পাঁচ মিশালী

কুশিয়ারার তীরে অন্যরকম এক দিন

মোঃ মনজুর আলম প্রকাশিত হয়েছে: ১৫-০৬-২০১৯ ইং ০০:৩৬:১৮ | সংবাদটি ১৬০ বার পঠিত

কুশিয়ারা সিলেটের বুক চিরে বয়ে চলা একটি নদী। সুরমা ও কুশিয়ারার মধ্যে কুশিয়ারা বেশি প্রমত্তা। কুশিয়ারার বুকে নৌকা চলা, মহাজনের মালের বোঝাই নৌকা, স্লুইচ গেইট ও নদী তীরে বসে সূর্যাস্ত দেখা এসবই হৃদয়কে আন্দোলিত করে। হঠাৎ স্থির হলো কুশিয়ারা নদীর বালাগঞ্জ অংশে একদিন বেড়াতে যাবো। বালাগঞ্জ বাসস্ট্যান্ডের এপার-ওপার কুশিয়ারা নদীর পার বড়ই চিত্তাকর্ষক। এ পারে বালাগঞ্জ ওপারে মৌলভীবাজারের রাজনগর সিলেট ও মৌলভীবাজার দুই জেলার মাঝে দিয়ে কুশিয়ারা নদী বয়ে চলা এমনটি সব জায়গায় দেখা যায় না। আর কুশিয়ারা নদীতে খেয়া পার হয়ে দুই জেলার মানুষ ক্রয়-বিক্রয়ের জন্য সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত যাতায়াত করে। প্রায় সময় দেখা যায় শীতল পাটি নিয়ে মানুষের আনাগোনা। এসব দেখতে একদিন কুশিয়ারার পাড়ে বালাগঞ্জ অংশে যাওয়া। লেখক মোহাম্মদ আব্দুল হককে জানালাম নদী পাড়ে ঘুরে আসার কথা। প্রথমে বিভিন্ন কাজের কথা বলে উনি আমাকে প্রায় নিরাশ করলেন। বললাম ভাই নদী তীরে গেলে আপনার আমর লেখার অনেক খোরাক হবে। ভ্রমণ করা কিংবা কোন কোন জায়গায় গিয়ে কিছু অবলোকন করলে আমি লিখায় বসলে অনেক লিখতে পারি। মোহাম্মদ আব্দুল হক এবার সায় দিলেন। আমি মনে মনে ভাবী যদি সূর্যাস্ত পর্যন্ত থাকা যায় তবে গোধূলির আবিরে রাঙা অস্তায়মান লাল সূর্যটি দেখা যাবে। নদী তীরে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্তের মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্য অবলোকন করা যায়। পশু-পাখি, মানুষ সবারই তখন ঘরে ফিরার পালা। চরাচরে সর্বত্রই বিরাজ করে এক নৈসর্গিক নীরবতা। সূর্যের রক্তিম আলোর ছটায় প্রকৃতি যেন অন্যরকম রঙে নিজেকে সাজায়। নদী তীরের এমন দৃশ্য যে কাউকে উদ্বেলিত করে। নদীর টানে আমাদের যাত্রা শুরু হলো ৩রা মে ২০১৯ শুক্রবার। প্রকৃতি সে দিন অনুকূলে ছিল না তবুও অদম্য স্পৃহায় সামনে এগিয়ে চলে যেতেই হবে। ঘূর্ণিঝড় ফনীর কারণে সেদিন উপকূলীয় এলাকায় কোথাও ৭নং কোথাও ৬নং এবং কোথাও ৪নং বিপদ সংকেত চলছে। এমন বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে নদী দেখার শখ আমাদেরকে নিভৃত করতে পারেনি।
সিলেটের আকাশেও গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি ও হাওয়া বইছে। মাঝে মাঝে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি হয়েছে। কখনো বৃষ্টি থেমে একটু ফর্সা হয়ে উঠে আকাশ। এরই মধ্যে বালাগঞ্জের কুশিয়ারা তীরে পৌঁছা। বালাগঞ্জের নবীনগরে একটি মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করে কিছু দূর এগিয়ে পেয়ে গেলাম আমাদের কাক্সিক্ষত স্থান। আমি মোহাম্মদ আব্দুল হককে বললাম ঐ পার হচ্ছে মৌলভীবাজারের রাজনগর। হক ভাই নদী দৃশ্য দেখে অভিভূত হলেন। খেয়া নৌকায় মানুষ পারাপার কিছু কিছু নৌকা কোথায় যেনো যাচ্ছে। ফনীর প্রভাবে নদীর ¯্রােত যেন একটু বেশি মনে হলো। আমরা দু’জন সামনে হেঁটে যাচ্ছি। নদী পারের বাড়ি, গাছ পালা আমাদেরকে যেনো আরো কাছে টানছে। এবার কিছু খেতে হবে। আমি বলতে ছিলাম ঐ সামনের বাড়িতে বসবাস করেন বালাগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি সাহাব উদ্দিন আহমদ শাহিন। শাহিন ভাইর বাড়িটি একেবারে নদী পার ঘেঁষা, ওমনি পেছন থেকে উনি বলে উঠলেন এইতো আমি। আমি উনাকে জড়িয়ে ধরলাম। শাহিন ভাই আমাদেরকে তার ঘরে নিয়ে গেলেন। ঘরে উনি আমাদেরকে অনেকগুলি বই ও তার সম্পাদিত বালাগঞ্জ বার্তা উপহার দিলেন। তারপর আমাদেরকে নিয়ে সেলফি তুললেন। ইতিমধ্যে ছড়াকার ফয়ছল আহমদ জীবন ফোন করলেন আমার মোবাইলে। আমি বললাম আমরা বালাগঞ্জে শাহিন ভাই’র ঘরে। জীবন ব্যস্ত হয়ে আমাদের সাথে দেখা করতে শাহিন ভাই’র ঘরে চলে এলেন।
এবার চার জন মিলে নদী পারে ঘুরা, সেলফি তোলা বেশ মজা হলো। আমাদের আগমনে অনেকেই কৌতুহলি দৃষ্টিতে তাকাতে থাকলেন। বেলা অনেক হয়েছে এবার কিছু খেতে হবে শাহিন ভাই আমাদেরকে নিয়ে একটি রেস্টুরেন্টে গেলেন। এখানে খাওয়া দাওয়া হলো আমি বিল দিতে চাইলেও শাহিন ভ্ইা’র কারণে দিতে পারিনি। আরেক ছড়াকার ও লেখক লিটন দাস লিখন আমাদের খবর পেয়ে তার বাড়িতে আমন্ত্রণ করলেন। ছড়াকার ফয়ছল আহমদ জীবন আমাদেরকে নিয়ে লিখন দাদার বাড়ি রওয়ানা হলেন। সাথে শাহিন ভাইও আমাদের যাত্রা সঙ্গি। লিখন দাদার বাড়ি যেতে আমাদের চোখে পড়ল বালাগঞ্জ কলেজ ও কলেজ সংলগ্ন শহীদ মিনার আমাদের সকলেরই ইচ্ছা কলেজ হয়ে লিখন দাদার বাড়ি যাই। তা-ই হলো ঘূর্ণিঝড় ফনীর প্রভাবে কখনো কখনো বৃষ্টি হচ্ছে। আমরা কাক ভেজা হয়ে লেখক লিটন দাস লিখনের বাড়ি পৌঁছলাম। তিনি আমাদের সবাইকে অভ্যর্থনা জানালেন। তারপর আমাদের বালাগঞ্জ আগমনের কারণ জানতে চাইলেন। আমি ও মোহাম্মদ আব্দুল হক নদী পারে বেড়ানোর কথা জানালাম। আমাদের এই দুর্যোগের দিনে বেড়ানো সবাইকে কিছুটা ভাবিয়েছে। আসলে লেখক মনের ক্ষুধা কখন যে কোথায় জাগে তা বলা মুশকিল। লিখন দাদা খুব খুশি হলেন। আমরা দেখলাম তিনি চতুর দিকে ফোন করে আমাদের আগমন বার্তা দিচ্ছেন। বালাগঞ্জে যারা লিখেন তারা খুব আগ্রহ নিয়ে সিলেটের দুজনকে (ছড়াকার লেখক) দেখতে এলেন। একে একে অনেকে এসে গেলেন। সাংবাদিক ও লেখক সাহাব উদ্দিন আহমদ শাহিন আগেই আমাদের সাথে যোগ দিয়েছিলেন। লেখক ও ব্যাংকার জ্যোতির্ময় দাস যীশু, ছড়াকার হিমাংশু বর্ধন হিমু, ইমরান আহমদ, আঞ্চলিক নাটকের অভিনেতা মু. আ. মহিত, প্রবাসী ও ছাত্র নেতা সিরাজুল ইসলাম তছলু, ছাত্রনেতা তুহিন মনসুর, মাস্টার ও লেখক কালা চাঁদ, ইউনিয়ন সেক্রেটারি এসোসিয়েশনের সভাপতি (সিলেট) রঙ্গেশ কুমার দাস সহ আরো নাম না জানা অনেকে। কয়েক জন আমাদেরকে কিছু বলার জন্য বললে আমরা আমাদের অনুভূতি ব্যক্ত করলাম। নদী পারে ঘুরে অনেক অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করা যায় জানালাম। তারপর লিখন দাদা সবাইকে বিরিয়ানী খাওয়ালেন। তার এই আপ্যায়নে আমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলাম। কয়েক লেখক আমাদেরকে কিছু বই দিলেন। তারপর সবাই মিলে ফটো সেশনে অংশ নিলাম। বালাগঞ্জের স্মৃতি ভুলার নয়।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT