সাহিত্য

আলোকিত কবিতার ধ্যান

মামুন সুলতান প্রকাশিত হয়েছে: ২৩-০৬-২০১৯ ইং ০০:৫৬:৪১ | সংবাদটি ১৯০ বার পঠিত

আশরাফ হাসান নব্বই দশকের শক্তিমান কবি। কবিতার ধীমান জগতে তিনি একজন প্রদীপ্ত প্রতিভা। তাঁর কবিতার ভাব-ভাষা, বিষয়-আশয়, ছন্দ-গতি-প্রবহমানতা, রস-রহস্য; ছন্দ-অলংকার, ভাবচিত্র-কল্পচিত্র কিংবা চিত্রকল্প ইত্যাদি সংগত শিল্পগুলো সুষ্পষ্ট। কবিতার এই অনিবার্য উপকরণগুলো তিনি সচেতনভাবে ব্যবহার করার চেষ্টা করেন সব সময়। নব্বই দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে আমি তাঁর কবিতার অনুসন্ধিৎসু পাঠক। কবিতার ধারাপাত খুঁজতে ডুব দিতাম তাঁর কবিতায়। চিত্রকল্পের সুনিপুণ চিত্র নির্মাণে তিনি দক্ষ শিল্পী। মেঘের দেশের নাইওরী পালকি চড়ে বাপের বাড়ি যায়। তাঁর কবিতা পড়তে পড়তে আমি তাঁর মুগ্ধ পাঠক। কোন সাহিত্য আসরে সুরেলাকণ্ঠে তিনি যখন আবৃত্তি করতেন তাঁর কবিতার পংক্তিমালা, আমরা তখন মুগ্ধস্রোতা। কবিতার সাথে সাথে হারিয়ে যেতাম কোন কল্পজগতে। ঈর্ষা করতাম। এতো সুন্দর কবিতা কেমনে লিখেন!
কবি আশরাফ হাসান কবিতার সংসার বহু মানুষের সঙ্গ পেয়েছেন। বহুলোককে দিয়েছেন তাঁর মূল্যবান সময়। তিনি যেমন ভালো কবিতা লিখতেন- তেমনি কবিতার সমঝদার পাঠকও বটে। সেই সুবাদে অনেক অগ্রজ-অনুজ কবিদের কবিতা নিয়ে শ্রমসিদ্ধ সার্থক সমালোচনা লিখেছেন। স্থানীয়-জাতীয় পত্র-পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। মনের মাধুরী মিশিয়ে সাহিত্য সমালোচনা করেছেন। তিনি বড়কে বড় বলার উদারতা দেখিয়েছেন। একচক্ষু মনোভাব নিয়ে কখনো সাহিত্য বিচরণ তাঁর ছিলো না। তিনি শাদাকে শাদা এবং কালোকে কালো বলার সাহস ছিলো। বড়দের সম্পর্কে তিনি কখনো বিরূপ মন্তব্য করেন না। ছোটদের লালন করেন ভাবিকালের সাহিত্যিক হিসেবে। তিনি একসময় অনেক কবি-সাহিত্যিকদের নিয়ে আলোচনা করেছেন। আজ সময় এসেছে কবি আশরাফ হাসান আলোচিত হবেন।
সম্প্রতি আশরাফ হাসানের বিয়াল্লিশটি কবিতার একটি পা-ুলিপি আমার হস্তগত হয়েছে। এ কবিতাগুলো আমার পাঠকমনকে তুষ্ট করতে পাঠে মনোযোগী হয়েছি। বরাবরের মতো তৃপ্ত হয়ে দু’কলম আবেগ-উৎঘীরণে নিযুক্ত হলাম। এই পা-ুলিপিটি ‘পাখিলৌকিক জোছনা’ হয়ে পাঠকের দরবারে আসছে। সেই সাথে কবিতার ভেতর বাড়ির আসবাবপত্র সাজানো-গোছানো-কেমন পরিপাটি হলো, দরজার নকশা, জানালার কাঁচ, রান্না-ঘরের তৈজসপত্র, ড্রয়িংরুমের কারুকাজ, কবিডোরে ঝুলন্ত-চেয়ারে ইত্যাদির খোঁজ-খবর দিতে সূত্রধর হিসেবে বলার চেষ্টা করবো।
‘তোমরা আমায় দোষ দিও না দোষ দিও না;/ তিনি আমার হারিয়ে যাওয়া মেঘের ছায়া/ মা শুধু নয়, মা শুধু নয়Ñভালোবাসা।’
কবির মাথার উপর ছায়া নেই। রোদে পুড়ে গেলে গীতল আদরে খোকাকে স্নিগ্ধ-শীতল ছায়া দেবে না কেউ। দুঃখে কষ্টে মলিন হলে, দস্যু-দানবে আক্রান্ত হলে-মায়ার মাদুর হয়ে, প্রীতির সভায় প্রধান হয়ে, ঢালের মতো আঁচল দিয়ে মা’ ই সন্তানের একমাত্র ছায়া হয়ে থাকেন। কবির সেই ছায়া সেই মাকে স্মরণ করে লিখেছেনÑ
‘এখন আমার মাথার উপর সেই ছায়া নেই,/ ঝলসে যদি বোশেখ রোদে ধূমকেতু হই/ সকল ফাঁদে নির্বিবাদে অগিড়ব ঝরাই।’
কবির অস্তিত্ব নিয়ে কবি সন্দিহান। মানুষ আর মাটি। একক সত্তা-নাকি দ্বৈত সত্তা। ‘আমিহীন মাটি আর মাটিহীন আমি’-এই আমিত্ব আর মাটিত্ব - নিয়ে কবির প্রশ্ন ‘-একই সত্তার দুটো দাফন কী করে সম্ভব?’ মহাপ্রয়াণে কে যাবেন? - কবি যখন ‘মাটি’ হতে চান তখনই তিনি মাটিহীনদের পায়ে পায়ে পিষ্ট হন। আবার ‘মাটিহীন’ হতে চাইলেÑ
প্রতিবাদের ভাষাকে বানাই নির্মেদ প্রহরী/ বিদ্রোহের বারুদে পোড়াই উৎপীড়ক দিন/ মাটি আমাকে বিনত হতে বলে/ মাটিহীন ‘ওরা’ নসিহত বাটেÑ/ খুলে ফেলো তোমার অহমিকার দুর্বিনীত পোশাক/ এখন ভেবেই পাচ্ছি না/ মাটিহীন ‘আমি’ হবো/ না আমিহীন ‘মাটি’!’
কী সাংঘাতিক আধ্যাত্মিকতা। মাটির সাথেই ‘আমি’ -মিশে যাবে মানুষ। কেবল ‘আত্মা’- চিরঞ্জীব সত্য।
‘ঘড়ির কাঁটা ধরে নামে অমাবস্যা’ কবিতায় সেই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যেতে পারে। দ্বান্দ্বিক কোলাহলে কবি যখন নিরন্নের মতো যখন লাইট পোস্টের নীচে দাঁড়ান- তখন থোকা থোকা জমা হয় ‘অশান্ত অন্ধকার’... চল্লিশ বছর ধরে যা সঞ্চয় করেছেন- তা কেবলই- ‘অগণিত শূন্যের বেসাতি।’ সংগ্রাম মুখর জীবনে রাজপথে উত্তাল মিছিল থেকে ফিরে আসেন শূন্য হাতে।
তারপর এভাবে তারাদের রাত যখন/ জোছনার হাত থেকে ঝরে যায়,/ শেষের অস্থির সন্তাপ গায়ে মেখে/ চলে যেতে হয় আজন্ম রিক্ত হাতে/ আর অভিষ্ট মানজিলের প্রস্তুতি/ কেবল অগোছালোই থেকে যায়।
অথবা :
ঘাসের ওপারে মৃত্তিকা/ উর্বর পলির দ্যাশ/ স্বপ্নের মুক্তি যেখানে/ ‘কুলু নাফসিন জা-য়িক্বাতুল মাউত’
কবির পরকাল ভাবনা কবিকে আড়ষ্ট করে না। বরং কবির আত্মাকে সঁপে দিয়েছেন ‘সুদূর আলোকের উর্ধ্বালোকে।’ কবি ভীষণ উৎসুক নিয়ে ছুটে যান গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে। স্বপ্নিল সব সফর শেষে কবি পেয়েছেন ‘অঢেল মুক্তির ইয়াকুত।
‘পরম তৃপ্তির সম্মোহন সংবাদ’ পেয়ে অকষ্মাৎ চেয়ে দেখেন ‘সফেদ পর্দার লাখো স্তবকে সাজানো আমার চারদিকে স্বপ্নিল ক্যানভাস।’ কবির কাছে আসে সেই সম্মোহন সংবাদ কী আশ্চর্য মোহনীয়। নূরে আ’লার মে’রাজ কামনা করেন তপ্ত অশ্রুজলে। কবি আশরাফ হাসানের সুপরিমিত মানস-কামনা ‘অনন্ত অনিঃশেষ’ কবিতায় ভেসে উঠেছে ‘-আমার নূরে আ’লার আল্লাহর অনন্ত সান্নিধ্যে অনিঃশেষ...। আল্লাহর কাছে যার আত্ম-সমর্পণ কবিতা তার কাছে আন্তরিক শব্দ-দ্যোতনায় বিগলিত হবে পরম মমতায়।
‘প্রতীক্ষার প্রহর’- কবিতায় কবি সেই মানস আরো প্রকটভাবে ধরা দিয়েছে।
কবির আহ্বান-
‘জায়নামাজের নরম মুসল্লায় একটি বার হাত রাখো-
জায়নামাজের নরম মুসালায়/ একটিবার হাত রাখো,/ দ্যাখো ঊষ্ণতার অনন্ত আলোয় কী ভীষণ উদ্ভাসিত/ তোমার উ™£ান্ত অহমিকার নিকষিত নীল!/ সান্নিধ্যের প্রার্থী তো সে হবেই,
এখানে স্রষ্টার ভালোবাসা নিরঞ্জন!’ -এখানে স্রষ্টার ভালোবাসা নিরঞ্জন’ আহ- কী মধুর- কী আকুল আকুতি! স্রষ্টার নৈকট্য লাভের একান্ত আগ্রহ নিয়ে কবির একান্ত আহ্বান-
দ্যাখো, চেয়ে দ্যাখো তোমার অস্তিত্বের/ প্রতিটি অনুতে পরমাণুতে স্রষ্টার ভালোবাসা নিরঞ্জন!/ যাও, প্রস্তরিত কবট বুকে/ প্রশস্ত ঔদার্যের হাত ধরে যাও/ এগিয়ে যাও ঘনিষ্ঠতার একনিষ্ট মহিমায়-’
‘বসন্তবেলা’ কবিতায় কবি কী যেন বলতে চান। কার আসার প্রতীক্ষায় দিন গুনছেন। প্রতিশ্রুতি দিয়েও সে আসছে না। তার জন্য কতো বিনিদ্র রজনী কেটেছে সবার। গণহত্যার ঝাঁঝালো রাত গেলো-বাবা জায়নামাজে সেজদারত, মা দোয়ায় অশ্রুসিক্ত, বোন খোঁজেন প্রভাতের মুখ তবু সেই প্রত্যাশা ফিরে আসে না, -সেই মুখ, সেই প্রত্যাশা কবির ভাষায় শোনা যাক :
অপেক্ষায় প্রতীক্ষার রেশ প্রলম্বিত বহুদূর/ এখনো আত্মার স্পন্দন যেনো তোমার অভাবনীয় মুহূর্তের ভয়/ মাটির প্রতিটি ধুলিকণায় জুড়ে বসে অপ্রেমিক দস্যুদের পার্ক/ বিবর্ণ ডায়রির পুঁতে রাখা রক্তিম কবিতার শুরু হয়েছে প্রসব বেদনা.../ তোমার আর আসা হলো কই?
অথচ, ‘সুবোধ সংলাপ’ - কবিতায় কবি হতাশা নিয়ে বলছেন-
‘কী বিশাল নীল খামের ভিতর ক্রমাগত ঢুকে যাচ্ছে/ আমার গতিময় আলোর সাম্পান...’
‘নেই কিছু নেই মুক্তি চাই’ - কবিতায় সেই হতাশা আরো গভীর দুঃখ নিয়ে দেখা দিয়েছে-
হায়! এখন কার কাছে যাই/ প্রতিদিন ফুটছে দুঃখের লাভা/ তাকেও বলি ওগুলি ফেরত নাও/ লাল শরম ঝেড়ে আশাহত করলো সে/ ক্রেতাজন ধারেপাশে দেখছি না কেউ
নেই কিছু নেই, মুক্তি চাই।- মুক্তি চাই মুক্তির স্বাদে কবি যখন দেওয়ানা। তখন ‘ডানাভাঙা পাখি’ কবিতায় এ কী শোনাচ্ছেন কবি?
মৃত্যু ঘটেছে কবির কতকাল আগে/ খোঁড়া শালিকের মতো নিঃশ্বাস হাঁটে/ কার ধ্যানে চোখ দুটো শ্রাবণের ধারা/ কষ্টপ্রহর বেয়ে দস্যুরা নামে;/ হৃদয়ের তারে তারে রিদম মরে গেছে/ রক্তিম কবিতার ভাষা ডানাভাঙা পাখি।’ সেই ‘ডানাভাঙা পাখি’ ‘বিবর্ণ বেলায় এসে’ খানিকটা আলো নিয়ে উড়তে দেখা গেছে-
কে তুমি বলে যাও, বলে যাও/ লৌকিকতায় অলৌকিক আলো/ কিংবা মৃদু গতির এক স্বচ্ছন্দ পাখি/ আমাকে বলে যাও আঁধার গহিনে’
কে ওই সহসা জ্বলে বিজলি সম! - এখানে যে পাখিকে দেখা গেলো সেই পাখিও সুরের পাখি। সেই পাখির তীক্ষè কণ্ঠে রবের তৃষ্ণা। বেলায়েতি ধ্যানে কবিও মগ্ন হন এই বিবর্ণ বেলায়।
কবি আশরাফ হাসানের কাব্যিক বুননে ছন্দের সেলাই সুনিপুণ। ছন্দপটু কবি হিসেবে তিনি গ্রহণযোগ্য শিল্পী। স্বরবৃত্ত, অক্ষরবৃত্ত এবং মাত্রাবৃত্ত ছন্দের ব্যবহার করেছেন। আধুনিক কাব্যগাঁথুনির সাথে ছান্দিকতা তার কবিতাকে অপূর্ব রূপ-ব্যঞ্জনা দান করেছে। কথা বলেন অতি আড়াল থেকে কিন্তু শব্দের ছন্দ-প্রবহমানতা অত্যন্ত সাবলীল। স্বচ্ছন্দগতিতে ঋজু-তালে সামনে এগুতে থাকে।
‘হারিয়ে যাওয়া মেঘের ছায়ায়’ দেখা যায়-/ চোখের তারায় কাঁদতো তাঁহার কত্তো রহম/ প্রীতির সভায় প্রধান তিনি দৃপ্ত অটল/ কিংবা ধরো দস্যু দানব হায়না যারা/ খামচে দেবে শীর্ণ দেহ এই যে আমারÑ/ আঁচলটাকে টানিয়ে দিতেন ঢালের মতো;’
এভাবে চিত্রকল্পের বিস্তর উদাহরণ পেশ করা যাবে। কবি আশরাফ হাসানের এটাই স্বতন্ত্র্য কাব্যপ্রতিভা।
উপমা- অলংকার ব্যবহারেও কবি দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। তার কবিতা পাঠ করলে মনের মাঝে এক ধরনের ভালো লাগা তৈরি হয়। এই ভালো লাগার জন্য কবিতা পাঠ জরুরি। মন-খারাপের দিন যদি কবিতা পাঠে মন ভালো হয়ে যায় তাহলে এই কবিতা যাপন দিনই হোক যাপিত জীবনের সঙ্গী। কবিতার আসরে কবি আশরাফ হাসান কালের নকীব হয়ে পাঠকের মিনারে ধ্বনিত হবেন প্রতিদিন। ‘পাখিলৌকিক জোছনা’ কবিতার বইটি অনাগত পাঠকের হাতে নন্দিত হবে। পঠিত হবেন কবি আশরাফ হাসান। আলোকিত কবিতার ধ্যানে বিমোহিত হবেন কাব্যপাঠক। ভবিষ্যতের পড়ার টেবিলে ল্যাম্পপোস্ট হয়ে হয়ে থাকবে ‘পাখিলৌকিক জোছনা’...। গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে পা-ুলিপি প্রকাশন। মূল্য রাখা হয়েছে ১২০ টাকা। প্রচ্ছদ করেছেন বায়েজীদ মাহমুদ ফয়লসল। আমরা গ্রন্থটির বহুল প্রচার কামনা করি।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT