শিশু মেলা

ভূতের পরাজয়

সুলতান মাহমুদ প্রকাশিত হয়েছে: ২০-০৬-২০১৯ ইং ০১:২৬:২৫ | সংবাদটি ১৮৭ বার পঠিত

আম গাছের তলায় সাদা ধবধবে শাড়ী পরা নতুন বউ গাছের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে। তার পা দুটো মাটিতে আর মাথাটা তার গাছের আগা অবধি।
তিন তিন জন একইভাবে দেখেছে। সেদিন সন্ধ্যে বেলায় বৈশাখী ঝড় হয়েছিল। গাছ ভর্তি পাকা টসটসে আম। আমের বাগানটি আমাদের বাড়ি থেকে তেমন দূরে নয়। আম বাগান মানে এখনকার মতো ডিজিটাল আম বাগান নয়। আমাদের বাড়ি থেকে ১৪০-১৫০ মিটার দূরে একটু উঁচু জায়গায় বেশ কিছু ঝোঁপ ঝাড় নিয়ে ৭-৮টি গাছের (আম গাছ) সমাবেশে আমাদের আম বাগান। অনেককাল আগে থেকেই আম গাছগুলো এখানে তাদের বসতি স্থায়ীভাবে গড়ে তুলেছে। এটি আমাদের দখলে, কিন্তু আম খায় সকলে। আমের সিজন মানেই বৈশাখ মাস। বৈশাখ মাস এলেই আমাদের পাড়ার সকল পোলাপানের আম বাগানে যাওয়ার ধুম লাগত। আম গাছগুলো ছিল অনেক পুরনো এবং মোটা তাজা। গাছে উঠে কেউ আম পাড়ার সাহস করত না। একমাত্র জোরে জোরে বাতাস এলেই পোলাপানেরা আম কুড়োনোর খেলায় মেতে উঠত। জোরে হাওয়া বইলো ধপাধপ আম পড়তে লাগলো। পাকা টসটসে আম। আম পাওয়া নিয়ে কাড়াকাড়ি মাতামাতি চলত। কিলকিলায়ে খিলখিলায়ে হাসাহাসি। কে কতটা পেল। এ-যেনো মহা প্রতিযোগিতা। আমি ১৯৮৬-৮৭ সনের কথা বলছি।
বলছিলাম সে দিন কালবৈশাখী ঝড় হয়েছিল। সন্ধ্যার দিকে ঘন অন্ধকার হয়েছিল। গাছের ডালে ডালে আমের ছড়াছড়ি। কাঁচায় পাকায় মিশামিশি। ঝড় উঠার সাথে সাথে আমার নিজের ছোট বোন এবং চাচাতো দুই বোন আম বাগানে হাজির। পাকা আমের লোভ তাদের পেয়ে বসেছে।
প্রচন্ড বাতাসে গাছগুলো হেলে দুলে নাচানাচি করছে। বাগানে তখনও অন্য কেহ ঢুকেনি। এরা তিনটি ক্ষুদে বালিকা মাত্র। বাগানে গিয়েই তারা ইয়া লম্বা শাড়ী পরা এক বউকে দেখতে পায়। সাদা শাড়ী পরা বউ। গাছের গোড়ায় বৌয়ের পা এবং গাছের আগায় বৌয়ের মাথা। শাড়ী হাওয়ায় উড়ছে। বালিকাত্রয়ের মনে কোন সন্দেহ রইল না যে এটা ভূত নয়। সাথে সাথে তাদের গলা ফাটানো চিৎকার এবং একযোগে দৌড়ে ঘরে পলায়ন। ওরা তিনজনই ভয়ে ডরে আতংকে জড়সড়। বাড়ির মহিলা গার্জিয়ান সকলে এবং ছোট পিচ্চিরা তাদের তিনজনকে ঘিরে ধরেছে। ওরা তিনজন সাদা শাড়ির ভূতের বর্ণনা দিয়ে যাচ্ছে। আর বাকী সকলে গিলে গিলে সেই কাহিনী খাচ্ছে। আমিও ছিলাম সেখানে। আমি তখন ক্লাস নাইনে পড়ি। আমার ভূত দেখা তিনটে বোন একই ক্লাসে পড়ে। ক্লাস সেভেনে। এই তিন বালিকার ঘধঃঁৎব আমার খুব ভাল করেই জানা আছে। এরা প্রতিদিনই নিজেরা ভৌতিক কাহিনী যেমন পড়ে তেমনি নিজেরাই আবার বানিয়ে বানিয়ে অনর্গল ভৌতিক গল্প বলে যেতে পারে। মাঝে মাঝে নাকি এরা ভূত পেতœীর দেখাও পায়। যেমন আজ পেয়েছে।
আমি সর্বদাই এদেরকে গাঁজাখুরী গল্পবাজ বলতাম এবং টিটকারী করতাম।
এ নিয়ে তাদের সাথে আমার প্রায়ই ঝগড়া ফ্যাসাদ হত। আমি ভূত প্রেতে যতটা না অবিশ্বাসী ছিলাম তার চেয়ে ঢের বেশি ছিলাম চাপাবাজী করে নিজের দাপটটাকে প্রকাশ করতে। আমার চাপাবাজিতে তারা শেষে টিকতে না পেরে বলতো, ‘কী আমার ঝপরবহপব এর ছাত্র রে...., দু’পাতা ঝপরবহপব পড়ে ভাতেরে কয় অন্ন। ভূত বিশ্বাস করে না, কত বড় বিজ্ঞানী হয়ে গেছে; বিজ্ঞানী গ্যালিলিও।
ভূতের নাকানি, চুবানী যেদিন খাবে না সে দিন টের পাবে, কত ভূতের কত পা। তাদের গল্পটা আমার চাচীরা এবং আমার দুই দাদী খুব মনোযোগ সহকারে শুনছিল। ছোটরা তো পিন পতন নিরবতা বজায় রেখে গো-গ্রাসে গিলছিল। গা-ছমছম করা গল্প তো। আমার সহ্য হচ্ছিল না। ধমকে উঠলাম।
শ্রোতারা সব হুতাস হলো। তাদের মজাটাই যেনো আমি নষ্ট করে দিলাম। ছোট চাচীতো রাগ করে বলেই উঠলো, সুলতানের সব কিছুতেই বাড়াবাড়ি। ওরা নিজের চোখেই তো দেখেছে।
এখানে যুক্তিতে আমি দুর্বল। আমার যুক্তিকে সবল করার জন্য ঠিক এই সময়েই এগিয়ে এলো, আমাদের বাড়ির দুই জন কামলা। ওরা আমাদের বছরাই কামলা। একজনের নাম মুন্না এবং অপর জনের নাম আনিছ।
তারা ঘটনা বলল এইভাবে যখন মেয়েরা ভূত দেখার কথা বাড়িতে এসে বলছিল, তা শুনার সাথে সাথে মুন্না আর আনিছ লাঠি সোটা নিয়ে বাগানে চলে যায়। বাগানে গিয়েই তারা দেখে যে একটা লথা শাড়ী কাপড় আম গাছের ডালে আটকে বাতাসে ঝুলছে। তারা শাড়ীটা যখন ডাল থেকে উদ্ধার করে তখনও বাড়ির শান্তি দিদি চিৎকার করে বলছিল, আমার শাড়ী গেল কই। এহানেই রোদে শুকাতে দিছিলাম। মরার ঝড় তুফান আমার শাড়ীটারে উড়ায়ে কই নিল গো। আনিছ বলল, আমরা সাথে সাথেই বুঝলাম ঘটনা তাহলে এই। তার পর আম কুড়ায়ে চলে এলাম। ঘরে তখন হাসির একটা হিড়িক পড়ে গেল। আমার বিজ্ঞানের হলো জয়। ভূতের হলো পরাজয়।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT