মহিলা সমাজ

জলপাথরের খেলা

আয়েশা মুন্নি প্রকাশিত হয়েছে: ১৮-০৬-২০১৯ ইং ০১:০৮:৩০ | সংবাদটি ২২৭ বার পঠিত

প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য আর জলপাথরের লীলাখেলায় মত্ত বিছনাকান্দি। একবার গেলে বারবার যেতে মন চায় সৌন্দর্যের এই লীলাভূমিতে। জায়গাটি আমার পরিবারের মতোই আপন। যেমনটি আমার পরিবার আমার স্বর্গ। তাই পুত্র, কন্যা আর বরসহ প্রকৃতির নেয়ামত সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলায় অবস্থিত বিছনাকান্দি ভ্রমণে ছিল স্বর্গীয় আমেজ।
ড্রাইভিং সিটে উনি মানেই আমার নির্ভারতা ‘পতিজি’। পুত্র, কন্যা পেছনে আর সামনে উনার পাশের সিটে আমি হেল্পার! সকাল নয়টা নাগাদ সিলেট থেকে রওয়ানা হলাম। শহর ছেড়ে কিছুদূর যেতেই ভাঙ্গা রাস্তার খানাখন্দে মোটামুটি ধপাস ধপাস শব্দ। যাক, গন্তব্যে পৌঁছতে গিয়ে সবকটা ঘাট ছুঁয়ে ছুঁয়ে গেছি অনেকটা মিস গাইডের কারণে। প্রথম যেখানটায় গেলাম, সেই জায়গাটার নাম বঙ্গবীর। সেখানে রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা দু’জন পিচ্চিকে জিজ্ঞেস করলে তারা বললে, এটাই শেষ ঘাট। কিন্তু ওখানে গিয়ে দেখি অল্প কয়টা মাত্র নৌকা এবং এখান থেকে নৌপথে বিছনাকান্দির দূরত্ব অনেক।
আসল সত্যটা হচ্ছে, প্রতিটা ঘাটের আগেই লোক দাঁড় করানো আর তারাই বলছে বাকীপথ গাড়ি যাবে না রাস্তা খুবই খারাপ। যাই হোক, এরি মধ্যে থানা পুলিশের একটি টহল গাড়ি ঘাটে এসে থামল। গাড়িতে বসেই দেখেছি, নৌকার অতিরিক্ত ভাড়া নিয়ে যাচ্ছেতাই অবস্থা, বাক-বিতন্ডা চলছে সমান তালে বেড়াতে আসা যাত্রীদের সাথে। কোনভাবেই হয়রানি করা যাবে না বলে পুলিশের হস্তক্ষেপে একটা মীমাংসা হলো। আমার বর নেমেই অফিসারের সাথে কথা বলতেই তিনি বললেন, ‘স্যার, হাদারপাড় থেকে সবচেয়ে কাছে হবে বিছনাকান্দি; ওখানে চলে যান। রাস্তা প্রচন্ড খারাপ তবে যাওয়া যাবে।’ এভাবে প্রায় চার/পাঁচটা ঘাট পার হলাম। তবে রাস্তা শুধু খারাপ না, ভয়াবহ রকমেরই খারাপ।
অবশেষে পৌঁছলাম হাদারপাড়। ঘাটে দেখা পেলাম টুরিস্ট পুলিশের টহলদলের। দায়িত্বরত সাব-ইন্সপেক্টর পূর্ব পরিচিত। আমার বরের অধীনে চাকুরি করেছিল বেশ কয়েক বছর আগে। যাই হোক, উনারাই নৌকা রিজার্ভসহ যাবতীয় ব্যবস্থা করে দিলেন। আমাদের নৌ-ভ্রমণ শুরু হল হাদারপাড় থেকে বিছনাকান্দির উদ্দেশ্যে। বিশাল নৌকার পাটাতনে চেয়ার পাতানো সারি সারিভাবে। যাত্রী কেবল আমরা চারজন; সাথে দু’জন মাঝি। ঘড়ির কাঁটা তখনো বারোটা ছোঁয়ার অপেক্ষায়। তবুও প্রশান্তির বাতাসের সাথে মিলেমিশে একাকার আকাশ, জল আর সবুজ।
এমন উতলা পরিবেশ চারদিকে তাই চেয়ার ছেড়ে মাথায় হ্যাট পরে নৌকার কিনারে গিয়ে বসলাম। ঐ দূরের আকাশ আর সাথে জলের মিলে হয়েছে নীলে সন্তোলন...। নৌকায় জল ভেদ করে ছুটে চলছি যে নদীর বুক চিড়ে সেই নদীটির নাম পিয়াইন।
বর্ষা বলেই ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পাহাড়ি ঝর্ণা থেকে নেমে আসা শীতল জলে পিয়াইন কানায় কানায় পরিপূর্ণ। নদীর দু’পাশের বিস্তীর্ণ সবুজ যেন গালিচা পাতা সবুজের বিছানা। আবার মাঝে মাঝে দেখা যাচ্ছে পাথরের স্তূপ। নৌকার কোণে বসেই দিগন্তে প্রসারিত দৃষ্টিতে আমার মনে হচ্ছিল ঐ দূরে, সবুজ আবৃত্ত সারি সারি পাহাড়ের উচ্চতা যেন মেঘদের ভেসে বেড়ানোতে বাঁধা দিচ্ছে। মাঝে মাঝে পাহাড়ি ঝর্ণাগুলোকেও দূরত্বের কারণে দেখতে খুব রহস্যময় লাগছিলো; মনে হচ্ছিলো এগুলো যেন পাহাড়ের বুকে জমে থাকা স্বচ্ছ বরফের কাঁচ। এ যেন প্রকৃতি তার মায়াজাল বিছিয়ে, মোহনীয় সুরের ছন্দে আমাকে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে বিছনাকান্দি। আমি এতটাই মুগ্ধতায় বুঁদ হয়ে ছিলাম যে, কখন যে মাথায় পরা হ্যাট বাতাসের তোড়ে খুলে নদীতে ভেসে গেছে দূরে টেরই পাইনি! বাচ্চাদের হৈহৈ-তে খেয়াল করলাম। ততক্ষণে বিছনাকান্দির কাছাকাছি পৌঁছে গেছি।
দেখলাম, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের খাসিয়া পাহাড়গুলো ধাপে ধাপে দুইপাশ থেকে এসে এক অস্তিত্বে মিশেছে আর সেই পাহাড়ের খাঁজে মেঘালয়ের সুউঁচ্চ ঝর্ণা পতিত হচ্ছে। পাহাড়ে পাহাড়ে মাখামাখি করে চলছে শুভ্র মেঘের উড়াউড়ি। নৌকা থেকে নামতে জলে পায়ের পাতা ভেজাতেই শিহরিত হলো পুরো শরীর, শিথিলতা যেন পা বেয়ে পুরো অঙ্গে ছড়িয়েছে।
পাথরের উপরে বয়ে চলা স্বচ্ছ জলের ধারা, ছোট বড় মাঝারি শত সহস্র পাথর, ভেসে যাওয়া জলস্রোতে কালের পর কাল ভিজেও পিচ্ছিল হয়নি। পাহাড়, নদী, ঝর্ণা আর পাথরের বিছানায় যেন প্রকৃতি তার মায়াজাল বিছিয়ে রেখেছে। এই স্বচ্ছ জলে গা এলিয়ে কি যে মানসিক প্রশান্তি পেলাম, মনে হচ্ছিল যেন 'জলের চাদরে স্নিগ্ধ বাসর পেতেছি'। দীর্ঘ সময় ধরে চলল এই জলকেলি।
জল পাথরের বিছানায় শুয়ে বসে আমরা চারজন ছবি তুললাম (ফটোগ্রাফার ও আছে ওখানেই)। এই শীতল জলের স্রোতে শরীর এলিয়ে, মন ভিজিয়ে পেলাম পৃথিবীর পরম প্রশান্তি। আর এই প্রশান্তিটুকুই যাবার পথের সকল ভোগান্তি নিমিষেই ভুলিয়ে দিল, ভুলিয়ে দিল জীবনের শত গ্লানিকে। আমার কেবল মনে হচ্ছিলো, একটা জীবন যদি কাটিয়ে দিতে পারতাম প্রকৃতির সৌন্দর্য আলিঙ্গন করে।
উঁচু পাহাড় ঘেরা সবুজের মায়াজাল থেকে নেমে আসা ঝর্ণার অশান্ত শীতল জল; নদীর বুকেই যার গন্তব্য সেই জলে আমার শরীর এলিয়ে পাঁথুরে বালিশে মাথা পেতে উপভোগ করেছি, পাথরগুলোর বুক ছুঁয়ে শীতল জলের বয়ে চলা কল-ধ্বনি, সম্মুখে মন হরণকারী উঁচু পাহাড়ে সবুজের সমাহার। এই জল পাথরের স্বর্গে আমার স্বগোক্তিÑ
‘ঝরনার পাদদেশে পা ভিজিয়ে
মেঘের রাজ্যে স্বপ্নবাসর সাজাই।
জলের হীম ছোঁয়ায় মন জুড়িয়ে
বহতা অথচ শান্ত স্রোতের রূপের লীলায়,
লীন হয় আমার দর্প আর
আমি শিখি ধীর লয়ে বয়ে চলা।’
জাগতিক জীবনের যন্ত্রণার আবার হলো শুরু। উনার তাড়া ‘এবার উঠো ফিরতে হবে, রাস্তা ভাল না।’ আমরা মা আর ছেলে-মেয়ে চূড়ান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও ফিরতি পথ ধরলাম। ফেরার পথে পুরোটা নৌপথ আমি একটি শব্দ কথাও বলিনি। এতটাই আত্মতৃপ্তিতে আমি বিলীন হয়ে গিয়েছিলাম। যাওয়ার পথের বর্ণনায় করা একই নৈসর্গিক শুদ্ধতায় বুদ হয়ে হাদারপাড় ফিরে এলাম।
ক্ষুধায় তখন আমার বরের চোখ-মুখে অন্ধকার। বললো, ‘না খেলে ড্রাইভ করতে পারবো না।’ ঘাটে অপেক্ষারত ট্যুরিস্ট পুলিশ টিম গনি মিয়ার খিচুড়ি এবং আরো শুকনো খাবারের ব্যবস্থা করেছে ইতিমধ্যে। বারবার বিনয়ের সাথে বলছে, যদি আগ থেকে জানিয়ে যেতাম তবে রান্নার ব্যবস্থা করে রাখতো।
খাবার শেষে আবার কংক্রিটের পথে...।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT