উপ সম্পাদকীয়

অপরাধ লাগামহীন : উদ্বেগ জনমনে

স্থিতধী বড়ুয়া প্রকাশিত হয়েছে: ১২-০৬-২০১৯ ইং ০০:০৭:১৪ | সংবাদটি ১০৭ বার পঠিত

বিগত কয়েক বছর যাবত বাংলাদেশে ধর্ষণ, শিশু ও নারী নির্যাতন, মাদক ও মানবপাচার উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে এ সমস্যা এখন জাতীয় সমস্যায় পরিণত হওয়ায় দেশের সর্বত্র আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রায় প্রতিদিন কোথাও না কোথাও নারী-শিশু শারীরিক নির্যাতন, যৌন হয়রানি এবং ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। এর সাথে পাল্লা দিয়ে নদীর স্রোতের মতো সীমান্ত পথে মাদক প্রবেশ করছে এবং একইভাবে সীমান্ত পথে অবৈধভাবে বিদেশে মানবপাচার হচ্ছে। মাদক ও মানবপাচার নির্মূলে র‌্যাব-পুলিশ সহ অন্যান্য বাহিনীর ক্রস ফায়ার এবং তৎপরতাও থেমে নেই। ধর্ষণের হাত হতে এখন কয়েক সন্তানের জননীও রেহাই পাচ্ছে না। মিডিয়ার বদৌলতে দেখা যায় একশ্রেণীর মাদকাসক্ত বিকৃত রুচিসম্পন্ন সন্তানতুল্য বখাটে যুবক ও কিশোর মায়ের বয়সী নারীকে ধর্ষণ করতেও দ্বিধাবোধ করছে না। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য প্রথমে পালাক্রমে ধর্ষণ এবং পরবর্তীতে খুন করার এমন খবরও অনলাইন নিউজ, প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ার বদৌলতে পাওয়া যাচ্ছে। এখন দুই/তিন বছরের শিশুও ধর্ষণের হাত হতে রেহাই পাচ্ছে না। শিশু অপহরণ এবং পরবর্তীতে মুক্তিপণ দাবীর পর দাবীকৃত অর্থ না পেলে অপহৃত শিশুকে হত্যা করার মত নৃশংসতাও এখন ঘটছে। শারীরিকভাবে ধর্ষণ ছাড়াও নারীরা পথে-ঘাটে, গণপরিবহনে, শিক্ষাঙ্গনে, নারীর কর্মস্থলে, হাটে-বাজারে, কথায়, আকার-ইঙ্গিতে এবং স্পর্শে ব্যাপক হারে যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকহানাদার বাহিনী এদেশের কিশোরী, যুবতী এবং প্রাপ্তবয়স্কা মহিলাদের ধর্ষণ এবং ধর্ষণ পরবর্তী সময়ে হত্যা করেছিলো এমন বহু নজির আছে। দুই/তিন বছরের শিশু বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে মারার বহু নজির রয়েছে। কিন্তু ধর্ষণ করার এমন কোন নজির আছে বলে মনে হয় না।
ফেনীর সোনাগাজী থানার সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দ্দৌল্লা মাদ্রাসার ছাত্রীদের রক্ষক হয়ে ভক্ষকের ভূমিকায় তারই মাদ্রাসার ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফীকে ভয়-ভীতি দেখিয়ে ধর্ষণ ইদানীং সময়ের একটি বহুল আলোচিত ঘটনা। শুধু তাই নয়,‘হুজুর’ নামের কলংক এই ভক্ষক শিক্ষকের বিরুদ্ধে রাফীর মা মামলা করলে সে প্রথমে মামলা তুলে নিতে ভয়-ভীতি প্রদর্শন করে। রাফীর মা রাজী না হলে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রভাবে রাফীর মাকে মামলা তুলে নিতে বাধ্য করতে না পারায় এই লম্পট অধ্যক্ষের নির্দেশে তার কয়েকজন অনুগত ছাত্রী ও মুখোশধারী অনুসারীরা রাফীকে গত ৬ এপ্রিল মাদ্রাসার ছাদে ডেকে নিয়ে যায়। এরপর তার হাত-পা বেঁধে গায়ে কেরোসিন ঢেলে হত্যা করার চেষ্টা করে। এতে রাফীর শরীরের ৮০ ভাগ অগ্নিদগ্ধ হয়। অগ্নিদগ্ধ এ কিশোরীকে সংকাটপন্ন অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ণ ইউনিটে ভর্তি করার পর গত ১০ এপ্রিল মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে এই হতভাগ্য কিশোরী মৃত্যুর কাছে হার মানতে বাধ্য হয়। এই মামলা পিআইবি তদন্ত শেষে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দ্দৌল্লা সহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ পত্র দাখিল করেন। বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত হতে জানা যায়, স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন যদি মামলা রজুর সাথে সাথে বাদীর মাকে (মামলার বাদী) প্রথম থেকে সক্রিয়ভাবে সহায়তা প্রদান করতো তাহলে এই হৃদয়বিদারক ঘটনা নাও ঘটতে পারতো। সোনাগাজী থানার সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম সাহায্যের পরিবর্তে বরং এই কিশোরীর মুখে ধর্ষণের বর্ণনা ভিডিওতে ধারণ করে তা প্রচার মাধ্যমে ফাঁস করে দিয়ে একজন পেশাদার, দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তা কা-জ্ঞানহীনভাবে দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছে এতে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। তার বিরুদ্ধে তথ্যপ্রযুক্তি আইনে মামলা হয়েছে এবং এ মামলায় তাকে গ্রেফতারের জন্য বিজ্ঞ আদালত হতে গ্রেফতারি পরোয়ানাও জারি করা হয়েছে। শিক্ষকতা একটি অতি পবিত্র পেশা, এরা মানুষ গড়ার কারিগর। আমাদের সমাজে পিতা-মাতা এবং অভিভাবকের পরের স্থান হচ্ছে শিক্ষকের। একজন আদর্শবান স্কুল, কলেজ এবং মাদ্রাসার শিক্ষককে সবাই শ্রদ্ধাবনত চিত্তে সম্মান করে। মুষ্টিমেয় কিছু শিক্ষকের অপকর্মের দায়ভার মানুষ গড়ার সম্মানিত বৃহৎ অংশকেও এখন বহন করতে হচ্ছে। কিছু ব্যতিক্রম বাদে এই সম্মান অনেকে এখন ধরে রাখতে পারছে না। শিক্ষক এখন ছাত্রী ধর্ষণ করে, শিক্ষক ছাত্রী অপহরণ করে, শিক্ষক এখন মাদক পাচারের সাথে জড়িত এমন সংবাদও মাঝে মধ্যে গণমাধ্যমে পাওয়া যায়। এখনকার কিছু কিছু শিক্ষক তাদের পবিত্র পেশার প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ না হয়ে ক্ষমতার বলয়ের সাথে জড়িত হওয়ায় সমাজে তাদের সম্মানের স্থান তাপমান যন্ত্রের পারদের মতো অনেক নিচে নেমে যাচ্ছে।
প্রচারমাধ্যম, নারী নেতৃত্ব সহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন এই নৃশংস হত্যায় সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের জন্য সোচ্চার থাকাবস্থায় কিশোরগঞ্জের কটিয়াদিতে চলন্ত বাসে ঢাকার ইবনে সিনা হাসপাতালে কর্মরত নার্স ২৫ বছরের যুবতী শাহীন আক্তারকে ধর্ষণ করে হত্যার অভিযোগ বিভিন্ন গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রকাশিত হয়। গত ৬ মে সোমবার বিকেলে শাহীন আক্তার রাজধানীর মহাখালী হতে স্বর্ণলতা পরিবহনের একটি বাসে বায়োজিদপুর উপজেলায় তার গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার জন্য উঠে। বাসটি কটিয়াদি পৌঁছালে বাসের সব যাত্রী নেমে পড়ায় সে একা ওই বাসে যাত্রী হিসেবে থাকাবস্থায় চলন্ত বাসে চালক ও হেলপার তাকে ধর্ষণ করে। ধর্ষণের সময় বাধা দেওয়ায় তার মাথায় আঘাতের পর স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ফেলে রেখে বাসের চালক ও হেলপার পালিয়ে যায়। এ হতভাগ্য যুবতীকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে বলে তদন্তে আলামত পাওয়া গেছে। এই দুইটি হৃদয়বিদারক ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশ হওয়ায় আমাদের দেশে নারীরা সামাজিকভাবে কতটুকু নিরাপদ এ নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
উল্লেখ্য যে, কক্সবাজার জেলার উখিয়া এবং টেকনাফ উপজেলার রোহিঙ্গা শিবিরেও কিশোরী ও নারী ধর্ষণের ঘটনা থেমে নেই। গত ২৬ মার্চ বালুখালী রোহিঙ্গা শিবিরে ই-ব্লকে ১৯ বছর বয়সী আয়েশা বেগম নামে এক রোহিঙ্গা যুবতীকে ধর্ষণের পর গলাটিপে হত্যা করা হয়। গত ৩ ফেব্রুয়ারি কুতুপালং শিবিরে খদিজা বেগম নামে অপর এক রোহিঙ্গা কিশোরীকে একদল মুখোশধারী অপহরণ করে গণধর্ষণের পর হত্যা করে লাশ পার্শ্ববর্তী জঙ্গলে ফেলে দেয়। শুধু তাই নয়, রোহিঙ্গা কিশোরী এবং যুবতী মেয়েদের একশ্রেণীর রোহিঙ্গা এবং এদেশীয় দালালচক্র দেশের নামি-দামী আবাসিক হোটেলে অর্থের বিনিময়ে অসামাজিক কাজে লিপ্ত হতে বাধ্য করে এমন সংবাদও প্রচার মাধ্যমে জানা যায়। এসব মেয়েরা দেহ ব্যবসার সাথে সাথে মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত এমন সংবাদও পাওয়া যায়।
বর্তমানে আমাদের দেশে নারী ধর্ষণের সাথে সাথে শিশু ধর্ষণও উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ হতে জানা যায় জানুয়ারি ২০১৮ থেকে ডিসেম্বর ২০১৮ পর্যন্ত ৫২৭ জন শিশু ধর্ষিত হয়েছে। ২০১৯ সালে মার্চ পর্যন্ত ১৪৫ জন শিশু ধর্ষিত এবং ৪১৪ জন বিভিন্নভাবে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে। নারী ও শিশু ছাড়াও পুরুষ শিশুদের ব্যাপারে শিশু আইন-২০১৩ এর বিধানাবলী আমাদের দেশে মানা হচ্ছে না। এ আইনের বিধান সমূহ যথাযথভাবে মানা হলে দেশে পুরুষ শিশু নির্যাতন এতো বাড়তো না এবং শিশুদের জোরপূর্বক শ্রমনির্ভর কাজ করতে বাধ্য করা যেতো না।
আমাদের দেশে শিশু আইন-২০১৩ এর বিধান অনুযায়ী ১৮ বছর পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত সবাইকে শিশু বলা হয়। কিন্তু ইদানীং সময়ে দেখা যায় ১৪ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোররা হত্যা, গুম, অপহরণ, ছিনতাই, ধর্ষণ এবং মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত হয়ে পড়ছে। কিভাবে এর প্রতিকার করা যায় এর জন্য রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, সমাজবিজ্ঞানী এবং গবেষকদের এ মুহুর্তে গবেষণার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। শিশুদের মাঝে ইয়াবা আসক্তিও দিন দিন বাড়ছে। গত ৫ বছরে নেশাগ্রস্ত শিশু সন্তানের হাতে মা-বাবা খুন হয়েছে এমন নজিরের অভাব নেই। ২০১৩ সনের ১৪ আগস্ট নেশাগ্রস্ত কিশোরী কন্যা ঐশী (১৭) এর হাতে তার পিতা ঢাকার বিশেষ শাখার পুলিশ পরিদর্শক মাহফুজুর রহমান এবং মাতা স্বপ্না রহমান চামেরী বাগের বাসায় খুন এর ঘটনা এর একটি জ্বাজ্জ্যল্যমান দৃষ্টান্ত।
আমরা যখন শিশু ছিলাম তখন আমাদের মা-বাবা কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম, মহাত্মা গান্ধী, প-িত নেহেরু, মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ এর মতো আরো অনেক খ্যাতিমান ব্যক্তির জীবনী সম্বলিত ছোট ছোট বই পড়ার জন্য আমাদের হাতে তুলে দিতো। কিন্তু এখনকার পিতা-মাতারা বইয়ের বদলে এই বয়সী শিশুদের হাতে স্মার্ট ফোন তুলে দিচ্ছে। আকাশ সংস্কৃতির এ যুগে তারা মোবাইলের বদৌলতে খুন, ধর্ষণ, মাদকাসক্তি সহ বিভিন্ন অপরাধ চিত্র দেখার প্রতি বেশী আকৃষ্ট হচ্ছে। মোবাইলে ভাইবার, ফেসবুক ইত্যাদির প্রতি শিশু-কিশোরদের অতি আকর্ষণের কারণে এখন বলতে দ্বিধা নেই ৮/১০ বছরের শিশু-কিশোরদের মধ্যেও অপরাধ প্রবণতা বেড়েছে। অন্ধকার জগত সম্পর্কেও আমাদের ঐ বয়সের চেয়ে তুলনামূলকভাবে তারা অনেক বেশী জ্ঞানের অধিকারী। শহরের বিভিন্ন বস্তি এলাকায় অযতেœ এবং অবহেলায় বেড়ে উঠা শিশুর-কিশোর অপরাধী এবং অপরাধের সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে। এখনই এর প্রতিকার এবং প্রতিরোধের জন্য দৃশ্যমান সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে এর ভয়াবহতা আরো বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
যৌতুকের জন্য নারী নির্যাতন এখন অনেকাংশে বেড়েছে। গত ১লা জুন যৌতুকের দাবীতে ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলায় স্বামী ও শ্বশুড়-শ্বাশুড়ী মিলে শিরীণ আক্তার নামে ২২ বছর বয়সী গৃহবধূর গায়ে যৌতুকের দাবীতে আগুন ধরিয়ে দেয়। অগ্নিদগ্ধ অবস্থায় তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হওয়ায় এখন সেই গৃহবধূ ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় আছে (দৈনিক প্রথম আলো ০৯-০৬-১৯)। পুলিশের চাকুরী জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার আলোকে বলতে পারি এখনকার অপরাধীরা আগের দিনের অপরাধীদের মত এত বেয়কুব ছিল না। আগের দিনে চোর, ডাকাত, ছিনতাইকারী, খুনি এরা সাধারণত পেশা বদল করতো না। ডাকাতরা ডাকাতি করার সময় অসহায় সুন্দরী গৃহবধূ কিংবা যুবতী মেয়ে বাগে পেলেও ধর্ষণ করতো না। তথ্য প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে অপহরণের ধরণও পাল্টে গেছে। এখনকার অপরাধীরা ক্ষণে ক্ষণে পেশা বদলের কারণে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জালে সহজে ধরা পড়ে না। এদের আবার পিঠ বাঁচানোর জন্য রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা অনেক সময় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পক্ষে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভবপর হয় না। আধুনিক সর্ববিদ্যায় পারদর্শী এসব অপরাধীরা নারী ধর্ষণ ছাড়াও মানবপাচার এবং মাদক পাচারের সাথে জড়িত এমন তথ্যও পাওয়া যায়।
ইদানীং সময়ে সহজলভ্য যৌন উত্তেজক ইয়াবা নামক একটি মাদক মিয়ানমার হতে স্থল ও জল পথে সীমান্ত পেরিয়ে দেশের অভ্যন্তরে স্রোতের মত প্রবেশ করছে। ফেনসিডিল, গাঁজা, মরফিন ও আফিম ইয়াবার আগ্রাসনের কাছে হার মেনেছে। প্রাণঘাতি এই মাদকের ব্যবসা অধিকতর লাভজনক ব্যবসা বিধায় দ্রুত কোটিপতি হওয়ার আশায় অনেকে এ ব্যবসার দিকে ঝুঁকে পড়েছে। এখন প্রায় প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও মাদক ব্যবসায়ী বন্দুকযুদ্ধে নিহত হচ্ছে। গত বছর এ অভিযান শুরু পর হতে মাদক বিরোধী অভিযানে প্রায় ৩৮০ জন এ যাবত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে বলে প্রচার মাধ্যম হতে জানা যায়। টেকনাফের মাদক সম্রাট সাইফুল করিম গত ৩১ মে পুলিশের সাথে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়। গত ১লা জুন টেকনাফের আলোচিত ইয়াবা সম্রাট মাদক ব্যবসায়ী নুরুল হক ভুট্টু পরিবারের দু’টি আলীসান বাড়ি সহ ৩১ কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ সরকারের অনুকূলে জব্দ করা হয়। তারপরও মাদক ব্যবসায়ীদের এ ব্যবসা ছাড়ার দৃশ্যমান কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
মাদকের সাথে সাথে সীমান্ত পথে মানবপাচারও থেমে নেই। এদেশের গরিব, বেকার নারী-পুরুষ একশ্রেণীর দালালরা ভালো চাকুরীর প্রলোভন দেখিয়ে বিদেশে পাচার করছে। এরা বিদেশে নারীদের দেহ ব্যবসায় এবং পুরুষদের অল্প বেতনে শ্রমনির্ভর পেশায় কাজ করতে বাধ্য করছে। মানবপাচার এবং মাদকপাচারের সাথে কক্সবাজার জেলার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সন্ত্রাসী গ্রুপও জড়িত এমন তথ্যও পাওয়া যায়।
আমাদের দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের জন্য নারী-শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০ সংশোধিত ২০০৩, মাদকের জন্য মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৮ এবং মানবপাচারের জন্য মানবপাচার প্রতিরোধ এবং দমন আইন ২০১২-তে অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদ- এবং সর্বনিম্ন শাস্তি সহ জরিমানার বিধান রয়েছে। প্রত্যেকটি অপরাধের আলাদা আলাদা শাস্তি সম্বলিত এমন সুন্দর আইন থাকা স্বত্ত্বেও অপরাধের মাত্রা কিন্তু থেমে নেই। মানবপাচার এবং মাদক নিয়ন্ত্রণে ক্রস ফায়ার এর একমাত্র নির্ভরযোগ্য সমাধান হতে পারে না। গডফাদার এবং উপরের মহল যাদের প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ মদদে এই ঘৃণ্য দ্রুত কোটিপতি হওয়ার লাভজনক ব্যবসার সাথে সম্পৃক্ততা রয়েছে তাদের আইনের আওতায় আনার ব্যবস্থা নিতে হবে। এসব অপরাধ দমনে সামাজিকভাবে আন্দোলনের মাধ্যমে জনসচেতনতাও গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। কিশোর অপরাধীদের দমন করতে গেলে পিতা-মাতা, অভিভাবকদের মুখ্য ভূমিকা রয়েছে এতে কোন সন্দেহ নেই। পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা উপড়ে ফেলে আগের দিনের মত যৌথ পারিবারিক বন্ধনই এ সমস্যা সমাধানের সবচেয়ে উত্তম উপায়।
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • প্রকৃতির সঙ্গে বিরূপ আচরণ
  • ঈদের ছুটিতেও যারা ছিলেন ব্যস্ত
  • সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের বর্ষপূর্তি : প্রাপ্তি ও প্রত্যাশা
  • আইনজীবী মনির উদ্দিন আহমদ
  • শিশুদের জীবন গঠনে সময়ানুবর্তিতা
  • শাহী ঈদগাহর ছায়াবীথিতলে
  • কিশোর-কিশোরীদের হালচাল
  • বলকানস : ইউরোপের যুদ্ধক্ষেত্র
  • সন্তানের প্রতি অভিভাবকের দায়িত্ব
  • শিক্ষার হার এবং কর্মসংস্থান প্রসঙ্গ
  • শিক্ষার রাজ্যে এক বিস্ময়
  • ডেঙ্গু ও বানভাসি মানুষ
  • শিল্প-সাহিত্যে ১৫ আগস্ট
  • ইমাম-মুয়াজ্জিন সার্ভিস রোলস-এর প্রয়োজনীয়তা
  • বাঙালির মুক্তিসনদ ঐতিহাসিক ৬ দফা
  • শিশুদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশে পরিবেশ
  • তিনি কোন দলের নয়, সমগ্র বাঙালির
  • ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম অধ্যায়
  • বঙ্গবন্ধুর ফিরে আসা
  • শিক্ষা ও নৈতিকতা
  • Developed by: Sparkle IT