ধর্ম ও জীবন

রাসুলে পাক (সা.) এর সংক্ষিপ্ত জীবনপঞ্জী

আব্দুল হান্নান তুরুকখলী প্রকাশিত হয়েছে: ২১-০৬-২০১৯ ইং ০২:০৯:২১ | সংবাদটি ৩১৮ বার পঠিত

আব্দুল হান্নান তুরুকখলী
ছাহেবে খুলুক্বীন আজীম, মানবতার মুক্তির সনদ সাইয়্যিদুল মুরসালিন, শাফিউল মুজনিবীন হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর পবিত্র জীবনী আমাদের পথ চলার একমাত্র পাথেয়। তাঁর পবিত্র জীবন সর্বকালের সকলের জন্য মহান আদর্শ। নি¤েœ তাঁর পবিত্র জীবন সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোকপাত করা হচ্ছে :
জন্মকাল :
প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) হযরত নুহ (আ.) এর তুফানের ৩৯১৩ বছর পর, হযরত আদম (আ.) এর জন্মের ৬১২৫ বছর পর ২০ শে এপ্রিল ৫৭০ খ্রিস্টাব্দে মোতাবেক ৯ মতান্তরে ১২ই রবিউল আউয়াল সোমবার সুবহে সাদিকের সময় মক্কার বিখ্যাত কুরাইশ বংশে জন্মগ্রহণ করেন। উল্লেখ্য যে, রাসুল (সা.) এর জন্মের ৫০ দিন পূর্বে আবরাহার হস্তি বাহিনী মক্কা আক্রমণ করেছিলো।
বংশ পরিচয় পিতার দিক থেকে :
সাইদুনা ও মাওলানা মুহাম্মদ (সা.) ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুল মুত্তালিব ইবনে হাশিম ইবনে আবদে মনাফ ইবনে কুসাই ইবনে কিলাব ইবনে মুররাহ ইবনে কা’ব ইবনে লুয়াই ইবনে গালিব ইবনে ফিহির ইবনে মালিক ইবনে নজর ইবনে কিনানা ইবনে খুজাইমা ইবনে মুদরিকা ইবনে ইলিয়াছ ইবনে মুজার ইবনে নিজার ইবনে মা’আদ ইবনে আদনান।
বংশ পরিচয় মাতার দিক থেকে :
মুহাম্মদ (সা.) ইবনে আমিনা ইবনে ওয়াহাব ইবনে আবদে মানাফ ইবনে জুহরা ইবনে কিলাব ইবনে মুররা। দেখা যাচ্ছে যে, কিলাব ইবনে মুররা পর্যন্ত গিয়ে রাসুর (সা.) এর পিতৃ ও মাতৃ বংশ পরস্পরা একত্রে মিলে যায়। উল্লেখ্য যে, রাসুল (সা.) এর দাদীর নাম ফাতিমা বিনতে আমর ইবনে আইজ।
জন্মকালে যাদের উপস্থিতি :
রাসুল (সা.) এর জন্মলগ্নে বা প্রসবকালে তাঁর সেবার জন্য জান্নাত থেকে যে সব মহিলা উপস্থিত হয়েছিলেন তারা হচ্ছেন ১. বিবি মরিয়ম। ২. বিবি আছিয়া। ৩. বিবি হাওয়া। ৪. বিবি সারা।
আকীকা ও নামকরণ :
জন্মের সপ্তম দিনে তাঁর দাদা আব্দুল মুত্তালিব তাঁর আকীকা সম্পন্ন করেন। রাসুল (সা.) এর দাদা তাঁর নাম রাখেন মুহাম্মদ এবং তাঁর মাতা তাঁর নাম রাখেন আহমদ। মুহাম্মদ শব্দের অর্থ সর্বাধিক প্রশংসিত, চরম প্রশংসিত। আর আহমদ শব্দের অর্থ চরম প্রশংসাকারী।
লালন পালন :
রাসুল (সা.) এর জন্মের ৩-৪ দিন পর্যন্ত তাঁর আম্মা আমিনা তাঁকে দুধ পান করান। অতঃপর নবী (সা.) এর চাচা আবু লাহাবের কৃতদাসী মুয়াইবিয়া তাঁকে দুধ পান করান। জন্মের দু’সপ্তাহ পর থেকে মা হালিমা তাকে দুধ পান করান। মা হালিমা তাঁকে দু’বছর দুগ্ধ পান করান। নবী (সা.) এর ৬ বছর বয়সে মা আমিনা মদিনার আবওয়া নামক স্থানে ইন্তেকাল করেন। আর তাঁর পিতা তো তাঁর জন্মের ৭ মাস পূর্বে ইন্তেকাল করেন। তাঁর মাতা আমিনার ইন্তেকালের পর তাঁর দাদা আব্দুল মুত্তালিব তাঁর লালন পালনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ৮ বছর বয়সে দাদার ইন্তেকাল হলে চাচা আবু তালিব নবীজির লালন পালনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
সিনাচাক :
রাসুল (সা.) এর চার বার সিনাচাক বা বক্ষ বিদারণ করা হয়েছিল। ১. চার বছর বয়সে দুধ মাতা হালিমার গৃহে অবস্থানকালে। ২. দশ বছর বয়সে পবিত্র মক্কায়। ৩. চল্লিশ বছর বয়সে নবুয়ত প্রাপ্তির সময় হেরা গুহায় ওহী নাযিলের পূর্বে। ৪. মেরাজের সময়। তখন নবীজির বয়স ৫০ মতান্তরে ৫১ বছর।
নবুয়ত লাভের পূর্বে :
১২ বছর বয়সে নবী (সা.) তাঁর চাচা আবু তালিবের সাথে সিরিয়ায় ব্যবসার উদ্দেশ্যে যান এবং খ্রিস্টান ধর্মযাজক বুহাইয়া কর্তৃক নবী হওয়ার ভবিষ্যদ্বানী প্রাপ্ত হন। ২২ বছর বয়সে আবার বিবি খাদিজার প্রতিনিধি হয়ে খাদিজার ক্রীতদাস মাইসারাকে সাথে নিয়ে দ্বিতীয় বারের মত সিরিয়ায় বাণিজ্য যাত্রা করেন। এবারে তিনি নাসতরা নামক জৈনিক পাদ্রী কর্তৃক নবী হওয়ার ভবিষ্যত বাণী প্রাপ্ত হন। ৫৯৫ খ্রিস্টাব্দে ২৫ বছর বয়সে নবী (সা.) মক্কায় শান্তি স্থাপনের জন্য ‘হিলফুল ফুজুল’ নামক শান্তি সংঘগঠন করেন। আর নবী (সা.) ২৫ বছর বয়সেই ৪০ বছর বয়সী মহিলা খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। ৬০৫ খ্রিস্টাব্দে ৩৫ বছর বয়সে রাসুলে পাক (সা.) কা’বা ঘর নির্মাণ করেন। এ বছর কা’বা ঘরে হাজারে আসওয়াদ বসানোকে কেন্দ্র করে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের দামামা বেজে উঠলে নবী (সা.) অত্যন্ত দক্ষতার সাথে এই কলহের ঐতিহাসিক মীমাংসা করেন এবং হাজারে আসওয়াদ কা’বা গৃহে স্থাপন করেন। ৩৬-৪০ বছর পর্যন্ত নবী (সা.) অধিকাংশ সময় হেরা গুহায় ধ্যানমগ্ন থাকতেন। ৪০ বছর বয়সে নবুয়ত লাভ করেন।
নবুয়ত লাভের পরে :
নবুয়ত লাভের পর প্রথম তিন বছর গোপনে ইসলাম প্রচার করেন। নবী (সা.) এর নবুয়ত লাভের পর প্রথমেই যারা ইসলাম গ্রহণ করেন তারা হচ্ছেÑ হযরত খাদিজাতুল কুবরা, হযরত আবু বকর (রা.), হযরত আলী (রা.), যায়েদ বিন হারিছ (রা.), হযরত উম্মে আয়মন (রা.) সহ আরো অনেকে। নবুয়তের চতুর্থ বছরে রাসুল (সা.) প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচার শুরু করেন। তখন থেকে শুরু হয় নবীজির উপর অকথ্যা নির্যাতন। জুলুম-নির্যাতনের আধিক্যের ফলে নবী (সা.) এর নির্দেশে নবুয়তের ৫ম বছরের রজব মাসে ১১ জন পুরুষ এবং ৫ জন মহিলা আবিসিনিয়ায় হিজরত করেন। নির্যাতন আরো বৃদ্ধি পেতে থাকলে নবী (সা.) দ্বিতীয়বার আবিসিনিয়ায় হিজরত করার নির্দেশ দেন। এই নির্দেশে ৮৫ জন এবং ১৬ জন মহিলা সাহাবী আবিসিনিয়ায় হিজরত করেন। নবুয়তের ৬ষ্ঠ সালে হযরত ওমর (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেন। নবুয়তের ৭ম বছরে নবী (সা.) চন্দ্র দ্বিখন্ডিত করেন। ৭ম থেকে ১০ম বছর ‘শুআবে আবু তালিব’ নামক উপত্যকায় বনু আব্দুল মুত্তালিব ও বনু হাশিমসহ বন্দী জীবন যাপন করেন। নবী (সা.) এর ৫০ বছর বয়সে তথা নবুয়তের ১০ম বছরে চাচা আবু তালিব ও বিবি খাদিজা (রা.) ইন্তেকাল করেন। এ বছরেই প্রিয়নবী (সা.) ইসলাম প্রচারের জন্য তায়েফ গিয়ে নির্যাতিত হন। তায়েফ থেকে ফিরে আসার পথে একদল জ্বিন ও মদিনাবাসী ইসলাম গ্রহণ করেন। নবুয়তের ১১তম বছরে মিরাজ সংঘটিত হয়। এ বছরে মদিনার খাজরাজ গোত্রের ৬জন লোক ইসলাম গ্রহণ করেন। নবুয়তের ১২তম বছরে ১২ জন এবং ১৩তম বছরে ৭৫জন মদিনাবাসী নবীর কাছে বাইয়াত গ্রহণ করেন। আর নবুয়তের ১৩তম বছরেই নবী করিম (সা.) মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেন। তখন থেকেই হিজরি সন গণনা শুরু হয়।
প্রিয়নবী (সা.) এর মদিনা জীবন :
প্রথম হিজরীতে নবী (সা.) মসজিদে নববী স্থাপন করেন। মুসলিম-ইহুদি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। যা মদিনার সনদ নামে খ্যাত। দ্বিতীয় হিজরীতে আজান প্রবর্তন হয়। যাকাত ও রোজা ফরজ হয়, বদর যুদ্ধ সংঘটিত হয়। হযরত আলী (রা.) সাথে হযরত ফাতিমা (রা.) বিবাহ হয়। সদকাতুল ফিতর ও ঈদুল ফিতর-ঈদুল আজহার হুকুম নাযিল হয়। এ বছরেই হযরত আয়শার সাথে নবী (সা.) এর বিবাহের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। কেবলা পরিবর্তনের হুকুমও এ বছর নাজিল হয়। তৃতীয় হিজরীতে শরাব হারাম করা হয়, ওহুদের যুদ্ধ হয়, এ বছর শাবাস মাসে হযরত ওমর (রা.) এর কন্যা হযরত হাফসা (রা.) এর সাথে রাসুল (সা.) এর শাদী মোবারক হয়।
চতুর্থ হিজরির শাওয়াল মাসে হযরত উম্মে সালমার সাথে এবং রমজান মাসে জয়নব বিন খুজাইমার সাথে রাসুল (সা.) এর শাদী মোবারক হয়। পঞ্চম হিজরিতে পর্দার হুকুম নাজিল হয়, হজ ফরজ হয়, খন্দকের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ৬ষ্ঠ হিজরিতে হুদায়বিয়ার সন্ধি স্বাক্ষরিত হয়, এ বছর নবী (সা.) বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র প্রধানদের কাছে ইসলামের দাওয়াত সম্বলিত পত্র প্রেরণ করেন। ৭ম হিজরিতে খায়বর যুদ্ধ সংঘটিত হয়, হুদায়বিয়ার সন্ধি মোতাবেক সাহাবায়ে কেরামগণকে নিয়ে রাসুল (সা.) ওমরা করেন। ৮ম হিজরিতে মুতার যুদ্ধ সংঘটিত হয়, মক্কা বিজয় হয়, হুনাইন ও তায়িফের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ৯ম হিজরিতে তাবুকের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ১০ম হিজরিতে নবী (সা.) ১ লক্ষ ২৪ হাজার মুসলমান নিয়ে বিদায় হজ পালন করেন। ১১তম হিজরিতে কুরআনের সর্বশেষ আয়াত নাজিল হয়, ইসলামের পরিপূর্ণতা দান করা হয়। ১১ হিজরির রবিউল আউয়াল মাসেই ৬৩ বছর বয়সে নবীজির ওফাত হয়।
নবী (সা.) যুদ্ধাভিযানের সংখ্যা :
যে সকল যুদ্ধে নবী (সা.) স্বয়ং শরীক হয়েছেন সেগুলোর ধারাবাহিক সংখ্যাÑ ১. আবওয়া। ২. বাওয়াত। ৩. সাফওয়ান। ৪. জুল আশিয়ার। ৫. বদর। ৬. বনী কহিনুকা। ৭. মুওয়াইক। ৮. করকরাতুল কদর। ৯. গাতফান। ১০. ওহুদ। ১১. হামরাউল আসাদ। ১২. বনু নজীর। ১৩. বদরে সুগরা। ১৪. দমাতুল জন্দল। ১৫. বনু মুস্তালিক। ১৬. খন্দক। ১৭ বনু কুরাইজা। ১৮. বনু লাহইয়ান। ১৯. জিফরওয়ার। ২০. হুদায়বিয়া। ২১. খাইবার। ২২. ওয়ালিদ কুরা। ২৩. জাতুর রিকা। ২৪. মক্কার যুদ্ধ। ২৫. হুনাইন। ২৬. তায়েফ। ২৭. তাবুক।
ওহী লিখকগণ :
১. হযরত আবু বকর (রা.)। ২. হযরত ওমর (রা.)। ৩. হযরত ওসমান (রা.)। ৪. হযরত আলী (রা.)। ৫. হযরত জায়েদ বিন ছাবিত (রা:)। ৬. হযরত মুয়াবিয়া (রা.)। ৭. হযরত শুরাহবিল বিন হাছনা (রা.)। ৮. হযরত আমের বিন ফুহাইয়া (রা.)। ৯. ওবাই ইবনে কাব (রা.)। ১০. হযরত আব্দুল্লাহ বিন আকরাম (রা.)। ১১. হযরত হানজালা বিন রবী (রা.)। ১২. হযরত খালিদ বিন সাইদ (রা.)। ১৩. হযরত ছাবিত বিন কাইস (রা.)।
প্রিয়নবী (সা.) ফুফুগণ :
১. হযরত সাফিয়া (রা.)। ২. উম্মুল হাকিম আল বাইদ। ৩. আরওয়া। ৪. আতিকা। ৫. বররা। ৬. উমাইয়া।
প্রিয়নবী (সা.) এর চাচাগণ :
১. হযরত হামজা (রা.)। ২. হযরত আব্বাস (রা.)। ৩. আবু তালেব। ৪. আবু লাহাব। ৫. যুবাইর। ৬. মুকাওয়াম। ৭. জিরার। ৮. মুগীরা। ৯. হারিছ। নবী (সা.) এর চাচাদের মধ্যে হযরত হামজা (রা.) ও হযরত আব্বাস (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।
প্রিয়নবী (সা.) এর ছেলেগণ :
(১) হযরত কাসিম (রা:), (২) হরত আব্দুল্রাহ (রা:), (৩) হযরত ইব্রাহীম (রা:)।
প্রিয়নবীর (সা:) মেয়েগণ :
১. হযরত যাইনাব (রা.)। ২. হযরত রোকেয়া (রা.)। ৩. হযরত উম্মে কুলসুম (রা.)। ৪. হযরত ফাতেমা (রা.)।
প্রিয়নবী (সা.) এর সম্মানিতা স্ত্রীগণ :
১. হযরত খাদিজা (রা.)। ২. হযরত আয়শা (রা.)। ৩. হযরত হাফসা (রা.)। ৪. হযরত জয়নব বিনতে খুজাইমা (রা.)। ৫. হযরত উম্মে সালমা (রা.)। ৬. হযরত জয়নব বিনতে জাহাশ (রা.)। ৭. সওদা বিনতে জামআ (রা.)। ৮. হযরত উম্মে হাবিবা বিনতে আবু সুফিয়ান (রা.)। ৯. হযরত জুয়াইরিয়া (রা.) বিনতে হারেছ খুজাইয়া (রা.)। ১০. হযরত মাইমুনা (রা.) বিনতে হারিছ। ১১. হযরত সাফীয়া (রা.) বিনতে ইয়াহইয়া। ১২. হযরত মারিয়া কিবতিয়া (রা.)।
প্রিয়নবী (সা.) এর কতিপয় মুজিযা :
১. পবিত্র কুরআন মজীদ। ২. চাঁদ দু’টকুরো করা। ৩. তাঁকে গাছে সালাম করা। ৪. শত শত ভবিষ্যৎবাণী বাস্তবায়িত হওয়া। ৫. আঙ্গুল থেকে পানি বের হওয়া। ৬. কাটা বনের ক্রন্দন করা ইত্যাদি।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT