উপ সম্পাদকীয়

বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ এবং বাংলাদেশের বাস্তবতা

সুধীর সাহা প্রকাশিত হয়েছে: ২০-০৬-২০১৯ ইং ০১:২০:১২ | সংবাদটি ৯৮ বার পঠিত

বাংলাদেশের প্রচুর ছাত্রছাত্রী অনেক বছর ধরেই বাংলাদেশের বাইরে পড়াশোনার জন্য যাচ্ছে। বাইরের কোনো স্কুল, কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রাথমিক অধ্যায় হলো ভর্তির আবেদন করা। ভর্তির আবেদন করতে একটি ফি জমা দিতে হয়। হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী যারা বিদেশে পড়তে যেতে চায়, তারা ভর্তি ফি পাঠানোর সমস্যায় ভুগছে। বাংলাদেশ থেকে তারা ভর্তি ফির সামান্য পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রাও পাঠাতে সক্ষম হচ্ছে না। কেননা বাংলাদেশে কঠিন একটি বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইন আছে। এ আইনটির নাম হয়তো অনেকের কাছে দুর্বোধ্য লাগতে পারে। আইনটি হলো ‘দ্য ফরেন এক্সচেঞ্জ রেগুলেশন অ্যাক্ট, ১৯৪৭’। বুঝতেই পারছেন, এ আইনটি আমাদের করা নয়, ১৯৪৭ সালে তৎকালীন ভারতবর্ষে এবং পাকিস্তানে করা হয়েছিল। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও এ আইন আজ পর্যন্ত সে নামেই চলছে। যে ভারতবর্ষে এ আইন প্রণীত হয়েছিল, সেই ভারত এবং পাকিস্তান কিন্তু এমন একটি কঠিন আইনের মধ্যে এখন আর নেই। তাদের দেশে এ আইনটি সহজ করা হয়েছে। ভারতে যে কোনো নাগরিক প্রতিবছর একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা তার ইচ্ছানুযায়ী বাইরে পাঠাতে পারছে। পাকিস্তানের মানুষও তাদের দেশ থেকে বৈদেশিক মুদ্রা পাঠাতে এখন আর কোনো রকম বাধার সম্মুখীন হচ্ছে না। পড়াশোনা, চিকিৎসা, ব্যবসা কিংবা যে কোনো কারণেই ভারত কিংবা পাকিস্তানের যে কোনো নাগরিক বৈদেশিক মুদ্রা বাইরে পাঠাতে কোনো রকম সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে না। তাদের স্ব-স্ব দেশের সংশ্লিষ্ট আইন সময়ের উপযোগী করে সংশোধন করে নিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ আজও ১৯৪৭ সালে হওয়া আইনটি সেভাবেই ধরে রেখেছে। কোনো পরিবর্তন নেই, সংশোধন নেই। এ আইনের কারণে কোনো নাগরিক বাংলাদেশ থেকে কোনো বৈদেশিক মুদ্রা বাইরে পাঠাতে পারবে না। বিশেষ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনসাপেক্ষে শিক্ষা ও চিকিৎসার জন্য বৈদেশিক মুদ্রা বাইরে নেওয়ার ব্যবস্থা থাকলেও তার পরিমাণটি আবেদনকারীদের জন্য সব সময় অপ্রতুল হয়ে থাকে। বাংলাদেশ ব্যাংক চিকিৎসার খরচের জন্য এবং পড়াশোনার টিউশন ফির জন্য অনুমোদন দিলেও বাড়তি কোনো খরচের জন্য অনুমোদন দেয় না। ফলে চিকিৎসা করতে রোগীর সঙ্গে কোনো আত্মীয় গেলে তার থাকা-খাওয়ার অর্থ তারা বৈদেশিক মুদ্রায় নিতে পারে না। অন্যদিকে, ছাত্রছাত্রীর টিউশন ফির বাইরে যে খরচ হবে তার জন্যও কোনো বৈদেশিক মুদ্রার অনুমোদন পাওয়া যায় না।
আমদানিকারকগণ আমদানি করার ক্ষেত্রে এলসি করে বৈদেশিক মুদ্রা পাঠাবার সুযোগ পায়। কিন্তু সেই এলসি করার সুযোগ আসে আমদানিকৃত মালামাল যখন জাহাজযোগে বাংলাদেশে পৌঁছে যায় তারপর। বিদেশি প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান প্রায়শই বাংলাদেশের খদ্দেরের মালামাল প্রস্তুত করার শুরুতে অগ্রিম কিছু অর্থ দাবি করে। কিন্তু বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৪৭ বলবৎ থাকায় সেই অগ্রিম অর্থ পাঠাবার কোনো আইনগত ব্যবস্থা বাংলাদেশের আমদানিকারকদের কাছে নেই। এর ফলে অগ্রিম অর্থ পাঠাতে ব্যর্থ হওয়ায় অনেক আমদানিকারক ঠিক সময়ে মালামাল আমদানি করতে ব্যর্থ হচ্ছে। অন্যরা আবার ভিন্নপথ গ্রহণ করে অবৈধভাবে অর্থ পাঠাচ্ছে।
পৃথিবীর প্রায় সব দেশে আজ বাংলাদেশের নাগরিকরা বসবাস করছে। কেউ স্থায়ীভাবে, কেউ-বা অস্থায়ীভাবে। কেউ চাকরি নিয়ে, আবার কেউ-বা উচ্চশিক্ষা গ্রহণের কারণে। তবে কারণ যা-ই হোক, আজকের দুনিয়ার যে প্রান্তেই আপনি যাবেন কোনো না কোনো বাঙালির দেখা আপনার মিলবেই। ছড়িয়ে গেছে বাংলাদেশের মানুষ আজ বিশ্ব সমাজে। সাধারণত যুবক-যুবতিরাই বেশি সংখ্যায় বিদেশে পাড়ি দিয়েছে। এমন অনেক পরিবার রয়েছে, যেখানে বাংলাদেশে শুধু তাদের বৃদ্ধ মা-বাবা বসবাস করছেন। এদের বাবা-মা একসময় বাংলাদেশে তাদের স্থায়ী সম্পত্তি বিক্রি করে দেন। তখন বাবা-মা চান তাদের সম্পত্তির বিক্রি করা অর্থ থেকে একটি অংশ কিংবা পুরো অংশ তাদের বিদেশে বসবাস করা সন্তানদের পাঠাবেন। কিন্তু এক্ষেত্রেও বাধা হয়ে দাঁড়ায় ওই বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইন। তারা কোনো অর্থই আইনগত পথে তাদের ছেলেমেয়েদের পাঠাতে পারে না। অন্য আরো একটি উদাহরণ দিচ্ছি এ ধরনের সমস্যার ক্ষেত্রে। আবুল বরকত মৃত্যুবরণ করেছেন প্রায় দশ বছর আগে। মা ছালেহা বয়সের ভারে হঠাৎ অসুস্থ। বাংলাদেশে নিকটতম আত্মীয় বলে কেউ নেই তাদের। দুভাই আমেরিকাতে থাকেন সপরিবারে। মায়ের অসুস্থতার খবর পেয়ে ছুটে আসেন দুভাই। কিন্তু এসে আর কোনো লাভ হয় না। মায়ের সঙ্গে শেষ দেখা হলেও মাকে তারা বাঁচাতে পারেন না। কয়েক দিন শোকের ঘোরেই কাটল তাদের। তারপর একসময় আবার বাস্তবের ধাক্কায় সবকিছু গুছিয়ে নিতে চাইলেন। মা-বাবার রেখে যাওয়া বাড়িটি তারা বিক্রি করে দিতে চাইলেন। কিন্তু তারপর? বিক্রি করা টাকা তো তারা আমেরিকাতে নিতে পারবেন না। বাংলাদেশ থেকে তো কোনো বৈদেশিক মুদ্রা আমেরিকাতে নেওয়ার সুযোগ নেই। তারা এদিক-ওদিক গেলেন, আইনজীবীদের পরামর্শ নিলেন। কিন্তু না, শক্ত আইন এটি। একটি ডলারও তারা নিতে পারবেন না। তাহলে তারা কী করবেন?
এখন মূল প্রশ্নে আসি। ব্যবসা, ভ্রমণ, উচ্চতর শিক্ষা, চাকুরি, চিকিৎসা এসব প্রয়োজনে মানুষকে সব সময়ই দেশের বাইরে যেতে হয়। সারা পৃথিবীকে বর্তমান সময়ে ধরা হয় একটি গ্লোবাল ভিলেজ। আজ বাংলাদেশ, কাল ভারত, পরের দিন ইউরোপ-আমেরিকা। এমনভাবেই তো আজকের উন্নত মানুষ চলাচল করছে। বিস্তার ঘটেছে মানুষের চলাচলে। দেশ কিংবা মানুষ আজ আর থেমে নেই সেই ১৯৪৭ সালে। চিকিৎসার জন্য তো অনেক সময় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দেশ ছাড়তে হয়। এত দ্রুত বৈদেশিক মুদ্রার অনুমোদন পাওয়ার কোনো পদ্ধতি কিংবা নজির বাংলাদেশে নেই। তবে সিঙ্গাপুর, ভারত, ব্যাংকক কিংবা অন্য কোনো দেশে চিকিৎসার জন্য দ্রুত যেতে হলে হাসপাতালের খরচ চালানোর সমাধানটি কীভাবে হবে তা কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ভাবতে হবে। অন্যদিকে, ব্যক্তিমালিকানাধীন সমপত্তি বিক্রি করে তার অর্থ যদি সেই ব্যক্তি বিদেশ নিতে চান কিংবা পাঠাতে চান তার কোনো স্বজনকে, তাহলে তা তিনি কীভাবে পারবেন তাও ভাবতে হবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে। কেননা সম্পত্তি কিংবা টাকার মালিকানা সম্পূর্ণভাবেই ব্যক্তির এবং তিনি তা খরচের কিংবা প্রেরণের কিংবা দানের সম্পূর্ণভাবেই অধিকার রাখেন। তার টাকার ওপর তার অধিকার অস্বীকার করা হচ্ছে কি না এটিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ভেবে দেখতে হবে। বৈদেশিক মুদ্রার ক্ষেত্রে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে কিংবা আজকের বাংলাদেশে সেই ১৯৪৭ সাল থেকে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া আছে। বাস্তবে কি সেভাবেই হচ্ছে, যা আইন বলছে? নাকি কোথাও কোথাও কখনো কখনো তার ব্যত্যয় ঘটছে? সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে গভীরভাবে তা ভাবতে হবে। টাকা ফুটবল কিংবা ক্রিকেট খেলার বলের মতো গড়াতে পছন্দ করে। ট্র্যাক না পেলে ট্র্যাকের বাইরেও গড়াতে চায় বল। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার ক্ষেত্রে এমন কিছুই কি হচ্ছে? সবই হচ্ছে, শুধু বাংলাদেশের ব্যাংক এবং সরকার কিছু আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
ভাবনার দিন এসেছে ১৯৪৭ সালের বৈদেশিক মুদ্রাবিষয়ক আইনটির সংস্কার প্রয়োজন কি না, ভাবনার সময় এসেছে বৈদেশিক মুদ্রা খোলা বাজারে ছেড়ে দিয়ে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের অবস্থান অন্যান্য দেশের কাতারে নেওয়া যায় কি না, ভাবনার সময় এসেছে ব্যক্তির অর্জিত অর্থ বিদেশ প্রেরণের ক্ষেত্রে নিষেধজনিত এই অসম আইনটি বাতিল কিংবা সংস্কার করা যায় কি না। ভারতের পথ অনুসরণ করা যেতে পারে যদি কর্তৃপক্ষ মনে করেন। পুরোপুরি খুলে দেওয়ার অবস্থায় বাংলাদেশ এখনো আসেনি। সেক্ষেত্রে ভারতের মতো বছরে একটি সীমারেখা ধরে দেওয়া যেতে পারে। তবে এ কথা এখন ভাবতেই হবে যে, বিংশ শতাব্দীর আজকের দিনে ১৯৪৭ সালের বৈদেশিক মুদ্রা প্রেরণের বাধাকে আধুনিক এবং সংবিধানসম্মত গতিধারা সম্পন্ন আইন বলার কোনো সুযোগ নেই। বাংলাদেশ উন্নত দেশের স্বপ্ন দেখছে। উন্নত দেশের আদলে সবকিছুকে দেখতে হলে এই বৈদেশিক মুদ্রা চলাচলের আধুনিকরণের বাইরে বাংলাদেশকে রাখা যাবে না। সারা পৃথিবীতেই আজ বৈদেশিক মুদ্রা চলাচলের ওপর কোনো বিধিনিষেধ নেই এবং তাতে তাদের দেশের আর্থিক লাভ ছাড়া ক্ষতিও হচ্ছে না। ব্যক্তির টাকা ব্যক্তি যেভাবে খুশি সেভাবেই রাখতে পারে ব্যাংকে রাখতে পারে, সমপত্তি কিংবা ব্যবসায় জোগান দিতে পারে কিংবা দেশের বাইরে পাঠাতে পারে। টাকাটা যেহেতু তার, এটা নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিপূর্ণ অধিকার তার থাকাটাই কি স্বাভাবিক নয়? অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, আইন মন্ত্রণালয় বিষয়টি নিয়ে ভাববে কি?

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বৃক্ষরোপণ
  • জলবায়ু পরিবর্তনই আসল সমস্যা
  • কিশোর অপরাধ
  • আ.ন.ম শফিকুল হক
  • হোটেল শ্রমিকদের জীবন
  • বিশেষ মর্যাদা বাতিল ও কাশ্মীরের ভবিষ্যত
  • বাংলাদেশে অটিস্টিক স্কুল ও ডে কেয়ার সেন্টার
  • বেদে সম্প্রদায়
  • গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে সুপারিশমালা
  • ত্যাগই ফুল ফুটায় মনের বৃন্দাবনে
  • প্রকৃতির সঙ্গে বিরূপ আচরণ
  • ঈদের ছুটিতেও যারা ছিলেন ব্যস্ত
  • সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের বর্ষপূর্তি : প্রাপ্তি ও প্রত্যাশা
  • আইনজীবী মনির উদ্দিন আহমদ
  • শিশুদের জীবন গঠনে সময়ানুবর্তিতা
  • শাহী ঈদগাহর ছায়াবীথিতলে
  • কিশোর-কিশোরীদের হালচাল
  • বলকানস : ইউরোপের যুদ্ধক্ষেত্র
  • সন্তানের প্রতি অভিভাবকের দায়িত্ব
  • শিক্ষার হার এবং কর্মসংস্থান প্রসঙ্গ
  • Developed by: Sparkle IT