উপ সম্পাদকীয়

জীবনে শৃঙ্খলাবোধের প্রয়োজনীয়তা

মোঃ আবদুল আউয়াল প্রকাশিত হয়েছে: ১৯-০৬-২০১৯ ইং ০০:৪২:২৬ | সংবাদটি ১৩২ বার পঠিত

মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। এই কথাগুলো সর্বজন বিদিত ও সর্বজন স্বীকৃত। তাই অন্যান্য প্রাণী থেকে মানুষের পার্থক্য হলো এই যে, মানুষ বুদ্ধিমান ও নিয়ম-শৃঙ্খলার প্রতি পরম শ্রদ্ধাশীল। এই গুণের ফলশ্রƒতিতেই মানুষ স্মরণাতীতকাল থেকেই সমাজ গঠন করে একত্রে পরম আনন্দে ও শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতে অভ্যস্ত হয়েছে। তাই সমাজ জীবনে যেমন ব্যক্তিগত জীবনেও তেমনি মানুষের জন্য নিয়মানুবর্তিতা ও শৃঙ্খলাবোধের প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য। এমনিভাবে জীবন চলার পথে প্রতিটি কাজের জন্যই সুনির্দিষ্ট নিয়ম-কানুন বিদ্যমান। সে নিয়মকেই বলা হয় শৃঙ্খলা। শৃঙ্খলাই জীবনকে সুন্দর, গতিশীল ও সার্থক করে তোলে। এ প্রসঙ্গে আরো উল্লেখ্য যে, সমস্ত বিশ্ব প্রকৃতি এক অদৃশ্য নিয়ম ও শৃঙ্খলার অধীন। যেমন, সৌরজগতের গ্রহ-উপগ্রহ থেকে পৃথিবীর গাছপালা, সূর্যোদয়, সূর্যাস্ত ও ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কীটপতঙ্গ পর্যন্ত একটি নির্দিষ্ট ও কঠোর নিয়ম-শৃঙ্খলায় নিয়ন্ত্রিত। কোথাও এর সামান্যতম ব্যতিক্রম বা বিপর্যয় নেই। ফ্রান্সের স¤্রাট নেপোলিয়নও তাঁর ভাষায় বলেছিলেন, ‘উরংপরঢ়ষরহব রং ঃযব শবু ংঃড়হব ঃড় ংঁপপবংং যিরপয রং পড়সঢ়ঁষংড়ৎু ঃড় ভড়ষষড়ি ঃড় নধষধহপব ঃযব ংুংঃবসং.’-অর্থাৎ শৃঙ্খলা হলো উন্নতির চাবিকাঠি যা প্রক্রিয়াকে সমন্বয় করার নিমিত্তে বাধ্যতামূলক অনুসরণীয়।’ মানব জীবনেও প্রয়োজন সেই কঠোর নিয়মের শাসন।
মানুষের জীবনকে সুন্দর করে গড়ে তুলতে হলে জীবনে শৃঙ্খলাবোধের একান্ত প্রয়োজন। কারণ, শৃঙ্খলাই সৌন্দর্য ও জাতীয় উন্নতির একমাত্র উপায়। কারণ, শৃঙ্খলা ছাড়া মানব জীবন তথা সমাজ জীবন চলতে পারেনা। বিভিন্ন সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানে, পূজা-পার্বন, ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক, সামাজিক অনুষ্ঠান ইত্যাদি সব কিছুই নিয়ম-শৃঙ্খলা অনুযায়ী হয়ে থাকে। নিয়ম-শৃঙ্খলা না থাকলে সমাজে চরম আকারে শান্তি-শৃঙ্খলা বিঘিœত হয়। তাই নিয়ম-শৃঙ্খলা সমাজ জীবনের জন্য এক অপরিহার্য বিষয়। শৃঙ্খলাই সমাজকে সুন্দর ও সার্থক করে তোলে। আর শৈশবকালই মানব জীবনে প্রবেশের সিংহদ্বার। কাজেই শৈশবের শুভ লগ্নেই শৃঙ্খলা ও নিয়মানুশীলনের শিক্ষা গ্রহণ একান্ত প্রয়োজন। মানব জীবনে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে হলে চাই নিয়মানুবর্তিতা ও শৃঙ্খলাবোধের নিখুঁত ও আন্তরিক অনুশীলন। কঠিন নিয়মের বাঁধনে বাঁধতে না পারলে পরিবারে ভাঙ্গন ধরে, সমাজ টেকেনা, রাষ্ট্র পর্যন্ত বিপর্যস্ত হয়, প্রতিষ্ঠান অচল হয়ে পড়ে। শৈশব থেকে প্রতিটি মানুষকে সমাজে বিচরণ করতে হয় বিধায় গ্রহণ করতে হয় নানা সামাজিক দায়িত্ব। কিন্তু সমাজের প্রতিটি মানুষ যদি খেয়াল-খুশিমত যথেচ্ছাচার শুরু করে, তাহলে সমগ্র সমাজটাই উচ্ছৃঙ্খলতার উন্মাদাগারে পরিণত হতে বাধ্য। তাই সামাজিক জীবনে শৃঙ্খলা বিধান অপরিহার্য। ছাত্র জীবনেও শৃঙ্খলাবোধের প্রয়োজনীয়তা সীমাহীন। কারণ, ছাত্র জীবন মানব জীবনের উৎকৃষ্ট সময়। এ সময়ই যথাযথভাবে জীবন গঠন পূর্বক পরবর্তীকালে যথার্থ মানুষ হয়ে ওঠার উৎকৃষ্ট সময়।
তাই সৈন্যদলের মত ছাত্রদেরকেও মেনে চলতে হয় কঠোর নিয়ম ও শৃঙ্খলা। নিয়ম-শৃঙ্খলার গন্ডীর মধ্যে গড়ে তোলে যেমন সেনাবাহিনীকে যে কোন পরিস্থিতির মোকাবেলা ও জয়ের সম্মুখীন করে, তেমনিভাবে নিয়মনিষ্ঠা ও শৃঙ্খলাবোধ ছাত্রদের জীবন চলার পথকে গৌরবোজ্জ্বল করে ও সফলতা এনে দেয়। অবশ্য সব ছাত্রেরই মেধা একরকম থাকেনা, আবার আর্থিক সামর্থও সকলে এক রকম থাকেনা, কিন্তু ছাত্র যদি নিয়মনিষ্ঠ জীবন যাপন করে, শিক্ষা ক্ষেত্রে যদি উপযুক্ত শৃঙ্খলা মেনে চলে, জীবন যাপনেও যদি তার সঠিক প্রয়োগ করে তাহলে সে সকল ছাত্ররাও ভবিষ্যতে শ্রেষ্ঠ নাগরিক ও শ্রেষ্ঠ দেশপ্রেমিকরূপে গড়ে ওঠে দেশমাতৃকার সেবায় আত্মনিয়োগ করে দেশের আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা সকলের স্মৃতির পাতায় চিরস্মরণীয় হয়ে থাকতে পারে। অপরপক্ষে যে সকল ছাত্র-ছাত্রী সর্বদাই নিয়ম-শৃঙ্খলার প্রতি চরম উদাসীন এবং নিয়মিত পড়াশুনা করেনা, তাদেরকে জীবনভর অনুতাপের অনলে তিলে তিলে দগ্ধ হতে হয়। তাই বিদ্যালয়ের সকল নিয়ম-শৃঙ্খলা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলা প্রতিটি বিদ্যার্থীর পবিত্র দায়িত্ব ও কর্তব্য।
এ প্রেক্ষাপটে আরো একটি বিষয় উল্লেখ করতে চাই যে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছাড়াও এ জীবজগতে নিয়ম-শৃঙ্খলা শিক্ষার অনুকরণীয় অনেক মাধ্যম রয়েছে। যেমন-পাখিরা সকালে ওঠে কলগান করে, রাত্রে বিশ্রাম নেয়। মৃদুমন্দ বাতাসের পরশে নদীর বুকে কলতান শুরু হয়, আবার বায়ুপ্রবাহ বন্ধ হওয়ার সাথে সাথে নদীর বুক শান্ত হয়ে যায়। মৌমাছি ও পিপীলিকা প্রভৃতি ক্ষুদ্র প্রাণিদের মাঝেও নিয়ম-শৃঙ্খলার কোনই ব্যতিক্রম দেখা যায় না। তাছাড়া, বনের হরিণ, ভেড়া ও অন্যান্য প্রাণি দলবদ্ধভাবে তাদের নিজ নিজ দলনেতার আদেশ পালন করে। যেমন-একটা কাককে যদি কেউ আঘাত করে কিংবা হত্যা করে মহল্লার সকল কাক দলবদ্ধভাবে এর তীব্র প্রতিবাদ করে। আবার শীতকালে অতিথি পাখি দলবদ্ধভাবে আমাদের দেশে উড়ে আসে কিন্তু শীত শেষে শৃঙ্খলার সহিত একইভাবে নিজ দেশে উড়ে যায়। সামান্য পিঁপড়া ও মৌমাছিরাও সুশৃঙ্খলভাবে একতাবদ্ধ হয়ে মিলেমিশে শান্তিপূর্ণ জীবন যাপন করে। কাজেই আমরা পশুপাখি ও ক্ষুদ্র প্রাণির জীবন যাত্রার প্রক্রিয়া ও পদ্ধতি থেকেও অনায়াসে নিয়মানুবর্তিতা ও শৃঙ্খলার মৌলিক শিক্ষা অনায়াসে গ্রহণ করতে পারি। কাজেই জীবন চলার প্রতিটি ক্ষেত্রে আমাদের শৃঙ্খলাবোধ ও নিয়মানুবর্তিতার প্রতি অতন্দ্র প্রহরীর ন্যায় সজাগ থাকতে হবে অন্যথায় ব্যথাহতচিত্তে জীবনভর পরাজয়ের গ্লানি সহ্য করতে হবে। এ পৃথিবীতে যাঁরা বড় হয়েছেন, প্রাতঃস্মরণীয় হয়েছেন, তাঁরা জীবন চলার সর্বক্ষেত্রে কঠোরভাবে শৃঙ্খলা ও নিয়মনীতি পালন করেছেন। সে পথ লক্ষ্য করে সে নীতি অনুসরণকল্পে আমরাও অটল ও অবিচল থাকব এ হলো আমাদের প্রতিশ্রুতি।
লেখক : কলামিস্ট

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বৃক্ষরোপণ
  • জলবায়ু পরিবর্তনই আসল সমস্যা
  • কিশোর অপরাধ
  • আ.ন.ম শফিকুল হক
  • হোটেল শ্রমিকদের জীবন
  • বিশেষ মর্যাদা বাতিল ও কাশ্মীরের ভবিষ্যত
  • বাংলাদেশে অটিস্টিক স্কুল ও ডে কেয়ার সেন্টার
  • বেদে সম্প্রদায়
  • গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে সুপারিশমালা
  • ত্যাগই ফুল ফুটায় মনের বৃন্দাবনে
  • প্রকৃতির সঙ্গে বিরূপ আচরণ
  • ঈদের ছুটিতেও যারা ছিলেন ব্যস্ত
  • সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের বর্ষপূর্তি : প্রাপ্তি ও প্রত্যাশা
  • আইনজীবী মনির উদ্দিন আহমদ
  • শিশুদের জীবন গঠনে সময়ানুবর্তিতা
  • শাহী ঈদগাহর ছায়াবীথিতলে
  • কিশোর-কিশোরীদের হালচাল
  • বলকানস : ইউরোপের যুদ্ধক্ষেত্র
  • সন্তানের প্রতি অভিভাবকের দায়িত্ব
  • শিক্ষার হার এবং কর্মসংস্থান প্রসঙ্গ
  • Developed by: Sparkle IT