উপ সম্পাদকীয়

মুর্তাজা তুমি জেগে রও!

ঝরনা বেগম প্রকাশিত হয়েছে: ১৭-০৬-২০১৯ ইং ০০:৫৫:৩৮ | সংবাদটি ১০৭ বার পঠিত

একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি!/ ওমা! হাসি হাসি পরবো ফাঁসি/ দেখবে ভারতবাসী! একবার বিদায় দে-মা ঘুরে আসি---
ভারতের কিংবদন্তী শিল্পী লতা মুঙ্গেশকর-এর এ বিখ্যাত গানটি জানি না এখন সৌদি কারাগারে বসে ১৮ বছর বয়সের যুবক মুর্তাজা গাইছে কি না। কেননা, ভারতের সাড়া জাগানো কিশোর অপরাধী ক্ষুদিরাম-এর মতো পরিণতিতে যেতে চলেছে মুর্তাজা।
এক সময় কলকাতার চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ড স্বাধীনতাকামীদের শাস্তি দিয়ে বেশ আলোচনায় এসেছিলেন। বিপ্লবী ক্ষুদিরাম-এর এটা সহ্য হচ্ছিল না। তাই কিংসফোর্ডকে হত্যার মিশন নিয়ে ক্ষুদিরাম এক বোমা হামলায় অংশগ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু ওই হামলা ভুল নিশানায় আঘাত হেনেছিল। তারপরও বিচারে ক্ষুদিরাম-এর ফাঁসির আদেশ ঘোষণা করা হয়েছিল। ফাঁসি কার্যকরের সময় ১৯০৮ সালে ক্ষুদিরাম-এর বয়স ছিল আঠারো বছর সাত মাস এগার দিন। আর ১৯০৮ সালের ১১ আগস্ট সারা ভারতবর্ষের মানুষ প্রতিবাদের ঝড় তুলেছিল। শোকে মুহ্যমান হয়ে কেউ কেউ ঘরে চুলা জ্বালানোও বন্ধ করে দিয়েছিল।
বিপ্লবী ক্ষুদিরাম-এর সে-ই ঘটনার একশত এগার বছর পর সৌদিআরবে আরেক বিপ্লবী মুর্তাজা কুরেইরিসের শিরñেদ হতে যাচ্ছে। দশ বছর বয়সে মুর্তাজা এক অপরাধ করেছিল। আর এইজন্য তাঁর এ শাস্তির আয়োজন! সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই চাঞ্চল্যকর ঘটনার খবর প্রকাশিত হবার পর পুরোটা বিশ্ব প্রায় উত্তাল! কিন্তু আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি যে, এ ব্যাপারে সৌদি সরকার প্রায় নীরব। আর এই সৌদি সরকারের শেকড় উপড়ে ফেলে দেওয়ার আহবান জানিয়েছিল আরব বসন্ত বিপ্লবের চেনা মুখ মুর্তাজা কুরেইরিস নামে এক শিশু বিপ্লবী। আমরা অনেকেই হয়তো পূর্বে তাঁকে ততোটা চিনতাম না, অথবা জানতামও না হয়তো। কিন্তু শিরñেদের পূর্বে সে-ই মুর্তাজাকে বাঁচাতে এখন আমরা গোটা বিশ্ববাসী প্রায় উদগ্রীব। আমাদের সকলের একই কথা ‘মুর্তাজা মরতে পারে না! মুর্তাজাকে আমরা বাঁচাবোই।’
সিএনএনের এক রিপোর্ট থেকে জানা যায়, বন্ধুদের সাথে নিয়ে আরব বসন্তের সময় সাইকেল নিয়ে নিরস্ত্র অবস্থায় মিছিলে নেমেছিল আমাদের প্রাণের প্রিয় যুবক মুর্তাজা। আর এ অপরাধের মিথ্যা স্বীকারোক্তি তাঁর কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে আঘাত ও নিপিড়নের মাধ্যমে। এবং এক পর্যায়ে রাষ্ট্রদ্রোহিতার সাজা স্বরূপ মুর্তাজা’র শিরñেদ ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু গোটা বিশ্ববাসীকে হতবাক করেছে তাঁর অপরাধের ধরণটা। অর্থাৎ, শান্তিপূর্ণভাবে মিছিল করার ইনটেনশন (উদ্দেশ্য) নিয়ে সে রাজপথে নেমেছিল। তাঁর বয়স তখন কম ছিল। নাবালক ছিল সে। তাহলে নাবালককে তাঁর কাজের এমন শাস্তি দেওয়া কী উচিত? সৌদি সরকারের কাছে-এমন প্রশ্নের বার্তা পাঠিয়ে দিচ্ছেন অনেকে। মুর্তাজার ‘অপরাধ’ কী এতই বিশাল যে তাঁকে শিরñেদ দিতে হবে! সেদিন প্ল্যাকার্ডে অথবা শ্লোগানে সে বলেছিল ‘মানবাধিকার’ আর সে ‘মানবাধিকার’ চাওয়ার জন্যই কী এমন সাজা? তবে বিশ্বে মানবাধিকার সংস্থাগুলো আছে কেন?
রাজতন্ত্র ও স্বৈরতন্ত্রের অবসান চেয়ে ২০১০ সালে আরব বিশ্বের নির্যাতিত মানুষ রাজপথে নেমেছিল। অর্থাৎ গণতন্ত্র চালু করতে আরবের লোকজন রাজপথে নেমে প্রতিবাদ, প্রতিরোধে সোচ্চার হয়েছিল। তিউনিসিয়ার হকার (ফেরিওয়ালা) বাওয়াজিজি ২০১০ সালের সতের ডিসেম্বর আরব বসন্তের মশাল জ্বালিয়েছিলেন নিজ শরীরে আগুন জ্বেলে। ব্যস্, বিদ্রোহের আগুন ছড়িয়ে পড়ে আরব বিশ্বের প্রায় সবখানে। আর সে আগুনের লেলিহান শিখায় দগ্ধ হয়ে গদিচ্যুত হন মিসরের হোসনি মোবারক, তিউনিসিয়ার জয়নাল আবেদীন বেন আলি, ইয়েমেনের আলি আব্দুল্লাহ সালেহ, ইরাকের সাদ্দাম হোসেন, লিবিয়ার মুয়াম্মার গাদ্দাফিসহ অনেকে।
রাজতান্ত্রিক রাস্ট্র সৌদিতেও এমন বসন্তের বাতাস লাগে। সৌদিআরবের তখনকার সময়ের বাদশাহ ফাহাদ তাঁর জনগণের ওপর আর্থিক, রাজনৈতিকসহ নানাভাবে টর্চার চালান। তো, অন্যান্য পাবলিকের সাথে সতের বছরের কিশোর আলি কুরেইরিসও মিছিলে যায়। নেতৃত্ব দেয় শ্লোগানে। সৌদিআরবের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে গভীর রাতে সে পোস্টার সেঁটে দেয়। আর তাঁকে বাসায় পোস্টার লিখতে হেল্প করে দশ বছর বয়সের ছোট ভাই মুর্তাজা কুরেইরিস। কোনো এক মৃদু-মন্দ বাতাসে ভরপুর দিনে মুর্তাজার বড় ভাই আলিকে আন্দোলনের সময় সৌদিআরবের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা গুলি করে হত্যা করে। এটা মুর্তাজার মনকে ভেঙে দেয়। সে মেনে নিতে পারেনি ভাই ‘আলি’র মৃত্যু। তাই ভাইয়ের লাশ দাফন শেষ হতেই দশ বছরের নাবালক শিশুমুর্তাজা কেঁদে কেঁদে বন্ধুদের নিয়ে রাজপথে ‘মানবাধিকার! মানবাধিকার!’ বলে মিছিল করতে থাকে। আশপাশে সাড়া জাগে ‘কে সে’? ‘এমন বজ্রকন্ঠ কার’? সবাই তখন বলে ‘মুর্তাজা’র। আর সে-ই থেকে সৌদিআরবের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখের বালি মুর্তাজা কুরেইরিস নামের দশ বছরের শিশু। এবং সেজন্য সেই ঘটনার ৩ বছর পর ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বাহরাইন সীমান্তে পরিবারের সদস্যদের সাথে দেশ ত্যাগের সময় রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে অভিযুক্ত মুর্তাজা কুরেইরিসকে আটক করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে কোনো লিখিত অভিযোগ ছিল না, তারপরও তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। এবং আইনগত সহায়তার কোনো সুযোগ তাঁর পরিবারকে না দিয়ে তাঁকে কারাগারের নির্জন সেলে পাঠানো হয়। তেল সম্পদের জোরে সৌদিআরবে কোনো লিখিত সংবিধান না থাকার কারণে আইনকে যেমন খুশি ব্যবহার করা হচ্ছে। আর এর বলিষ্ঠ উদাহরণ মুর্তাজা’র শিরñেদ অর্ডার (আদেশ)। ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মতো সৌদির বর্তমান ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান-এর নামটিও ‘টক অব দ্যা ওয়ার্ল্ড’ হয়ে গেছে। তবু বিশ্ববাসী চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে মুর্তাজা’র শিরñেদ যেন না হয়। সোশাল মিডিয়ার প্রায় সকলেই মুর্তাজা’র বিষয়টি নিয়ে সোচ্চার।
আধুনিক যুগের ডিজিটাল ‘ক্ষুদিরাম’ মুর্তাজাকে বাঁচাতে তাঁর ভাই এবং মা-বোন যেমন চোখের বারি ফেলছেন, ঠিক তেমনি আমরা বিশ্ববাসীরাও মুর্তাজা’র জন্য কাঁদছি। মৃদু-হাসিমাখা আলোময় মুর্তাজা’র মুখটি দেখলে সকলেরই মনে মায়া জাগে। গণতন্ত্রের পতাকা উড়াতে চেয়েছিল যে দশ বছরের শিশু মুর্তাজা, আজ বয়সের পরিক্রমায় সে-ই মুর্তাজা আঠারো বছরের যুবক। আমরা তাঁকে তাঁর স্বপ্ন এবং হাসিকে বাঁচিয়ে রাখতে চাই। তাই সৌদি রাজতন্ত্রের সরকারের প্রতি আমাদের বিনীত অনুরোধ ‘মুর্তাজা’কে দয়া করে আপনারা শিরñেদ দিবেন না। অন্তত তাঁর হাসির জন্য না হয় তাঁকে বাঁচিয়ে রাখুন! বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষ মুর্তাজা’র হাসি দেখে প্রেরণা পাবে নিশ্চয়ই? তো, তাঁকে মারবেন কেন? সে তো আলোর পথযাত্রী! সকল খেলায় সে করবে খেলা। কে বলে সে-ই প্রভাতে আমাদের মুর্তাজা নেই! কে বলে? আমরা মুর্তাজাকে বাঁচাতে চাই। মুর্তাজা তুমি দৃঢ় সংকল্পে থাকো অটল, আমরা তোমাকে বাঁচানোর চেষ্টাটুকু করে যাবো। আমরা গোটা বিশ্ববাসী আছি তোমার পাশে। তো, তোমার ভয় কী মরণে?
লেখক : আইনজীবী, কলামিস্ট।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • কিশোর-কিশোরীদের হালচাল
  • বলকানস : ইউরোপের যুদ্ধক্ষেত্র
  • সন্তানের প্রতি অভিভাবকের দায়িত্ব
  • শিক্ষার হার এবং কর্মসংস্থান প্রসঙ্গ
  • শিক্ষার রাজ্যে এক বিস্ময়
  • ডেঙ্গু ও বানভাসি মানুষ
  • শিল্প-সাহিত্যে ১৫ আগস্ট
  • ইমাম-মুয়াজ্জিন সার্ভিস রোলস-এর প্রয়োজনীয়তা
  • বাঙালির মুক্তিসনদ ঐতিহাসিক ৬ দফা
  • শিশুদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশে পরিবেশ
  • তিনি কোন দলের নয়, সমগ্র বাঙালির
  • ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম অধ্যায়
  • বঙ্গবন্ধুর ফিরে আসা
  • শিক্ষা ও নৈতিকতা
  • কুরবানির সূচনা
  • কুরবানি ও আমাদের করণীয়
  • উন্নয়নের মানবিকতা বনাম গতানুগতিকতা
  • বিশ্বাসের উপলব্ধি
  • নিরাপত্তাহীনতায় নারী
  • স্বাগতম ঈদুল আযহা
  • Developed by: Sparkle IT