উপ সম্পাদকীয়

শান্তির জন্য চাই মনুষ্যত্বের জাগরণ

আফতাব চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ১৫-০৬-২০১৯ ইং ০০:৩৩:১১ | সংবাদটি ৮২ বার পঠিত

‘আমরা কি প্রকৃত মানব’-? এ প্রশ্নটি যত সহজ বলে মনে হয় উত্তর তত সহজ নয়,বরং জটিল এর উত্তর। এ প্রশ্নের উত্তরের জন্য আমাদের জানা প্রয়োজন যে একজন প্রকৃত মানব হতে হলে তার কি কি বৈশিষ্ট্য থাকা প্রয়োজন।
নিজেকে প্রকৃত মানব রূপে গড়ে তুলতে হলে সর্বপ্রথম নিজের অন্তর্নিহিত মনুষ্যত্বকে জাগ্রত করতে হবে। অন্তরের অনুভূতি, অন্তরচেতনাকে জাগ্রত করে তুলতে হবে। বর্তমান সমাজে মানুষ হয়ে উঠেছে আত্মকেন্দ্রিক। তারা সর্বদাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। তারা নিজের বৈষয়িক চিন্তায় এতই মগ্ন থাকে যে অন্যের সুখ-দুঃখ নিয়ে চিন্তা করার সময় তাদের থাকে না। মানুষের এ স্বার্থান্বেষী চিন্তাধারার জন্য তারা প্রকৃত মানব সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। প্রকৃত মানুষ হতে হলে আমাদের চাই পরস্পরের প্রতি অন্তরের ভালোবাসা, চাই ¯েœহ, করুণা, স্বার্থপরহীনতা। প্রতিদিন খবরের কাগজ খুললে দেখা যায, পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে কি ভাবে চলছে হিংসা, বিদ্বেষ, ক্রোধ, লুণ্ঠন, ধর্ষণ ইত্যাদি পাপকর্ম-এটাই কি প্রকৃত মানবের মনুষ্যত্বের পরিচয়? হযরত মোহাম্মদ (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি সর্বশক্তিমান আল্লাহকে বিশ্বাস করে এবং মানুষকে ভালবাসে সে প্রকৃত মুসলমান’। এখানে প্রকৃত মুসলমান বলতে প্রকৃত মানুষের কথা বলা হয়েছে যার অন্তরে থাকবে পরস্পরের প্রতি ¯েœহ, ভালবাসা এবং আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস। স্বামী বিবেকানন্দ বলে গেছেন-“জীবে প্রেম করে যেইজন,সেইজন সেবিছে-ঈশ্বর”। কিন্তু বর্তমান মানব সমাজের গতি তার উল্টোদিকে। বর্তমানে মানুষ নিজেকেই প্রেম করে নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। তার মতে প্রকৃত মানুষ হলো ঈশ্বরের সমতুল্য।
বর্তমান জগতে মানুষের প্রতি মানুষের যে ভালবাসা, ¯েœহ, মমতা দেখা যায় তা অতি কৃত্রিম। তাতে থাকে না কোনও আন্তরিকতা, থাকে শুধু কপটতা আর স্বার্থপরতা। এ ভালবাসা শুধু নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য। বর্তমানে এ জগতের রথ চলছে মিথ্যা এবং ছল নামক ইন্ধনের দ্বারা। এ রথে যারা চলছে তাদের প্রকৃত মানব বলা যায় না। তাদের বলা যেতে পারে ভন্ড, পাষন্ড। এ ভন্ডামির জন্য বর্তমান মানব সমাজ ধূলির সমতলে। এ ধূলিসম অবস্থা থেকে উঠে আসার জন্য চাই প্রকৃত ¯েœহ, ভালবাসা, যার দ্বারা আমরা এ বিশ্বের মানুষের মন জয় করে প্রকৃত মানুষ বলে নিজেকে পরিচয় দিতে পারি।
একজন ব্যক্তিকে প্রকৃত মানব রূপে গড়ে ওঠার জন্য নিজের ভাবাধারার পরিবর্তন ঘটানো একান্ত প্রয়োজন। যে ব্যক্তি জগতের সকল ব্যক্তিকে নিজের বন্ধু, ভাই,পিতা ও মহিলাদের নিজের বোন, মাতা হিসেবে দেখেন সে ব্যক্তিই জগতের প্রকৃত মানব। অর্থাৎ থাকা দরকার পরস্পর পরস্পরের প্রতি ভ্রাতৃত্ববোধ। কিন্তু বর্তমান জগতে এ ভাবধারার মানুষ নিতান্তই নগণ্য। কেন না বর্তমানে সকলেই হয়ে উঠেছে স্বার্থপর, আত্মকেন্দ্রিক। তাদের এরুপ চিন্তা ধারার জন্যেই প্রকৃত মানব ধীরে ধীরে লোপ পেয়ে যাচ্ছে। বর্তমান মানবের এরুপ চিন্তাধারার জন্যই বর্তমান জগত অবক্ষয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আমরা শিক্ষা-দীক্ষা,জ্ঞান-বিজ্ঞানে যতই উন্নতি করি না কেন প্রকৃত মানব না হতে পারলে এ উন্নতির কোনও মূল্য নেই। এ উন্নতি হয়ে পড়বে ক্ষণিক সময়ের। কেন না একজন প্রকৃত মানবই একটি জগতের উন্নতি ঘটাতে পারে।
আমাদের হারিয়ে যাওয়া এ মনুষ্যত্ববোধ এবং মানবের চারিত্রিক গুণাবলী ফিরিয়ে আনতে চাই পারস্পরিক সম্প্রীতি। পরিতাপের বিষয় আজ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সস্প্রদায়গত ভেদবুদ্ধি মানুষের প্রতি আচরণে ঘৃণ্য বর্বরতায় মেতে উঠে মানুষ মানুষের রক্তে নিজেকে রঞ্জিত করছে। সভ্যতা ও সংস্কৃতির উপর কলঙ্ক লেপন করছে। মানবিকতাকে করছে পদদলিত। যারা মানবিকতাকে অস্বীকার করে বিশেষ বিশেষ ধর্মের প্রচলিত যুক্তিহীন আচার-অনুষ্ঠানে ও বিশ্বাসে দায়বদ্ধ থাকে, তারাই মৌলবাদী।কোন কোন দেশের মৌলবাদীরা নিজ স্বার্থেই অন্ধ অনুগামীদের অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতি অসহিষ্ণু করে তুলছে। সমাজবাদী শক্তির ঘৃণ্য চক্রান্ত মৌলবাদীদের প্ররোচনাতেই সাম্প্রতিক বিভিন্ন দেশে সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মীয় বিদ্বেষ উগ্ররূপ ধারণ করছে।
বর্তমানের মানব মনুষ্যত্বহীন হয়ে পড়ছে। আর এ মনুষ্যত্বহীন মানব পানি বিহীন সাগরের ন্যায়। পানি বিহীন সাগরের যেমন পরিচয় পাওয়া যায় না, ঠিক তেমনই মনুষ্যত্বহীন মানবের পরিচয় পাওয়া যায় না। অর্থাৎ সূক্ষ্ম দৃষ্টি দিয়ে দেখতে গেলে মনুষ্যত্ব আর মানবের সম্পর্ক পানি ও জীবনের সম্পর্কের ন্যায়। মনুষ্যত্ব আমাদের অন্তরের বিষয়। আর এ অভ্যন্তরীণ বিষয়কে জাগ্রত করার জন্য আমাদের চাই আন্তরিক ইচ্ছা। এ মনুষ্যত্ব গড়ে তোলার জন্য আমাদের চাই মানসিক শক্তি, অন্তরের দৃঢ় বিশ্বাস যা আমাদের প্রগতির পথে বাধা দান করা বিভিন্ন বিপদের সাথে সংগ্রাম করতে সাহায্য করবে। এ সংগ্রামে জয়ী হলেই আমরা প্রকৃত মানুষ হতে পারব ও নিজেবে গড়ে তুলতে পারব সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তি রুপে।
এ জগতের বাহ্যিক রুপ অতি সুন্দর, মনোমুগ্ধকরা-ঠিক একটি রূপসী নারীর মত, কিন্তু এর অভ্যন্তরীণ রূপ বড়ই জটিল। বিভ্রান্তিকর মরিচীকার মত, যা তৃষ্ণার্ত পথিকদের প্রবঞ্চিত করে। বর্তমান জগতের মানবরুপও ঠিক মরিচীকার মত। তারা নিজের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য,লিপ্সা ও আকাংখা পূরণের জন্য অন্যকে মিথ্যা প্রলোভনে বিভ্রান্ত করে নিয়ে যায় অস্তিমের দিশায়।
এটি প্রকৃত মনুষ্যত্ব নয়। বর্তমান সমাজের মানব বন-মানুষের সমতুল্য। অরণ্যবাসী বন-মানুষের অন্যের প্রতি হিংসা,বিদ্বেষ ও স্বার্থপরতা থাকে। অন্যের মুখের গ্রাস ছিনিয়ে নেওয়ার প্রবণতা তাদের অধঃপতন মুখে ঠেলে দিয়েছে। ঠিক তেমনই বর্তমান সমাজের মানব সমাজ একই দিকে ধাবিত হচ্ছে। আমরা হাজার হাজার বছর ধরে ক্রম বিবর্তনের পথে পরিবর্তিত হয়ে বন-মানুষের দেহাবয়ব ত্যাগ করে প্রকৃত মানবরুপ ধারণ করতে সক্ষম হয়েছি । কিন্তু দুঃখের বিষয় আমরা আন্তরিক ভাবে প্রকৃত মানুষ হতে পারিনি। তাই সময় থাকতে আমরা যদি আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটাতে না পারি তাহলে আমাদের পতন নিশ্চিত।
আমাদের এ আসন্ন পতন থেকে উঠে দাঁড়াতে হলে আমাদের অন্তর আত্মাকে উন্নত করতে হবে। আমাদের স্বার্থপরতা বিসর্জন দিয়ে বিশ্ব ভ্রাতৃত্ববোধ জাগ্রত করতে হবে। তা হলে আমাদের মুক্তি নতুবা আমাদের মানব অধিকার নিরর্থক।
তবে মনে হয় বর্তমানের এ অবস্থা (অবক্ষয়) মানব সভ্যতার শেষ নয়। নতুন সূর্যের আলো প্রতিদিন নতুন আশা বহন করে আনে। ঠিক তেমনই ভবিষ্যতের মানব সমাজ একদিন এ পৃথিবীকে নতুন রূপে, নতুন চিন্তাধারায়, নতুন মনুষ্যত্বে মানবের প্রকৃত রুপ ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হবে।
নতুন মানব সমাজ গড়ে তুলতে চাই মনুষ্যত্বের জাগরণ, আর এ জাগরণের জন্য চাই প্রকৃত ধর্মীয় শিক্ষা। যার মাধ্যমে আমরা নিজের মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটাতে পারি এবং তারই মাধ্যমে এক প্রকৃত মানব সমাজ গড়ে তুলতে পারব।
ভবিষ্যতের এ আদর্শ সমাজ গড়ে তুলতে সদ্যোজাত শিশুই আমাদের আগামী দিনের দিশারী। তাদের উপযুক্ত ধর্মীয় শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষিত করে তুলতে পারলে এ কলুষিত জগৎ একটি নির্মল স্বাস্থ্যবান জগতে পরিণত হবে। আর এ প্রজন্মকে উপযুক্ত দিশা দেওয়ার জন্য বর্তমানে প্রাপ্ত বয়স্কদের উপযুক্ত ভূমিকা নিতে হবে। নতুন প্রজন্¥কে গড়ে তোলার জন্য শুধু স্কুলে শিক্ষা দিলে চলবে না তার সাথে সাথে নতুন প্রজন্মকে দিতে হবে ধর্মীয় এবং বাহ্যিক শিক্ষা। যার মাধ্যমে এ নব প্রজন্ম আহরণ করে আনবে এক পূর্ণাঙ্গ ব্যক্তিত্ব, এক কলুষহীন সুন্দর পৃথিবী।
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বৃক্ষরোপণ
  • জলবায়ু পরিবর্তনই আসল সমস্যা
  • কিশোর অপরাধ
  • আ.ন.ম শফিকুল হক
  • হোটেল শ্রমিকদের জীবন
  • বিশেষ মর্যাদা বাতিল ও কাশ্মীরের ভবিষ্যত
  • বাংলাদেশে অটিস্টিক স্কুল ও ডে কেয়ার সেন্টার
  • বেদে সম্প্রদায়
  • গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে সুপারিশমালা
  • ত্যাগই ফুল ফুটায় মনের বৃন্দাবনে
  • প্রকৃতির সঙ্গে বিরূপ আচরণ
  • ঈদের ছুটিতেও যারা ছিলেন ব্যস্ত
  • সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের বর্ষপূর্তি : প্রাপ্তি ও প্রত্যাশা
  • আইনজীবী মনির উদ্দিন আহমদ
  • শিশুদের জীবন গঠনে সময়ানুবর্তিতা
  • শাহী ঈদগাহর ছায়াবীথিতলে
  • কিশোর-কিশোরীদের হালচাল
  • বলকানস : ইউরোপের যুদ্ধক্ষেত্র
  • সন্তানের প্রতি অভিভাবকের দায়িত্ব
  • শিক্ষার হার এবং কর্মসংস্থান প্রসঙ্গ
  • Developed by: Sparkle IT