উপ সম্পাদকীয়

শান্তির কপোতের অপেক্ষায়

ইনাম চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ২২-০৬-২০১৯ ইং ০০:১৫:১৮ | সংবাদটি ৯২ বার পঠিত

ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তার বিদেশ সফরকালে পার্শ্ববর্তী দেশ পাকিস্তান এর আকাশ ব্যবহার এড়িয়ে ঘুরপথে তার বিদেশযাত্রা শুরু করেছেন। পাকিস্তান এর অনুমতি লাভের পরও তিনি উল্লেখিত উড়াল পথটি উপেক্ষা করেছেন। পাকিস্তানের প্রতি মোদীর বিতৃষ্ণা যেন দিন দিন বেড়েই চলেছে অন্যদিকে পাকিস্তান বারবার আলোচনার উদ্দেশ্যে ভারতের দিকেই হাতটি বাড়িয়ে দিচ্ছে। রহস্যটা কি বুঝা যাচ্ছে না।
ভারত খুব সম্ভবত মার্কিনী টোপটি গিলতে যাচ্ছে। এই দেশটি ভারতকে তাদের শিখন্ডী হিসাবে ব্যবহার করতে চাচ্ছে, যাতে করে গণচীন বা রাশিয়া এইদিকে তাদের প্রভাব বিস্তারে একটু সতর্কতা অবলম্বন করে। অন্যদিকে পাকিস্তানকে তার আচলে বেধে নিয়েছে গণচীন। সড়ক, নৌ এবং বিমান পথ সকল যোগাযোগ ব্যবস্থাই অব্যাহতভাবে শক্তিশালী ও পাকাপোক্ত করে তুলছে। পাকিস্তান এর গোয়াদর সমুদ্র বন্দরটিকে আধুনিকায়নের নামে গণচীন প্রায় একটি নিজস্ব নৌঘাটি বানিয়ে ফেলেছে ওখানে। কারাকোরাম সড়কটিকে আধুনিক, উন্নত আর ভারী যানবাহন ব্যবহার উপযোগী করে তুলেছে শুধুমাত্র পাকিস্তানের সাথে সড়কপথের যোগাযোগ ব্যবস্থা অটুট রাখার জন্য। এই রাস্তা বিনির্মাণে যে কৌশল, অর্থব্যয় আর বিপদ-আপদ এর বন্যা বয়ে গেছে সেটা একটা অকল্পনীয় ব্যাপার। আজ এটিকে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থায় একটি বিস্ময় হিসাবে গণ্য করা হয়। গণচীন এশিয়ার হাইওয়ে ব্যবস্থায় যেমন শরিক থাকছে তেমনি ট্রান্স এশিয়ান রেল ব্যবস্থায়ও শরিক থাকছে। পাকিস্তান ও ভারতের নিকট প্রতিবেশী আর অতি গুরুত্বপূর্ণ হিমালয় পর্বতমালার দেশসমূহ নেপাল ও ভূটানকেও আপন বলয়ে টেনে নিতে চাইছে চীন। সাফল্যও আসছে এক্ষেত্রে। এই দুটো দেশের অর্থনীতিতে অবাধ মুদ্রা বিনিয়োগ নীতি গ্রহণ করে দুর্বল অর্থনৈতিক ভীতকে শক্তিশালী করার প্রয়াস চালিয়ে গণচীন সাফল্য লাভ করেছে।
মালাক্কা প্রণালী, টংকীন উপসাগর এলাকায় আধুনিক নৌটহল ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে চীন। এটি মার্কিনীদের জন্য হয়েছে একটি বড় মাথা ব্যথার কারণ। জাপান সাগরে স্প্রাটলী দ্বীপপুঞ্জের মালিকানা দাবিটি এখন চীন বড়গলায় তুলে ধরছে বিশ্ব দরবারে। তারা ওই এলাকায় সকল সুবিধা সম্বলিত একটি নৌঘাটি বানিয়ে ফেলেছে ঠিক নিজ উদ্যোগে একেবারে আপন উদ্ভাবিত পন্থায় সাগর থেকে মাটি তুলে জায়গা ভরাট করে। সেই নবনির্মিত দ্বীপটিকে আবার আধুনিক বিমান ক্ষেত্র এবং পোতাশ্রয় হিসাবে গড়ে তুলেছে। আগে যেখানে গণচীন কোন বিমানবাহী রণতরীর অধিকারী ছিলোনা এখন সেটিও তার রয়েছে। না জানি কোন গোপন ঘাটিতে আরো কয়েকটি বিমানবাহী রণতরী বানিয়ে ফেলছে কিনা চীন, সেটা নিয়েও এখনও ভাবিত আছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
গণচীন এর রয়েছে যোগ্য, অভিজ্ঞ আর পোড় খাওয়া নেতৃত্ব, তাই তারা সবকিছু রাজনৈতিক, কূটনৈতিক আর অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করে প্রতিটি পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেন পড়েছে এক বেমক্কা সমস্যায়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নাকি এতোদিন ধরে জানতেন ভুটান আর নেপাল নামক দুটো রাষ্ট্রই ভারত এর অধীন দুটো প্রদেশ। তিনি ভুটানকে ব্যাটন আর নেপালকে নেপল বলে অভিহিত করে আসছিলেন। যাই হোক শেষ রক্ষা হিসাবে বৃহৎ রাষ্ট্র ভারতের কাঁধে সওয়ার হতে চাচ্ছেন ট্রাম্প। ভারত কিন্তু সাবধানে পা ফেলতে চাচ্ছে। তারা মার্কিনী ফেরে পড়ে আমছালা খোয়াতে চায়না। তারা জানে শুধু আকাশপথ নির্বিঘœ রেখে মার্কিনীরা আর কতোটুকুই বা কি করতে পারবে। ভারতীয় অর্থনীতির স্বার্থে বিরাট অংকের মার্কিন পুঁজি ভারতের দরকার। তারা সেটা গ্রহণে পুরোমাত্রায় রাজি। অন্যদিকে পাকিস্তানকে চাপে রাখার জন্য মার্কিন জুজুর ভয় দেখাতে চাচ্ছে প্রতিবেশী দেশটিকে। কাশ্মীর বা সীমান্তবর্তী এলাকায় পাকিস্তানী হুমকী ধামকীকে ভারত গুরুত্বের সাথেই নিয়েছে। পাকিস্তানও চাচ্ছে না ভারতের মতো বৃহৎ প্রতিবেশী আবার শক্তিধর দেশটিকে এখনই তাতিয়ে তুলতে কারণ পাকিস্তান তার অর্থনীতিকে একটু শক্ত ভীতের উপর দাড় করিয়ে যা করার করবে। সৌদি অর্থনৈতিক সাহায্য নিশ্চিত করতে পাকিস্তান এখন মরিয়া। এই সাহায্য দ্বারা সে তার অর্থনীতিতে যেমন রক্তসঞ্চার করতে চায় তেমনি চায় তার সামরিক সম্ভার বাড়াতে। তাই তার দরকার সময় ও প্রস্তুতির। পাকিস্তান তার প্রাকৃতিক গ্যাস ক্ষেত্রগুলির উন্নয়ন সাধন করছে। তারা বিভিন্ন শিল্প কারখানায় অধিক পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহার নিশ্চিতকরণের প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। অন্যদিকে ভারত বিমসটেক চুক্তির আওতাভুক্ত দেশগুলির সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে পাকিস্তানের উন্নয়ন প্রচেষ্টা সমূহকে বাধাগ্রস্থ করতে চাইছে। পাকিস্তান কিন্তু এই চুক্তিভুক্ত দেশগুলির সদস্য তালিকায় নাই।
সৌদি আরব পাকিস্তানকে একটি হুমকি হিসাবে দাড় করাতে চাইছে পার্শ্ববর্তী দেশ ইরানের বিরুদ্ধে। বেলুচিস্তান এর জাহিদান সীমান্তে পাকিস্তান বিমান বাহিনী বেশ বড়সড় (বিমান) ঘাটি বানিয়েছে। সেখানে পাকিস্তানী বাহিনীর শক্তিমত্তা প্রদর্শনের সুযোগ নাই কারণ পার্শ্ববর্তী দেশ ইরান কখনোই কোন আগ্রাসী ভূমিকা নিতে চাচ্ছে না। সৌদি সরকার এর সহযোগিতায় যে সকল যুদ্ধ বিমান সংগ্রহ করা হয়েছে বা হবে সেগুলি পাকিস্তান আপন প্রতিরক্ষার প্রয়োজনে শুধুমাত্র ব্যবহার করবে কখনোই আক্রমণাত্মক কর্মকান্ডে যাবে না বলে ঘোষণা দিয়েই রেখেছে। অন্যদিকে সৌদি সরকার প্রচন্ড আত্মতুষ্টিতে রয়েছে যে প্রয়োজনবোধে পাকিস্তানী বিমানঘাটিটি ব্যবহার করা যাবে ইরান এর বিরুদ্ধে। সৌদি ইরান বৈরীতা কিন্তু শিয়া সুন্নী বৈরীতা জাতীয় নয় বরং রাজতন্ত্র আর ইসলামী সাম্যবাদ এর মধ্যকার দ্বন্দ্বের বহিঃপ্রকাশ মাত্র। ইরান সবসময় বর্তমান সৌদি রাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা এবং পবিত্র কাবা শরীফের রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা নিয়ে সোচ্চার এবং প্রতিবাদমুখর। সে চায় সেখানে ইসলামী মূল্যবোধের আলোকে সাম্যবাদী ভাবধারার একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে উঠুক। মহান আল্লাহতায়ালার মোমিন বান্দা হিসাবে প্রত্যেক মুসলমানই যেন হতে পারে পবিত্র কাবা শরীফের খেদমতগার। সেই ধারণা বা মতবাদ প্রতিষ্ঠিত হলে সৌদি রাজতন্ত্রেরই ধারা বদলে যায় তাই তারা ইরান বা পারসিক ইসলামী চিন্তা ধারাকে সবার কাছ থেকেই দূরে সরিয়ে রাখতে চায় আর নিজেরাতো থাকছে আপন সৃষ্ট বলয় আর আবেষ্টনীতে আবদ্ধ হয়ে।
অন্যদিকে, সৌদির মতো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের পয়লা নম্বরের শত্রু। একটি পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে যখন অত্র এলাকায় শান্তি সহমর্মীতার আবহ সৃষ্টি হয়েছিলো তখন হঠাৎ করেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ চুক্তি থেকে সরে আসে একক সিদ্ধান্তে এবং উল্টো ইরানের উপর পরমাণু অস্ত্র তৈরী প্রচেষ্টার অমূলক অভিযোগ এনে দেশটির উপর অবরোধের খড়গ চাপিয়ে দেয়। দমবার পাত্র নয় ইরানও। সে তার পরমাণু প্রকল্প চালু করে, পারমাণবিক অস্ত্র বহনকারী ক্ষেপণাস্ত্র তৈরী সহ যুদ্ধ বিমান ব্যবস্থা গড়ে তোলে। আধুনিক যুদ্ধাস্ত্র বহনকারী ছোট আকারের নৌযান বহর গড়ে তোলে পারস্য উপসাগরকে রক্ষাব্যুহ প্রতিপন্ন করে। এখন ইরান বারবার আগ্রাসী মনোভাব দেখাচ্ছে মার্কিনীদের যুদ্ধ জাহাজগুলির প্রতি। মার্কিন সরকার এ ব্যাপারে বেশ বিচলিত। জাপানী প্রধানমন্ত্রী ইরানকে বাগে আনতে দুতিয়ালী চালিয়ে যাচ্ছেন। অন্যদিকে আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত ইরান থেকে কমদামে তেল কিনে আনতে যেন মুখিয়ে রয়েছে। শুধু মুরুব্বীই বাধা। যদ্ভব-তদ্ভব।
লেখক : অধ্যক্ষ, কলামিস্ট।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বৃক্ষরোপণ
  • জলবায়ু পরিবর্তনই আসল সমস্যা
  • কিশোর অপরাধ
  • আ.ন.ম শফিকুল হক
  • হোটেল শ্রমিকদের জীবন
  • বিশেষ মর্যাদা বাতিল ও কাশ্মীরের ভবিষ্যত
  • বাংলাদেশে অটিস্টিক স্কুল ও ডে কেয়ার সেন্টার
  • বেদে সম্প্রদায়
  • গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে সুপারিশমালা
  • ত্যাগই ফুল ফুটায় মনের বৃন্দাবনে
  • প্রকৃতির সঙ্গে বিরূপ আচরণ
  • ঈদের ছুটিতেও যারা ছিলেন ব্যস্ত
  • সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের বর্ষপূর্তি : প্রাপ্তি ও প্রত্যাশা
  • আইনজীবী মনির উদ্দিন আহমদ
  • শিশুদের জীবন গঠনে সময়ানুবর্তিতা
  • শাহী ঈদগাহর ছায়াবীথিতলে
  • কিশোর-কিশোরীদের হালচাল
  • বলকানস : ইউরোপের যুদ্ধক্ষেত্র
  • সন্তানের প্রতি অভিভাবকের দায়িত্ব
  • শিক্ষার হার এবং কর্মসংস্থান প্রসঙ্গ
  • Developed by: Sparkle IT