সাহিত্য

লেখকের ট্রাঙ্ক

বাশিরুল আমিন প্রকাশিত হয়েছে: ১৬-০৬-২০১৯ ইং ০০:৩৩:২৬ | সংবাদটি ১৬০ বার পঠিত

দিনশেষে একজন লেখকের সহায় সম্পত্তি হিসেবে কী থাকতে পারে? কাড়ি কাড়ি টাকা, প্রাসাদোপম অট্টালিকা, সুনাম-সুখ্যাতি না পদক-সম্মাননা। হয়তো এর কোনোটাই না। লেখকের কাছে সবচে বড় হয়ে থাকে তার লেখাজোখা, পা-ুলিপি বা এর সাথে সম্পর্কিত অতি সাধারণ কিছু। এর বাইরের তাবৎ বিত্ত-বৈভবকে কি আর সম্পদ বা সম্পত্তি হিসেবে দেখেন লেখকরা? অধিকাংশের ক্ষেত্রেই যে উত্তরটি আসবে তা বোধ হয় না-ই হবে। তা না হলে কি টিনের বাক্সকে আগলে রেখে জীবন পার করে দেয় কেউ! আজ এমন ক’জন লেখককে নিয়ে গল্প করতে চাই যারা লেখার ট্রাঙ্ককেই বড়ো সম্পত্তি ভেবেছেন। তবে তা নিছক গল্প হলেও কিছু প্রামাণ্য রেফারেন্সের আলোকেই বলার চেষ্টা করব।
জীবনের তাগিদে এখান থেকে ওখানে সরেছেন কবি জীবনানন্দ দাশ, তাই বলে নিজের ট্রাঙ্ক রেখে পা ফেলেননি কোত্থাও। ১৯৪৬-১৯৪৭ সালে বরিশাল ছেড়ে স্থায়ীভাবে কলকাতায় চলে যান জীবনানন্দ দাশ। বলতে গেলে নিজের সবকিছুই ফেলে যান তিনি কিন্তু কাগজে ঠাসা টিনের বাক্সগুলি ঠিকই নিয়ে গেছেন। এসব আগলে রাখতেন একান্তভাবে। কাউকে দেখেতে দিতেন নাÑ নিজ স্ত্রীকেও না। গৌতম মিত্র তাঁর প্রবন্ধে একটি সাধারণ দৃশ্যের উল্লেখ করেন এভাবেÑ ট্রাঙ্ক খুলে বসে থাকেন জীবনানন্দ। এক মনে কী যেন দেখেন। আবার কাউকে দেখলেই আড়াল করে ফেলেন।
১৯৫৪ সালে ট্রামের নিচে চাপা পড়লেন জীবনানন্দ পরে হাসপাতালের বেডে মারা গেলেন তিনি। ১৮৩ ল্যান্সডাউন স্ট্রিটের বৈশিষ্টহীন বড়িতে তার নিজের রুমে রেখে গেলেন কেরোসিন কাঠের একটি টেবিল, টেবিলের ওপর কয়েকটা খাতা, সুলেখা কালির দোয়াত, একটি ঝরনা কলম আর তক্তপোশের নিচে গোটা কয়েক কালো টিনের ট্রাঙ্ক। ট্রাঙ্কের সংখ্যা কতো ছিল এ নিয়ে কিছু মতভেদ আছে। জীবনানন্দ গবেষক ভ’মেন্দ্র গুহ পাঁচ-ছয়টা ট্রাঙ্কের কথাই জানান। এই-ই ছিল জীবনানন্দের সহায়-সম্পত্তি। ট্রাঙ্কগুলো আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে হেলায়-অবহেলায় ঘুরতে লাগলো। একবার তো হারিয়েই গিয়েছিল এসব, পরে বহু কষ্টে ট্রাম ডিপো থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল। একটা সময় বোন সুচরিতা আর কবি ভূমেন্দ্র গুহ হাত দিলেন ট্রাঙ্কে, সেখান থেকে আবিষ্কার হতে থাকলো বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সব সম্পদ ।
কথাসাহিত্যিক শাহাদুজ্জামান তার ‘কমলালেবু’ গ্রন্থে এই ট্রাঙ্ক থেকে পা-ুলিপি আবিষ্কারকে আখ্যায়িত করেছেন, তুতেনখামেনের পিরামিডের গুপ্তধন আবিষ্কার হিসেবে। সত্যিই তাই। এই ট্রাঙ্ক ছাড়া আমরা জীবনানন্দকে কি এতো বিশাল করে পেতাম। অতি সামান্যতেই তুষ্ট থাকতে হতো বাঙালি পাঠকদের।
কী ছিল এসব ট্রাঙ্কে? ফিরিস্তিটা বেশ বড়ো। প্রায় আড়াই হাজার কবিতার পা-ুলিপি, ২১টি উপন্যাস, একশো ২৮টি গল্প, ৭৮টি প্রবন্ধ-নিবন্ধ-ব্যক্তিগত রচনা। ৫৬টি খাতায় ঠাসা প্রায় সাড়ে চার হাজার পৃষ্ঠার ‘লিটারারি নোটস’ নামের ডায়েরিধর্মী রচনা। এমন কিছু খাতাও পাওয়া গেছে যার এক পাশে লেখা ছিল খরচের হিসাব অন্যপাশে কবিতা।
প্রথম আলোতে প্রকাশিত ফয়জুল লতিফ চৌধুরীকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ভুমেন্দ্র গুহ জানান, ‘ ১৯৫৪-এর ২২ অক্টোবর রাতে জীবনানন্দ মারা গেলেন শম্ভুনাথ প-িত হাসপাতালে। পরদিন হলো শেষকৃত্য। পুরো পরিবার চলে গেল ত্রিকোণ পার্কের কাছেÑ মেজদা অশোকানন্দের শ্বশুরবাড়িতে। জীবনানন্দের সবকিছু পড়ে থাকল ল্যান্সডাউন রোডের বাড়িতে। তো, আমার ওপরই দায়িত্ব পড়ল জীবনানন্দের জিনিসপত্তরগুলো নিয়ে আসার। পাঁচ-ছয়টা ট্রাঙ্ক, দুটি বইয়ে ঠাসা। তিনটিতে লেখার খাতা বেশ সাজিয়ে রাখা। মেজদা অশোকানন্দের কাছে জীবনানন্দের অপ্রকাশিত লেখার তাগাদা আসে। তিনি আমাকে ডেকে পাঠান। ত্রিকোণ পার্কের বাসায় গিয়ে আমি ট্রাঙ্ক খুলে মেঝেতে বসে কপি করি, বেশ উত্তেজনা নিয়েই করি কাজটা। জীবনানন্দের লেখার ধাঁচটা চিনে ফেলার পর কাজটা আমার জন্য আর খুব কঠিন ছিল না। মেজদা, রিতাদিÑ (জীবনানন্দের ছোট বোন) এঁরা আমাকে ভীষণ স্নেহ করতেন। এভাবে চলল কয়েক বছর। ১৯৫৭-তে ডাক্তারি পাস করে হাসপাতালের কাজে ভারী জড়িয়ে পড়লুম, কাজের চাপে মেজদার বাসা গিয়ে কাজ করা মুশকিল। অথচ লেখার খাতা ঘেঁটে কপি তো করতে হবে। এদিকে সম্পাদকেরা এবং প্রকাশক মশাইদের আগ্রহ বাড়ছিল। ফলে ট্রাঙ্কগুলো আমার বাসায় নিয়ে আসতে হলো।’
সেটা ছিল ১৯৫৪ থেকে ১৯৬৮ সনের কথা, বেশ খেটেছেন ভূমেনদ্র গুহ। ‘মাল্যবান’ উপন্যাসের পা-ুলিপি দুইবার কপি করতে হয়েছিল তাকে, তবু তিনি ক্লান্ত হননি। তার সাথে অশোকানন্দও ছিলেন। তাদের প্রচেষ্টায় ‘ধূসর পা-ুলিপি’র বর্ধিত সংস্করণ বের হলো। ধীরে ধীরে বাজারে আসলো ‘বেলা অবেলা কালবেলা’, ‘কবিতার কথা’ ও রূপসী বাংলা। ১৯৬৮ তে ডাক্তারি পেশায় কলকাতা ছাড়লেন ভ’মেন্দ্র গুহ । পা-ুলিপির কাজ শ্লথ হয়ে আসলো, ঢিমেতালে যা পারলেন করে গেলেন। ১৯৯৪-এ ডাক্তারি চাকরি থেকে অবসর নিলেন ভুমেন্দ্র । আবার শুরু হলো জীবানানন্দ আবিষ্কারের মহাযজ্ঞ।
ততোদিনে এসব ট্রাঙ্কের গুপ্তধন আবিষ্কারে অনেকেই নেমে গেছেন। তাদের মধ্যে গৌতম মিত্র, দেবেশ রায়, শঙ্খঘোষ ও আফসার আহমদ অন্যতম। এ তো ছিল জীবনানন্দের ট্রাঙ্কের গল্প। এখন অন্য দুয়েকজনের কথা বলা যায়।
টিনের ট্রাঙ্ক ছিল আহমদ ছফার। তার ট্রাঙ্কে তিনি খাতাপত্র ও পা-ুলিপি রাখতেন। তার এই ট্রাঙ্কে জীবনানন্দের মতো অঢেল কিছু ছিলা না বটে তবে তিনি এটিকে বিশাল সম্পত্তি জ্ঞান করতেন। যেখানে যেতেন সাথে করে নিতেন ট্রাঙ্কটি। কেবল বাসা না নিজের কর্মস্থল বা অফিসেও নিয়ে গেছেন এটি। কথাসাহিত্যিক অদিতি ফাল্গুনি জানান, আজিজ মার্কেটের দু-তলায় উত্থানপর্বের অফিসে ট্রাঙ্কটি তাঁকে আহমদ ছফা নিজেই দেখিয়েছিলেন। এ ট্রাঙ্ক নিয়ে আহমদ ছফা বলতেন- এটি চট্টগ্রামের গরীব মুসলমান কৃষকের ঐতিহ্য। আহমদ ছফার একটি ট্রাঙ্ক এখনো আছে। তার ভাতুষ্পুত্র নুরুল আনোয়ারকে দিয়ে গেছেন এটি।
আল মাহমুদের ট্রাঙ্ক নিয়ে ভিন্ন রকম গল্প চালু আছে। কবি হওয়ার জন্য আল মাহমুদ গোলাপ ফুল আঁকা টিনের বাক্স নিয়ে ঢাকায় এসিেছলেন, মাহমুদ নিজেই বলেছিলেন এই ট্রাঙ্কের কথা। শহীদ কাদরী এ নিয়ে আল মাহমুদকে ক্ষ্যাপাতনে খুব।
নাসির আলী মামুনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে আল মাহমুদ বলেন, ‘শহীদ বলত, টিনের স্যুটকেস, তার ওপরে ছিল গোলাপ ফুল আঁকাÑ এটা নিয়ে আল মাহমুদ ঢাকায় এসেছিল। স্যুটকেসের ভেতরে যে কী ছিল, সেটা শহীদ জানত না।’ আল মাহমুদের ট্রাঙ্কে আসলেই এমন কিছু ছিল যা কেউ জানতো না। একবার আল মাহমুদ বলেন, আমার এই ট্রাঙ্কের ভেতরেই সমগ্র বাংলাদেশ!
ফের্নান্দো পেসোয়। ‘দ্যা বুক অব ডিসকোয়াইট’ এর লেখক, বিখ্যাত কবি ও সমালোচক। জীবনানন্দের মতো তিনিও নির্জন ছিলেন। মাত্র ৪৭ বছর বয়সে মারা যাওয়া এই লেখক গদ্য থেকে নিয়ে কবিতা সব-ই লিখেছেন। কেবলমাত্র তাঁর লেখা প্রেমপত্রই বিক্রি হয়েছে কোটি টাকায়। তবে তার বিশাল পরিমাণ লেখার খুব অল্পই জীবদ্দশায় প্রকাশ পেয়েছিল। তার মৃত্যুর পর আবিষ্কৃত হয় যাদুর ট্রাঙ্ক, যাতে ছিল বিপুল পরিমাণ পা-ুলিপি। ফের্নান্দো পেসোয়ার ট্রাঙ্ক থেকে প্রাপ্ত পা-ুলিপি নিয়ে কাজ চলছে এখনো।
অধিকাংশ লেখাই প্রকাশ করতে চাইতেন না ফ্রানৎস কাফকা, ড্রয়ারে-ট্রাঙ্কে লুকিয়ে রাখতেন তাঁর পা-ুলিপি ও লেখার খাতা। মরার আগে বন্ধু ম্যাক্সকে অনুরোধ করে যান তার এসব লেখা পুড়িয়ে ফেলতে। এরকম আরো অনেক গল্প আছে। লেখকদের একটা অংশ নিজেদের লেখাকে আড়াল করে রাখতে চান। তাদের লেখাজোখা তুতেন খামেনের গুপ্তধনের মতো ট্রাঙ্কে-ড্রয়ারে বা গোপন কোনো স্থানে লুকিয়ে রাখেন। আর কিছু লোক বেরিয়ে আসেন যারা খুঁজে খুঁজে বের করে আনেন এসব গুপ্তধন।
তথ্যসূত্র:
ক্স এখনো জীবনানন্দের অনেক কবিতা আছে, যা কোথাও ছাপা হয়নি- ভূমেন্দ্র গুহ, সাক্ষাৎকার, ফয়জুল লতিফ চৌধুরী, দৈনিক প্রথম আলো
ক্স একজন কমলালেবু, শাহাদুজ্জামান, প্রথমা
ক্স জীবনানন্দের পা-ুলিপি খুঁজে পাওয়ার নেপথ্যে- গৌতম মিত্র
ক্স সব পাখি ঘরে আসে, সব নদী, আসেন না জীবনানন্দ- দেবাশিষ ঘড়াই, আনন্দবাজার
ক্স আমার হৃদয়ের কলম অত্যন্ত অব্যর্থ, শক্তিশালী- আল মাহমুদ, নাসির আলী মামুন, দৈনিক প্রথম আলো
ক্স ফ্রানৎস কাফকা: জীবন ও সাহিত্য- মাসরুর আরেফিন, বিডিনিউজ২৪.কম

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT