পাঁচ মিশালী

‘সংবিধিবদ্ধ নসিহত’ পাঠ পর্যালোচনা

মো. খালেদ মিয়া প্রকাশিত হয়েছে: ১৫-০৬-২০১৯ ইং ০০:৩৬:৫০ | সংবাদটি ২০৬ বার পঠিত

বাংলা সাহিত্যাঙ্গনে কবিতা ও কবির কমতি নেই। কবিতা কঠিন-এ সত্য সম্পূর্ণ জ্ঞাতসারেই যারা বিশ্বকবির মতো কঠিনকে ভালোবাসার দুঃসাহস পোষণ করেন মোহাম্মদ ইকবাল তাদের একজন। তিনি একজন মননশীল লেখক। তাঁর ভাবানুভূতি তীক্ষ্ম, শব্দবিন্যাস চমৎকার, ভাষা মার্জিত-সাবলীল; চিন্তা-চেতনা অতীব শাণিত। বেশ কয়েকটি কাব্যগ্রন্থের রূপকার, কাব্যরসিক মোহাম্মদ ইকবাল ‘সংবিধিবদ্ধ নসিহত’ কাব্যগ্রন্থটি অসংখ্য বৈশিষ্ট্যে একটি সার্থক সৃষ্টি। চার ফর্মার গ্রন্থে প্রতিভাসিত হয়েছে কবির বহুমাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির সুন্দর প্রতিচিত্র। মূল্যবান গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়েছে সিলেটের নন্দিত প্রকাশনী বাসিয়া থেকে। প্রকাশকাল বইমেলা ২০১৯ খ্রিঃ, প্রকাশক বাসিয়া প্রকাশনীর কর্ণধার মোহাম্মদ নওয়াব আলী। উৎসর্গে ভিন্নমাত্রা রূপায়িত হয়েছে সার্থকভাবে। যেটা লেখকের উন্নত ও উদার মনমানসিকতার পরিচায়ক। গ্রন্থটির মূল্য ২০০ টাকা নির্ধারণকে কিছুতেই মাত্রাতিরিক্ত বলা যায় না। বাংলা ভাষার কাব্যগ্রন্থটির প্রিন্টাস লাইনে কেবল ইংরেজি সন-তারিখ । পাশাপাশি বাংলা সন-তারিখ থাকলে অধিকতর সুন্দর ও সার্থক হতো। শব্দের কারিগর মোহাম্মদ ইকবাল প্রণীত ব্যতিক্রমী কাব্যগ্রন্থ ‘সংবিধিবদ্ধ নসিহত’ থেকে কয়েকটি উদ্ধৃতি প্রদান দরকার।
‘নতুন ডানায় ভর করি/ আবার উড়ি আরও একটি নতুন জীবন।’ নতুন ডানায় ভর, (পৃষ্ঠা-৫) কবির স্বপ্ন চেতনা ও অদম্য বাসনার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে উল্লিখিত সতঃস্ফূর্ত উচ্চারণে ।
বিজ্ঞান ও সভ্যতার যুগে কবিতায় ক্ষমতাবান মানুষ অনেক ক্ষেত্রে যখন স্বার্থান্ধ ও বেপরোয়া হয়ে ওঠে তখন কবি মন প্রতিবাদী হতে বাধ্য হয়। যেমন হয়েছেন আমাদের মোহাম্মদ ইকবাল; রক্তের হোলিতে অসুরগুলি উন্মত্ত হলে;/ তাদের হাড়েই শান দেব কলমের নিব।' আঁধার বন্দনা (পৃষ্ঠা-৭)
বিজ্ঞান যতই বেগবান হোক না কেন- আবেগধারী নয়। জীবনে আবেগ, অনুভূতি ও অনুভবের বিকল্প নেই। কবির কথায়; মানুষের অনুষজ্ঞ বায়োনিক বায়োমেট্রিক রোবট/ প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় মানুষ এখন যান্ত্রিক, যন্ত্রমানব।/ তারপরও কেউ কেউ মানুষ!/ পুরোপুরি রক্তমাংসের মানুষ। মানুষ, (পৃষ্ঠা-১০)
আত্মউপলব্দির পূর্বশর্ত হচ্ছে আত্মবিশ্বাস। আত্মবিকাশের জন্য আত্মবিশ্বাসের প্রয়োজন অপরিসীম। কবির ভাষায়, ‘কারণ আমি মনে প্রাণে বিশ্বাস করি আমি একজন কবি।’ আমার বিশ্বাস, (পৃষ্ঠা-১২)
কবিতায় ইতিহাস চেতনা অপরিহার্য। ইতিহাস থেকে কবিকে গ্রহণ করতে হবে শিক্ষা। মোহম্মদ ইকবাল একজন ইতিহাস সচেতন কবি যেটার প্রমাণ‘নদী পারের পরিত্যক্ত হিন্দু বসতবাটি, তাদের মন্দির এবং প্রিন্সিপাল স্যারের বাড়িটি/ রাজাকারদের ইন্ধনে পুড়িয়ে দিলো পাকি-হায়েনারা!' (যেভাবে দেখেছি বিজয়, পৃষ্ঠা -১৬)
দেহের মতো মনেরও চোখ থাকা চাই। যাদের মনের চোখ নেই তারা প্রকৃতার্থে অন্ধ । সত্যের অন্তর্গত সত্যকে পরিষ্কারভাবে অবলোকনের জন্য মনের চোখের প্রয়োজন। মোহাম্মদ ইকবাল বলেন, ‘অনেকই তার কিছুই দেখে না/ অবশ্য কেউ কেউ চিরকালই অন্ধ থাকে।’ (মাটির আয়না, পৃষ্ঠা-১৮)
কবির ধর্ম হচ্ছে 'সত্যচর্চা। বাস্তবতা এড়ানো কবির স্বভাব বিরুদ্ধ কাজ। সত্য ও সুন্দরের জয় মিছিলে সাফল্যের দাবিদার হতে হলে চিন্তা-চেতনায়, আদর্শে-উদ্দেশে, স্বভাবে বৈশিষ্ট্যে সত্যবোধের উপস্থিতি থাকা দরকার। সত্য ও সুন্দরকে এড়িয়ে জীবন সংগ্রামে টিকে থাকা কোনোভাবেই সম্ভবপর নয়। সত্যের সাধক, সুন্দরের পূজারী কবি মোহাম্মদ ইকবাল চিরায়ত সত্যের স্বপক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছেন- বিশ্বের মানচিত্রে একটি নতুন ভূখ-/ লাল সবুজের একটি পতাকা/ একজন সিংহপুরুষ/ একজন শেখ মুজিব/ একজন বঙ্গবন্ধু/ একজন জাতির জনক’ (একটি দর্পী বিজয়ের গল্প, পৃষ্ঠা- ২৪)
আশাবাদ মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। চাওয়া-পাওয়া জীবনের একটি স্বাভাবিক বিষয়। মন থাকলে বাসনা থাকে। ভালোবাসার কাঙাল মোহাম্মদ ইকবাল প্রিয়জনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন- কারও দৃষ্টির বৃষ্টিতে ভিজুক হৃদয়/ শ্রাবণ নিশিতে বৃষ্টির ফোটায় ফোঁটাবো নিশিপদ্ম কথা দিলাম (কথা দিলাম, পৃষ্ঠা- ২৬)
কবিরা সাহসী হয়। সত্য উচ্চারণের কারণে তাদের মুখোমুখী হতে হয় অসংখ্য বাধা বিপত্তি এবং গঞ্জনা ও লাঞ্ছনা। কবিকে হতে হয় প্রতিবাদী। আত্মিক দৃঢ়তার অনুরণন ঘটে মোহাম্মদ ইকবালের লেখায়, ‘অজ¯্র বুলেটে ঝাঁঝরা হবে বুক/ ধর্ষিত হবে, গুম হবে, খুন হবে/ তারপরও লিখে যেতে হবে কবিতা।' (সংবিধিবদ্ধ নসিহত, পৃষ্ঠা-২৯)
ভালোবাসা এক প্রকার নেশা। একজনকে পাওয়ার আশায় ছোঁয়ার অভিপ্রায়ের সুতীব্র ব্যাকুলতা প্রতিধ্বনিত হয় মোহাম্মদ ইকবাল এর কবিতায়- ‘তোমাকে ছুঁয়ে দিলে যদি হাবিয়ার আগুনে ভেসে যেতে হয়- ভেসে যাব/ তারপরও তোমাকেই ছোঁবো’। (অনুশাসনের পরাকাষ্ঠা পৃষ্ঠা- ৩২)
সমাজ, সংস্কৃতি, লোকাচার ইত্যাদি কবি দৃষ্টিকে এড়ানোর সুযোগ পায় না। সজাগ কবিমন সমাজ জীবনের যাবতীয় অসঙ্গতির প্রতিরোধকল্পে সাহসী ভূমিকা রাখতে দ্বিধাবোধ করে না। যেমন- হয় তুমি সংযুক্ত হও মূলোৎপাটনের উৎসবে/ নতুবা মুখ লুকিয়ে পড়ে থাকো শুয়োরদের কলুষিত পঙ্কিলে! (বিষাক্ত শিকড়, পৃষ্ঠা ৩৬)
মানুষ স্বপ্নবিলাসী। বাংলাভাষার অন্যতম খ্যাতিমান কবি ও ভাষাবিজ্ঞানী হুমায়ুন আজাদ বলেন, কবি হতে হলে স্বপ্ন দেখতে হবে। একজনকে খুঁজার মানসে মোহাম্মদ ইকবাল মেঘের ভেলায় ভাসার আকাঙ্খা পোষণ করেন “আজ শুধু তোমাকেই পড়বো/ তোমাকে খুঁজতে ভাসবো মেঘের ভেলায়/ কাশবনে যাব।' (আগমনি বার্তা, পৃষ্ঠা- ৪৩)
এরকম অসংখ্য সুন্দর ও সাহসী উচ্চারণের এক মলাটবন্দি প্রয়াস সংবিধিবদ্ধ নসিহত। আলোচ্য গ্রন্থের অনেক কবিতার অধিকাংশ উচ্চারণে জীবনবোধের মূল্যবান কথা ধ্বনিত হয়েছে সে সত্যকে অস্বীকার করা যায় না। ‘কবিতা থামলেই থেমে যাবে বাংলাদেশ’ লেখকের সাথে সমবেত কণ্ঠে আমরা বলতে পারি, শুধু বাংলাদেশ নয়- ‘কবিতা থামলে এমনকি থেমে যাবে বিশ্ব।’ মোহাম্মদ ইকবাল ইতোমধ্যে তার বিভিন্ন লেখায় অনেক কিছু প্রকাশের সার্থক প্রয়াস পেয়েছেন। তার নিকট থেকে আমরা আরও সুন্দর, চমৎকার কবিতা কামনা করি।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT