ধর্ম ও জীবন

ইস্তাম্বুলে ব্লু মসজিদ

আফতাব চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ১৪-০৬-২০১৯ ইং ০০:০৩:২৫ | সংবাদটি ১১৪ বার পঠিত


মসজিদের শহর ইস্তাম্বুল। এ মহানগরীতে শত শত নয়, হাজার হাজার দৃষ্টিনন্দন মসজিদ রয়েছে সুউচ্চ মিনার সমেত। ইস্তাম্বুলে মসজিদসমূহ বিশ্বের কাছে প্রসিদ্ধ। বিশেষ করে এমন কয়েকটি মসজিদ রয়েছে যে মসজিদগুলো স্থাপত্য শিল্পের বিস্ময়কর অবদান মনে করি। তৎমধ্যে অন্যতম একটি হল ‘সুলতান আহমদ মসজিদ’ প্রকাশ ব্লু মসজিদ।
ইস্তাম্বুলে অসংখ্য সুবিখ্যাত মসজিদসমূহের মধ্যে সোলেমানী মসজিদ ও ব্লু মসজিদই প্রধান। তোপকাপি যাদুঘর তথা ওসসমানি সুলতানগণের প্রাসাদের সম্মুখভাবে এ ব্লু মসজিদ যা বিশ্ববিখ্যাত হাঘিয়া-সোফিয়া জাদুঘরের নিকটে।।
তুর্কি জনগণ ইস্তাম্বুলে শ্রেষ্টতম সুন্দর এবং বিশাল মসজিদগুলোর মধ্যে এটিকে অন্যতম মনে করে। এ মসজিদ প্রথম সুলতান আহমদ কর্তৃক নির্মিত হয়েছিল। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ২০ বছর। সুলতান হাঘিয়া-সোফিয়া গীর্জাকে মসজিদ-এ রূপান্তরিত করার পরেও পরিতৃপ্ত হচ্ছিলেন না। ফলে অত্র মসসজিদটি নির্মাণ করেন। শীশান-এর এক বিখ্যাত স্থপতি মুহাম্মদ আগার-এর দিক নির্দেশনায় এ মসজিদ নির্মিত হয়। মসজিদে ব্লু টাইলসের আধিক্যের কারণেই এ মসজিদটি সুলতান আহমদ মসজিদের পাশাপাশি ব্লু মসজিদ বলা হয়ে থাকে। প্রথম সুলতান আহমদ তার এ প্রিয় মসজিদটি ধর্মীয় ঘোষণা প্রদানের কেন্দ্রস্থল হিসাবে ব্যবহার করতেন। এখানে ধর্মীয় ছুটির দিনগুলো উদযাপিত হত। হজ্ব ও ওমরাহ যাত্রীগণ এ মসজিদ থেকে রওনা হতেন। মসজিদের গগণচুস্বী ৬টি মিনার বহুদূর থেকে দৃশ্যমান। সুলতান স্থপতিকে মিনারগুলো স্বর্ণের দ্বারা নির্মাণ করতে আদেশ করেন। স্থপতি সুলতানের কথাগুলোতে আবেগের প্রতিফলন বুঝতে পেরে তা অসম্ভব বলে মূল্যবান পাথর দ্বারা নির্মাণ সমাপ্ত করেন। আল্লাহর প্রতি প্রগাড় শ্রদ্ধা নিবেদনের নিদর্শনস্বরূপ সুলতান মসজিদের গেটে একটি ধাতব শিকল ঝুলিয়ে রাখেন। এ গেটের ভিতর দিয়ে ঘোড়ায় আরোহণ করে যাওয়ার সময় সুলতান প্রতিবারই মাথা নত করতেন। মসজিদের মূল কক্ষ ৬৪ মিটার, ৭২ মিটার। মসজিদের বারান্দা ৩০টি ছোট ছোট গম্বুজে আবৃত। মসজিদের উঠানে রয়েছে ৮ কোণাকৃতির একটি বিশেষ ঝর্ণা। মসজিদের ২৬০টি জানালায় সেকালের অতি মূল্যবান রঙিন কাঁচ ছিল। এ কাঁচ মসজিদকে দিনরাত আলোকিত রাখত। নীল ও সাথে সবুজ টাইলস এবং ফ্লোরে লাল কার্পেট আলোতে উজ্জ্বল হয়ে থাকত। তখন মসজিদের ভিতরের অংশকে মোহনীয় দেখাত। মসজিদের কেন্দ্রিয় তথা মূল গুম্বুজটি ৪৩ মিটার তথা ১৩০ ফুটের চেয়ে অতি উচ্চতায় অবস্থিত। শুধু তাই নয় বিশ্বখ্যাত এ গম্বুজটির ব্যাসার্ধ হল ২৪ মিটার তথা ৭০ ফুটের চেয়ে বেশী। মার্বেল পাথরের প্লেট দ্বারা আবৃত ৩টি গোলাকৃতি বিশিষ্ট পিলার গম্বুজটিকে উর্ধ্বে তুলে রেখেছে। মসজিদের দেয়ালকে আবৃত করা হয়েছে বর্ণিল অলংকরণের দ্বারা যার প্রধান বর্ণ হচ্ছে নীল। চমৎকার হস্ত লিপির ক্যালিগ্রাফি তথা আরবীয় নকশা রয়েছে এতে। মেহরাব এবং জুমার খুৎবার মিম্বর সাদা মর্মর পাথর দ্বারা নির্মিত যা তুর্কি সুলতানগণ কর্তৃক নির্মিত মসজিদে নববীর সাথে অনুকরণীয় বলা যেতে পারে। মসজিদের উঠান এবং চতুষ্পার্শের বাগান এর সৌন্দর্যকে বহুলাংশে বাড়িয়ে দিয়েছে। তুরস্কের মসজিদগুলোতে মেহরাবে দাঁড়িয়ে বা মিম্বরে বসে ওয়াজ নছিহত করার বিধান নেই। মসজিদের কোন এক পার্শ্বে একটি বিশেষ মঞ্চের মত রয়েছে ওয়াজ নছিহত করার উদ্দেশ্যে। তুরস্কের মসজিদের ইমামগণের বিশেষ লেবাস রয়েছে, তারমধ্যে মাথায় রুমি টুপি, তা অবশ্য লাল অথবা সবুজ। টুপিটি চারপার্শ্বে সাদা কাপড়ে পেঁচানো যা আমাদের দেশে সাদা পাগড়ী পরিধানের মত। গায়ে আবৃত গোড়ালীর উপর পর্যন্ত আমাদের দেশীয় ওভারকোট অথবা রেইন কোটের মত। ইমাম সাহেবের কক্ষে এরকম একাধিক টুপি ও একাধিক পোশাক রক্ষিত থাকে। তুর্কি পোশাক তথা প্যান্ট-শার্ট পরে এসে ঐ কক্ষ থেকে উক্ত পোশাক পরিধান করে ইমাম সাহেব ইমামতি করতে যান। নামাজান্তে উক্ত পোশাক তার খাস কক্ষে খুলে রাখবেন। নামাজের পর ইমাম পোশাক খোলার পর উনি যে একজন আলেম ও মসজিদের ইমাম তা বুঝার উপায় থাকেনা। ইমাম সাহেব আরবিতে কোরআন শরীফ ও হাদিস শরীফ পড়ে খুৎবার সুচনা করলেও কয়েক মিনিটের ব্যবধানে তুর্কি ভাষায় খুৎবা দেয়া শুরু করে দেন। খুৎবা দেয়া সমাপ্ত হলে খতীব সাহেব মিম্বরে সিঁড়ি বেয়ে নামতে মুয়াজ্জিন মাইকযোগে সুলতানের মাগফেরাত কামনা দোয়া ও সুরা ফাতেহা পড়তে থাকেন। সাথে সাথে উপস্থিত হাজার হাজার মুসল্লী সমন্বয়ে মুয়াজ্জিনের অনুকরণ করে সুরা ফাতেহা পড়ে সুলতানের জন্য দোয়া করেন। অতঃপর মুয়াজ্জিন একামত দিলে খতীব সাহেব নামাজ পড়িয়ে দেন। অবশ্য নামাজে আরবী ভাষা ব্যবহার করা হয়। খতীব সাহেব সালাম ফিরিয়ে নামাজ শেষ করার পর পর মুয়াজ্জিন মাইকযোগে ‘আল্লাহুম্মা আন্তাচ্ছালাম ওয়ামিনকাচ্ছালাম তারাবাকাত রাব্বানা ওয়াতায়া আইকা এযাজালজালালি ওয়াল ইকরাম’। মুয়াজ্জিনের মুখে মুখে উপস্থিত সমস্ত মুসল্লী সমস্বরে এ দোয়াটি পড়তে থাকেন। অতঃপর সুন্নাত নামাজ পড়া হয়। সুন্নাতের পর খতীব সাহেব কেবলা পিছ দিয়ে মুসল্লীগণকে সামনে রেখে দু’হাত তুলে মুনাজাত করেন। তারপর অনেক মুসল্লী খতীব সাহেবের সাথে করমর্দন বা মুসাফাহা করেন।
তুরস্কের মসজিদগুলোতে প্রবেশমুখে পলিব্যাগ রাখা থাকে। তথা হতে পলিথিন ব্যাগে জুতা ঢুকিয়ে রক্ষিত বাক্সে রাখা হয়। নামাজ শেষে বের হওয়ার পর পলিথিন বাক্সে পলিথিনগুলো রেখে দেয়া হয়। শীতকালে বরফ পড়ে বিধায় জুতা ভিজা থাকার কারণেই মনে হয় এ ব্যবস্থা। বাংলাদেশের দক্ষিণ চট্টগ্রামের চন্দনাইশে এ ‘ব্লু’ মসজিদের আদলে একটি মসজিদ নির্মাণ কাজ সমাপ্তির পথে। চন্দনাইশ উপজেলায় জুয়ারা ইউনিয়নের ফতেনগর গ্রামে এডভোকেট বদিউল আলমের পারিবারিক মসজিদটি পুনঃনির্মাণ করতে গিয়ে ইস্তাম্বুলের ‘ব্লু’ মসজিদের ৬টি মিনারকে পরিহার করে মসজিদের চারকোণে চারটি ছোট গম্বুজ দেয়া হচ্ছে। মসজিদের নির্মাণ কাজ সমাপ্ত হলে যারা ইস্তুাম্বুল গমনে অক্ষম তাদের জন্য কিছুটা হলেও দেখার খোরাক হতে পারে।
বস্তুত : ইস্তাম্বুলের ‘ব্লু’ মসজিদ বিশ্বখ্যাত। এ মসজিদের আদলে আরেকটি মসজিদ রয়েছে কয়েক কি.মি দূরত্বে পাহাড়ের উপর। ঐ মসজিদকে সুলায়মানী মসজিদ বলা হয়। এটাও বিশ্বখ্যাত মসজিদগুলোর অন্যতম একটি। ইস্তাম্বুলে এমন আরও কয়েকটি মসজিদ রয়েছে যেগুলোও দেখার মত। ব্লু মসজিদটি ইস্তাম্বুলের একদম নাভিতে অবস্থান করছে। হাঘিয়া-সুপিয়া জাদুঘর, তোপকাপিসহ প্রায় ৪/৫ বর্গ কি.মিটারের মধ্যে তুরস্কসহ ২ হাজার এর মত বিদেশী পর্যটকগণের আনাগোনা থাকে। এখানে মসজিদের আশেপাশের চতুরগুলো বাগানাদিতে ভরপুর। বাগানের ফাঁকে ফাঁকে রয়েছে খোলামেলা অসংখ্য রেষ্টুরেন্ট। এগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন স্টারমানের। দেশি বিদেশি পর্যটকদের কাছে ইস্তাম্বুলের প্রধান প্রধান কয়েকটি আকর্ষণীয় স্থাপনার মধ্যে এ ব্লু-মসজিদটি একটি।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT