উপ সম্পাদকীয়

এবার কুম্ভকর্ণের নিদ্রা ভংগ হোক

ইনাম চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ১৬-০৬-২০১৯ ইং ০০:১৯:৫৮ | সংবাদটি ৭৯ বার পঠিত

ভাবনা চিন্তার যেন শেষ নাই। সমস্যারও শেষ নাই। বাংলাদেশের লোকসমষ্ঠি নিরন্তর সংকটের মোকাবিলা করে চলেছে। নদীভাংগন থেকে শুরু করে কর্মসংস্থান সবকিছুই মানুষের দুর্ভাবনার খোরাক হয়ে রয়েছে। মানুষকে স্বস্তির একটু অবকাশ দেয়ার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। বিরাট আকার এর প্রকল্প সমূহ গ্রহণ করা হচ্ছে। সেগুলিকে ত্বরিত গতিতে সমাপ্ত করারও তাগিদ দেয়া হচ্ছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আহবানে সাড়া দিচ্ছে আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থা সমূহ। সম্প্রতি তিনটি বিরাটাকায় সেতুর নির্মাণ কাজ সমাপন করেছে বিদেশী দুটো নির্মাণ প্রতিষ্ঠান। তারা নির্ধারিত সময়ের আগেই কর্ম সম্পাদন করেছে আবার উদ্বৃত্ত অর্থও ফেরত দিয়েছে। এ জাতীয় অর্থ ফেরতদানের নজীর আমাদের দেশের ইতিহাসে বোধহয় একটি ব্যতিক্রমধর্মী ঘটনা। অব্যাহত নজরদারী আর বর্তমান সরকার এর আন্তরিকতা নিশ্চয় বিদেশী নির্মাণ প্রতিষ্ঠান সমূহের জন্যও হয়েছে একটি অনুপ্রেরণাদায়ক উপসর্গ। আমাদের দেশে কর্ম সমাপনের সময়কাল বৃদ্ধির প্রবণতা আবার নতুন করে অর্থের পরিমাণ বৃদ্ধির তৎপরতা একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসাবে বিবেচিত হয়ে আসছে এযাবৎকাল ধরে। শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে বিদেশী নির্মাণ কোম্পানীগুলি আমাদের নীতি নির্ধারকদের দেখিয়ে দিয়েছে আন্তরিকতা, কর্মনিষ্ঠা আর সততা কিভাবে সবকিছুকে সহজতর করে দেয়।
বর্তমানে আমাদের দেশে দুর্নীতি যেন ক্রমপ্রসারমান ব্যাধি হিসাবে দেখা দিয়েছে। যে যেখানে পারছে ঝোপ বুঝে কোপ মারছে। বিবেক, আত্মমর্যাদা বোধ কোন কিছুই তো কাজে আসছে না। বাঘের উপর টাগের দেখা পাওয়ার মতো ঘটনা দেখা যাচ্ছে আমাদের দেশে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে দুদক নামক সরকারি প্রতিষ্ঠানটি হরদম অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। এটির প্রধান ব্যক্তিটি বলেছেন কেউই এখন থেকে আর দুর্নীতিলব্ধ অর্থ ঘরে নিয়ে যেতে পারবেনা। অন্যদিকে এটি অবশ্য উল্লেখ করেন নাই এই অর্থটি হস্তান্তর করতে পারবেন না। সংবাদ বেরিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশের একজন ডি.আই.জি বিপুল অংকের অর্থ হস্তান্তর করেছেন দুদক নামক সংস্থাটির একজন পরিচালককে। টাকা গ্রহণকারী ব্যক্তিটিকে অবশ্য বরখাস্ত করা হয়েছে কিন্তু চাকুরীর রাজা পুলিশের ডি.আই.জি সাহেব নাকি এখনও আছেন বহাল তবিয়তে। নারায়নগঞ্জের এম.পি সাহেবের নাকি কয়েক হাজার কোটি টাকা বিদেশী ব্যাংকে জমা পড়েছে বলে গরম খবর বেরিয়েছে সংবাদপত্র সমূহে। সাহেব পারলে আমরা পারবোনা কেন ভাবনাটি কাজ করতে শুরু করেছে নি¤œস্তরে চাকুরীরত পুলিশ কর্মকর্তাদের মাঝে। ইদানীং বেশ কয়েকজন ও.সি সাহেবদের পাচারকৃত অর্থসম্পদের খবরাদি প্রকাশিত হয়েছে নানা সংবাদ মাধ্যমে। অবশ্য এজাতীয় সংবাদ বিশেষ গুরুত্ব বহন করেনা কারণ সাধারণ মানুষকে শোষণ আর লুণ্ঠন এর যাতাকলে ফেলে রেখেছে প্রশাসনিক কাঠামোগত ব্যবস্থা। ঔপনিবেশিক আমলের আইনকানুন আর নানা সংকটকালে সামষ্ঠিক সুবিধাদি হস্তগত করার সুবিধাটি হাতে রাখতে এদেরকে ছাড় দিতেই হয় বলে অনেক দায়িত্বশীলরাই মনে করেন। হচ্ছেটাও তাইই। কিন্তু সবকিছুর জোগানদাতা হতে হয় যে, সাধারণ মানুষকে সে ব্যাপারটি আবার নজরে আনতে অনেকেই নারাজ। সাধারণ মানুষের কর এর টাকায় জাতীয় অর্থনীতিকে সচল রাখতে হয়। জাতীয় প্রবৃদ্ধি বাড়াতে উৎপাদন প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে হয় অনুরূপভাবে সম্পদের বিভাজন ও সুষম বন্টনের নিশ্চিত ব্যবস্থা করতে হয়। বর্তমান অবস্থায় দেখা যায় পুরো জাতীয় উৎপাদনের সুফলটি গিয়ে শতকরা পচান্নব্বই ভাগ লোকের ঘরে উঠছেনা বরং সেটি পূর্বপরিকল্পিত ব্যবস্থামতো শতকরা পাঁচ ভাগ লোকের ঘরেই উঠছে এবং সেটি হচ্ছে বিপুল অংকে ও ব্যাপকতায়। কিছুই জানিনা বা কিছুই বুঝিনা ভাবটা বজায় রাখতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান সমূহ হয় চোখ বুঁজে আছেন আর নতুবা আপন ভাগটি বুঝে নিচ্ছেন কড়ায়গন্ডায়।
এই পুরো প্রক্রিয়াটিকেই দুর্নীতি নামে আখ্যায়িত করতে হয়। কে কতোটুকু কার কাছ থেকে হাতিয়ে নিলো সেটি খুঁজতে গেলে শত শত বছর গুজরে যাবে ফল থাকবে শূন্য। কারণ একেবারে নীচু স্তরের কর্মচারীটিকেও তার অবৈধ আয়ের ভাগটি পৌঁছাতে হয় একেবারে শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিবর্গের কাছে। আমাদের জনপ্রিয় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছেন এতো বিরাট অংকের অর্থ ব্যয় করে সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর পরও কেন এই লোকগুলি দুর্নীতি করছে। মনে রাখতে হবে এটি এখন জাতীয় ব্যাধি নয় বরং জাতীয় অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। অনেক অখাদ্য যেমন অপোগন্ড শিশুরা মুখে পুরে চিবোতে থাকে এবং জিজ্ঞাসিত হলে অবলীলায় বলে বসে এটি আমরা এমনি এমনি খাই। আমাদের দেশের দুর্নীতিগ্রস্থদের অবস্থাও ঠিক তাই। ইদানীং অনেক বড় বড় দুর্নীতিবাজদের ছবি সংবাদমাধ্যমসমূহে প্রকাশিত হয়েছে এরা কিন্তু পদে একেবারে নি¤œস্তরের কিন্তু সম্পদে অনেক উচুস্তরের। বিস্ময় জাগানীয়া ব্যাপারটি হলো ওদের বেশির ভাগই চেহারাসুরত সুফী সাধকদের মতো চুল, দাঁড়ি, টুপি কোর্তা সমেত। বেশ নুরানী ভাবধারার। অর্থাৎ তারা আগেভাগেই হারাম হালাল এর পার্থক্যটি গুছিয়ে নিয়েছেন। হতে পারে- ‘যো আপসে আতা হ্যায়, উয়ো হালাল হ্যায়’ নীতিটিকে অনুসরণ করতে বেশি উৎসাহী আবার পারংগমও।
জাতীয় পর্যায়ে দুর্নীতি রুখতে সমাজের সর্বস্তরের লোকদের সম্পৃক্ত করতে হবে এ জাতীয় মহৎ কর্মযজ্ঞে। নির্বাচন আসলেই তৃণমূল পর্যায়ে খেয়াল দিতে আমরা পাগলপারা হয়ে যাই আবার জাতীয় পর্যায়ের ঘুনপোকাদের ধরতে তৃণমূল কেন মধ্যস্তর পর্যন্ত কোন পর্যায়েই আমরা দৃষ্টি দিতে রাজী হইনা। কারণ সব কিছুর বা সব উদ্দেশ্যের লক্ষ্যবস্তুই তো এই তৃণমূল এর অপদস্থ হওয়া সাধারণ মানুষ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অহরহ সংবাদ বেরোচ্ছে অমুক অমুক কর্মকর্তা ঘুষের টাকাটি আগেভাগে হাতে ধরিয়ে না দিতে পারলে নথিটিই ছুড়ে ফেলে দেন। এ জাতীয় কর্মকান্ড যে সরকারি চাকুরিজীবীদের চাকুরিবিধি লংঘনের একটি বিরাট উদাহরণ সেটি পর্যন্ত দেখার কেউ নাই, আর দুর্নীতি সেটার ভাগতো পৌঁছবে যথাসময়ে যথাস্তরে। আজকাল নানা জায়গায় হঠাৎ করেই গজিয়ে উঠা আকাশছোয়া দালান দেখলেই অনেকে জিজ্ঞাসু নেত্রে তাকিয়ে অবস্থাটা ঠাহর করতে চান। তখন পাশ থেকে কেউ একজন উনার উৎসুক্য নিরসন করেন বাড়ীর মালিকটি কোন বিভাগে, কোন জায়গায় সরকারি চাকুরীটি করেন বিস্তারিত জানিয়ে। আজকাল যেন এটি এলাকাবাসীর জন্য বেশ গর্বের একটি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই তারা ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন সরকার আর উনাকে কতোটাকা বেতন দিতে পারবে, তাই তাকে নির্ভর করতে হয় উপরি আয়ের উপর। সেটি আবার বাধাহীন আর নির্বিঘœ, কারণ কর্মসম্পাদনে উপরি অর্থ প্রদান পদ্ধতিটি হলো সহজতর সমাধান। তাইতো বলা হয় স্পীড মানি, যা উপর থেকে আখ্যায়িত হয়েছে এবং পরোক্ষভাবে যেন অনুমোদিত হয়েই গিয়েছে।
আজকাল যেন সবকিছুকেই জগাখিচুড়ী বানাতে সকলে উঠে পড়ে লাগেন। কয়েকদিন মাত্র আগে ঈদুল ফিতর-এর চাঁদ দেখা নিয়ে বেশ নাটকীয় এবং উত্তেজনা সৃষ্টিকারী পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটে। আকাশ মেঘলা থাকতে পারে এটি যুগ যুগ ধরে হয়েই আসছে। আশেপাশের দেশের ভৌগলিক অবস্থান এবং চাঁদ দেখার বিষয়, ঈদ উদযাপন আবার সময়ের ব্যবধান হিসাব করেই আলেম উলামারা ঠিকঠিকই সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন। আজকাল কেন জানি তারাও দ্বিধান্বিত হয়ে পড়েন। আকলে আমার কূলায় না!
এই সেদিন আমার এক প্রবাসী বন্ধু আমাকে ফোন করলেন। তিনি বিদেশী একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নামিদামি অধ্যাপক। তিনি জানতে চাইলেন আমরা কেন আবু সিনা ছাত্রাবাসটি নিয়ে এতো চিল্লাচিল্লি করছি। তিনি বললেন কেন এই জায়গাটিতে একটি হাসপাতাল হতে আমরা দিচ্ছি না। তার মতে হাসপাতালের জায়গায় হাসপাতাল হবে সেটিই তো নিয়ম। সেটিই তো ঐতিহ্য। এটিকে আবু সিনা স্মৃতি হাসপাতাল নামে প্রতিষ্ঠিত করতে দোষ কোথায়। আধুনিক বহুমাত্রিক ভিডিও চিত্রের মাধ্যমে পুরো ছাত্রাবাসটিকে ধারন করে ছোট আকারের প্রদর্শনী কক্ষ সংযোজিত করে সেখানে অতীত দর্শনের যাবতীয় ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে। পুরো ইতিহাস বর্ণনা করে চলচ্চিত্রটি নির্মিত হলে অবশ্যই উৎসুক দর্শকরা টিকিট কেটেই সেটি দেখবেন অন্যদিকে হাসপাতালে চিকিৎসা সুবিধা বঞ্চিত সাধারণ মানুষ তাদের কাংখিত চিকিৎসা সুবিধাটি লাভ করবেন। তার মতে নগরীর যে কোন প্রবেশমুখে সেটি যদি স্থায়ী হয় তাহলে অন্যপ্রান্তের চিকিৎসা প্রত্যাশীদের নগরীর ভিড় ঠেলে, জাকান্দানী ভোগ করে উল্লেখিত স্থানটিতে পৌঁছতে হবে। সেই লোকসকল অবশ্যই একাধিক জেলা থেকে আগত এমনও তো হতে পারে। আমি তাকে সুষ্ঠু সিদ্ধান্ত গৃহিত হচ্ছে বলেই আশ্বস্ত করেছি।
পরিশেষে আমি সিসিক কর্তৃপক্ষকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই লামাবাজার নয়াপাড়া এলাকা, তাতীপাড়া এলাকা সহ নগরীর নানা জায়গায় অপদখলীয় জায়গাসমূহ উদ্ধারের কোন ব্যবস্থা বা পদক্ষেপ নেয়া হয় নাই অদ্যাবধি। খাল-নালা সব দখল করে দালান, দোকানকোঠা বানিয়ে তারা রাজার হালতে আছে আর ভোগান্তিতে পড়েছে মহল্লাবাসীরা। রহস্যটা কি। দো দিন কাট গ্যায়ে আরজু মে।
লেখক : অধ্যক্ষ, কলামিস্ট।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বৃক্ষরোপণ
  • জলবায়ু পরিবর্তনই আসল সমস্যা
  • কিশোর অপরাধ
  • আ.ন.ম শফিকুল হক
  • হোটেল শ্রমিকদের জীবন
  • বিশেষ মর্যাদা বাতিল ও কাশ্মীরের ভবিষ্যত
  • বাংলাদেশে অটিস্টিক স্কুল ও ডে কেয়ার সেন্টার
  • বেদে সম্প্রদায়
  • গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে সুপারিশমালা
  • ত্যাগই ফুল ফুটায় মনের বৃন্দাবনে
  • প্রকৃতির সঙ্গে বিরূপ আচরণ
  • ঈদের ছুটিতেও যারা ছিলেন ব্যস্ত
  • সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের বর্ষপূর্তি : প্রাপ্তি ও প্রত্যাশা
  • আইনজীবী মনির উদ্দিন আহমদ
  • শিশুদের জীবন গঠনে সময়ানুবর্তিতা
  • শাহী ঈদগাহর ছায়াবীথিতলে
  • কিশোর-কিশোরীদের হালচাল
  • বলকানস : ইউরোপের যুদ্ধক্ষেত্র
  • সন্তানের প্রতি অভিভাবকের দায়িত্ব
  • শিক্ষার হার এবং কর্মসংস্থান প্রসঙ্গ
  • Developed by: Sparkle IT