শিশু মেলা

 আমতলার পেত্নী

মিনহাজ উদ্দীন শরীফ প্রকাশিত হয়েছে: ২০-০৬-২০১৯ ইং ০১:২৮:৪১ | সংবাদটি ৭৭ বার পঠিত

রাত তখন আনুমানিক এগারোটা প্রায়। ইট বালুর বিশাল ঘরের এক কোণে আমার রুমটা। বাবার রুমটা; আমার কক্ষ থেকে তিনটা কক্ষ ছাড়িয়ে। আমি আনমনা কখন কোথায় কি রাখি খেয়াল থাকে না। ঐ রাতে আমি জীববিজ্ঞানের ‘জীবের পরিবহন’ এই পরিচ্ছেদটা নিয়ে ঘাটাঘাটি করছিলাম। সাড়ে এগারোটার দিকে বিদ্যুৎ চলে গেলো; তখন আঁধার এসে আমাকে ঘিরে ধরলো। টর্চ লাইট খুঁজতে লেগে গেলাম তাড়াহুড়ো করে। কিছুক্ষণ খোঁজার পর পেয়েছি টেবিলের এক কোণে। জ্বালিয়ে আবারও পড়তে শুরু করি। কিন্তু অসহ্য গরমের জন্য রুমে থাকাটা কষ্টসাধ্য ছিল। কোনো উপায় না পেয়ে জানালা খুলে দিলাম। জানালা খুলে দেওয়া মাত্রই শীতল বায়ু আমার রুম'টা শীতল করে দিলো। আহা! আমি আনন্দে লাফিয়ে গান ধরি গুনগুন করে। বেশ কিছুক্ষণ সময় এভাবে কাটালাম। হঠাৎ জানালার বরাবর চেয়ে দেখি আম গাছের তলে কে জেনো কাঁদছে। ফার্স্ট টাইম এতোটা গুরুত্ব দেইনি। যতোটা রাত গভীর হচ্ছে ততো কান্নার ধ্বনি বেড়েই চলছে। বিষয়টা আমার কাছে সুবিধার লাগছিলো না। তাই লাইট আর একটা লাঠি হাতে নিয়ে আম গাছের তলে যাই, গিয়ে দেখি কেউ নাই! ভাবলাম আমি হয়তো ভুল শুনেছি। এই বলে রুমে ফিরে আসার জন্য যেই না হাঁটতে শুরু করেছি। ঠিক তখনই পিছন থেকে কান্নার আওয়াজ কর্নে ভেসে আসল। ঘাড় ঘুড়িয়ে দেখি কারো উপস্থিতি নেই। একটু দাঁড়ালাম এদিক - ওদিক লাইট মেরে দেখছি। কাউকে পেলাম না। আর ভাবছি এতো রাতে এখানে আসা কি ঠিক হইল। বাবা একদিন বলেছিল এই আমতলায় একটা পেতœী আছে। ঐ তখন আমি বাবার কথাটা কানেই তুলিনি। কারণ আমি সাইন্স নিয়ে পড়ছি। বিজ্ঞান বিভাগ নিয়ে যারা পড়ালেখা করে তারা এইসব বিশ্বাস করে না আর আমিও তাদের ব্যতিক্রম নই। এইজন্য ভূত প্রেতাত্মা আছে বলে আমার বিশ্বাস হয় না।
কিন্তু আজ কেন্ জানি না বাবার কথাটাই সত্যি মনে হচ্ছে। বিষয়টা আরেকটু ক্লিয়ার করার জন্য মনে সাহস সঞ্চয় করে বলতে লাগলাম কেউ এখানে আছেন? থাকলে সামনে আসেন। চারিদিক নির্জন মনে হচ্ছিল কোনো অশুভ ছায়া ঘিরে রেখেছে ঐ রাত'টা। তারপরও ভয় পাইনি আম গাছের নিকটে একটা বাঁশের ঝোপ ছিল সেখানে গিয়ে একটু বসলাম। রীতিমত ঝড়ও উঠেছে। তাই বাসায় যেতে পারছি না। তখন রাত বারোটা। তখনই দেখলাম আসল লীলা। ছোট্ট বড় সতেরোটি পেতœী এক স্থানে মিটিং করছে। তারা বলছে আগামীকাল অমাবস্যা রাত ঐ রাতে যদি মানুষের রক্ত পান না করতে পারে তাহলে তাদের শক্তি হ্রাস পাবে। এই কথা শুনা মাত্রই আমার বুকে কম্পন সৃষ্টি হয়ে গেছে। তখন আমার পাশে বাবার উপস্থিতিটা বড়ই প্রয়োজন ছিল। কিন্তু বাবা জানে না আমি যে এখানে এসেছি। কিছুক্ষণ পর ঝড়ও থেমে গেল। ভাবছি পেতœীদের চোখের আড়াল হয়ে চলে যাবো বাসায়। যেই না ঝোপের আড়াল থেকে খোলা মাঠে আসলাম তখনই সবগুলো পেতœী আমাকে ঘিরে ধরলো। তাদের বিভিন্ন ধরনের রূপের আকৃতি দেখে আমি ভয়ে হতাশ হয়ে চিৎকার করে বাবাকে ডাকতে লাগলো। তাদের মধ্যে একটা পেতœী আমার কাছে এসে শরীর আর মুখে চেপে ধরার চেষ্টা করছে। ঐদিকে আমার চিৎকারে বাবা'রও ঘুম ভেঙে যায়। আমার নাম ধরে ডেকে বলছে মিনহাজ কইরে তুই। তাদের মধ্যে শক্তিশালী ও ভয়ানক চেহারার পেতœীটাকে দেখে আমি চিৎকার করতে লাগলাম। আমার চিৎকার শুনে বাবা আম তলায় দৌড়ে আসল। যেই না বাবার পায়ের শব্দ শুনা গেলো। তখনই পেতœী গুলা ভেনিস হয়ে যায়। বাবা ডাকছে মিনহাজ তুই কই বাবা। বাবার ডাক শুনে আমি বুক ভরা হতাশা নিয়ে বলতে লাগলাম বাবা আমি এখানে তুমি আমাকে বাঁচাও। বাবা বলল মিনহাজ চিন্তা করিস না আমি থাকতে তোর কোনো ক্ষতি হবে না। বাবাকে সামনে দেখতে পেয়ে সব ভয় কেটে গেলে। দৌড়ে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলাম। বাবা বলে আর কাঁদতে হবে না আমি তো আছি তোর পাশে। আমি স্তব্ধ, মুখে দিয়ে কোনো সাউন্ড আসছে না। বাবা বলল এতো রাতে তুই এখানে কেন? তুই না পড়তে বসেছিলে। আমি কোনো কথা না বলে বাবাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম। বাবা বুঝতে পেরেছে আমি যে খুব ভয় পেয়েছি। তাই আর কোনো কিছু জিজ্ঞাস না করে আমাকে বাসায় নিয়ে গেলো এবং বাবার বিছানায় ঘুম পাড়িয়ে দেয়। মুয়াজ্জিনের মধুর কন্ঠের আজান শুনে বাবা ও আমার ঘুম ভেঙে যায়। বাবা উঠে ওযু করে নামাজ পড়তে গেলো মসজিদে। নামাজ পড়ে একটু হেঁটে এসে আমাকে ডাকছে মিনহাজ উঠে গোসল করে আয় তোকে নিয়ে তান্ত্রিকের কাছে যাবো।
বাবার কথামতো উঠে গোসল করে আসলাম। এই ফাঁকে বাবা নাস্তা রেডি করে রেখেছে। আমি এসে খেলাম, পরে বাবা বলে এখন আয় যাওয়া যাক। বাবার হাত'টা ধরে বাসা থেকে বাহির হয়ে টমটম গাড়িতে চড়ে ঐ তান্ত্রিকের বাড়িতে গেলাম। ঐ তান্ত্রিক নাকি আমার ফুফা হয়। বাবা আসতে আসতে বলল। তান্ত্রিকের বাড়িতে গিয়ে তান্ত্রিকের সাথে দেখা হওয়া মাত্র বাবা সালাম দিলো আমিও দিলাম। তারপর কুশল বিনিময় হলো ফুফার (তান্ত্রিকের) সাথে বাবার । তান্ত্রিক ফুফা বাবাকে জিজ্ঞাসা করছে কিরে ভাই কি মনে করে আসলি বলতো? বাবা তান্ত্রিক ফুফার কাছে এক এক করে ঐ ঘটনা সহ পূর্বের ঘটনাও বলল। ফুফা বলে আর বলতে হবে না আমি সব জানি। আমি তো তান্ত্রিক ফুফার কথা শুনে বিস্মিত হয়ে গেছি। বাবা বলল ভাই আমাদের এই পেতœীর হাত থেকে রক্ষা করেন। বাবার কথা শুনে তান্ত্রিক ফুফা রাজি হলো আমাদের বাড়িতে আসার। আবারও আমরা টমটম ভাড়া করে বাড়িতে আসলাম তান্ত্রিক ফুফাকে নিয়ে। তান্ত্রিক ফুফা আমাদের বাড়িতে প্রবেশ করেই মন্ত্রপাঠ করতে লাগলো। তারপর বাবা নিয়ে গেলো ঐ ভয়ানক আমতলায় তান্ত্রিক ফুফাকে। তান্ত্রিক ফুফা গাছের তলায় গিয়ে পেতœীদের আহবান করছেন। কিছুক্ষণ এভাবে আহবান করার পর ছোট্ট বড় সতেরোটা পেতœী হাজির হলো। তারপর তান্ত্রিক ফুফা বলছে তোরা কার বাড়িতে আস্তানা করেছিস জানিস কি? পেতœীরা তান্ত্রিক ফুফার মন্ত্রে বশ হওয়া তাই কথা মতো উত্তর দিলো না। তান্ত্রিক ফুফা বলল এটা আমার শ্বশুর বাড়ি। তোরা আজকের মধ্যেই এই বাড়ি থেকে দূরে অন্য কোথাও চলে যাবি। তাদের দলের প্রধান পেতœীটা সাহস করে বলে উঠলো হুজুর যেতে পারি একটা শর্তে। তান্ত্রিক ফুফা বলল আবার কিসের শর্ত বল শুনি। বুঝে আসলে রাখবো না হলে বাদ। পেতœীটা বলল হুজুর আমাদের একটা ভেড়া দিতে হবে। তান্ত্রিক ফুফা বলল সারাজীবনের জন্য বন্দী হয়ে থাকতে চাস কি? পেতœীটা বলল না হুজুর আজ গভীর রাতেই আমরা চলে যাবো। তান্ত্রিক ফুফা বলল যেতে তোদের ভেড়া নিয়ে যাইস। পেতœীটা বলে তাহলে হুজুর গভীর রাতে ভেড়াটা দিতে হবে। তাদের কথা মতো গভীর রাতে তান্ত্রিক ফুফা ভেড়াটা আমতলায় ছেড়ে দিলো। পেতœীরা ভেড়া পেয়ে আম গাছের সবচেয়ে উঁচু ডাল'টা ভেঙে চলে গেলো। ভোর বেলা তান্ত্রিক ফুফা আবারও মন্ত্র পাঠ করে দেখে আসলেই চলে গেছে পেতœী ও তার দলবল। ঐ থেকে আমাদের বাড়িটা প্রেতাত্মা মুক্ত।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT