ইতিহাস ও ঐতিহ্য

জামাই ষষ্ঠী

দুলাল শর্মা চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ১২-০৬-২০১৯ ইং ০০:০৭:৪৬ | সংবাদটি ১৬৫ বার পঠিত

বাংলায় একটি কথা প্রচলিত আছে জ্যৈষ্ঠ মাস মধুমাস। এই জ্যৈষ্ঠ মাসেই আমাদের এই সবুজ-শ্যামল বাংলাদেশে পাওয়া যায় নানা রঙের নানা বর্ণের রসালো সুস্বাদু ফল। যার মধ্যে আছে, কাঁঠাল, আম, জাম, লিচু, আনারস, বেল, গোলাপজাম, কদবেল, পানিজাম। এক সময় বাংলার ঘরে ঘরে চলতো ফল খাওয়া উৎসব। যা আজ অনেকটাই ভাটা পড়ে গেছে।
আমাদের সিলেট অঞ্চলে এখনো একটি প্রথা চালু আছে যে, জ্যৈষ্ঠের এই ‘মধুমাসে’ বোনের বাড়িতে পাঠাতে হয় আম, কাঁঠাল, লিচুসহ নানা পদের মিষ্টি। সিলেটে এই অনুষ্ঠানকে বলে ‘আম-কাঁঠালি’ উৎসব। এই উৎসবের একেক অঞ্চলে একেক নামে পালিত হয়।
কথায় বলে, বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ। মারী, মড়ক, মন্বন্তর কিংবা রাজনৈতিক দুর্যোগের ঘনঘটা বাঙালির জীবনকে আচ্ছন্ন করলেও ভাটা পড়েনি তার অফুরান আনন্দযজ্ঞে। নানা রঙে সে তার উৎসব মুখর দিনের আনন্দঘন মুহূর্তগুলোকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দিয়েছে জীবনের সুবিস্তৃত আঙিনায়। এর কারণ একটাই, বাঙালি উৎসব প্রিয় জাতি।
রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘জগতে আনন্দযজ্ঞে আমার নিমন্ত্রণ’ আমার আনন্দে সকলের আনন্দ হউক, আমার শুভে সকলের শুভ হউক। আমি যাহা পাই তাহা পাঁচ জনের সহিত মিলিত হইয়া উপভোগ করি। এই কল্যাণী ইচ্ছাই উৎসবের প্রাণ। উৎসব প্রাণ বাঙালি ঐ কল্যাণী ইচ্ছা পোষণ করে বলেই আর পাঁচ জনের সঙ্গে মিলেমিশে উৎসবে মেতে ওঠে। গড়ে তোলে পরস্পরের মধ্যে প্রীতির সম্পর্ক। বাংলার উৎসবগুলিকে প্রধানত চার শ্রেণিতে বিভক্ত করা যায়। যথাÑ ঋতু উৎসব, ধর্মীয় উৎসব, সামাজিক উৎসব এবং জাতীয় উৎসব।
আম কাঁঠালি একটি সামাজিক অনুষ্ঠান ঠিক অনুরূপভাবে জামাই ষষ্ঠী নামে বাঙালি সমাজে এই অনুষ্ঠানটি পালিত হয়। জামাই ষষ্ঠী মূলত হিন্দু পরিবারগুলিতেই করতে দেখা যায়। জামাই ষষ্ঠী মূলত একটি সামাজিক উৎসব। জ্যৈষ্ঠ মাসের শুল্ক পক্ষের ষষ্ঠী তিথিতে শ্বশুর-শাশুড়িরা জামাইদের বাড়িতে নিমন্ত্রণ করেন। সেই সঙ্গে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু পাড়া পড়শিদেরও নিমন্ত্রণ করা হয়। এই নির্দিষ্ট দিনটি বাংলা দিন পঞ্জীতে জামাইদের জন্য উৎসর্গিত। জামাইদের মঙ্গল ও দীর্ঘায়ু কামনায় শাশুড়িরা ষষ্ঠীদেবীর পূজা দেন। এবং জামাইদের চন্দনের ফোঁটা, ধান, দুর্বা দিয়ে আশীবার্দ করেন। কোথাও আবার জামাইদের ডান হাতে হলুদ তাগা (্এক টুকরো কাপড়) বেঁধে দেওয়ার রীতি আছে। তারপর জামাইদের বিভিন্ন ফল, মিষ্টি এবং অনেক রকম রান্না করে খাওয়ানো হয়। শুধুমাত্র জামাইদের অনুষ্ঠান হলেও পরিবারের সবাই আনন্দে মেতে ওঠে। বাংলাদেশ ও পশ্চিম বাংলায় লোকাচার ভেদে অনুষ্ঠানের ধরণের বদল হয়। এই ষষ্ঠী কোথাও আবার অরণ্য ষষ্ঠী নামে পরিচিত।
জামাই জোড়া ইলিশ আর ধুতির কোঁচা ঝুলিয়ে শ্বশুর বাড়ির দিকে যাচ্ছে শ্বশুর-শাশুড়ির আশীর্বাদ নিতে এমন দৃশ্য শিহরণ জাগায় মনে। এই দিন জামাইদের দেওয়া হয় নতুন জামা-কাপড়। এদিন বাড়ির বউ, ঝিরা মেতে ওঠে বিভিন্ন স্বাদের নানা পদের রান্নায়। কোথাও কোথাও ১০৮টি পদ রান্না করা হয়। তার মধ্যে থাকে ইলিশ, রুই, বোয়াল, চিতল। ইলিশ মাছের সর্ষে বাটা-ভাজি, রুই মাছের কালিয়া, চিতল মাছের পুর, শোল মাছের বোনা, মুড়ির ঘণ্ট, কচি পাঁঠার মাংসের ঝুল, মুগের ডাল, কালাইর ডাল, মাস কালাইর ডাল, চানার ডাল, হরল ডাল, ছানার তরকারি, ডালনা, পটল ভাজা, আলু, বেগুন, করলা, নিমপাতা ভাজা। আলুর দম নানা ধরণের শাক-সবজি সেই সাথে থাকে আম দিয়ে তিশির টক, দই, মিষ্ঠান্ন আরও বহু ধরণের খাবার।
এই জামাই ষষ্ঠী উৎসবে ছোট বড় সবাই মেতে ওঠে আনন্দে। বিশেষ করে জামাইরা দিদিমা-ঠাকুমা এবং বৌদিদের সাথে মেতে ওঠে হাসি, ঠাট্টা তামাশায় গান আর লোক ছড়ায়। আজকাল জামাইকে পাত পেড়ে খাওয়ানোর সনাতন রীতি অনেকটাই বদলে যাচ্ছে। এখন বড় বড় হোটেল রেস্তোরাঁয় জামাইদের আপ্যায়নের ব্যবস্থা করা হয়। এরপরেও এখনো কিছু কিছু পরিবারে টিকে আছে জামাই ষষ্ঠীর এই দিনটি।

 

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • বাঙালির ইতিহাসে দুঃখের দিন
  • ঐতিহ্যবাহী নকশিকাঁথা
  • সাংবাদিকদের কল্যাণে সিলেট প্রেসক্লাব
  • প্রাকৃতিক মমিতে নির্মমতার ইতিহাস
  • গৌড়-বঙ্গে মুসলিম বিজয় ও সুফি-সাধকদের কথা
  • ঐতিহ্যের তাঁত শিল্প
  • সিলেট প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠাকাল নিয়ে ভাবনা
  • খাপড়া ওয়ার্ড ট্রাজেডি
  • জাদুঘরে হরফের ফোয়ারা
  • ইতিহাস গড়া সাত শক্তিমান
  • ভেজাল খাবার প্রতিরোধের ইতিহাস
  • বর্ষাযাপন : শহর বনাম গ্রামগঞ্জ
  • বর্ষা এলো বর্ষা
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • নবীদের স্মৃতিচিহ্নে ধন্য যে জাদুঘর
  • দর্শনীয় স্থান ও পর্যটন কেন্দ্র
  • ঐতিহ্যে অম্লান গোবিন্দগঞ্জ বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়
  • বিলুপ্তির পথে গরীবের ‘শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত’ মাটির ঘর
  • হারিয়ে যাচ্ছে হিজল গাছ
  • তালের পাখা প্রাণের সখা
  • Developed by: Sparkle IT