সম্পাদকীয়

কৃষিজমি সুরক্ষায় আইন

প্রকাশিত হয়েছে: ১৫-০৬-২০১৯ ইং ০০:৩৪:১২ | সংবাদটি ১০৬ বার পঠিত

কৃষিজমি সুরক্ষায় আইন করার তোড়জোর শুরু হয়েছে আবার। ‘কৃষিজমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহার আইন ২০১৯ শীর্ষক এই আইনের খসড়া ইতোমধ্যেই তৈরী হয়েছে। আর এই আইনের খসড়ায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে, গ্রামাঞ্চলে বহুতল ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে সহজশর্তে গৃহনির্মাণ ঋণের ব্যবস্থা করা। ভূমি মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত খবরে বলা হয়, গ্রামাঞ্চলে অপরিকল্পিত ভাবে বাসাবাড়ি তৈরী করে কৃষিজমি নষ্ট করা হচ্ছে। এর ফলে খাদ্য নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। একটি পরিবারের জন্য একটি বাড়ি না করে একটি বাড়িতে যদি দশটি পরিবারের আবাসনের ব্যবস্থা করা যায়, তবে অনেক জমি বেঁচে যাবে। এ কারণে পরিকল্পিতভাবে আবাসনের উর্ধমুখী সম্প্রসারণকে উৎসাহিত করছে সরকার। দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার আবাসন নিশ্চিত করা রীতিমতো দূরূহ হয়ে উঠছে দিন দিন। এজন্য পরিকল্পিত বাসস্থান গড়ে তোলা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যে কারণে কম জমিতে বেশি মানুষের বসবাসের জন্য বহুতল ভবন নির্মাণের তাগিদ দেয়া হচ্ছে।
কৃষিজমি ব্যবহৃত হচ্ছে অকৃষি খাতে। এতে কৃষিজমি সংকোচিত হচ্ছে। এটা আমাদের জন্য একটা নীরব বিপর্যয়। দেশে কৃষিজমির পরিমাণ কমছে প্রতিবছর প্রায় ৬৯ হাজার হেক্টর। সরকারি সূত্রে জানা যায়, দেশে আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ ৯০ লাখ ১৮ হাজার হেক্টর। এর মধ্যে আবাদযোগ্য পতিত জমি ১৫ লাখ ১৮ হাজার হেক্টর। অর্থাৎ মাথাপিছু চাষযোগ্য জমির পরিমাণ ১৫ শতাংশের কম। অথচ এই জমির পরিমাণ হ্রাস পাচ্ছে প্রতিদিন। দিনে কমপক্ষে দু’শ ২০ হেক্টর কৃষিজমি হারিয়ে যাচ্ছে। এই জমি ব্যবহৃত হচ্ছে অকৃষি খাতে। বসত বাড়ি, রাস্তাঘাট নির্মাণ, মার্কেট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিল্পাঞ্চলসহ অনুৎপাদনশীল খাতে চলে যাচ্ছে ভূমি প্রতি বছর ৩০ হাজার হেক্টর। এছাড়া, দেশে প্রায় পাঁচ হাজার ইটভাটায় ইট তৈরীতে প্রতি বছর ১৩ কোটি টনের বেশি কৃষিজমির মাটি ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে বছরে ১১ হাজার হেক্টর আবাদি জমিতে শস্য উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না। এই ধারা চলতে থাকলে আগামী ২০ বছর পর দেশের কৃষিজমি ৫০ হাজার হেক্টরে নেমে আসবে বলে আশংকা করা হচ্ছে। এই প্রেক্ষিতে দেশের কৃষিজমি সুরক্ষার জন্য প্রণীত হচ্ছে নতুন আইন। এতে পল্লী জনপদে বহুতল ভবন নির্মাণের ওপর জোর দেয়া হয়েছে। এছাড়া শিল্পকারখানা সরকারি-বেসরকারি অফিস ভবন এবং অন্যান্য স্থাপনার ক্ষেত্রেও উর্ধমুখী সম্প্রসারণকে উৎসাহিত করছে। খসড়া আইনে বলা হয়েছে, কৃষিজমি নষ্ট করে আবাসন, বাড়িঘর, শিল্পকারখানা, ইটের ভাটা বা অন্যকোন স্থাপনা নির্মাণ করা যাবে না।
ইতোপূর্বে ২০১৫ সালে ‘কৃষিজমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহার আইন’ প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়া হয়। এই আইন করার জন্য হাইকোর্টের নির্দেশনাও ছিলো। কিন্তু পরবর্তীতে এ ব্যাপারে তেমন কোন অগ্রগতি চোখে পড়েনি। এছাড়া, স্বাধীনতা পরবর্তীকালে বিভিন্ন সময় ভূমি ব্যবহার, কৃষিজমি সুরক্ষা এবং ভূমিজোনিং বিষয়ে বেশ কয়েকবার আইন, বিধিমালা, ম্যানুয়েল, প্রজ্ঞাপন ও নির্দেশনা জারি করা হয়। কিন্তু তার কোনটাই কার্যকর হয় নি। অপরদিকে প্রায় বছর পাঁচেক আগে গ্রামীণ এলাকায় কৃষিজমিতে বসতবাড়ি নির্মাণ প্রক্রিয়া বন্ধ করার জন্য ‘পল্লী জনপদ’ নামে ফ্ল্যাট বাড়ি নির্মাণের পরিকল্পনা নেয়া হয়। তারও কোন অগ্রগতি নেই। এবার কৃষিজমি সুরক্ষায় যে আইনটি প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, তা যাতে শুধুমাত্র কাগজেপত্রে সীমাবদ্ধ না থাকে সেটাই আমাদের প্রত্যাশা।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT