সাহিত্য

প্রেম বদল

এম আশরাফ আলী প্রকাশিত হয়েছে: ২৩-০৬-২০১৯ ইং ০১:০০:১০ | সংবাদটি ২৫৩ বার পঠিত

বিয়ের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলেন আকিরার অভিভাবক। একেতো বাড়ি ঘরের অবস্থা ভালো নেই, তার উপর বেজায় দূরত্ব। যেতে আসতে দুদিন লেগে যাবে। আদরের আকিরার মুখ না দেখলে মা-বাবার যেখানে পেটের ভাত হজম হয় না- এত দূরত্বে আকিরাকে পাঠিয়ে ওরা থাকবেন কী করে। অবশ্য ছেলেটা খুবই পছন্দের। ওর চাল চলন, আচার-ব্যবহার, সবাইকে মুগ্ধ করে। সরকারি চাকুরে। ইউনিয়ন কৃষি অফিসের কর্মকর্তা। সুঠামদেহী। নাদুস-নুদুস চেহারা। ন¤্র-ভদ্র। কোন দিকেই ফেলে দেবার নয়। বংশ মর্যাদাও কম নয়। তবে সংসারে যেমন দারিদ্র আছে, তেমনি ঘর-দোরও কাঁচা। ছন-বাঁশের তৈরি।
দেউল গ্রাম থেকে অচিন্ত্যপুর। তখন যাতায়াত ছিল কষ্টের। দেউল গ্রাম থেকে সিলেট সদর আসতেই লাগতো ছয়-সাত ঘন্টা। এখান থেকে ট্রেনে যেতে হয় ভানুগাছ। সেখানে নেমে সিএনজিতে যেতে হয় বিশ কিলোমিটার উত্তরপূর্বে। তারপর পায়ে হেঁটে বা রিকশাযোগে দুই কিলোমিটার। বাব্বা। সকালে যাত্রা করলে সন্ধ্যা হয়ে যায়। এমন অজপাড়া গায় কেউ আত্মীয়তা করে? যদিও ছেলেটা দুঃখ পাবে-তারপরও এক বেজারই ভালো। সম্পর্ক হলে তিন বেজারই হতে হবে। যাওয়া আসা, নাইওর, ইফতারি, আম কাঁঠালি নানা অনুষ্ঠানে যোগদান নিতান্ত কষ্টকর হবে। তাছাড়া একমাত্র আদরের দুলালী আকিরা। বিয়ের পরও যাতে কাছে থাকে, সেই চিন্তাই মা বাবার। এমন একটা পাত্রের সাথে বিবাহ দিতে হবে- যাতে ইচ্ছা করলেই ওকে নিয়ে আসতে পারে। ইচ্ছা হলেই গিয়ে দেখে আসা যায়। আকিরার বাবা অত্যন্ত দুঃখের সাথে জসীমকে ফিরিয়ে দিলেন।
দেউল গ্রামের কৃষিকর্মকর্তা জসীম উদ্দীন। সদ্য চাকরি নিয়ে এখানে এসেছেন। তখনতো আর এত যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল না। এখন যেভাবে শহরে থেকে গ্রামের যে কোন জায়গায় চাকরি করা যায়, তখন এরকম ছিল না। এ ছাড়া এখনকার মত গ্রামে গ্রামে বা নাগালের মধ্যে স্কুল কলেজ ছিল না। স্কুল-কলেজ পড়–য়া ছাত্ররা লজিংয়ে থেকে পড়া লেখা করত। ঠিক একইভাবে গ্রামে অবস্থিত অফিস আদালতে যারা চাকরি করত, তাদের লজিং এ থাকা ছাড়া বিকল্প ছিল না। জসীম উদ্দীন কাজে যোগদান করেই পড়লেন বিপাকে। আজই লজিং দরকার। বিছানাপত্র নিয়েই এসেছেন অথচ এখন বিকাল তিনটা। এক ঘন্টা পর অফিস ছুটি হয়ে যাবে। উঠবেন কোথায়? যে কোন মূল্যে একটা লজিং পাওয়া খুবই দরকার।
অফিসের দ্বিতীয় কর্মকর্তা হাফিজ আহমদ বেশ ক’বছর ধরে এই এলাকায়ই আছেন। উনি অবশ্য বেশ পরিচিত লোক। তার প্রচেষ্টায় একটি লজিং যোগাড় হয়ে গেল। রাউতার গাঁওয়ের মোড়ল আমির মেম্বারের বাড়িতে। চারটা বাজতেই দু’জন লোক হাজির। একজন বেশ মোটাসোটা। গায়ে বেশ জোর আছে বলে মনে হলো আর অন্য জন ছাত্র-ছাত্র ভাব।
হাফিজ আহমদ বিনয়ের সাথে বললেন ‘স্যার আপনার লজিং থেকে লোক এসেছে আপনাকে নেয়ার জন্য। আপনি ওদের সাথে যান।’ জসীম উদ্দীন ‘ধন্যবাদ’ বলে আগন্তুক লোকদের সঙ্গ নিলেন। অবশ্য মোটাসোটা লোকটি স্যারের বিছানাপত্র কাঁধে নিয়েছে। অল্পক্ষণের মধ্যে রাউতার গ্রামে হাজির হলেন জসীম উদ্দীন। গ্রামটি দেউল গ্রাম ইউনিয়নের একটি গ্রাম। বাড়ির পুকুর ঘাটে দেখা হলো লজিং মাস্টারের সাথে। লজিং মাস্টার আগেই সালাম দিয়ে জসীম উদ্দীনকে রিসিভ করলেন। জসীম উদ্দীন লজ্জিত ভঙ্গিতে সালাম দিয়ে লজিংয়ের বাসগৃহে অবস্থান নিলেন।
আমির মেম্বার নিজ হাতে বিছনাপত্র ঠিকঠাক করে, উনাকে খাইয়ে দাইয়ে তার পর বিদায় নিলেন। যাওয়ার সময় বললেন, ‘ভাগিনা নিজের বাড়ির মত থেকো। আর আমার ছেলেটাকে খেয়াল রেখো। ও এমনিতেই ভাল ছাত্র। তথাপি এমনভাবে গড়তে হবে যেন ভালো ছাত্রের সাথে ভালো ঈমান-আমল হয়। জসীম উদ্দিন বললেন- জ্বী আচ্ছা।
কৃষি কর্মকর্তা একজন কর্মক্ষম যুবক। ন্যায়নীতিপরায়ণ। সময় জ্ঞান সম্পন্ন। প্রতিদিন তার কর্মক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়ের পূর্বেই হাজির হন। আশেপাশের দশ গ্রাম জুড়ে কৃষি সম্প্রসারণ প্রকল্প হাতে নিয়েছেন। সকল গ্রামের কৃষকদের জড়ো করে সেমিনার করেন। কীভাবে ফসল ফলালে ভালো ফসল হবে, কেমন বীজ ব্যবহার করতে হবে কখন চাষাবাদ করতে হবে ও কোন সময় কী ফসল লাগালে দ্বিগুণ ফলন হবে ইত্যাদি পরামর্শ দেন। অল্প দিনের মধ্যেই ওর সুনাম ছড়িয়ে পড়ল। এলাকার সকল লোক তাকে কৃষি স্যার বলে ডাকতে শুরু করল। শুধু তাই নয়। অফিস আওয়ারের পরে যখন উনি লজিংয়ে থাকেন তখনও তিনি বসে থাকেন না। জাল দিয়ে মাছ ধরা, বিশেষ কায়দায় পটাশ দিয়ে পাখি শিকার ইত্যাদি অনেক কাজেই নিবিষ্ট থাকতেন জসীম উদ্দীন। লজিংয়ে গাছ লাগানো, ফসল তুলতে সহযোগিতা করা- অর্থাৎ তাকে মনে হতো এই বাড়িরই লোক। আর লজিংয়ের ছাত্র ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে পড়–য়া ফাহিম ওর সঙ্গ পেয়ে যেন দিন দুনিয়া ভুলে গেছে। স্কুল থেকে ফেরার পরই স্যারের সাথে সাথে থাকতো সে। পড়া শোনা, খেলাধুলা বেড়ানো ইত্যাদিতে ফাহিম, স্যারের নিত্যসঙ্গী। কিছুদিনের মধ্যে জসীম উদ্দিন এই পরিবারে এমন একটা অবস্থান তৈরি করলেন- যে জসীম উদ্দীন বলতে সবাই পাগল। সবকিছুতেই জসীম উদ্দিনকে জিজ্ঞেস করতে হবে। পারিবারিক, ব্যক্তিগত, সমষ্টিগত, বিয়ে শাদি ইত্যাদি সবখানেই জসীম উদ্দীন অনিবার্য হয়ে পড়লেন।
আমির মেম্বার লোকেদের বলতেন ‘জসীম উদ্দীন আমার ফাহিমের মত। ও সত্যিই অনেক ভালো ছেলে।
দিন যায়, মাস যায়, বছর যায়। জসীম উদ্দীন নিজেকে একজন সৎ ও যোগ্য অফিসার হিসেবে এলাকায় প্রমাণ করেন। সবাই ওর প্রশংসায় পঞ্চমুখ। সবাই বলে সত্যিই কৃষি স্যার একজন কাজের লোক। যে কোন কাজে অফিসে গেলে উনি আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করেন। ফসল ফলানো, ফসলের পোকা দমন, সার প্রয়োগ, বীজ বপন, ফসল কাটা ইত্যাদি সকল বিষয়েই সবাইকে পরামর্শ দেন।
ইতোমধ্যে উনার ছাত্র ফাহিম অষ্টম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছে। সবাই মহা খুশি। ফাহিম, স্যার ছাড়া কিছুই বুঝে না। স্যার যা বলেন ফাহিম তাই করে। অনেক সময় মা বাবার কথাও সে ফেলে দেয় কিন্তু স্যারের কথা ফেলে না। অর্থাৎ একজন ভক্ত বনে গেছে সে। অফিস বন্ধ থাকলে স্যার মাঝে মধ্যে বাড়িতে গেলে কেমন মন মরা হয়ে যেতো ফাহিম। শুধু পথের দিকে চেয়ে থাকতো কখন স্যার আসবেন। গুরু ও শিষ্যের মধ্যে এত প্রেম এর আগে মনে হয় কেউ কখনও দেখেনি। স্যার বেতন পেয়ে ফাহিমের জন্য, লজিংয়ের জন্য অনেক কিছুই কিনে আনতেন। উনি লজিংয়ে থাকেন, তার কার্যক্রম দেখে বুঝাই যেত না।
আকিরা আমির মেম্বার এর আপন ভাগ্নি। একই বাড়িতে চাচাতো ভাইয়ের সাথে বোন বিবাহ দিয়েছিলেন বলে তারা এ বাড়িরই বাসিন্দা। আকিরা যেমন সুন্দরী তেমনি বুদ্ধিমতী। ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত গ্রামের পাঠশালায় পড়েছে। তখনকার দিনে মেয়েদের বেশি পড়ানো হতো না। প্রাইমারি পাশ করলেই লেখাপড়ার ইতি টানা হতো। এইবার বিবাহের জন্য অপেক্ষা। শেয়ান মেয়েদের রাস্তাঘাটে চলা নিরাপদ ছিল না। স্কুলে যেতে আসতে বখাটেরা উৎপাত করত। শিষ দিত। খারাপ খারাপ কথা বলত। মান সম্মানের ভয়ে মানী লোকেরা তখন মেয়েদের ঘরে থাকাই উত্তম মনে করতেন। আকিরা জসীম উদ্দীনের কাছে পড়েনি। একই বাড়িতে থাকায় মাঝে মধ্যে চোখাচোখি হয়েছে। এ পর্যন্ত কথাও হয়নি। বিয়ের জন্য রিটায়ার্ড হয়ে বসে আছে। আর ওদিকে কৃষি স্যারেরও বিয়ের বয়স হয়েছে। জসীম উদ্দীনেরও লজিং বাড়ির সাথে অত্যন্ত ভালো সম্পর্ক। সেই সম্পর্ককে আরো জোরদার করার জন্য বা স্থায়ী রূপদানের জন্য জসীম স্থির করলেন আকিরাকেই তিনি বিয়ে করবেন। ওর চাল চলন, কথার ধরন, রূপগুণ সবকিছু ভালো লাগে কৃষি স্যারের। তাই ওকে আপন করে পেতে চাইলেন।
অনেক ভেবে চিন্তে একদিন লজিং মাস্টারের মুখোমুখি হলেন জসীম উদ্দীন। বললেন ‘মামা আমি একটি কথা বলতে চাই।’
-বলো বাবা বলো। কী কথা?
-আপনি যদি মাইন্ড করেন?
-এখানে মাইন্ড করার কী আছে?
-কোন মাইন্ড করবো না। যা ইচ্ছা তাই নির্ভয়ে নির্দ্বিধায় বলতে পারো।
লজ্জায় রাঙ্গা হয়ে উঠলো জসীম উদ্দীনের গাল। এত অভয় দেয়ার পরও ইতস্তত করতে লাগলেন জসীম উদ্দীন।
-কী হলো ব্যাটা। বল...
-আমি আকিরাকে বিবাহ করতে চাই।
কথাটি বলে নিজের রুমের দিকে এগিয়ে গেলেন তিনি।
এক সপ্তাহ হয়ে গেল। আমির মেম্বার কিছুই বললেন না। এদিকে জসীম উদ্দীনের সময় কাটে না। কি বলতে কী বলে ফেললাম। একটা কথা বলা আর একটা বুলেট মারা সমান হয়ে গেল। আমার এত দিনের সম্পর্ক কী এক কথায় শেষ করে ফেললাম। কথাটি না বললেই ভালো হতো.....। লজ্জায় অভিমানে জসীম উদ্দীন আর লজিং মাস্টারের সামনে পড়েন না। মামা এদিকে আসতে দেখলে জসীম যান অন্য দিকে.....।
এক শুক্রবার। জসীম উদ্দীন পুকুরে গোসল করতে গিয়ে পেয়ে গেলেন আকিরাকে। আকিরা সালাম দিয়ে ঘোমটা টেনে অন্যদিকে যেতে চাইলে উনি বললেন- দাঁড়াও আকিরা। আশেপাশে চেয়ে দেখলেন কেউ নেই। তিনি এগিয়ে গিয়ে আকিরার সামনে দাঁড়ালেন। বললেন ‘মনে কিছু নিয় না। আমি একটি প্রস্তাব পাঠিয়ে ছিলাম। কোন সাড়া পাইনি। এ বিষয়ে তুমি কী কিছু জানো?
ঘোমটাটা আরেকটু টেনে আকিরা বলল- স্যার, মনে হয় নেগেটিভ। আপনি মনে কষ্ট নিবেন না। সবকিছু ঠিক ছিল। শুধু আপনার বাড়ির দূরত্বের কারণে মা-বাবা সম্মত হননি। আপনি যদি আমাদের বাড়িতে স্থায়ীভাবে থেকে যান তাহলে হয়ত হতে পারে....। এই বলে আকিরা গুটি গুটি পায়ে প্রস্থান করল। আলতা রাঙ্গা পা দুটো যেন- জসীমের মনে আঘাত করতে করতে কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে। জসীম একদৃষ্টে ওর গন্তব্যের দিকে চেয়ে রইলেন। হঠাৎ ফাহিম এসে ডাকল- স্যার। তড়িৎ ফিরে জসীম বললেন- ফাহিম, কোথায় ছিলে? গোসল করবে?
-জ্বী স্যার।
চল।
ফাহিম কে জসীম ভালো করে গোসল করিয়ে দিলেন। অন্য দিনের মত কোন কথা বলছেন না দেখে ফাহিম বলে ‘স্যার আপনার মন খারাপ? কোন কথা বলছেন না যে...।
ইতস্তত করে বললেন না তেমনটা নয়। তুমি যাও। গায়ে তেল মাখো গিয়ে।
জসীম ভাবতেই পারলেন না- এতো করে যাদের ভালোবাসেন তারা তাকে দূরে ঠেলে দেবেন। আকিরা যে প্রস্তাব দিয়েছে তাও রাখা সম্ভব নয়। ঘর জামাই হয়ে যাওয়া আর নিজের অস্তিত্ব বিলীন করা সমান। জুম’আর নামায আদায় করে কিছুক্ষণ শুয়ে থাকলেন নিজের ঘরে। চৈত্রের শেষ বিকেল। প্রচন্ড খরতাপে চারিদিকে উষ্ণ হয়ে উঠেছে। এরই মধ্যে আকাশটা ঝাপসা হয়ে এলো। ধূ ধূ বাতাস বইতে লাগলো। মনে হয় কাল বৈশাখী শুরু হবে। জসীম উদ্দীন একবার ঘর থেকে বেরিয়ে আকাশের অবস্থা দেখলেন। হ্যাঁ- ঝড় বৃষ্টি হতে পারে। পাঞ্জাবী, পা জামা, কাপড় চোপড় ঘরে নিয়ে আসলেন তিনি। মনের অজান্তেই টিন নির্মিত বাক্সে ওগুলো ঢুকাতে লাগলেন। মনের মধ্যে প্রচন্ড ঝড় বইছে। কালবোশেখীও সে ঝড়ের কাছে হার মানবে মনে হয়। ঝড়ের তান্ডবে প্রতিটি শিরা উপশিরা পর্যুদস্ত। না। আর মাথা কোন কাজ করছে না। এখান থেকে আমাকে বিদায় নিতে হবে। নাড়ির সম্পর্ক থেকেও যে সম্পর্ক গভীরতর আজ তা ছিড়তে হবে। অজানা অভিমান আর অপমান যেন ঘিরে ধরল কৃষি স্যারকে। মনে মনে বললেন বিদায় দেউর গ্রাম বিদায় কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন।
যাবার বেলায় ফাহিম বাড়িতে ছিল না। কোথায় সাথীদের সাথে হারিয়ে গিয়েছিল। জসীম উদ্দীন আমির মেম্বার ও ঘরের সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চললেন নিজ গ্রামে। এ বিদায় বড়ই মর্মস্পর্শী।
আমির মেম্বার বললেন- একেবারেই চলে যাচ্ছ মনে হচ্ছে।
-না মামা। বাড়িতে কিছু কাজ আছে। আসতে লেইট হবে।
-কত দিন?
-প্রায় মাস খানেক। যদি আরও দেরি হয় তাহলে ফাহিমের জন্য একজন শিক্ষক রেখে দেবেন। আগামিতে ওর এসএসসি পরীক্ষা। একজন গাইড লাগবে ওর।
আমির মেম্বার মাথা নাড়লেন। তিনি পাকা লোক। কী বলছে জসীম তার পুরোটাই বুঝতে পারলেন। তিনি নিশ্চিত হয়ে গেলেন জসীম আর আসবে না। মনে মনে ব্যথা পেলেও সেটি প্রকাশ করলেন না। শুধু বললেন আসলে খুশি হব বাবা।
লজিং থেকে বেরিয়ে একবার ফিরে তাকালেন জসীম উদ্দীন। বড়ই প্রিয় বাড়ি। অনেকদিন এখানে থেকেছেন। এ বাড়ির প্রতিটি ধূলিকণার সাথে ওর যেন নাড়ির সম্পর্ক। আজ বিদায় বেলায় সবকিছু যেন হাহাকার করে উঠল। দূরে একটা আমগাছের আড়ালে আকিরার শাড়ির আঁচল স্পষ্টই দেখলেন জসীম। কিন্তু ওর সাথে কথা বলার সুযোগ ছিল না। হয়ত আকিরার চোখেও এ মহূর্তে দু’ফোটা জল। জসীম টিনের বাক্সটি নিয়ে দ্রুত হাঁটা দিলেন। চোখের পাতা ভিজে উঠার আগেই তার এ আঙ্গিনা ছাড়তে হবে।
ফাহিম বিষয়টি অবগত ছিল না। রোজকার অভ্যাস মত স্যারের কামরায় ঢুকলো। কিন্তু স্যারের কোন চিহ্নই সেখানে নেই। কাপড় চোপড়, বিছানা পত্র কিছুই নেই। দৌড়ে এসে মাকে বলল ‘মা স্যার কোথায়? চলে গেছেন বুঝি? কোন কাপড় চোপড় কিছ্ ুদেখছি না যে।
মা শান্ত¦নার স্বরে বললেন- হ্যাঁ ফাহিম। বাড়িতে গেছেন। এক মাসের মধ্যেই ফিরবেন। মায়ের কথা বিশ্বাস করতে পারলো না ফাহিম। কী একটা কষ্ট ওর বুকে বাজতে লাগলো। মনের অজান্তেই দু’ফোটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল ফাহিমের। তার মনে হলো একজন সত্যিকার বন্ধুকে হারিয়ে ফেলেছে সে। যার সঙ্গ ছাড়া একটি মুহূর্তও চলত না, সেই বন্ধু কিছু না বলেই চলে গেল? একটিবারও ভাবলো না আমার কষ্টের কথা?
ক্ষোভে অভিমানে সে রাতে কিছু খায়নি ফাহিম। পরের দিন স্যারের ঠিকানায় একটি চিঠি পাঠিয়ে দিল। অনেক অনুনয় বিনয় করে স্যারকে ফিরে আসতে বলল। কিন্তু অনেক দিন পরও চিঠির উত্তর যখন এলো না তখন ফাহিমও অভিমান করে বসল। আস্তে আস্তে স্যারের স্মৃতি বিস্মৃত হতে শুরু করল ফাহিমের অন্তর থেকে।
সময় গড়িয়ে যায়। আসে একাত্তর। মুক্তিযুদ্ধ। এরই মধ্যে ফাহিম এসএসসি পাশ করেছে। দীর্ঘদিন স্যারের সাথে কোন দেখা নেই। মনে মনে ভাবে দেশ এখন স্বাধীন। পাকিস্তানি হানাদাররা পালিয়েছে। একটি টকটকে লাল সূর্য খচিত সবুজ পতাকা আমরা পেয়েছি। কি যে আনন্দ। আজ স্যার থাকলে খুবই মজা হতো। হঠাৎ মনে হলো স্যার কি বেঁচে আছেন? মুক্তিযুদ্ধ তো আর কম মানুষ নিয়ে যায়নি। ত্রিশ লক্ষ মানুষকে রক্ত দিতে হয়েছে। এর মধ্যে স্যারের কি কোন অসুবিধা হলো? এমন তো স্যার ছিলেন না। অভিমান করে হয়তো চলে গেছেন। কিন্তু তিনি তো আমাকে অনেক অনেক ভালোবাসতেন। আমাকে তো তার ভোলার কথা নয়। হয়ত মুক্তিযুদ্ধের সময় কোন অসুবিধা হয়েছে। বা তার মৃত্যুও হতে পারে। এখন তো আমি বড় হয়েছি। একবার তো গিয়ে স্যারকে দেখে আসতে পারি। এ কথাটি মনে হতেই স্যারকে দেখার প্রবল বাসনা উদিত হলো ফাহিমের মনে। সে ঠিক করল আগামী শুক্রবার স্যারের বাড়িতে যাবো, স্যারকে একনজর দেখা উচিত। আর আমারও রিজাল্ট হয়েছে এতে তো স্যারেরই অবদান বেশি।
যেই ভাবা সেই কাজ। ফাহিম ছুটল ওর স্যারের সন্ধানে। ও তখন সিলেট শহরেই থাকতো। সকাল ৯টায় ট্রেন। উঠে বসল ফাহিম। সিলেট স্টেশন থেকে যাবে ভানুগাছ। জীবনের প্রথম ট্রেন চড়া। সে এক দারুন মজা। ঝকঝকা ঝক..... ছুটে চলল ট্রেন। অজ¯্র অগণিত মানুষ ট্রেনের ভেতর। হোটেলের মত মুখোমুখি সিট। বগির দু’পাশে সিট সাঁটানো মাঝখানে একটু ফাঁকা জায়গা। কিন্তু ফাঁকা বলতে কিছু নেই। অজ¯্র দাঁড়ানো প্রাসেঞ্জার। মনে হয় কেউ তাড়া করছে আর অজ¯্র মানুষ এসে ট্রেনে উঠেছে। দিনের আলোয় দূরের গ্রামগুলো বেশ চমৎকার দেখাচ্ছিল। ঘোরে ঘোরে যেন আক্রমণ করতে আসছে ট্রেনকে। কিন্তু ট্রেনকে আটকাতে পারে না ওগুলো। চেষ্টাই করে যায় শুধু।
ভানুগাছে যখন ফাহিম নামল তখন বেলা ১টা। এখান থেকে প্রায় বিশ কিলোমিটার উত্তর পূর্বে যেতে হবে সিএনজিতে। তার পর কাঁচা রাস্তা দু’কিলোমিটার। বিকালে আবার ফিরতে হবে। সময় নষ্ট না করে সিএনজি ধরল সে। পাশে বসা এক ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করতেই উনি বলল- অচিন্ত্যপুর যাবে। ব্যস, ফাহিম মনে মনে স্বস্তি পেল। সিএনজি থেকে নেমে পায়ে হেঁটে চলল ওরা। সঙ্গী লোকটি বলল কার বাড়ি যাবেন? কৃষি স্যার জসীম উদ্দীনের বাড়ি। ও আচ্ছা চিনতে পেরেছি। স্যারের বাড়িতে পৌঁছতে পৌঁছতে বেলা ৪টা। তখন স্যার বাড়িতে নেই। তিনি ইতোমধ্যে বিয়ে করে তিন তিনটে মেয়ের বাবা। বড়টি পড়ে সেভেনে। বেশ সুন্দর চেহারা। ওরা এসে ফাহিমকে ঘিরে ধরল। দূরে দরজার ফাঁকে স্যারের বউয়ের অস্তিত্ব বুঝা গেল। ওরা চিনতে চেষ্ট

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT