বে, বুঝতে পারেনি। সব টাকা যে মানিব্যাগে ছিল। এখন বাসের টিকিট কাটার টাকা পর্যন্ত নেই।
মধুমিতা পরিবহন নামে একটি বাসে ওঠে রনি। শেষ সিটে গিয়ে বসে পড়ার পর রনির প্রথমে মনে হলো সে হেলপারের নজরে পড়বে না। কারণ ঈদের ছুটিতে গ্রামে যাওয়া উৎসুক জনতার ভিড়ের মাঝে সে হেলপারের দৃষ্টির অগোচরেই থেকে যাবে।
২.
মহাসড়ক বেয়ে মধুমিতা পরিবহন ছুটে চলছে। রনির বুকটা কিছুক্ষণ পর পর ধক করে ওঠে। এই বুঝি হেলপার এসে তার টিকিট চাইবে। টিকিট না পেয়ে হেলপার তাকে বকাবকি করবে। দুই একটা থাপ্পড়ও মারতে পারে!
মানিব্যাগের কথা ভেবে চোখে পানি চলে এলো রনির। ইচ্ছে ছিল কাল বাজারে গিয়ে ঈদের কেনাকাটা করবে। বাবার জন্য একটা লুঙ্গি, মায়ের জন্য শাড়ি, ছোট্ট দুটি বোনের জন্য তাদের পছন্দ মতো থ্রিপিস। আর নাজমার জন্য একটি দামি জামা। দুই বছর আগে পারিবারিকভাবে বিয়ে ঠিক হওয়ার পর নাজমাকে সে কিছুই দিতে পারেনি। এবারের ঈদে নাজমাকে একটি দামি জামা কিনে দেয়ার খেয়াল ছিল। কিন্তু এখন তো তাও হচ্ছে না। মানিব্যাগ হারিয়ে গেছে।
ফরহাদ রনির সামনে এসে দাঁড়ায়। ফরহাদ এই মধুমিতা পরিবহনের হেলপার। রনির টিকিট দেখতে চায় সে। রনি টিকিট দেখাতে পারে না। হাল বৃত্তান্ত শোনে ফরহাদের মেজাজ খারাপ হয়। ড্রাইভারকে বাস থামাতে বলে। বাস থামে। ফরহাদ রনিকে গলা ধাক্কা দিয়ে অপমান করে বাস থেকে নামিয়ে দেয়। বিব্রত হয় রনি। দ্রুতগতিতে মধুমিতা পরিবহন চলে যায়। রনি ভেঙে পড়ে। কী হবে এখন! মানুষ এত নিষ্ঠুর হতে পারে!
রোদপড়া খাঁ খাঁ দুপুর। পথের পাশে দাঁড়িয়ে থাকে রনি। বাড়ি যাবে কিভাবে, ভেবে পায় না। ঘণ্টাখানেক পর একটি কালো প্রাইভেট কার এসে রনির সামনে থামে। কারের জানালার কাচ নামায় যে ছেলেটি, সে তানবির। রনির স্কুল জীবনের বন্ধু। একই পাড়ার মানুষ তারা। তানবির জানতে চায়Ñ ‘তুই এখানে কী করছিস?’ অসহায় দেখাচ্ছিল রনির মুখটা তখন। তানবিরকে সব ঘটনা খুলে বলে। তানবির ঈদের ছুটিতে বাড়ি যাচ্ছিল। রনিকে প্রাইভেট কারে তুলে নেয় সে। বিপদ থেকে রক্ষা করার মালিক আল্লাহ। সেজন্য তিনি একে জায়গায় একেকজনকে পাঠিয়ে দেন।
৩.
শেষ বিকেলে বাড়ি পৌঁছে রনি। মানিব্যাগ হারানো, হেলপারের অমানবিক আচরণ, তানবিরের হঠাৎ আগমনÑ সব বাবা মাকে খুলে বলে সে। অনেকদিন পর ভাইকে পেয়ে দুই বোনের আনন্দ বেড়ে যায়।
টিভিতে খবর চলছে। খবরে একটি সড়ক দুর্ঘটনার কথা বলা হচ্ছে। দুপুরে নাকি একটি দ্রুতগামী বাস মারাত্মক এক্সিডেন্ট করেছে। সবগুলো যাত্রীর প্রাণহানি। রনি খবরে মন দিলো। হঠাৎ সে চমকে ওঠে। টিভিতে এক্সিডেন্টের যে বাসটি দেখা যাচ্ছে, এটা তো সেই মধুমিতা পরিবহন। হ্যাঁ, এই বাস থেকেই তো ওই হেলপার তাকে অপমান করে নামিয়ে দিয়েছে। ওই যে লাশের ছবিও দেখা যাচ্ছে, ওই লাশটিই তো ফরহাদ নামের সেই হেলপারের। তার মানে ওই বাসটিই এক্সিডেন্ট করেছে! হেলপার যদি রনিকে অপমান করে না নামিয়ে দিত, তাহলে যে আজ রনিও ওই লাশের তালিকায় যুক্ত হতে পারত। আল্লাহই তাকে রক্ষা করে দিয়েছেন।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT