পাঁচ মিশালী

লজিং জীবন

সৈয়দ আহমদ প্রকাশিত হয়েছে: ১৫-০৬-২০১৯ ইং ০০:৩৪:৪৫ | সংবাদটি ১৫৩ বার পঠিত

গোবিন্দগঞ্জ অঞ্চলে শুধু গোবিন্দগঞ্জ স্কুল ও বাজারের নামই নয়, আশেপাশের অনেক গ্রামের নামই কিন্তু হিন্দু দেব-দেবী বা তাদের ধর্মীয় শ্রদ্ধাভাজন নামগুলোর সাথে মিল রেখে গ্রামগুলোর নামকরণ করা হয়েছিল। যেমন-রাধানগর, শিবনগর, হরিনগর, শ্যামনগর, শ্রীনগর, লক্ষিèপুর, পালপুর, রামপুর, গোবিন্দনগর, রায়সন্তোসপুর, ব্রাহ্মণগ্রাম ও কালিদাস পাড়া ইত্যাদি। আমি শিবনগরে লজিং থাকাকালীন সময়ে উক্ত নামকরণের মাহাত্ম জানার চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু কেউ তার সঠিক উত্তর দিতে পারেনি। তবে লজিং বাড়ি সংলগ্ন একজন বিজ্ঞ ও বয়স্ক ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম, পাক-ভারত অঞ্চলে মুসলিম শাসনের বহুপূর্ব থেকেই অত্রাঞ্চলে হিন্দু জনগোষ্ঠীর বসবাস ছিল ফলে তখনকার সময়ের হিন্দু জমিদার ও উচ্চবিত্ত শ্রেণির হিন্দুগণের দ্বারা দেওয়া নামে গ্রামগুলোর নামকরণ করা হয়েছিল; যা আবহমান কাল থেকেই চলে আসছে। পরবর্তীতে মুসলিম শাসন, বৃটিশ শাসন ও সর্বশেষ পাকিস্তানী শাসনসহ অনেক শতাব্দী অতিবাহিত হলেও নামগুলো আজও এলাকাটির ঐতিহ্য হিসাবে গণ্য করা হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে অত্রাঞ্চলে মুসলমানদের বসবাস বৃদ্ধি পেলেও তারা ধর্মান্ধ বা ধর্ম বিদ্বেষী ছিল না বলেই নামগুলোকে ঐতিহ্য হিসাবে গ্রহণ করে আসছে। তাছাড়া মুসলমান নামের প্রতি নয় বরং আল্লাহ ও রাসুলের প্রতি বিশ্বাস রেখে শ্রদ্ধা ও সম্প্রীতির সাথে দীর্ঘ কয়েক যুগ থেকে মিলেমিশে বসবাস করছে এবং সম্মিলিতভাবে দেশ ও এলাকার উন্নয়নে কাজ করে এলাকাটিকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে এগিয়ে নিচ্ছে এবং সহাবস্থান ও সম্প্রীতির নজির সৃষ্টি করছে।
ছাতক উপজেলাধীন গোবিন্দগঞ্জ অঞ্চল সেই বৃটিশ-পাকিস্তানী আমল থেকেই সাংস্কৃতিক চর্চার একটি কেন্দ্রবিন্দু ছিল। বিশেষ করে শীতকালীন সময়ে গোবিন্দগঞ্জ এলাকার বিভিন্ন গ্রামে বা বাজার সংলগ্ন খোলা মাঠে বা কোনো প্রতিষ্ঠানের সম্মুখে দেশীয় রীতিতে পেন্ডেল তৈরী করে নাটক, যাত্রা, সারিগান, বাউল গান ও যাত্রাপালার আসর বসানো হতো। ১৯৭০ সালে গোবিন্দগঞ্জ তেমুখীতে একবার বাউল গানের আসর বসেছিল। তেমুখীতে তখন রেলওয়ের গেইটম্যানের ঘরটি ছাড়া কোনো দোকানপাট বা ঘর দরজাই ছিল না। চতুর্পাশের রাস্তা ছিল খোলামেলা। তেমুখী রাস্তার উপর প্যান্ডেল বেধে হেজাক লাইট জ্বালিয়ে রাত্রি বেলায় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। উক্ত অনুষ্ঠানে তখনকার যুবক বাউল শিল্পী বর্তমানে প্রয়াত শাহ আব্দুল করিমসহ কয়েকজন বাউল শিল্পী পালাগান গেয়েছিলেন। সেই অনুষ্ঠানে আব্দুল করিমের একটি গান আজও আমার কানে ভেসে উঠে। গানটি হল-‘কেন পিরিতি বাড়াইলা বন্ধু, ছাইরা যাইবা যদি’ এবং দ্বিতীয়টি হল-‘দিবা নিশি ভাবি যারে, তারে যদি পাইনা, রঙ্গের দুনিয়া আমি চাই না’ তখনকার সময় শাহ আব্দুল করিমের গানগুলো গ্রামে গ্রামে মানুষের মুখে মুখে ভাইরাল ছিল।
সে সময়ে যাত্রা গান প্রদর্শনী খুব বেশি জনপ্রিয় ছিল। যাত্রা দলের নাচ-গান পরিবেশনায় শিশু-কিশোর বয়সের চার পাঁচটি ছেলেকে প্রশিক্ষণ দিয়ে মেয়ে সাজিয়ে তাদের দ্বারা নাচ-গান পরিবেশন করা হতো। যাত্রা অভিনয়ের ফাঁকে ফাঁকে মেয়ে সাজানো ছেলেগুলি দিয়ে নাচ-গান করিয়ে দর্শক শ্রোতাবৃন্দকে আনন্দ দিয়ে অর্থ আদায় করা হতো। প্রায় প্রতি বছর শিবনগরের পূর্বমাঠে বা রাধানগর মাঠে মেলা ও যাত্রা পালার আয়োজন করা হতো। যদিও ঘৌড়দৌড় প্রতিযোগিতা ছিল মেলার প্রধান আকর্ষণ কিন্তু মেলাগুলোতে প্রকাশ্যে জুয়া খেলার আসর চলতো সারা রাতব্যাপি। জুয়া খেলে অনেকেই সর্বস্বান্ত হলেও খেলার নেশা ছিল মারাত্মক। বর্তমান ডিজিটাল যুগের টিভি, মোবাইল ও ইন্টারনেট ইত্যাদির কারণে যুবক-যুবতীরা ঘরে বসে তো বটেই হাঁটতে হাঁটতে চলতে চলতে সব কিছু মোবাইলে দেখতে শুনতে ও কথা বলতে পারছে। তাই এখন যাত্রাগান, সারিগান, বাউল ও গ্রামীণ মেলার জনপ্রিয়তা হারিয়ে যাচ্ছে। তখনকার সময় স্কুলের সংস্কৃতিমনা ছাত্র-ছাত্রী ও শিক্ষকগণের সহায়তায় স্কুলে বড় বড় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানাদির আয়োজন করা হতো। ডিজিটাল যুগের কারণে সেগুলোও এখন বিলুপ্তির পথে।
১৯৭২ সালে স্বাধীনতা উত্তর গোবিন্দগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বাংলার স্বাধীনতা যুদ্ধের সর্বাধিনায়ক ও মন্ত্রী সিলেটের গর্ব মরহুম এম.এ.জি ওসমানীকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। উক্ত অনুষ্ঠানে আমাদের স্কুলের একজন ছাত্র, শিবনগর নিবাসী বাউল সাধক ও কবি মরহুম গিয়াস উদ্দিন আহমদের একটি গান পরিবেশন করেছিল। গানটি ছিল-‘ধন্যবাদ বঙ্গবন্ধু বাংলার নয়ন মনি, ধন্যবাদ নজরুল তাজউদ্দিন সামাদ কর্নেল ওসমানী’। অনুষ্ঠানে বর্ণিত গানটি শুনে তাৎক্ষণিক পুরস্কার ঘোষণা করেছিলেন বঙ্গবীর ওসমানী। উক্ত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মরহুম আব্দুস সামাদ সহ সুনামগঞ্জ ও ছাতকের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। উক্ত সাংস্কৃতিক ও সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের প্রধান পরিচালক ছিলেন তখনকার গোবিন্দগঞ্জ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারি প্রধান শিক্ষক ও গোবিন্দগঞ্জ আব্দুল হক স্মৃতি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের অধ্যক্ষ মরহুম সিরাজুল ইসলাম। অনুষ্ঠানটি ছিল উপভোগ্য ও অত্রাঞ্চলের আলোড়ন সৃষ্টিকারী একটি মনোজ্ঞ অনুষ্ঠান। আমার লজিং জীবনে ও লেখাপড়ার ক্ষেত্রে গোবিন্দগঞ্জ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের ভূমিকা ছিল প্রজ্জ্বলিত আলোকবর্তিকা স্বরূপ। লজিং জীবনের বিরাট একটা অংশ জুড়ে বিস্তৃত জ্যোতির্ময় প্রতিষ্ঠান গোবিন্দগঞ্জ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় নিয়েই লেখার প্রত্যাশা করছি।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT