উপ সম্পাদকীয়

চাঁদ দেখা বিষয়ক সমস্যা : স্থায়ী সমাধানের পথ

সৈয়দ মবনু প্রকাশিত হয়েছে: ১০-০৬-২০১৯ ইং ০০:১২:১১ | সংবাদটি ৩৩ বার পঠিত

চাঁদ দেখা বিষয়ক সমস্যা শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চাঁদ দেখা বিষয়ক মাসআলায় বিতর্ক প্রায়ই হয়। পাকিস্তানে এই বিতর্কে মুফতি রশিদ আহমদ লুধিয়ানভী (র.) এবং মুফতি শফি (র.) একেবারে বিপরীতমুখি ছিলেন। বৃটেন এবং বাংলাদেশে এ বিষয়ক আলেমদের বিভিন্ন আলোচনা এবং বিতর্কে আমার থাকার সুযোগ হয়েছে। এ বিতর্কের অনেক কিতাবও পড়েছি। অবশেষে একটা বিষয় অনুভবে এসেছে, যতক্ষণ পর্যন্ত চাঁদ বিষয়ক পুরাতন নীতির আলোকে ইজতিহাদ করে আন্তর্জাতিক মুসলিম সম্প্রদায় রাষ্ট্রীয়ভাবে এই বিষয়টির একটা মৌলিক আইনগত কাঠামো তৈরি করতে পারবে না ততক্ষণ পর্যন্ত এই সমস্যার সমাধান স্থায়ীভাবে সম্ভব নয়। ইসলামে চাঁদ দেখার যে বিধান তৈরি রয়েছে তা ভেঙে সরকার কিংবা চাঁদ দেখা কমিটির কিছু করতে হলে অনেক সমস্যা এবং সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়, তাই ওদের পক্ষে ঝুকি নেওয়া সম্ভব হয় না। যারা প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বে নেই তাদের পক্ষে যেকোন কথা বলা কিংবা করা যত সহজ, যারা দায়িত্বে থাকেন তাদের পক্ষে তা তত সহজ নয়। একটি গোষ্ঠি ইচ্ছে করলে যেকোন সিদ্ধান্ত নিতে পারে, কিন্তু যারা অসংখ্য গোষ্ঠি বা গোটা জাতির প্রতিনিধিত্ব করেন তাদের পক্ষে যেকোন সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বে সবার কথা বিবেচনায় রাখতে হয়। ভারত, বৃটেন, সৌদি আরব কিংবা বিশ্বের যেখাইেন চাঁদ দেখা হোক না কেন সেটা মানতে হলে আমাদের দেশের উলামারা সংঘবদ্ধভাবে সিদ্ধান্ত দিতে হবে। নতুবা বিশৃঙ্খলা আরও বৃদ্ধি পেয়ে নতুন ফিতনা তৈরি হবে। এখানে চিন্তাগতভাবে সকল গ্রুপকে মোটামোটি একটা ঐক্যে পৌঁছতে হবে, নতুবা নতুন সংঘাত তৈরি হবে। ইসলামী আইনের কিতাবগুলোতে মতামতের যে ভিন্নতা রয়েছে সেগুলোর মধ্যে সমন্বয় করে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় একটি ফকিহ গ্রুপকে জাতীয়ভাবে তৈরি করে অতঃপর সিদ্ধান্তে যেতে হবে, নতুবা অবস্থা আরও খারাপ হবে। শুধূ আবেগে কথা বললে হবে না। স্মরণ রাখতে হবে, চাঁদ দেখার বিষয়টি মাসআলা বা আইনগত, আবেগের বিষয় নয়। মাসআলার সার-সংক্ষেপ আমরা একটু নীচে দেখতে পারি;
চাঁদ দেখার বিষয়ে বিশিষ্ট সাহাবি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) বলেন, আমি হযরত রাসুল (স.) কে বলতে শুনেছি, তোমরা রমজানের চাঁদ দেখলে রোজা রাখ এবং শাওয়ালের চাঁদ দেখলে ইফতার কর। আর যদি আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হয় তবে ত্রিশদিন পূর্ণ করো। (সহীহ বোখারী, হাদিস নং ১১২৫)। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত আরেকটি হাদিসে রয়েছে, নবী করিম (স.) বলেছেন, তোমরা রমজানের চাঁদ না দেখে রোজা রেখ না। আবার চাঁদ না দেখে ইফতার করো না। যদি আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হয় তবে ত্রিশদিন পূর্ণ করো। (সহীহ বোখারী, হাদিস নং ১১২৭)। বিশিষ্ট সাহাবী হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত আরেকটি হাদিস, হযরত রাসুল (স.) বলেন, চাঁদ দেখে রোজা রাখবে এবং চাঁদ দেখে রোজা শেষ করবে। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকায় যদি চাঁদ তোমাদের দৃষ্টিগোচর না হয় তবে শাবান মাসকে ত্রিশদিন পূর্ণ করবে। (মুসলিম শরিফ)।
এই হাদিসগুলোর ভাষায় দৃষ্টি দিলে স্পষ্ট হয়, এগুলো ছিলো নির্দেশমূলক। আর হাদিসের নির্দেশমূলক স্পষ্ট বিধানগুলো মুসলমানদের জন্য মেনে চলা ওয়াজিব। ওয়াজিব ভঙ্গ করলে ফরজ ভঙ্গের মতোই পাপ হয়। তাই ইসলামের আইন বিশেষজ্ঞরা শাবান মাসের উনত্রিশ তারিখ সন্ধ্যাবেলা রমজানের চাঁদ তালাশ করা এবং রমজানের উনত্রিশ তারিখ শাওয়ালের চাঁদ তালাশ করা ওয়াজিব বলেছেন। যদি শাবানের উনত্রিশ তারিখ চাঁদ দেখা যায় তবে পরদিন রোজা রাখতে হবে, আর যদি আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হয় তবে শাবানকে ত্রিশদিন পূর্ণ করে রোজা রাখতে হবে। তেমনিভাবে যদি রমজানের উনত্রিশ তারিখ চাঁদ দেখা যায় তবে পরদিন রোজা ভেঙে ঈদ করতে হবে, আর যদি আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হয় তবে রমজানকে ত্রিশদিন পূর্ণ করে ঈদ করতে হবে। এই হলো চাঁদ সম্পর্কিত ইসলামের মৌলিক আইন বা মাসআলা।
ইসলাম যখন মক্কা-মদিনা থেকে বেরিয়ে বিশ্বব্যাপী বিস্তার লাভ করলো তখন দেখা দিলো এই মাসআলায় বিভিন্ন মতানৈক্য বা ইখতিলাফ। ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা খিলাফত যখন ভেঙে যায় তখন মাসআলাটা আরও জটিল হয়ে যায়। আবার যখন ইউরোপ, আমেরিকা, আরব, আফ্রিকায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মুসলমানরা জীবন সংগ্রামের তাকিদে গিয়ে সমবেত হতে শুরু করেন তখন এই মাসআলা হয়ে যায় আরও জটিল। প্রত্যেক দেশের প্রবাসীদের ইচ্ছে থাকে তার দেশের আত্মীয়-স্বজনের সাথে মিলিয়ে ঈদ উদযাপন করার। বৃটেনে আমি দেখেছি, এক সময় এমনও ছিলো, পাকিস্তানিরা ঈদ করতেন পাকিস্তানের সাথে মিলিয়ে, বাঙালিরা ঈদ করতেন বাংলাদেশের সাথে মিলিয়ে আর আরবিরা ঈদ করতেন আরবের সাথে মিলিয়ে। কেউ কেউ আফ্রিকাকেও অনুসরণ করতেন। অতঃপর যখন ধীরে ধীরে দেশ-কেন্দ্রিক চিন্তা হ্রাস পেতে থাকে তখন অনেকে মক্কা শরিফের সাথে মিলিয়ে ঈদ এবং রোজা রাখতে শুরু করেন। এবিষয়ে বৃটেনে অসংখ্য সেমিনার-মিটিং হয়েছে, অনেকগুলোতে আমি নিজেও উপস্থিত থেকেছি। যারা সৌদির সাথে মিলিয়ে ঈদ ও রোজা রাখার পক্ষে তারা একটা যুক্তি ধীরে ধীরে বৃটেনের তরুণ মুসলমানদের কাছে উপস্থাপন করলেন যে, বৃটেন থেকে সৌদি আরবের দূরত্ব মাত্র তিন ঘন্টার, বাংলাদেশের দূরত্ব ছয় ঘন্টার, পাকিস্তান-ভারতের দূরত্ব তেমনি চার-পাঁচ ঘন্টার তাই সৌদি আরব অর্থাৎ মক্কা-মদিনাকে অনুসরণ করা যুক্তিযুক্ত এবং মাসআলাগত সঠিক। অবশেষে এই মতটাই জনপ্রিয় হয়ে উঠতে থাকে।
আমাদের ছোটবেলায় বাংলাদেশে চাঁদ নিয়ে এত বিতর্ক এবং সমস্যা ছিলো না। কারণ তখন সৌদি আরব কিংবা বৃটেনের সাথে এত দ্রুত যোগাযোগ করা সম্ভব হতো না। এমন কি ভারত কিংবা পাকিস্তানের সাথেও যোগাযোগ সম্ভব হতো না। যখন মোবাইল-স্যাটেলাইটের যুগ আসে তখন সমস্যাটা ব্যাপক আকার ধারণ করতে শুরু করে। আবার যখন ফেসবুকের যুগ আসে তখন ভিন্নজন ভিন্ন মত নিজের মতো করে প্রকাশ করতে থাকলে সমস্যা আরও জটিল আকার ধারণ করে। এই সমস্যা তাদের বক্তব্যেই জটিল হয় যাদের চাঁদ দেখা বিষয়ে মৌলিক মাসআলার বিভিন্ন মতামতের সমন্বয় করা সম্ভব হয় না। চাঁদ দেখার হাদিস থেকে মাসআলা যখন স্থানীয়ভাবে উপস্থাপন করা হয় তখন প্রত্যেকে নিজেদের অবস্থান অনুযায়ী উপস্থাপন করেছেন। তখন ছিলো না আন্তর্জাতিক যোগাযোগ পদ্ধতি। এখন আন্তর্জাতিক যোগাযোগ পদ্ধতি হয়েছে, বিজ্ঞানের উন্নতি ঘটেছে, তবে মাসআলার মৌলিক সমন্বয় সম্ভব হচ্ছে না। এর অন্যতম একটি কারণ, পৃথিবীর অনেক বড় বড় মুফতি এবং আলেম-উলামা ইজতেহাদের পথ বন্ধ বলে ধারণা করে থাকেন। ইজতেহাদ ছাড়া একটি মৌলিক আইনকে পরিবর্তন কিংবা সংস্কার সম্ভব নয়। আর যখন ইজতেহাদের পথ বন্ধ থাকে তখন সাধারণ মানুষ নিজের প্রয়োজন মতো ইজতেহাদ করতে শুরু করে। সাধারণ মানুষের ইজতেহাদে সাধারণত আইনের মৌলিকত্ব থাকে না, থাকে শুধু প্রয়োজনের যুক্তি। তখন মানুষ বিভ্রান্ত হয়। যতক্ষণ পর্যন্ত ইজতেহাদের ধারণায় পরিবর্তন সম্ভব হবে না ততক্ষণ পর্যন্ত চাঁদ দেখার মাসআলায়ও পরিবর্তন সম্ভব নয়। ফলে ঈদের দিন নিয়ে মতানৈক্য থেকেই যাবে। স্মরণ রাখতে হবে, ঈদ শুধু উৎসব নয়, ঈদ একটি মৌলিক ইবাদতও। তা ছাড়া রোজা তো ইসলামের মৌলিক ফরজের অন্যতম একটি। এখানে সোয়াব- গোনাহের ব্যাপার রয়েছে, রয়েছে হালাল-হারামের। এই বিষয়গুলোতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বে দায়িত্বশীলদের অনেক ভাবতে হয়।
এই ভাবনা থেকেই ঈদ কিংবা রোজার চাঁদ দেখা বিষয়ে দায়িত্বশীলদের প্রায় সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। অনেক সময় তারা এ বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না বলে অনেকে তাদের সমালোচনা এবং নিন্দা করেন, যদিও তা উচিৎ নয়। যারা চাঁদ দেখা বিষয়ক হাদিস কিংবা ফিকাহের মাসআলা জানেন তারা নিশ্চয় অনুভব করতে পারেন তখন দায়িত্বশীলদের চিন্তার কারণসমূহ। আমরা মনে করি প্রত্যেক মুসলমানের উচিৎ এই মাসআলাকে কোরআন-হাদিস-ইজমা এবং কিয়াসের আলোকে পর্যালোচনা করা।
লেখক : প্রাবন্ধিক।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • ভারতের জাতীয় উন্নয়ন ও ভারত মহাসাগর
  • জীবনে শৃঙ্খলাবোধের প্রয়োজনীয়তা
  • চলুক গাড়ি বিআরটিসি
  • জলবায়ু পরিবর্তন ঝুঁকি মোকাবেলায় আমাদের করণীয়
  • নির্ধারিত রিক্সাভাড়া কার্যকর হোক
  • নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা
  • খাদ্যে ভেজাল রোধে জিরো টলারেন্স দেখাতে হবে
  • মুর্তাজা তুমি জেগে রও!
  • সন্তানের জীবনে বাবার অবদান
  • এবার কুম্ভকর্ণের নিদ্রা ভংগ হোক
  • বন উন্নয়নে মনোযোগ বাড়ুক
  • একজন অধ্যক্ষের কিছু অবিস্মরণীয় প্রসঙ্গ
  • গ্রামাঞ্চলে বৃক্ষ রোপণ
  • শান্তির জন্য চাই মনুষ্যত্বের জাগরণ
  • উন্নয়ন ও জনপ্রত্যাশা পূরণের বাজেট চাই
  • মোদীর বিজয় : আমাদের ভাবনা
  • অধিক ফসলের স্বার্থে
  • টেকসই উন্নয়ন ও অভিবাসন সমস্যা ও সমাধানে করণীয়
  • সড়ক দুর্ঘটনা
  • চীনের বিশ্বশক্তির প্রত্যাশা ও ভারত মহাসাগর
  • Developed by: Sparkle IT