পাঁচ মিশালী

কুশিয়ারা এক মায়াবী নদীর নাম

তোফায়েল হোসেন প্রকাশিত হয়েছে: ২২-০৬-২০১৯ ইং ০০:১৬:২৯ | সংবাদটি ১০৭ বার পঠিত

ছেলেবেলায় রাত জেগে রেডিওতে নাটক শোনার অভ্যাস ছিলো আমার। এক রাতে শুনেছিলাম নাটক ‘কুশিয়ারা’। গভীর জলের অতলে কুশিয়ারা নদীর এক জেলে নৌকাডুবিতে তলিয়ে যায়। পাতালের দেশে জেলের মায়াবী বিচরণ শেষে আবার ডাঙায় ফিরে আসা। কত বিচিত্র সব গল্প। শৈশবের কল্পনায় সেদিনের অনুভূতি প্রাপ্ত বয়সে এসে আজো রয়ে গেছে একই রকম জীবন্ত। চাকরি সূত্রে বালাগঞ্জ উপজেলায় অবস্থান করতে গিয়ে শৈশবের সেই কল্পনার নদী কুশিয়ারার সাথে আমার সরাসরি সাক্ষাৎ। বলা যায় ভাবজগতের নদীর সাথে বাস্তবের সাক্ষাৎ। এ এক অলীক অনুভূতি। কি যে এক রোমাঞ্চ জাগা অনুভূতি!
এই নদী তুমি--
এর নাম ধানসিঁড়ি বুঝি?
জীবনানন্দ দাশের মত আমিও বিড়বিড় করে বলেছিলাম কুশিয়ারার সাথে প্রথম সাক্ষাতের দিন,
‘এই নদী তুমি-
তোমার নাম কুশিয়ারা বুঝি?’
আমার বাড়ি ফরিদপুর। বৃহত্তর ফরিপুরের পার্শ্বদেশ বিদীর্ণ করে প্রবাহিত প্রমত্তা পদ্মার সাথে আমার আজন্ম পরিচয়। ঘোলা পানি আর রুপালী ইলিশের জন্য বিখ্যাত এই নদী পৌরাণিক নদী গঙ্গার শাখা। বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে গোয়ালন্দ, রাজবাড়ীতে যমুনার কালো জলের প্রবাহকে ধারন করে একই নাম নিয়ে এগিয়ে চলেছে। চাঁদপুরে মেঘনা নদীর সাথে মিলে পদ্মা নাম খুইয়ে তিন নদীর মিলিত প্রবাহ মেঘনা নাম নিয়ে পতিত হয়েছে বঙ্গোপসাগরে।
‘তোমার আমার ঠিকানা/ পদ্মা মেঘনা যমুনা।’
শৈশবে শোনা এই শ্লোগান শুনে চমকিত হতাম। এত সুন্দর করে প্রাণের কথা প্রকাশ করা শ্লোগানটি নাকি মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে জন্ম নিয়েছে। এতটা শৈল্পিকভাবে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের আন্দোলনটি পরিচালিত হয়েছিলো ভেবে গর্ব অনুভব করেছি সব সময়। পদ্মা মেঘনা যমুনা অববাহিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চল বাংলাদেশ নামক ভূখন্ডকে ভৌগলিকভাবে স্বাতন্ত্রমন্ডিত করেছে। এই তিন নদীর প্রবাহ আর তাদের শাখা-প্রশাখা এই মাটিকে করেছে সুজলা সুফলা শস্য-শ্যামলা। বাঙালির হাজার বছরের বসবাস ও উপস্থিতিকে সম্ভব করেছে হিমালয় থেকে প্রবাহিত এসকল নদী-উপনদী। নদীমাতৃক বাংলাদেশ কথাটির উৎপত্তিও হয়েছে সেই কারণে।
আজ যখন ছেলেবেলার ভাবজগতে প্রবাহিত নদী কুশিয়ারার পারে দাঁড়িয়ে অনুভব করি প্রাগৈতিহাসিক অনুঘটকগুলোকে, তখন এই নদী নাড়ীর গভীরে গিয়ে মোচড় মেরে দেয় টান।
কবির ভাষায় অনুভূতির প্রকাশ :
‘আচানক নদীর কোমর ধরে দিলাম জোরে টান/ নদী আমার গলায় ঝুলে ছুড়লো গভীর বাণ।/ নদীরে জীবন কই, নদী আমার সই/ নদীর ঘরে বসত করে নদীর কথা কই।/ ডরের ঘোরে বেঘোর লাগে শরম জ্বলা দুপুর/ বেদন চিতে হৃৎকম্প হৃদয় জাগানো ভোর।/ এপার ধরে ভাটিয়ালি ওপার কীর্তনীয়া।’
ভারতের আসাম রাজ্যের উত্তরাঞ্চলের পর্বত থেকে উদ্ভুত হয়ে বরাক নদী কিছু দূর পর্যন্ত নাগাপাহাড় ও মণিপুর রাজ্যের মধ্যে সীমারেখা রচনা করেছে। এরপর দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হয়ে কাছাড় জেলার শিলচর থেকে পশ্চিম দিকে প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশের সিলেট জেলার জকিগঞ্জ উপজেলার উত্তর-পূর্ব সীমান্তে অমলসিদ নামক স্থানে বরাক দুটি ধারায় বিভক্ত হয়েছে। উত্তর-পশ্চিমের ধারাটি সুরমা এবং দক্ষিণ-পশ্চিমের ধারাটি কুশিয়ারা। হবিগঞ্জ জেলার আজমিরিগঞ্জ উপজেলার মারকুলী নামক স্থানে কুশিয়ারা পুনরায় সুরমার সঙ্গে মিলিত হয়ে কালনী নাম ধারণ করে দক্ষিণ দিকে ভৈরব উপজেলার ভৈরববাজার পর্যন্ত প্রবাহিত হওয়ার পর সুরমার অপর শাখা ধনুর সঙ্গে মিলিত হয়ে মেঘনা নামে প্রবাহিত হয়েছে। মারকুলীর উজানে কুশিয়ারা কিছুটা জায়গা জুড়ে বিবিয়ানা নদী নামেও পরিচিত। (তথ্যসূত্র : বাংলাপিডিয়া)
মেঘনা নদীর প্রবাহের বেশিরভাগ পানি কুশিয়ারা দিয়ে প্রবাহিত হয়। কালো রঙের মায়াময় জলের ¯্রােত বয়ে চলা সুগভীর কুশিয়ারা দৃশ্যত এক রহস্যময় নদী। সিলেট জেলার বালাগঞ্জ উপজেলা থেকে মৌলভীবাজার জেলার রাজনগর উপজেলাকে পৃথক করেছে এই নদী। নদী পার হতে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ খেয়া নৌকা ব্যবহার করে। মানুষ পারাপারের এত ভীড় দেখে এই নদীতে সেতুর প্রয়োজন আপনা হতেই বোধ করে সবাই। হয়তো কর্তৃপক্ষ সেটি নিয়ে ইতিমধ্যে কাজও করছে। কুশিয়ারার কোমল-কমনীয় রুপ-সৌন্দর্য আর বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য আশির্বাদের চিরাচরিত বাস্তবতার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় হুমকি হতে চলেছে টিপাইমুখ বাধ। ভারতের অভ্যন্তরে বরাক নদীর উপর এ বাঁধ কার্যকর হলে নিশ্চিতভাবেই নিয়ন্ত্রিত হবে কুশিয়ারা নদীর প্রবাহ। জীববৈচিত্র আর জলের ধারা বাধাগ্রস্ত হবার ক্ষতিকর প্রভাব বাংলাদেশের উপর ব্যাপকভাবে পড়বে বলেই বিশেষজ্ঞদের অভিমত।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, কুশিয়ারা নদী এক দিন বিপুল ঐশ্বর্যে ভরপুর ছিল। শুশুক, ইলিশসহ বহু প্রজাতির মাছ এখানে খেলা করত। উত্তাল ¯্রােতে চলতো পাল তোলা নৌকা। লঞ্চ, স্টিমার ও মালবাহী জাহাজ চলতো সারা বছর। ঘাটে ঘাটে ছিলো নৌকার ভিড়। ছিলো কুলি-শ্রমিকদের কোলাহল। কুশিয়ারা নদীকে কেন্দ্র করে বালাগঞ্জ বাজার, শেরপুর ঘাট ও ফেঞ্চুগঞ্জ বাজার ছিলো সদা কর্মতৎপর সচল নৌবন্দর। বিস্তীর্ণ জনপদে কুশিয়ারা নদীর সেচের পানিতে হতো চাষাবাদ। অনেক পরিবারের জীবিকা নির্বাহের অবলম্বন ছিল এই কুশিয়ারা। কিন্তু এখন নদীর দিকে তাকানো যায় না। দিন দিন যেন সঙ্কীর্ণ হয়ে আসছে তার গতিপথ। অথৈ পানির পরিবর্তে কেবল কান্নার সুরই যেন ভেসে আসে কুশিয়ারার বুক থেকে। এ যেন সৈয়দ ওয়ালী উল্লাহর 'কাঁদো নদী কাঁদো' উপন্যাসের কথা মনে করিয়ে দেয়। কুশিয়ারার তীর ঘেষে বালাগঞ্জ উপজেলা পরিষদ থেকে বাজারের দিকের পাকা রাস্তা দেখলাম ধ্বসে পড়েছে। স্থানীয়রা বলছে, এটা নাকি অতিমাত্রায় ড্রেজিং করার কারণে হয়েছে। কুশিয়ারা নিরবে-নিভৃতে বয়ে চলা নদী, পদ্মার মত কীর্তিনাশা নয়। বাংলাদেশের নদী ব্যবস্থাপনা যে দুর্বল, এই ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে।
তবুও নদীর গতিপথ ধরে রূপ-সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে আপন মনে ভাবি, কুশিয়ারা বেঁচে থাক। বেঁচে থাকুক তার বুকের ভেতর প্রাণী বৈচিত্রের কোলাহল, দু’পারের মানুষের প্রাণ-চাঞ্চল্যের প্রতীক হয়ে টিকে থাকুক গভীর ¯্রােতস্বিনী মায়াবী-রূপসী কুশিয়ারা নদী।
লেখক : সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার, বালাগঞ্জ, সিলেট।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT