সম্পাদকীয়

ভিটামিন এ প্লাস ক্যাম্পেইন ও সতর্কতা প্রসঙ্গ

সৈয়দ আছলাম হোসেন প্রকাশিত হয়েছে: ১৯-০৬-২০১৯ ইং ০০:৪৭:২৩ | সংবাদটি ১৪৭ বার পঠিত

জাতীয় পুষ্টি সেবা ও জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠান স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এর অধীনে আগামী ২২ জুন এক যোগে সারা দেশে ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন (১ম রাউন্ড) ২০১৯ অনুষ্ঠিত হবে। এতে ৬-১১ মাস বয়সী শিশুদের লাল রং এর পরিবর্তে নীল রং এর ক্যাপসুল খাওয়ানো হবে। পাশাপাশি ১৫-৫৯ মাস বয়সী শিশুকে লাল রংয়ের একটি ভিটামিন এ প্লাস খাওয়ানো হবে। এ বিষয়ে সচেতনতার জন্য সরকারি বেসরকারি এক সাথে পরামর্শ দেয়া হয় শিশুর বয়স ৬ মাস পূর্ণ হলে মায়ের দুধের পাশাপাশি পরিমাণ মত ঘরে তৈরি সুষম খাবার খাওয়ান। ভিটামিন এ অপুষ্টিজনিত অন্ধত্ব থেকে শিশুদের রক্ষা করে, শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে, ডায়রিয়ার ব্যাপ্তিকাল ও জটিলতা কমায় এবং শিশু মৃত্যুর ঝুঁকি কমায়। আমাদের দেশে ভিটামিন ‘এ’ এর অভাব জনিত সমস্যা প্রতিরোধে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে জাতীয় পুষ্টি সেবা, জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠান বছরে দুইবার জাতীয় ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন করে থাকে। যার কারণে দেশের প্রতিটি শিশু ভিটামিন ‘এ’ খাওয়ার সুযোগ পায়। ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইনের উদ্দেশ্য হল ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সি শিশুদের মধ্যে ভিটামিন ‘এ’ এর অভাবজনিত রাতকানা রোগের প্রাদুর্ভাব এক শতাংশের নীচে কমিয়ে আনা এবং তা অব্যাহত রাখা। ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে অপুষ্টিজনিত মৃত্যু প্রতিরোধ করা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের মাঠকর্মীগণ এবং এনজিওকর্মীগণ গত ক্যাম্পেইনের পূর্বে তৈরীকৃত ওয়ার্ডম্যাপ আপডেট করেন। পূর্বে ম্যাপ তৈরি না থাকলে মাঠ কর্মীগণ নতুন ওয়ার্ড ম্যাপ তৈরি করে কাজ শুরু করেন যাতে একটি শিশুও ভিটামিন ‘এ’ থেকে বাদ না পড়ে। ম্যাপে বিভিন্ন এলাকা এবং ঘরবাড়ি বিশেষ করে সম্ভাব্য বাদপড়া শিশু/এলাকাসমূহ (যথা নদী, হাওড়, চর এলাকা, নির্মাণ এলাকা ইত্যাদি) সতর্কতার সাথে চিহ্নিত করে কাজ করা হয়। শিশু নিবন্ধনের জন্য বাড়ি পরিদর্শনের সময় ভিটামিন ‘এ’ এর অভাব জনিত সমস্যা প্রতিরোধে নি¤েœর বার্তাসমূহ প্রচার করা হয়। যা ভিটামিন ‘এ’ বার্তা নামে পরিচিত।
১। ভিটামিন ‘এ’ অপুষ্টিজনিত অন্ধত্ব থেকে শিশুদের রক্ষা করে শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে ডায়রিয়ার ব্যপ্তিকাল ও জটিলতা কমায় এবং শিশুমৃত্যুর ঝুকি কমায়।
২। জেরোফব্যালমিয়া (রাতকানা ও বিটটস স্পট) দীর্ঘমেয়াদি ডায়রিয়া, হাম ও মারাত্মক অপুষ্টি আক্রান্ত শিশুকে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়ানো হবে।
৩। জাতীয় ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইনের দিন ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানোর জন্য আপনার ৬-৫৯ মাস বয়সী শিশুকে নিকটস্থ ক্যাম্পেইন কেন্দ্র নিয়ে আসবেন।
৪। সকল ক্যাম্পেইন কেন্দ্র সকাল ৮টা থেকে ৪টা পর্যন্ত খোলা থাকবে।
৫। যদি কোন শিশু গত ৪ মাসের মধ্যে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খেয়ে থাকে তবে সেই শিশুকে ক্যাম্পেইনে ভিটামিন ‘এ’ খাওয়ানো যাবে না।
৬। ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল ভরাপেটে খাওয়ানো ভাল।
৭। ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল শিশুর জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ।
৮। ভিটামিন ‘এ’ খাওয়ালে পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া হওয়ার তেমন কোনো ঝুকি নেই, পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া হলে নিকটস্থ স্বাস্থ্য কেন্দ্রে যাবেন।
৯। আপনি যেখানেই থাকেন না কেন দেশে যে কোনো ক্যাম্পেইন কেন্দ্র থেকে আপনার শিশুকে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়াতে পারেন।
১০। ভ্রমণে থাকাকালীন সময়ে আপনি রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল, ফেরিঘাট ও লঞ্চঘাটে অবস্থিত ক্যাম্পেইন কেন্দ্র থেকে আপনার শিশুকে ভিটামিন ‘এ’ খাওয়াতে পারবেন।
১১। মারাত্মক অসুস্থ শিশুকে স্বাস্থ্যকর্মী/চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ভিটামিন ‘এ’ খাওয়াতে হবে।
ভিটামিন ‘এ’ প্লাস পুষ্টি বার্তা সমূহ নিচে উল্লেখ করা হল-
(১) জন্মের পর পরই নবজাতককে শালদুধ সহ মায়ের দুধ খাওয়ানো শুরু করুন। (২) জন্মের পর প্রথম ৬ মাস (১৮০) দিন শিশুকে শুধু মাত্র মায়ের দুধ খাওয়ান। পানি, মধু, চিনি বা মিসরির পানি ইত্যাদি খাওয়ানো যাবেনা। (৩) শিশুর বয়স ৬ মাস পূর্ণ হলে মায়ের দুধের পাশাপাশি পরিমাণ মত ঘরে তৈরি সুষম খাবার খাওয়ান। (৪) মা ও শিশুর জন্য গর্ভবতী এ পুয়াতি মায়েদের স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি পরিমাণে ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধ প্রাণিজ খাবার (মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, কলিজা ইত্যাদি) ও উদ্ভিজ্জ খাবার (হলুদ ফলমূল ও রঙিন শাক সবজি) খেতে দিন। (৫) পরিবারের রান্নায় ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধ ভোজ্য তেল ব্যবহার করুন। ক্যাম্পেইনে কয়েকগুলো সতর্কতা আছে যা না মানলে অনেক ক্ষতিকর সমস্যায় পড়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই এই নিয়ম অবশ্যই মেনে চলতে হবে।
(১) ভিটামিন ক্যাপসুল অবশ্যই প্রশিক্ষিত মাঠকর্মী/এনজিওকর্মী/স্বেচ্ছাসেবী দ্বারা খাওয়াতে হবে। কোনো অবস্থাতেই অভিভাবক/শিশুর হাতে ভিটামিন ‘এ’ দেওয়া যাবে না (২) কান্নারত অবস্থায় কিংবা জোর করে শিশুকে ভিটামিন ‘এ’ খাওয়ানো যাবে না। (৩) ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুলের মুখ কাচি দিয়ে কেটে ক্যাপসুলের ভেতরের তরল ভিটামিন ‘এ’ শিশুকে খাওয়াতে হবে। (৪) কোনো ভাবেই শিশুকে আস্ত বা খোসা সহ ভিটামিন ‘এ’ খাওয়ানো যাবেনা, (৫) সবগুলো ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল একসাথে কেটে রাখা যাবেনা। এতে ক্যাপসুলের ভেতরের তরল ভিটামিন ‘এ’ নষ্ট হয়ে যাবে। (৬) প্রতিটি শিশুকে খাওয়ানোর আগে ১টি করে ক্যাপসুলের মুখ কেটে ভেতরের সম্পূর্ণ তরলটুকু সঙ্গে সঙ্গে খাইয়ে দিতে হবে। (৭) ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানোর পর একটি নির্দিষ্ট স্থানে ক্যাপসুলের খোসাটি রাখতে হবে। (৮) কোনো শিশুই যেন ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়া থেকে বাদ না পড়ে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
সতর্ক থাকতে হবে যেন কোন শিশু নিজ হাতে ২/৩টি ভিটামিন ‘এ’ খাওয়ার সুযোগ না পায়। ভিটামিন ‘এ’ সতর্কতার সাথে খাওয়াতে হবে।
লেখক : কলামিস্ট।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT