উপ সম্পাদকীয় স্মরণ

একজন অধ্যক্ষের কিছু অবিস্মরণীয় প্রসঙ্গ

সাদিকুর রাহমান প্রকাশিত হয়েছে: ১৫-০৬-২০১৯ ইং ০০:৩৭:৪৮ | সংবাদটি ১৮২ বার পঠিত

অধ্যক্ষ মুফতি আবুল হাসান মুহাম্মদ নুরুল হক (১ সেপ্টেম্বর ১৯৬০-১৬ জুন ২০১৫) একজন উদার প্্রকৃতির মানুষ ছিলেন। একেবারে ব্যক্তিগত বিষয়াদি থেকে শুরু করে পরিবার, সমাজ, রাজনীতি, ধর্ম ও প্রতিষ্ঠানসহ সকল ক্ষেত্রে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল উদার। বিশেষত ধর্মীয় ক্ষেত্রে। ধর্মীয় মতানৈক্যপূর্ণ ব্যাপারে তাঁর উদার দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়টি অবিস্মরণীয়। উদাহরণীয় ও অনুসরণীয়। এসব ব্যাপারে তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক বিচরণ ও সুসংহত পদবিক্ষেপ অনুকরণীয়। জীবনভর মতানৈক্যের ভেতরে ঐক্যের অন্বেষণে ছিলেন নিয়ত ভাবিত। তাঁর বিনম্্র পদচারণায় ছিল একতার আচরণিক পয়গাম। ঐক্যের প্রচেষ্টা ও উদারতার সুন্দর বিনির্মাণে তাঁর ভেতরে প্রবল আবেগ ছিল। সে আবেগের উৎসও কুরআন-সুন্নাহ। কুরআন ও হাদিসে বিবৃত ঐক্যের গভীর মর্মবাণীকে উপজীব্য করে একতার পথে হেঁটেছেন। নীরবে। সংগোপনে। ঐক্য ও উদারতার আবাহনে ব্যক্তিগত আবেগের প্রশ্্রয় ছিল না। তাঁর উদারতার মান্দন্ড ছিল কুরআন-সুন্নাহর সমন্বিত প্রয়াস ইসলামি শরিয়াহ। শরিয়তে যে বিষয়ে যতটুকু ছাড় দেওয়ার সুযোগ আছে, ততটুকু দিতেন। বেশকম করতেন না।
নুরুল হক মাওলানা আব্দুল লতীফ ফুলতলী-এর সঙ্গে আধ্যাত্মিক সম্পর্কিত ছিলেন। আবার ফিকহি সম্পর্ক রাখতেন কওমি ঘরনার বিদগ্ধ আলেম আল্লামা মুফতি আবুল কালাম যাকারিয়া-এর সঙ্গে। ফিকহি সমাধানের জন্যে বরাবরই তাঁর কাছে ছুটে আসতেন। এটি তাঁর উদারতার অনন্য দৃষ্টান্ত। নুরুল হক-এর কাছে প্রচলিত মাসলাক ও মানহাজ মানে ফেরকাবাজি নয়; দ্বিন কায়েমের ভিন্ন ভিন্ন আন্দোলন। এসব তাঁর কাছে সাগরের জলের মতো। ভিন্ন ভিন্ন অববাহিকায় ছুটেচলা তাওহিদের বিস্তৃত জলরাশি। একই কালেমার বহুজলধারা। যার আদি-অন্ত এক। উৎস ও গন্তব্য অভিন্ন। এটা ছিল তাঁর সারাজীবনের অনুভব। যে কারণে সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখাকে দ্বিনি দায়িত্ব মনে করতেন। ব্যবহারিক জীবনেও এ চিন্তার প্রতিফলন ছিল। ভিন্ন মত ও ভিন্ন পথের মানুষের সঙ্গে নুরুল হক-এর আত্মীয়তার, পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্ক তাঁর উদারতার আরেক দৃষ্টান্ত।
নুরুল হক-এর জীবন ও ধর্মীয় যাপন ছিল মতো ভারসাম্যপূর্ণ। এসবের ক্ষেত্রে তাঁর মধ্যে বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ি ছিল না। ধর্ম ও জীবনের প্রতি ছিলেন সমানভাবে সচেতন। জীবনকে বাদ দিয়ে শুধু ধর্মীয় যাপন বা জীবনের প্রতি উদাসীনতাকে বৈরাগ্য মনে করতেন। আজীবন দ্বিনকে দ্বিনের মতো ও জীবনকে জীবনের মতো গুরুত্ব প্রদান করে গেছেন। তাঁর জীবনকালে জীবনের জন্যে ধর্ম ও ধর্মের জন্যে জীবন কোনওটি কখনও ব্যহত হয়নি।
মাওলানা নুরুল হক কর্মজীবন শুরু করেন ১৯৭৯ সনে। শুরু ও শেষ সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার বুরাইয়া মাদরাসায়। শুরু করেন জুনিয়র মৌলবি হিসেবে। আর শেষ হয় অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে। অধ্যক্ষ মুফতি আবুল হাসান মুহাম্মদ নুরুল হক শিক্ষকতাকে জীবনের পেশা ও নেশা হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। শিক্ষকতায় পেশাদারিত্ব তাকে অনেক দূর এগিয়ে নেয়। বার বার শ্্েরষ্ঠত্বের শিরোপা অর্জন করেন। শিক্ষকতায় শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ অর্জন করেন শ্রেষ্ঠ শিক্ষক সম্মাননা-২০০২। এ সম্মাননার অনুপ্রেরণা তাকে এগিয়ে নেয় আরও অনেক দূর। বুরাইয়া মাদরাসায় ধারাবাহিক পদোন্নতি হতে থাকে। ক্রমান্বয়ে আরবি প্রভাষক ও মুহাদ্দিসসহ মাদরাসার বহু গুরুত্বপূর্ণ পদ অলঙ্কৃত করেন। সর্বশেষ ২০০৫ সনে বুরাইয়া মাদরাসায় অধ্যক্ষের দায়িত্বে নিয়োজিত হন।
কর্মজীবনে বহুমুখী প্রতিভা ও দক্ষতার আলোয় একজন মাত্র নুরুল হক বহুজনে রূপ নিয়ে ছিলেন। শিক্ষকতা, প্রশাসনিক দক্ষতা, মার্জিত আচরণ ও সংযত আলাপে সকলের কাছে ছিলেন সমান জনপ্রিয়। তাঁর যোগ্যতা ও প্রশাসনিক দক্ষতার ফলে মাদরাসার শিক্ষা, সংস্কৃতি, নৈতিকতা ও অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ সার্বিক উন্নয়ন সাধন হয়। নুরুল হক অধ্যক্ষের দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র তিন বছরের মধ্যে বুরাইয়া মাদরাসা স্মরণকালের সবচেয়ে বড় অ্যাকাডেমিক সফলতা অর্জন করে। তাঁর আন্তরিক প্রচেষ্টায় ২০০৮ সনে বুরাইয়া মাদরাসার ফাযিল ও কামিল স্তর কুষ্টিয়া ইসলামি বিশ^বিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হয়। কুষ্টিয়া ইসলামি বিশ^বিদ্যালয়ের অধিভুক্ত সুনামগঞ্জ জেলার একমাত্র কামিল মাদরাসা হিসেবে বুরাইয়া কামিল মাদরাসার সুনাম ও খ্যাতি সবখানে ছড়িয়ে পড়ে।
নুরুল আজীবন (২০০৫-২০১৫) বুরাই কামিল মাদরাসার অধ্যক্ষ ছিলেন। দীর্ঘ দশ বছরের প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে সহকর্মীদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল একইসঙ্গে নীতিবান প্রশাসক ও বন্ধুভাবাপন্ন। ছাত্রদের কাছে ছিলেন অভিভাবকের মতো। ছাত্র-শিক্ষকের সুখে-দুঃখে সবার আগে তিনিই ছুটে আসতেন। সহকর্মীদের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল মোহনীয়। প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্কের বাইরে ছাত্র-শিক্ষকদের ব্যক্তিগত খোঁজখবরও রাখতেন। বিজ্ঞানসম্মত পাঠদানের জন্যে শিক্ষকদেরকে সবসময় উৎসাহিত করতেন। পূর্বপ্রস্তুতি ও পাঠপরিকল্পনা ছাড়া পাঠদানের ব্যাপারে কঠোর ছিলেন। পূর্বপ্রস্তুতি বা পূর্ব-অধ্যয়ন ছাড়া কেতাব পড়ানোকে তিনি নাজায়েজ মনে করতেন। নিজেও এ দৃষ্টিভঙ্গির ওপর সারাজীবন আমল করেছেন। মাদরাসাকে তিনি এত আপন করে নিয়ে ছিলেন যে, প্রাতিষ্ঠানিক সময়ের বাইরেও মাদরাসার জন্যে সময় প্রদান ছিল নিয়মিত। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মাদরাসায় থাকা ছিল তাঁর রুটিন ওয়ার্ক।
আমানতদারিতা ছিল তাঁর অনন্য বৈশিষ্ট্য। আমানতদারিতার কারণে বুরাইয়া মাদরাসার সাবেক প্রিন্সিপাল মুফতি আব্দুল খালিক কোষাধ্যক্ষের দায়িত্ব প্রদান করেন তাকে। কোষাধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন দীর্ঘদিন। অধ্যক্ষ হওয়ার আগপর্যন্ত। নুরুল হক আমানতদারিতার কারণে মুফতি আব্দুল খালিক-এর এত বিশ^স্ত ছিলেন যে, হিসাব-কিতাবের যাবতীয় দায়ভার তাঁর ওপর ছেড়ে দিতেন। এমনকি ব্লাঙ্ক চেক প্রদানেও কুণ্ঠাবোধ করতেন না। তাঁর অধ্যক্ষজীবনে মাদরাসার একটি পয়সাও অযথা ব্যয় করেননি। মাদরাসার সম্পদকে ব্যয় করতেন যথাযথ আমানতদারির সঙ্গে। তাঁর আমানতদারিতা ও মিতব্যয়িতা প্রসঙ্গে তাঁর এক সহকর্মী বলেছিলেন, একটি প্রাতিষ্ঠানিক সফরে একবার হোটেলে নিয়মের চেয়ে সামান্য অতিরিক্ত ব্যয় হয়ে যায়। এ নিয়ে নুরুল হক পেরেশান হয়ে পড়েন। পরবর্তীতে এ অতিরিক্ত খরচ পুষিয়ে নিয়ে পরে স্বস্তিবোধ করেন।
সকল পরিস্থিতিকে ধৈর্যের সঙ্গে মোকাবেলা করতে পারতেন নুরুল হক। জটিল পরিস্থিতিতেও অস্থির হতেন না। ‘তোমরা ধৈর্যধারণ ও সালাত আদায়ের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর’Ñ কুরআনের এ আয়াতের ওপর তাঁর পরিপূর্ণ আমল ছিল। সুযোগ পেলেই ছাত্রদেরকে কুরআনের এ আয়াত স্মরণ করিয়ে দিয়ে ধৈর্যধারণের উপদেশ দিতেন। প্রায়ই বলতেন, ধৈর্য মানুষের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। বিশেষত ‘দায়িত্ব পালনে ধৈর্যই প্রধান হাতিয়ার’।
মুফতি আবুল হাসান মুহাম্মদ নুরুল হক ভালো শিক্ষক ও প্রশাসকের পাশাপাশি ভালো সংগঠকও ছিলেন। সরাসরি কোনও রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে সক্রিয় না থাকলেও পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। বাংলাদেশ আনজুমানে আল ইসলাহকে বিশেষভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। সামাজিক সংগঠনসমূহের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। বহু সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও পালন করেছেন। আজীবন বাংলাদেশ জমিয়াতুল মোদাররেছিন সুনামগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতি ছিলেন। এর বাইরে আঞ্জুমানে মাদারিছে আরাবিয়া, মুফতি আব্দুল খালিক রাহ. ট্্রাস্ট, বুরাইয়া একাডেমিসহ আরও অনেক প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের দায়িত্ব পালন করেন।
লেখক : শিক্ষক, প্রাবন্ধিক।

 

 

 

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বৃক্ষরোপণ
  • জলবায়ু পরিবর্তনই আসল সমস্যা
  • কিশোর অপরাধ
  • আ.ন.ম শফিকুল হক
  • হোটেল শ্রমিকদের জীবন
  • বিশেষ মর্যাদা বাতিল ও কাশ্মীরের ভবিষ্যত
  • বাংলাদেশে অটিস্টিক স্কুল ও ডে কেয়ার সেন্টার
  • বেদে সম্প্রদায়
  • গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে সুপারিশমালা
  • ত্যাগই ফুল ফুটায় মনের বৃন্দাবনে
  • প্রকৃতির সঙ্গে বিরূপ আচরণ
  • ঈদের ছুটিতেও যারা ছিলেন ব্যস্ত
  • সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের বর্ষপূর্তি : প্রাপ্তি ও প্রত্যাশা
  • আইনজীবী মনির উদ্দিন আহমদ
  • শিশুদের জীবন গঠনে সময়ানুবর্তিতা
  • শাহী ঈদগাহর ছায়াবীথিতলে
  • কিশোর-কিশোরীদের হালচাল
  • বলকানস : ইউরোপের যুদ্ধক্ষেত্র
  • সন্তানের প্রতি অভিভাবকের দায়িত্ব
  • শিক্ষার হার এবং কর্মসংস্থান প্রসঙ্গ
  • Developed by: Sparkle IT