উপ সম্পাদকীয়

সন্তানের জীবনে বাবার অবদান

ডাঃ নূরুল হুদা নাঈম প্রকাশিত হয়েছে: ১৬-০৬-২০১৯ ইং ০০:২৩:২৪ | সংবাদটি ১২৭ বার পঠিত

বাবা/ তোমার স্নেহ-শাসন,/ শিখিয়েছে বাবা,/ শুদ্ধপথে দীপ্ত-চল;/ তোমার আদর্শে,/ আজও উজ্জীবিত বাবা,/ সত্যে আছি অবিচল।
পটভূমি-১: যে যে নামেই ডাকুকনা কেন আমার কাছে বাবা ডাকই ভালো লাগে। বাবাকে হারিয়েছি সেই শৈশবে। খুব বেশি স্মৃতিও তৈরীর সুযোগ হয়নি। তবে একথা মনে পড়ে আশে-পাশের মানুষজন আপসোস করে বলতেন-“এই ছেলের মনে থাকবেনি তার বাবার কথা”। মায়ের মুখে শুনেছি বাবা নাকি প্রায়শঃ বলতেন- “দেখো একদিন তোমার এই ছেলেই তোমার সব সাধ-আহলাদ পূরণ করবে”। আজ মাও নেই, জানিনা কতটুকু পেরেছি, তবে আমার সাধ্যের সর্বোচ্চটুকু দিয়ে মাকে সুখী করতে ছিলাম সর্বদা সচেষ্ট। আমার মা বলতেন আল্লাহ তোমাকে শান্তি দিবেন বাবা, জীবনে অনেক সুখি হবে তুমি। মায়ের দোয়ার বদৌলতেই হয়তো এখন শান্তিতে আছি। মা-বাবাহীন জীবন আসলে ভাসামান সমুদ্রে মাঝিহীন নৌকার মতো।
পটভূমি-২: পরিবারের সবাই মিলে রাতের খাবার গ্রহণ করছেন। ২০ মাসের ছোট মেয়ে তাজকিয়াও বসে আছে বেবী চেয়ারে। হঠাৎ রাস্তায় কুকুরেরা মারামারি শুরু করেছে। কুকুরদের চিৎকার চেঁচামেচিঁ শুনে তাজকিয়া- ভয় পাইছি বলে কান্না শুরু করলো। পাশে বসা ওর মা টান দিয়ে কোলে নিলেন। সবাই বললো ভয় নাই তাজকিয়া ভয় নাই। কিন্তু ছোট্ট তাজকিয়া বলতে থাকলো- বাবা কোলে নাও, বাবা কোলে নাও। কুকুরেরা এখনও মারামারি করছে। এই ছোট্ট মেয়েটিও এরকম বিপদের সময় বাবার কোলকেই নিরাপদ ভাবছে। অবশ্যই মায়ের কোলই সন্তানের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়স্থল কিন্তু এ ছোট মেয়ের মনে এমনটা কেন হলো তা আমাকে ভাবিয়ে তুলেছে। এটা কি প্রকৃতিজাত ? তাই বাবা দিবসের লেখায় এমন অবতারণা।
পটভূমি-৩ : ছেলেগুলো বাবার সঙ্গে কথা বলা শুরু করে। তা দেখে আশপাশের ছেলেমেয়েরাও জড়ো হতে থাকে। দূর থেকে জটলা দেখে। কি হচ্ছে তা দেখতে ও এগিয়ে আসে। কাছাকাছি এসে বাবার চোখে চোখ পড়ে ওর। দুজনই থমকে যায়। শামিম কোনো কথা না বলে অন্যদিকে চলে যায়। দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে যাওয়ার আগ পর্যন্ত বাবা ওর দিকে তাকিয়ে থাকে। বাবা বিষয়টি বুঝতে পারেন। তাকে এই কাপড়ে দেখে শামিম পরিচয় না দিয়ে এড়িয়ে গেল! বাস্তবতা এমনই। সমাজে আমরা অনেক শিক্ষিত ছেলে-মেয়ে এখন মা-বাবাকে নিয়ে এমন বিব্রত হই।
আজ রোববার বিশ্ব বাবা দিবস। আজকের দিনটি শুধুই বাবাদের জন্য। পিতার প্রতি সন্তানের সম্মান, শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা প্রকাশের জন্য দিনটি বিশেষভাবে উৎসর্গ করা হয়ে থাকে। জুন মাসের তৃতীয় রোববার বিশ্বের প্রায় ৭৪টি দেশে বাবা দিবস পালিত হয়। তৃতীয় রোববার হিসাবে এ বছর ১৬ জুন পালিত হচ্ছে বাবা দিবস। ধারণা করা হয়, ১৯০৮ সালের ৫ জুলাই প্রথম ‘বাবা দিবস’ পালিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম ভার্জিনিয়ার ফেয়ারমন্টের এক গির্জায় প্রথম এ দিনটি পালিত হয়। আবার সনোরা স্মার্ট ডড নামে ওয়াশিংটনের এক নারীর মাথাতেও বাবা দিবসের আইডিয়া আসে। অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও ঘরে ঘরে নানা আয়োজনে পালন হবে বাবা দিবস।
পবিত্র কোরআন শরীফে আল্লাহ্আদেশ দিয়েছেন :
‘আর তোমার প্রতিপালক আদেশ করেছেন যে, তোমরা তাঁকে ছাড়া অন্য কারও উপাসনা করো না এবং তোমরা পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ করো। তাদের মধ্যে কেউ অথবা উভয়ে যদি তোমার নিকট বার্ধক্যে উপনীত হন, তাহ’লে তুমি তাদের প্রতি উহ্ শব্দটিও উচ্চারণ করো না এবং তাদেরকে ধমক দিয়ো না। তুমি তাদের সাথে নম্রভাবে কথা বল’। ‘আর তাদের প্রতি মমতাবশে নম্রতার পক্ষপুট অবনমিত কর এবং বল, হে আমার প্রতিপালক! তুমি তাদের প্রতি দয়া কর যেমন তারা আমাকে শৈশবে দয়াপরবশে লালন-পালন করেছিলেন’।’ -সূরা বণি ইগ্রাঈল ১৭/২৩-২৫)।
রাসূল ( সাঃ ) বলেছেন- আল্লাহ্ তা’আলার সন্তুষ্টি পিতা-মাতার সন্তুষ্টির মধ্যে এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টি পিতা-মাতার অসন্তুষ্টির মধ্যে নিহিত রয়েছে। [তিরমিযী-১৮৯৯]
বাবা মানে নিঃস্বার্থ ভালোবাসার এক ঠিকানা, বাবা মানে নির্ভরতা, শর্তহীন নিরাপত্তা, বাবা মানে বিশালতা। সন্তানের কাছে বাবা পথপ্রদর্শক ও বন্ধুর মতো। বাবার ভালোবাসা, বাবার স্নেহ, বাবার আদর অতুলনীয়। বাবাই সন্তানকে দেন ভরসা, জীবনে চলার পথে দেন বলিষ্ঠ সাহচর্য, দেন সঠিক পথের দিশা, ভাল কাজে দেন অনুপ্রেরণা, দেন জীবনে এগিয়ে যাওয়ার ছবক। বাবা সন্তানকে শিশুকাল থেকে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত সাহায্য করেন, সন্তানের মুখে হাসি ফুটাতে আত্মত্যাগ করেন, সুস্থ ও সবল রাখতে যতœ করেন, সম্মানিত ও দক্ষ-যোগ্য মানুষ হিসেবে গড়তে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা করেন, বিপদে-আপদে পাশে থেকে উৎসাহিত অনুপ্রাণিত করেন, প্রেমময় মনোযোগে যুক্ত রাখেন, সন্তানের মঙ্গলে পেরেশান থাকেন, আবেগগত চাহিদাগুলো পূরণে থাকেন আন্তরিক। বাবা আছেন তো, সন্তান চিন্তাহীন-ভাবনাহীন। বাবা থাকলে যত চিন্তা সব বাবা নিয়ে নেন, কোনো ভয়ই কাজ করে না। পৃথিবীর সকল বাবাই বাহির থেকে ফিরে প্রথমেই সন্তানদের বুকে জড়িয়ে ধরেন, আদর করেন। বাবাদের বুক যেনো সন্তানের জন্য পরম আশ্রয়স্থল। সন্তানের দঃসময়ে বাবারা চেষ্টা করেন সব কষ্ট ঘুচিয়ে দেয়ার। হাজার কষ্ট সয়ে তিলে তিলে সন্তানকে বড় করেন একজন বাবা। বাবাদের শার্টগুলো বেশিরভাগ সময় দামি হয় না, বাবাদের ওয়্যারড্রব ভর্তি শার্ট-প্যান্ট থাকে না। বাবাদের জুতা চলে বছরের পর বছর, মোবাইলটা একেবারে নষ্ট না হলে বদলান না, ঘড়িটা বৃদ্ধ হয়, তবুও হাতেই থাকে। একা খেতে হলে সবচেয়ে সস্তা হোটেল খোঁজেন, একা কোথাও গেলে বাসে চড়েন। বাবারা একান্ত বাধ্য না হলে কখনও না বলেন না। নিজের জন্য সবচেয়ে কৃপণ বাবাটা তার স্ত্রী-সন্তানের জন্য সবচেয়ে বেশি বেহিসাবি। বেশিরভাগ বাবাই ভালোবাসি শব্দটা বলতে জানেন না, করতে জানেন।
বাবার মাঝে জড়িয়ে আছে বিশালত্বের এক অদ্ভুত মায়াবি প্রকাশ। বাবার কাঁধটা কি অন্য সবার চেয়ে বেশি চওড়া? তা না হলে কি করে সমাজ সংসারের এত দায়ভার অবলীলায় বয়ে বেড়ান বাবা। বাবার পা কি অন্য সবার চেয়ে দ্রুত চলে? নইলে এতটা পথ এত অল্প সময়ে কি করে এত শক্ত করে সব কিছু আগলে রাখেন বাবা। লেখক হুমায়ূন আহমেদের ভাষায়, "পৃথিবীতে অনেক খারাপ মানুষ পাবেন কিন্তু একটিও খারাপ বাবা পাওয়া যাবে না।"
দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, ডিজিটাল প্রযুক্তির অপব্যবহারের মাধ্যমে বর্তমানে জীবন এক ভঙ্গুর ভিত্তির ওপর দাড়িয়ে আছে। কী এক বেদনাদায়ক অগ্নি পরীক্ষার মুখোমুখি সমগ্র মানবজাতি। তৈরি হচ্ছে সন্তানের সাথে বাবা-মা’র দূরত্ব যার ফলে যৌথ পরিবার ভাঙ্গা তথা পারিবারিক বন্ধন এক করুণ পরিনতির দিকে যাচ্ছে।
পিতা-মাতার সেবা করা প্রত্যেক সন্তানের নৈতিক ও মানবিক দায়িত্ব। আমরা যেন ভুলে না যাই বাবার অপত্য স্নেহের মাঝে বেড়ে উঠা আমাদের শৈশব আর কৈশোরের দিনগুলো। যাদের বাবা-মা বেঁচে আছে বাবা-মাকে সম্মান করুন। বাবা-মাকে দৈননিন্দ খরচ দিন। দান-খয়রাত করতে চাইলে সহযোগিতা করুন। সময় পেলে আত্মীয়-স্বজনদের বাসায় বেড়াতে নিয়ে যান। বিশেষ করে তার বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে, পুরাতন আত্মীয়দের সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থা করে দিন। পারিবারিক কোনো বিষয়ে উনার পরামর্শ গ্রহণ করুন। তাদের বোঝান যে আপনি এখনও বাবা-মাকে ছাড়া কিছু করেন না। যাদের বাবা-মা নেই তারা উনাদের জন্য দোয়া করুন। শেষ বয়সে কোন বাবা-মাকে যেন অসহায়য়ের মত জীবনযাপন করতে না হয়। যে বাবা-মার জন্য আমরা পৃথিবীর আলো দেখেছি সেই বাবা-মাকে যেন কেউ কষ্ট না দেয়। ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন পৃথিবীর সকল বাবা-মা।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, নাক-কান-গলা ও হেড-নেক-ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ সার্জন, সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বৃক্ষরোপণ
  • জলবায়ু পরিবর্তনই আসল সমস্যা
  • কিশোর অপরাধ
  • আ.ন.ম শফিকুল হক
  • হোটেল শ্রমিকদের জীবন
  • বিশেষ মর্যাদা বাতিল ও কাশ্মীরের ভবিষ্যত
  • বাংলাদেশে অটিস্টিক স্কুল ও ডে কেয়ার সেন্টার
  • বেদে সম্প্রদায়
  • গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে সুপারিশমালা
  • ত্যাগই ফুল ফুটায় মনের বৃন্দাবনে
  • প্রকৃতির সঙ্গে বিরূপ আচরণ
  • ঈদের ছুটিতেও যারা ছিলেন ব্যস্ত
  • সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের বর্ষপূর্তি : প্রাপ্তি ও প্রত্যাশা
  • আইনজীবী মনির উদ্দিন আহমদ
  • শিশুদের জীবন গঠনে সময়ানুবর্তিতা
  • শাহী ঈদগাহর ছায়াবীথিতলে
  • কিশোর-কিশোরীদের হালচাল
  • বলকানস : ইউরোপের যুদ্ধক্ষেত্র
  • সন্তানের প্রতি অভিভাবকের দায়িত্ব
  • শিক্ষার হার এবং কর্মসংস্থান প্রসঙ্গ
  • Developed by: Sparkle IT