ইতিহাস ও ঐতিহ্য

বিলুপ্তির পথে গরীবের ‘শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত’ মাটির ঘর

মোজাম্মেল আলম ভুইয়াঁ প্রকাশিত হয়েছে: ১২-০৬-২০১৯ ইং ০০:০৯:১৬ | সংবাদটি ৩৮ বার পঠিত

কালের আবর্তে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য মাটির ঘর এখন বিলুপ্তির পথে। মাটির ঘরকে স্থানীয়ভাবে গরীবের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘর বলা হয়। শীত ও গরম উভয় মৌসুমেই এই মাটির ঘর আরামদায়ক। তাই আত্মতৃপ্তি লাভের জন্য গ্রামের দরিদ্র মানুষের পাশাপাশি অনেক ধনাঢ্য বক্তিরাও মাটির ঘর তৈরি করতেন।
প্রাচীনকাল থেকেই এই মাটির ঘরের প্রচলন ছিল। কিন্তু বর্তমানে তা বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। এটেল মাটি বা আঠালো মাটি দিয়ে এসব ঘর তৈরি করা হয়। মাটি কাদায় পরিণত করে, সেই মাটি দিয়ে এই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘর নির্মাণ করা হয়। মাটির কাদা দিয়ে ২/৩ ফুট চওড়া জায়গায় একটু একটু করে দেয়াল সৃষ্টি করা হয়। আর সেই দেয়াল ১০/১৫ ফুট উঁচু করে সেই দেয়ালে কাঠ বা বাঁশের সিলিং তৈরি করে তার উপরে দেয়া হয় সরু খড় অথবা টিনের ছাউনি। তারপর সেই ছাউনির ওপর গ্রামীণ গৃহিনীরা শিম, পুঁইশাক, শশা, মিষ্টি কুমড়া, লাউ, পূরল, ঝিঙ্গাসহ বিভিন্ন প্রকারের সবজি লাগিয়ে আর্থিক স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা করতেন। আর গৃহকর্তারা মাটির ঘরের চারপাশে আম, জাম, কাঠাল, নারিকেল, লিচুসহ বিভিন্ন জাতের ওষুধি গাছ লাগিয়ে বাড়ির সৌন্দর্য বৃদ্ধির পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষায় যথেষ্ট ভূমিকা রাখতেন। তাছাড়া এই মাটির ঘরকে অনেক সময় দোতলা পর্যন্ত তৈরি করা হয়। আর এসব মাটির ঘর এর চেয়ে বেশি বড় হয় না। এছাড়া বাড়ির সীমানা প্রাচীরও দেয়া হয় মাটি দিয়ে। তবে এই সীমানা প্রাচীরের ওপর টিন বা খড়ের আচ্ছাদন দেয়া হয়। আর বর্ষার পানি থেকে দেয়াল রক্ষার জন্যই এই আচ্ছাদনের ব্যবস্থা।
মাটি ও গোবর মিশ্রণের সাহায্যে লেপন করলে মাটির ঘর সুন্দর দেখায় ও স্বাস্থ্যসম্মত হয়। গৃহিনীরা তাদের হাতের স্পর্শে সেই মাটির ঘরের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেন। কিন্তু পাকা ঘরবাড়ি এখন সেই স্থানগুলো দখল করছে। এর কারণ হিসেবে জানা যায়, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে মাটির ঘরবাড়ির ব্যাপক ক্ষতি হয় বলে ইট, সিমেন্টের ঘর নির্মাণে উৎসাহী হয়ে উঠছে মানুষ। এছাড়া গ্রামাঞ্চলের মানুষ আধুনিকতার ভাব ফুটে তুলতেও পাকা ঘরবাড়ি নির্মাণ করছে। গ্রামের অবস্থাপন্ন বা ধনী লোকেরা মাটির ঘরের পরিবর্তে ইট, সিমেন্ট, বাঁশ ও টিনের ঘর তৈরি করছে। যার ফলে মাটির ঘর আজ অনেকের কাছেই স্মৃতি।
তাহিরপুর উপজেলার কড়ইগড়া, চানপুর, চারাগাঁও, বীরেন্দ্রনগর ও বারেকটিলায় এখনও অনেক মাটির ঘর রয়েছে। আর মাটির ঘরে বসবাসরত বারেক টিলার আব্দুল কাইয়ুম সহ আরও অনেকেই জানান, মাটির ঘর শীত ও গরম উভয় মৌসুমেই বেশ আরামদায়ক। তবে প্রবল বর্ষণে ও বর্ষার সময় মাটির ঘরের ক্ষয়ক্ষতি হয় বেশি। আর বন্যার সময় অসংখ্য মাটির ঘর ধসে পড়ে। তবে বন্যা বা ভূমিকম্প না হলে একটি মাটির ঘর শতাধিক বছর টিকে থাকে।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT