উপ সম্পাদকীয়

ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি

বদরুল হাসান প্রকাশিত হয়েছে: ২০-০৬-২০১৯ ইং ০১:২২:৩৯ | সংবাদটি ৯৪ বার পঠিত

বিগত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশক থেকে দেশে উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত হতে শুরু করে। বলা হয়ে থাকে, এরপর প্রতি দশকে প্রবৃদ্ধির হার গড়পড়তা এক শতাংশ করে অতিরিক্ত যুক্ত হতে থাকে। কেইন্সীয় তত্ত্ব অনুযায়ী সরকারি বিনিয়োগ বাড়িয়ে দেশের উন্নয়ন অভিযাত্রা শুরু হলেও বেসরকারি বিনিয়োগও এ ক্ষেত্রে মূল্যবান অবদান রাখে। বিশ্বের সর্বত্র বেসরকারি খাতকে উন্নয়নের ইঞ্জিন আখ্যা দেওয়া হয়। সরকারি নিয়ন্ত্রণের ঘোর সমর্থক সমাজতান্ত্রিক চীনেও সাংস্কৃতিক বিপ্লবোত্তর সময়ে দেং জিয়াও পেংয়ের হাত দিয়ে এই ইঞ্জিন ফোঁস ফোঁস করে গর্জে ওঠে। আমাদের সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায়ও এই ইঞ্জিনের আক্ষরিক স্বীকৃতি রয়েছে। কিন্তু উন্নয়নের প্রাথমিক পর্যায়ে ভালো অবদান রাখতে সমর্থ হলেও এখন এ খাত অনেকটা স্থবিরতায় ভুগছে। এ খাতের বিনিয়োগ ২১/২৩ শতাংশের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। অথচ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের এ পর্যায়ে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা আরও বেশি।
বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য প্রয়োজন সহজে ব্যবসা করার পরিবেশ ও পুঁজির নিরাপত্তা বিধান। উন্নয়নের ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব সাফল্য প্রদর্শন সত্ত্বেও বাংলাদেশ এক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে; সহজে ব্যবসা করার সূচকে এবারে (২০১৯) ১৯০টি দেশের মধ্যে তার অবস্থান দাঁড়িয়েছে ১৭৬তম। অথচ যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানের অবস্থান ১৬৭তম। দশটি পরিমাপকের ভিত্তিতে মূল্যায়িত এ সূচকের মধ্যে ব্যবসা শুরু করা, ঋণ পাওয়া, সংখ্যালঘিষ্ঠ বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা প্রদান, পূর্তকাজের অনুমতি প্রদান এবং আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্য সম্পাদন পরিমাপকে এবার বাংলাদেশের আরও অধোগতি হয়েছে। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিআইডিএ বা বিডা) অবশ্য আশাবাদ ব্যক্ত করছে যে, তাদের অ্যাকশন প্লান বাস্তবায়িত হলে আগামী প্রতিবেদনে দেশের অবস্থান ১০০-এর মধ্যে চলে আসবে। তবে সমস্যা হলো এই যে, বিডার কার্যক্রম প্রধানত বিদেশি পুঁজি আকর্ষণকেন্দ্রিক; দেশি পুঁজির অপগমন রোধ ও বিনিয়োগ এ পরিস্থিতিতে কতটুকু উৎসাহিত হবে, তা অবশ্যই ভাবনার বিষয়। সম্পত্তি নিবন্ধন, বিদ্যুৎ সংযোগ ও কর প্রদানের ক্ষেত্রে সামান্য উন্নতি করলেও প্রকৃত অবস্থা এখনো উৎসাহব্যঞ্জক কিছু নয়।
পুঁজির বিকাশ ঘটে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারের মাধ্যমে। পুঁজি আবার বিনিয়োগ বাড়ায়, বৃদ্ধি করে কর্মসংস্থান। এভাবে দারিদ্র্যের দুষ্ট চক্রের বিপরীতে সমৃদ্ধির এক শিষ্ট চক্র তৈরি হয়। একসময় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতবর্ষে নতুন নতুন ব্যবসার দ্বার উন্মোচন করত আর লন্ডন স্টক একচেঞ্জে তার শেয়ারের দামের উল্লম্ফন ঘটত। ব্যবসা করতে এসে ইংরেজরা একসময় আমাদের শাসক বনে যায়। আমরা ভারতবাসী হয়ে যাই অচ্ছুত প্রজা বা নেটিভ। আমাদের পুঁজি হবে কোত্থেকে? ব্যতিক্রম ছিল মাড়োয়ারি জনগোষ্ঠী আর মুসলমানদের মধ্যে ইসমাইলি সম্প্রদায়। তারা ‘বাণিজ্যে বসতি লক্ষ্মী’র সন্ধান পায়। বাঙালিরা তাদের ধারেকাছে পৌঁছাতে পারে না। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশদের কাছ থেকে আমরা যখন আইনি স্বাধীনতা লাভ করি, তখন পাকিস্তান নামক ভূখ- থেকে মাড়োয়ারি পুঁজিপতিদের হিজরত শুরু হয়। নতুন শাসকগোষ্ঠীর মদদপুষ্ট আদমজী, বাওয়ানি, ইস্পাহানীরা সে শূন্যস্থান দখল করে স্বল্প সময়ে ফুলেফেঁপে ওঠে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ব্যবসায়ীদের ভাগ্যে সে সুযোগ ধরা দেয় সামান্যই; পাকিস্তানের ধনকুবের ২২ পরিবারের মধ্যে তাদের সংখ্যা দাঁড়ায় মাত্র ২। তৎকালীন পাকিস্তানের শিল্পায়ন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও কর্মসৃজনে অবদানের জন্য খ্যাতির সঙ্গে এই ধনকুবের পরিবারগুলো বৈষম্যজনিত কুখ্যাতিও অর্জন করে।
বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থার এন্তার পরিবর্তন হয়েছে। এখন হাজার হাজার ধনকুবের দেশে তৈরি হয়েছে; তাদের কিছু অর্থ বিনিয়োগ হচ্ছে, বেশির ভাগের পাচার হওয়ার অভিযোগ আছে। ২০১৫ সালে দেশ থেকে ৫.৯ বিলিয়ন ডলার পুঁজি পাচারের খবর প্রকাশ করে ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টার (২৯/০১/২০১৯)। বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশের অভাব যে এ পুঁজি পাচারের অন্যতম প্রধান কারণ, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। দু’একটি দৃষ্টান্ত থেকে এর ধারণা পাওয়া যাবে।
এখানে ব্যবসা শুরু করতে গেলে প্রথমে ইউনিয়ন কাউন্সিল, পৌরসভা বা সিটি করপোরেশন থেকে ট্রেড লাইসেন্স নিতে হয়। আমার এক আত্মীয় একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার স্থাপন করার জন্য বেশ কিছু দিন ঘোরাঘুরি করে সিটি করপোরেশন থেকে ৭,৪০০ টাকা ফিতে ‘ঘ’ ক্যাটাগরির ট্রেড লাইসেন্স নেন এবং একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার দাঁড় করান। তার ব্যবসার বিষয়টি মানুষের স্বাস্থ্য-সম্পর্কিত হওয়ায় এ সংক্রান্ত ব্যবসা পরিচালনা করার জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লাইসেন্স গ্রহণ করা প্রয়োজন। এ জন্য তিনি আবেদনপত্র জমা দেন সেখানে। কিন্তু দীর্ঘদিন কোনো সাড়া-শব্দ না পেয়ে আবার ঘোরাঘুরির প্রয়োজন হয় সেই অধিদপ্তরে। তখন জানতে পারেন যে, পরিবেশ সুরক্ষার প্রয়োজনে নতুন নিয়ম চালু হয়েছে; পরিবেশ অধিদপ্তরের অনাপত্তি ছাড়া স্বাস্থ্য বিভাগ আর কোনো লাইসেন্স জারি করবে না। লাইসেন্স ফিও এক হাজার থেকে বাড়িয়ে ৩৫ হাজার টাকা করা হয়েছে। কিন্তু গরজ বড় বালাই। কাজ তো শুরু করা হয়ে গেছে, শেষ তো করতেই হবে। কাজেই এবার শুরু হলো পরিবেশ অধিদপ্তরে যোগাযোগ আর সাক্ষাতের পালা। কিন্তু দেশের সংকটাপন্ন পরিবেশ সুরক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকরা বহুত্ববাদের অনুসারী; স্থানীয় দমকল বাহিনীর লাইসেন্স ও ওয়ার্ড কমিশনারের অনাপত্তি ছাড়া তারা এ কাজ করেন না। সিটি করপোরেশন থেকে লাইসেন্স নেওয়ার পর আবার ওয়ার্ড থেকে কেন অনাপত্তি নিতে হবে, তার কোনো ব্যাখ্যা তারা দিতে রাজি নয়। যাই হোক, অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র বাবদ ১০ হাজার এবং দমকল বাহিনীর লাইসেন্স বাবদ ৭৬০ টাকা জমা করে আর জুতার সুকতলা খুইয়ে বাকি দপ্তর থেকে প্রয়োজনীয় দলিলাদি সংগ্রহ শেষে তিনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে সেগুলো জমা দেন।
স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা সরেজমিন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে সবকিছু যাচাই অন্তে লাইসেন্স জারি করবেন। এটাই করার কথা। মানুষের জীবন বলে কথা; পশু হাসপাতাল জাতীয় কিছু হলে না হয় আলাদা কথা ছিল। কিন্তু কর্মকর্তারা সময় পাচ্ছেন না সেন্টার ভিজিট করার; শত শত আবেদন পড়ে আছে, কয়টির পেছনে ছুটবেন তারা? তা ছাড়া পরিদর্শন করাই তাদের একমাত্র ও প্রধান কাজ নয়, আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ তাদের প্রতিনিয়ত করতে হয়। সে জন্য যারা তাদের সঙ্গে দেখা করে অনুরোধ জানান, তাদের কাজটা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে করার ব্যবস্থা নেন। আমার ওই আত্মীয়ের তাড়া ছিল। সেই জন্য তিনি তাদের সঙ্গে দেখা করেন। তাতে কাজ হয়। ভিজিট খুব দ্রুত সম্পন্ন হয়। কিন্তু এক্স-রে মেশিন থাকায় আণবিক শক্তি কমিশনের লাইসেন্স ছাড়া তো সেন্টার চালু করার অনুমতি দেওয়া যায় না। আবার দৌড়াদৌড়ি শুরু হলো সেখানে। শেষে সবই পাওয়া গেল, তবে উৎসাহ আর পুঁজির একটা বড় অংশ গেল কর্পূরের মতো উবে। এ যেন কৃষণ চন্দরের ‘জাম গাছ’ গল্পে গাছের নিচে পড়া মানবসন্তানকে উদ্ধারে গাছ কাটতে প্রথমে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে নথি চালাচালি,পরে এক এক করে কৃষি, উদ্যান, সংস্কৃতি, বন এবং সর্বশেষ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দৌড়ঝাঁপ দিয়ে ছাড়পত্র সংগ্রহের বাস্তব কৌতুকাভিনয়, যেখানে সবার ছাড়পত্র পাওয়া যায় ঠিকই, কিন্তু ততক্ষণে ভুক্তভোগীর জীবন প্রদীপ নিভে যায়। ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ভ্যাকসিন প্রয়োগের ব্যবস্থা থাকায় তার আরও আছে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের লাইসেন্সের প্রয়োজনীয়তা।
আমার কথা হলো ব্যবসা সহজ করার প্রয়োজন যখন আমাদের, তখন ব্যবসায়ীকে এত জটিলতার মধ্যে ফেলার দরকার কী? প্রতিটি ক্ষেত্রে যেসব মানদ- অনুসরণ করতে হবে, তার সুস্পষ্ট বিনির্দেশ উল্লেখ করে একটি সংস্থা, যেমন সিটি করপোরেশন থেকে একটি মাত্র লাইসেন্সের ভিত্তিতে ব্যবসা পরিচালনা করার অনুমতি দিতে বাধা কোথায়? পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থা তাদের সুবিধা মতো সময়ে বিষয়গুলো প্রতিপাদন করে দেখতে পারে। তবে এ কাজে যাতে হয়রানি বা ঝামেলা তৈরির সুযোগ না থাকে, সে লক্ষ্যে উভয় পক্ষের জন্য শাস্তি ও প্রণোদনার ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে। কোনো পক্ষই যাতে তাদের অন্যায় কৃতকর্মের জন্য অব্যাহতি না পায়, তার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যেতে পারে। আবার এ দরকার ফুরিয়ে গেলে আমরা আগের মতো ব্যবসা শুরু করার আগেই কড়াকড়ি শুরু করে দিতে পারি। যেমন সিঙ্গাপুর ও হংকংয়ের ব্যবসা সংক্রান্ত আইন-কানুনের প্রয়োগ সম্পর্কে বলা হয় যে, সিঙ্গাপুরের আইনে স্পষ্টভাবে যা যা করা যাবে বলে নির্দেশ দেওয়া আছে, তার বাইরে কোনো কিছু করা যায় না। পক্ষান্তরে হংকংয়ে যা যা নিষেধ করা আছে, সেগুলো ছাড়া সব কিছু করা যায়। অর্থাৎ সিঙ্গাপুরের আইন-কানুন অধিকতর নিয়ন্ত্রণমূলক, অপর দিকে হংকংয়ের দৃষ্টিভঙ্গি এক্ষেত্রে সংস্কারমুক্ত ও উদারনৈতিক। বর্তমানের প্রয়োজন আমাদের হংকংয়ের মতো উদারনৈতিক হতে নির্দেশ করে।
এখানে কর ও ফি নির্ধারণের ক্ষেত্রে এখনো প্রধান বিবেচ্য বিষয় স্বল্প মেয়াদে সরকারের রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি করা; দীর্ঘ মেয়াদি টেকসই উন্নয়ন ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার বিবেচনা সেখানে কল্কে পায় না। কিন্তু সম্ভাবনার বিবেচনায় খাতভিত্তিক প্রকৃত ও যোগ্য বিনিয়োগকারীদের কর অবকাশ বা সুবিধা দেওয়া হলে তার বহুমাত্রিক সুফল রাষ্ট্র ও সমাজ ভোগ করতে পারে। মালয়েশিয়ার চীনা বংশোদ্ভূত স্বল্প শিক্ষিত কিংবদন্তিতুল্য ধনকুবের লিম গো টং (খরস এড়য ঞড়হম) ১৯৭১ সালে গেনটিং হাই ল্যান্ডের প্রাথমিক উন্নয়ন কাজ শেষে যখন তার বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করেন, তখন তার বার্ষিক আয় ছিল মাত্র ২০ লাখ রিঙ্গিট। ৪০ শতাংশ হারে এর ওপর বিনোদন কর আসত ৮ লাখ রিঙ্গিট। তৎকালীন আইন অনুসারে কোনো বিনোদনকেন্দ্র পথিকৃতের মর্যাদায় কর-অবকাশ পাওয়ার অধিকারী ছিল না। কিন্তু দূরদৃষ্টিসম্পন্ন লিম গো টং রাজস্ব কর্মকর্তা ও তাদের রাজনৈতিক প্রভুদের বোঝাতে সক্ষম হন যে, এ কর-অবকাশ আসলে কর-ছাড় নয়; প্রকৃত প্রস্তাবে তা হবে অধিকতর উৎপাদনশীল সরকারি বিনিয়োগ। কারণ, সামনের পাঁচ বছরে আয়ের পুরো অর্থ কেন্দ্রের উন্নয়নে বিনিয়োগ করা হলে ষষ্ঠ বছরে গিয়ে এক বছরে যে কর সংগ্রহ হবে, তার পরিমাণ দাঁড়াবে পাঁচ বছরে ছাড় দেওয়া কর-অবকাশের চেয়ে ঢের বেশি। এতে সরকারেরও আয় বাড়বে, আবার দেশেরও উন্নতি হবে। এর চেয়ে জয়-জয়কার অবস্থা আর কী হতে পারে? রাজস্ব কর্মকর্তারা তার যুক্তি মেনে নিয়ে আইন সংশোধন করেন। পাঁচ বছর পর ১৯৭৫ সালে তার দাবির সত্যতা পেয়ে সরকার তাকে আরও এক বছরের জন্য বোনাস কর-অবকাশ প্রদান করে।
ক্ষুদ্র ও খুচরা ব্যবসায়ীদের আমরা অনেক সময়েই গালমন্দ করে আনন্দ পাই। তাদের অতি মুনাফা-লোভ আমাদের সবার আক্রোশের কারণ। মুন্সীগঞ্জের ২০ টাকা কেজি বেগুন তারা ঢাকায় ৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করেন, নরসিংদীর ৩০ টাকা কেজি করলা রাজধানীতে ৯০ টাকার কমে ছাড়েন না। তাদের লালসার শিকার আমরা সীমিত আয়ের চাকরিজীবী ও নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির ছাপোষা মানুষ। কাজেই তাদের প্রতি রুষ্ট হওয়ার সঙ্গত কারণ রয়েছে। কিন্তু মুদ্রার অপর পিঠ দর্শন করলে অনেকেরই রাগ উবে যাবে। একবার আমার এক চাকরিজীবী আত্মীয় মুনাফাখোর খুচরা সবজি বিক্রেতাদের মুন্ডুপাত করতে করতে আমার কাছে এসে যেন বিচার দিয়ে বসলেন। তিনি ছোটখাটো একটা চাকরি করেন। মাসে হাজার চল্লিশেক টাকা বেতন পান। অর্ধেকের বেশি টাকা চলে যায় কাঁচাবাজারে। তার চলবে কীভাবে? আমি তাকে চাকরি ছেড়ে বেগুন আর করলার খুচরা ব্যবসার কাজে নেমে পড়তে উপদেশ দিলাম। কারণ, তাতে খরচ বাদে প্রতি কেজিতে ২০ টাকা লাভ থাকলে প্রতিদিন গড়ে পাঁচ মণ সবজি বিক্রি করতে পারলে চার হাজার টাকা আয় হবে। মাসে তার পরিমাণ দাঁড়াবে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা; তার বেতনের তিন গুণ। তবে চাকরি ছাড়ার আগে সম্ভাব্য পেশাটির খুঁটিনাটি জেনে নিতে অনুরোধ করেছিলাম। খোঁজখবর নেওয়ার পর তিনি যখন আবার আমার সামনে এলেন, তখন আর তার মধ্যে উৎসাহ বা উষ্মা কোনোটাই লক্ষ করলাম না। তিনি জানালেন, এ কাজে ঘাটে ঘাটে পরিবহন শ্রমিক, মধ্যস্বত্বভোগী ও পরাশ্রয়ী অদৃশ্য খেলোয়াড়দের যেভাবে পয়সা খয়রাত করতে হয়, তাতে পুঁজি তোলার পর লাভ করা আলাউদ্দিনের চেরাগ-জাত জিনের কর্ম বৈ আর কিছু নয়। এখানেই নিহিত রয়েছে এদেশে ব্যবসায় বর্ধিত খরচের গুপ্ত রহস্য।
আসলে এদেশে পর্যাপ্ত সস্তা শ্রম গড়াগড়ি গেলেও এবং তা কর্মে নিয়োগ করে পর্যাপ্ত মুনাফা করার সম্ভাবনা থাকলেও ব্যবসা করার ঝামেলা ও খরচ এত বেশি যে, এখানে লাভের গুড় পিঁপড়ায় খেয়ে যায়। এর বাইরে অবকাঠামোগত অপর্যাপ্ততা তো আছেই। ইদানীং অবশ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ ও বন্দরসেবা মানের যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। কিন্তু ব্যবসার প্রতিটি ক্ষেত্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, আইন ও চুক্তির বস্তুনিষ্ঠ প্রয়োগ এবং দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তির বিচারিক কাঠামো গড়ে তুলতে না পারলে অর্থনীতিকে সত্বর সামনের দিকে নিয়ে যাওয়া যেমন কঠিন হবে, তেমনি ব্যবসা করার সূচকেও অভীষ্ট পরিবর্তন আনা দুরূহ হবে। তবে সহায়ক আইনি কাঠামো, অবকাঠামোগত পর্যাপ্ততা ও অনুকূল নীতি-সহায়তাই শেষ কথা নয়; এগুলোর পেছনে যারা ক্রিয়াশীল থাকেন, যারা এগুলো পরিচালনা করেন, সেই কুশীলবদের জ্ঞান, মেধা, দক্ষতা, আন্তরিকতা, সর্বোপরি দেশপ্রেম এক্ষেত্রে বড় কথা। অনেক সময় শুধু আন্তরিকতা ও দেশপ্রেম দিয়ে অনেক বড় বড় বাধা অতিক্রম করে কাজ করা সম্ভব হয়। এজন্য স্বপ্নদর্শী নেতৃত্বের রূপকল্প বাস্তবায়নে সময়ের চাহিদা অনুযায়ী আমলাতন্ত্রকে শিক্ষা, দীক্ষা ও প্রশিক্ষণ দিয়ে উপযুক্ত করে গড়ে তুলতে হবে।
‘ব্যবসার প্রতিটি ক্ষেত্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, আইন ও চুক্তির বস্তুনিষ্ঠ প্রয়োগ এবং দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তির বিচারিক কাঠামো গড়ে তুলতে না পারলে অর্থনীতিকে সত্বর সামনের দিকে নিয়ে যাওয়া যেমন কঠিন হবে, তেমনি ব্যবসা করার সূচকেও অভীষ্ট পরিবর্তন আনা দুরূহ হবে। তবে সহায়ক আইনি কাঠামো, অবকাঠামোগত পর্যাপ্ততা ও অনুকূল নীতি-সহায়তাই শেষ কথা নয়; এগুলোর পেছনে যারা ক্রিয়াশীল থাকেন, যারা এগুলো পরিচালনা করেন, সেই কুশীলবদের জ্ঞান, মেধা, দক্ষতা, আন্তরিকতা, সর্বোপরি দেশপ্রেম এক্ষেত্রে বড়ো কথা’।
লেখক : খাদ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • কিশোর-কিশোরীদের হালচাল
  • বলকানস : ইউরোপের যুদ্ধক্ষেত্র
  • সন্তানের প্রতি অভিভাবকের দায়িত্ব
  • শিক্ষার হার এবং কর্মসংস্থান প্রসঙ্গ
  • শিক্ষার রাজ্যে এক বিস্ময়
  • ডেঙ্গু ও বানভাসি মানুষ
  • শিল্প-সাহিত্যে ১৫ আগস্ট
  • ইমাম-মুয়াজ্জিন সার্ভিস রোলস-এর প্রয়োজনীয়তা
  • বাঙালির মুক্তিসনদ ঐতিহাসিক ৬ দফা
  • শিশুদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশে পরিবেশ
  • তিনি কোন দলের নয়, সমগ্র বাঙালির
  • ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম অধ্যায়
  • বঙ্গবন্ধুর ফিরে আসা
  • শিক্ষা ও নৈতিকতা
  • কুরবানির সূচনা
  • কুরবানি ও আমাদের করণীয়
  • উন্নয়নের মানবিকতা বনাম গতানুগতিকতা
  • বিশ্বাসের উপলব্ধি
  • নিরাপত্তাহীনতায় নারী
  • স্বাগতম ঈদুল আযহা
  • Developed by: Sparkle IT