উপ সম্পাদকীয়

বৃদ্ধাশ্রম নয় বৃদ্ধালয়

মোহাম্মদ আব্দুল হক প্রকাশিত হয়েছে: ২১-০৬-২০১৯ ইং ০২:০০:০৫ | সংবাদটি ৭৫ বার পঠিত

প্রথমেই বলছি এটি দীর্ঘ কোনো লেখা নয়। বলা যেতে পারে অতি সংক্ষিপ্ত কথার উপস্থাপনা। বৃদ্ধ কিংবা বৃদ্ধা আমাদের সমাজের সম্মানিত নাগরিক। এখন আমাদের শহরের ব্যস্ত জীবনে অনেক ছোটো পরিবারে ছেলে বা মেয়ে এবং একই সাথে পুত্রবধু ও জামাতা সকলেই সারাদিন ঘরের বাহিরে কর্মব্যস্ত সময় কাটিয়ে সন্ধ্যায় ঘরে ফিরেন। তাদের সন্তানরা আবার স্কুল-কলেজ এবং কোচিং সেন্টারে দিনের পুরো সময় কাটায়। এমন পরিস্থিতি যে পরিবারের সেখানে দাদা, দাদী বা নানা, নানী ঘরের ভিতর সারাদিন একাই থাকেন। বৃদ্ধকালে এমনিতেই নানারকম শারীরিক অস্বাভাবিকতা দেখা দেয়। কাজেই একা থাকা মোটেই নিরাপদ নয়। এছাড়া একাকিত্ব নানান রকম হতাশার জন্ম দেয়। তাই যেখানে একান্ত প্রয়োজন দেখা দেয়, সেখানে একা না থেকে কোনো হোস্টেলে আরো অনেক মানুষের সাথে ওই সময় কাটালে মন্দ হয় না। নিশ্চয় ওই ধরনের আবাসিক ব্যবস্থায় সঠিক যতেœর আয়োজন থাকবে এবং একাকিত্বের পরিবর্তে বন্ধু জুটবে কথা বলার। তাই আমি মনে করি, নিজের বাসায় বন্দি জীবন কাটানোর চেয়ে বৃদ্ধালয়ে আরো অনেকের সাথে সময় কাটানো ইতিবাচক। হ্যাঁ, অস্বীকার করার উপায় নাই যে, অধিক আয়-রোজগারে ব্যস্ত না হয়ে বয়স্ক মা-বাবা কিংবা শ্বশুর-শাশুড়ির প্রতি মনোযোগি হওয়া অতি উত্তম এবং এটাই মানবিক। আমি মনে করি, মা-বাবা বৃদ্ধ হলে ছেলে অথবা মেয়ের সান্নিধ্যে থাকা সবচেয়ে সুন্দর। কষ্ট হলেও এমনটিই মহত্তম সহাবস্থান। তাই প্রয়োজনে মানবিক মানুষের তত্ত্বাবধানে বৃদ্ধালয় হতেই পারে।
এ নিয়ে আরো অল্প কিছু কথা বলবো। তার আগে আমি শব্দ প্রয়োগের ক্ষেত্রে আমার চিন্তার বিষয়ে প্রাসঙ্গিক কিছু কথা উপস্থাপন করছি।
আমি যেমন সামাজিক মানুষ হিসেবে ‘সামাজিক’ শব্দটিকে ইতিবাচক দেখি, তেমনি আমি একটি সম্প্রদায়ের মানুষ তা অস্বীকার করিনা। আমি সম্প্রদায়ের মানুষ বলেই আমি সাম্প্রদায়িক। আমি ‘চেতনায় সারাবেলা’ গ্রন্থের এক প্রবন্ধে বলেছি, অসাম্প্রদায়িক শব্দটি ইতিবাচক নয়। আমি উল্লেখ করেছি, সমাজভুক্ত মানুষ যেমন সামাজিক, তেমনি সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষ সাম্প্রদায়িক। এখানে সামাজিক মানুষের ন্যায় সাম্প্রদায়িক মানুষ। আমি আরো বলেছি, অসামাজিক মানুষ যেমন ভালো নয়, তেমনি অসাম্প্রদায়িক মানুষকে ইতিবাচক অর্থে দেখার সুযোগ নেই। বরং নিজের সমাজের প্রতি যার শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা আছে তারা অন্য সমাজের ক্ষতি করতে পারেনা; তদ্রুপ নিজের সম্প্রদায়ের প্রতি সঠিক জ্ঞান নিয়ে যারা আছে, তারাও অন্য সম্প্রদায়কে অশ্রদ্ধা প্রদর্শন করতে পারেনা। তাই আমি বলেছি যে বা যারা নিজ নিজ ধর্ম-কর্ম পালনের পাশাপাশি সকল সম্প্রদায়কে সম্মান করে তাদেরকে সু-সাম্প্রদায়িক বলা যায়। অতএব, আমাদের দেশে ‘সাম্প্রদায়িক’ এবং ‘অসাম্প্রদায়িক’ শব্দের প্রচলিত যে ধারণা আছে তা ঠিক নয়। ‘সাম্প্রদায়িক’ ইতিবাচক শব্দ এবং অবশ্যই ‘অসাম্প্রদায়িক’ নেতিবাচক শব্দ। ‘সু-সাম্প্রদায়িক’ শব্দটি হচ্ছে সকল সম্প্রদায় মিলে থাকার অর্থাৎ সব ধর্ম এবং বর্ণের মানুষের সহাবস্থানের ক্ষেত্রে উত্তম প্রয়োগ।
এখন আসি প্রথমোক্ত বিষয়ে। এখানে আমি এ অঞ্চলে প্রকাশ ও বিকাশ ঘটতে যাওয়া এক শব্দ ‘বৃদ্ধাশ্রম’ নিয়ে কিছু কথা বলতে চাই। আমরা জানি এবং পেয়েছি বাংলা একাডেমি কর্তৃক প্রকাশিত সংক্ষিপ্ত বাংলা অভিধানে আছে একটি শব্দ ‘আশ্রম’, যার বহুল প্রচলিত অর্থÑ
১। সংসার ত্যাগী সাধু সন্যাসীদের বাসস্থান, ২। সাধনা বা শাস্ত্রচর্চার জন্য নির্দিষ্ট স্থান; মঠ; আস্তানা; আখড়া; ৩। হিন্দু শাস্ত্রোক্ত জীবনকালের চতুর্বিধ অবস্থা-ব্রহ্মচর্য; গার্হস্থ্য; বানপ্রস্থ ও সন্যাস। আরো অনেক অর্থ প্রকাশিত আছে। তাহলে দেখা যাচ্ছে আমাদের দেশে অসহায় বৃদ্ধ নারী-পুরুষের জন্যে যে আশ্রয়কেন্দ্র গড়ে উঠেছে, সেগুলিকে আশ্রম বলার সুযোগ নাই। কারণ; আমাদের দেশের অসহায় বৃদ্ধ কিংবা বৃদ্ধা যারা সন্তানদের নানান ব্যস্ততার কারণে একা থাকতে স্বাচ্ছন্দবোধ করেন না, তারা একাকিত্ব ঘুচিয়ে চলতে অনেকে মিলে সময় কাটানোর জন্য একটা সেবাকেন্দ্রে বা আশ্রয়কেন্দ্রে যান। সেখানে ঢালাও ভাবে কোনো সংসারত্যাগী সাধু সন্যাসী হয়ে জীবন কাটাতে যান না। তাই আমি মনে করি, এ সকল আশ্রয়কেন্দ্রকে বৃদ্ধ+আশ্রম= বৃদ্ধাশ্রম বলা যায়না; বরং আলয় অর্থ হচ্ছে আবাস অর্থাৎ বসবাসের ঘর বা স্থান। সেই অর্থে, এখানে আমাদের যারা বয়সকালে প্রায় সমবয়সী অন্যান্য বৃদ্ধ বা বৃদ্ধাদের সাথে মনের কথা বলে এবং আশ্রয়কেন্দ্রের পরিচালকের তত্ত্বাবধানে কোনো আশ্রয়কেন্দ্রে জীবন যাপন করতেই হয়, তাদের এমন আবাসিক হল বা গৃহকে বৃদ্ধাশ্রম না বলে বরং বৃদ্ধ (বৃদ্ধা)+আলয়= বৃদ্ধালয় বললেই সঠিক বলা হবে।
‘সাম্প্রদায়িক; ‘অসাম্প্রদায়িক’, ‘বৃদ্ধাশ্রম’ ইত্যাদি শব্দের গভীর অর্থ খুঁজে প্রয়োগ করতে হবে। হ্যাঁ, অবশ্যই এ কাজটি গবেষণার দাবি রাখে। আসল কথা হচ্ছে যেনতেন শব্দ প্রয়োগে যাচ্ছেতাই বুঝা উচিত নয়। একটা কিছু বলা হয়ে গেছে বলেই যে আমাকে সেটাই মেনে নিতে হবে এটা কোনো শুভ লক্ষণ নয়। চিন্তা করতে হবে। আমাদেরকে বাংলা ভাষার শব্দের ব্যবহার ঠিক জায়গায় করার ক্ষেত্রে আরো সচেতন হতে হবে।
লেখক : কলামিস্ট ও প্রাবন্ধিক

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • কিশোর-কিশোরীদের হালচাল
  • বলকানস : ইউরোপের যুদ্ধক্ষেত্র
  • সন্তানের প্রতি অভিভাবকের দায়িত্ব
  • শিক্ষার হার এবং কর্মসংস্থান প্রসঙ্গ
  • শিক্ষার রাজ্যে এক বিস্ময়
  • ডেঙ্গু ও বানভাসি মানুষ
  • শিল্প-সাহিত্যে ১৫ আগস্ট
  • ইমাম-মুয়াজ্জিন সার্ভিস রোলস-এর প্রয়োজনীয়তা
  • বাঙালির মুক্তিসনদ ঐতিহাসিক ৬ দফা
  • শিশুদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশে পরিবেশ
  • তিনি কোন দলের নয়, সমগ্র বাঙালির
  • ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম অধ্যায়
  • বঙ্গবন্ধুর ফিরে আসা
  • শিক্ষা ও নৈতিকতা
  • কুরবানির সূচনা
  • কুরবানি ও আমাদের করণীয়
  • উন্নয়নের মানবিকতা বনাম গতানুগতিকতা
  • বিশ্বাসের উপলব্ধি
  • নিরাপত্তাহীনতায় নারী
  • স্বাগতম ঈদুল আযহা
  • Developed by: Sparkle IT