সাহিত্য

একজন গবেষকের জীবন ও সৃষ্টির আলেখ্য

আশরাফ হাসান প্রকাশিত হয়েছে: ১৬-০৬-২০১৯ ইং ০০:২১:০৫ | সংবাদটি ২৯৬ বার পঠিত

কীর্তিমানদের মৃত্যুর পর মূল্যায়ন করাই যেনো অলঙ্ঘনীয় প্রথা (Tradition)। হালে এর ব্যতিক্রম ঘটছে না এমন নয়। বিশেষ ক্ষেত্রে আমাদের সমাজে প্রাজ্ঞ-গুণীজনের মূল্যায়নকর্ম লক্ষ করা যাচ্ছে তাঁদের জীবদ্দশায়ই। এটি সন্দেহাতীতভাবে আমাদের বোধসত্তার উত্তরণ-উজ্জীবন। এরই ধারাবাহিকতায় সাহিত্য-সংস্কৃতির সুপ্রাচীন ঐতিহ্যভূমি সিলেটে গুণী ব্যক্তিজন তথা কবি-লেখক-সাহিত্যিকদের বিশেষ মূল্যায়নধর্মী কর্মকা- এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সংবর্ধনা, পুরস্কার-সম্মাননা প্রদান ও মূল্যায়নধর্মী গ্রন্থ প্রকাশনা ইত্যাকার আয়োজনের মধ্য দিয়ে তাঁদের সৃষ্টিকর্মকে সুধী সমাজের কাছে নিবিড়ভাবে উপস্থাপন করা হয়। বিশিষ্ট ঐতিহ্য-অনুসন্ধিৎসু গবেষক হারূন আকবর এমনি এক আলোকিত ব্যক্তি। সমসাময়িক কালে সতাশ্রিত আদর্শিক চেতনা সঞ্জাত মৌলিক প্রাবন্ধিক হিসেবে সমধিক পরিচিত। সমাজ, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ঐতিহ্যচেতনা বিশেষ করে লোকসাহিত্য গবেষণায় ইতোমধ্যে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন। অপরিমেয় নিষ্ঠা, অক্লান্ত পরিশ্রমী এ লেখক সম্প্রতি তাঁর মূল্যবান গবেষণা-কৃতির জন্য রাগীব রাবেয়া সাহিত্য পুরস্কার ২০১২ লাভ করেছেন।
০২.
হারূন আকবরকে নিয়ে মূল্যায়নধর্মী গ্রন্থ ‘সময়ের আলোয় হারূন আকবর’ সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে। গ্রন্থটির প্রকাশনায় রয়েছে পা-ুলিপি প্রকাশন সিলেট, প্রকাশকাল : ডিসেম্বর ২০১৩। মূল রচনা লিখেছেন সংগঠক ও লেখক বায়েজীদ মাহমুদ ফয়সল। এছাড়া পরিশিষ্ট পর্বে আলোচনা ও মূল্যায়ন লিখেছেন বিশিষ্ট সাহিত্য সমালোচক শামসুল করিম কয়েস, বিশিষ্ট গবেষক প্রফেসর নন্দলাল শর্মা, কবি ও সাহিত্য সমালোচক আশরাফ হাসান। গ্রন্থের শেষাংশে বিভিন্ন অনুষ্ঠান সংশ্লিষ্ট ও পারিবারিক অ্যালবাম সন্নিবেশিত হয়েছে। শৈল্পিক প্রচ্ছদ এঁকেছেন এম.এ. মুমিন। পরিচ্ছন্ন ও শক্ত বাঁধাই সমৃদ্ধ গ্রন্থটির মূল্য রাখা হয়েছে ১০০ টাকা।
০৩.
গ্রন্থের প্রারম্ভে প্রসঙ্গ-কথা লিখেছেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ লে. কর্ণেল এম. আতাউর রহমান পীর। এতে গবেষক হারূন আকবরকে নিয়ে অনুভূতি ব্যক্ত করা হয়েছে। গ্রন্থটি প্রকাশের পটভূমি, লেখকদের প্রতি সামাজিক দায়বদ্ধতা, গ্রন্থে সন্নিবেশিত বিষয়বস্তু নিয়ে তিনি আলোকপাত করেছেন। প্রসঙ্গ-কথার স্মরণযোগ্য অংশ বিশেষÑ‘সময়ের আলোয় হারূন আকবর’ গ্রন্থটি পাঠকদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করবে, কারণ এতে সৃষ্টিকর্মের মূল্যায়নে আন্তরিক অন্তর্প্রেরণা কাজ করেছে। আর উদ্দেশ্য হচ্ছে লেখক-গুণী সৃষ্টিতে সমাজকে অনুপ্রাণিত করা।’
তরুণ লেখক ও সংগঠক বায়েজীদ মাহমুদ ফয়সল ‘সময়ের আলোয় হারূন আকবর’ শীর্ষক দীর্ঘ প্রবন্ধে লোকসাহিত্যের স্বনামধন্য গবেষক হারূন আকবরকে নিয়ে নানামাত্রিক আলোচনা ও বিশ্লেষণের প্রয়াস পেয়েছেন। তাঁর অভিজাত বংশ-পরিচয়, বংশের শাজারাহ, পারিবারিক ঐতিহ্য, আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক আবহ, শিক্ষাজীবন, সাহিত্যকর্ম, সামাজিক সম্পৃক্ততা, তাঁর সম্পর্কে মনীষীদের উক্তি ও জীবনচিত্রকে তথ্যনির্ভর হৃদয়গ্রাহী ভাষায় পাঠকদের সামনে উপস্থাপন করেছেন লেখক বায়েজীদ মাহমুদ ফয়সল। প্রবন্ধটির বিষয়-বিন্যাস, সাজুয্যপূর্ণ পরম্পরা এবং সামাগ্রকতায় পারঙ্গমতা লক্ষণীয়। গবেষণাকর্মের জন্য হারূন আকবর দেশে-বিদেশে আলোচিত ও মূল্যায়িত হয়েছেনÑএর পূর্ণাঙ্গ বয়ান লেখক পেশ করেছেন। প্রবন্ধটি সত্যসন্ধ পাঠককে আলোড়িত ও প্রলুব্ধ করবে।
প্রবন্ধে গবেষক হারূন আকবরের পূর্বসুরীদের সমাজকীর্তি, সাহিত্যচর্চা, প্রাজ্ঞতা বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। বস্তুত বংশীয় ধারাবাহিকতায় জ্ঞানী-গুণী সৃষ্টি হওয়ার ক্ষেত্রে বিরল এক দৃষ্টান্ত হারূন আকবরের সাহিত্যময় জীবন ও কর্ম। প্রবন্ধে এ বিষয়ে তথ্যবহুল বর্ণনা স্থান পেয়েছে।
‘যুগ মনীষীদের কথায় হারূন আকবর’Ñঅংশে দেশের প্রখ্যাত লোকবিজ্ঞানী ডক্টর আশরাফ সিদ্দিকীর অভিমত উদ্ধৃত করা হয়েছে। তাঁর ভাষায়Ñ‘আমাদের সব সাহিত্যসেবীদের সন্তানগণই যদি তোমার মতো হতো, তবে এই হতভাগ্য দেশের ইতিহাসই অন্যরূপ হতো।’ (সময়ের আলোয় হারূন আকবর : পৃষ্ঠাÑ১৩) এ প্রসঙ্গে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকসংস্কৃতি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডক্টর আব্দুল জলিলের অভিমত প্রণিধানযোগ্যÑ‘আপনি যোগ্য পিতার যোগ্য সন্তান। লোকসাহিত্য চর্চায় আপনার ও আপনার পিতার অনুরাগ প্রশংসনীয়। বাংলাদেশের ফোকলোর চর্চার ইতিহাসে আপনারা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। বিশেষ করে লোকসাহিত্যের চর্চায় আপনার প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ সকল প্রশংসার ঊর্ধ্বে।’ (সময়ের আলোয় হারূন আকবর : পৃষ্ঠাÑ১৪) লেখক বায়েজীদ মাহমুদ ফয়সল তার প্রবন্ধে হারূন আকবর সম্পর্কে লিখেছেনÑ‘প্রাচীন ঐতিহ্যের ধারক হারূন আকবর একটি শিক্ষিত মার্জিত সংস্কৃতিবান পরিবারের সফল প্রতিনিধি। গঠনমূলক কাজে তাঁর সকল প্রয়াস ঋদ্ধ। নীতিনিষ্ঠ মানুষ হওয়ায় কথা ও কাজে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’ (সময়ের আলোয় হারূন আকবর : পৃষ্ঠাÑ১৫)
‘সময়ের আলোয় হারূন আকবর’Ñগ্রন্থে পরিশিষ্ট হিসেবে সংকলিত হয়েছে বিশিষ্ট লেখক গবেষক শামসুল করিম কয়েস, গবেষক নন্দলাল শর্মা ও কবি-প্রাবন্ধিক আশরাফ হাসানের মূল্যায়নধর্মী-আলোচনামূলক গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ। শামসুল করিম কয়েস তাঁর লেখায় হারূন আকবরের ব্যক্তি পরিচিতি, কর্মজীবনসহ বিভিন্ন সাহিত্যকর্মের বিশ্লেষণধর্মী মূল্যায়ন করেছেন। প্রকাশিত গ্রন্থ নিয়ে আলোচনা করেছেন যা হারূন আকবরের সমৃদ্ধ গবেষণাকর্মকে ঘনিষ্ঠভাবে পাঠকদের সামনে পরিস্ফুটিত করে। শামসুল করিম কয়েসের ভাষায়Ñ‘লোকসংস্কৃতির প্রকৃতি নির্ভর করে সে অঞ্চলের সাধারণ মানুষের মানসিকতার ওপর। অতীতকাল থেকে সিলেটের লোকসাহিত্য অত্যন্ত সমৃদ্ধ। সিলেটের লোকসাহিত্যের স্বরূপ উন্মোচন করে বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক হারূন আকবর রচনা করেছেন ‘লোকসাহিত্যে সিলেট’ গ্রন্থটি।’ (সময়ের আলোয় হারূন আকবর : পৃষ্ঠাÑ১৯)
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ প্রফেসর নন্দলাল শর্মার সমালোচনামূলক প্রবন্ধটি মৌলিক অবয়বসমৃদ্ধ। এখানে চমৎকারভাবে আলোচিত হয়েছে হারূন আকবরের গ্রন্থাবলী সম্পর্কে। নন্দলাল শর্মার লেখায়Ñ‘১৩৭৩ বঙ্গাব্দের পৌষসংখ্যা মাসিক জালালাবাদে ‘অদ্ভুত বুদ্ধি’ নামে একটি লোকগল্প প্রকাশের মাধ্যমে হারূন আকবর ফোকলোর চর্চার জগতে প্রবেশ করেন। তার ফোকলোর চর্চাকে চার ভাগে ভাগ করা যায়। ক. গ্রন্থ প্রণয়ন, খ. গ্রন্থ সম্পাদনা, গ. প্রবন্ধ রচনা, ঘ. জালালাবাদ লোকসাহিত্য পরিষদ লালন।’ (সময়ের আলোয় হারূন আকবর : পৃষ্ঠাÑ২৪)
হারূন আকবরের আরেকটি গ্রন্থ বিষয়ে নন্দলাল শর্মার মূল্যায়ন উল্লেখের দাবি রাখে। এর খানিক উদ্ধৃতিÑ‘হারূন আকবরের ‘সিলেট গীতিকায় পতিপ্রেম’ প্রবন্ধটি সাপ্তাহিক সিলেট সমাচারে (৩ সেপ্টেম্বর ১৯৮২) প্রকাশিত হয়। এই প্রবন্ধে তিনি সিলেট গীতিকার নারী চরিত্রগুলোর পতিপ্রেমের পরাকাষ্ঠা বর্ণনা করেছেন।’ (সময়ের আলোয় হারূন আকবর : পৃষ্ঠাÑ২৬)
গবেষক হারূন আকবর ইতোমধ্যে দুইবার ভারতের আসাম রাজ্যের শিলচরে ভারতের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের আমন্ত্রণে বইমেলায় অতিথি হিসেবে যোগদান করেছেন। প্রথমবার বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের মধ্যে ছিলেন লেখক ও গবেষক মইনুল হক চৌধুরী, কবি আবিদ ফায়সাল, লেখক ও প্রকাশক বায়েজীদ মাহমুদ ফয়সল প্রমুখ। দ্বিতীয়বার সফরসঙ্গী ছিলেন মইনুল হক চৌধুরী, এনামুল করিম চৌধুরী রিয়াদ ও বায়েজীদ মাহমুদ ফয়সল। বইমেলায় হৃদয়গ্রাহী অনুষ্ঠান ও আনন্দময় সফর প্রতিনিধি দলের অভিজ্ঞতাকে আরো সমৃদ্ধ করে। সিলেট ও আসামের সুপ্রাচীন অভিন্ন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য উভয় দেশের লেখকদের সম্মিলনে পুনরায় উজ্জীবিত হয়ে ওঠে। গবেষক হারূন আকবর বইমেলা উপলক্ষে বইমেলার প্রেক্ষাপট, ঐতিহ্যিক মেলবন্ধন, সাহিত্যের ক্ষেত্রে উভয় অঞ্চলের ইতিহাস চেতনাকে উপজীব্য করে গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ প্রদান করেন। এ দুটো ভাষণ গ্রন্থের শেষাংশে সংযোজিত হয়েছে। যা আমাদের সাহিত্যের পথযাত্রায় ঐতিহ্য অন্বেষায় যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে নিঃসন্দেহে। হারূন আকবর তার প্রদত্ত ভাষণের এক জায়গায় উল্লেখ করেন : ‘আসামের সুরমাভ্যালি খ্যাত এ অঞ্চলের জনপদের মানুষের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক অবস্থান ছিল সুদৃঢ় উন্নত। শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিচর্চায় সিলেট কাছাড় শিলচরের জনগণের নৃতাত্ত্বিক বৈচিত্র্যের মধ্যেও ঐক্য ছিল। অভিন্ন ভাষা, অভিন্ন জীবনাচার, অভিন্ন সংস্কৃতি ও জীবনবোধ এখনও এ অঞ্চলের মানুষ অন্তরে লালন করে। পারস্পরিক সহমর্মিতা আন্তরিকতায় আকৃষ্ট হয়ে একে অন্যকে কাছে টানে।’ (সময়ের আলোয় হারূন আকবর : পৃষ্ঠাÑ৫৮)
০৪.
আমাদের ঐতিহ্যিক চেতনাকে লালন করার শ্রমসাধ্য কর্মযজ্ঞে হারূন আকবর নিবেদিতপ্রাণ। সত্যনিষ্ঠার মাধ্যমে সাহিত্য সৃষ্টিতে তাঁর অবদান নিঃসন্দেহে মূল্যায়নযোগ্য। ‘সময়ের আলোয় হারূন আকবর’ গ্রন্থটি স্বল্প পরিসরে হলেও এমন মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় উদার পদক্ষেপ ও অভিনন্দনযোগ্য।



শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT