সাহিত্য

আরও দূরে

আবদুস সবুর মাখন প্রকাশিত হয়েছে: ২৩-০৬-২০১৯ ইং ০১:০২:৩৩ | সংবাদটি ১২১ বার পঠিত

মুখোমুখি দু’জন। চোখে চোখ। একান্ত নিজের সময়। নিজস্ব ভুবন। পাতা ঝরার শব্দ নেই। যন্ত্রদানবের যন্ত্রণাময় আওয়াজ পালিয়েছে সুদূরে। একটি ফিঙ্গের ঠোঁট উন্মাতাল। শুধু দু’টি প্রাণীর উদাসী নিঃশ্বাস।
: এই নীরবতা আর কতো?
: তুমি যতো চাইবে।
: মানে?
: মানে তুমি চাইলে এই মুহূর্তে এই ছোট্ট ‘ক্যাফে প্রিন্স’ হয়ে উঠবে বাসর ঘর।
ডেজি হাসি থামাতে পারলো না। চিবুক থেকে দু’হাত নামালো টেবিলে। চুড়ির শব্দে আর হাসির শব্দে একাকার হলো। প্রাণখোলা হাসি ডেজির। যেন অবিরাম সাগর সৈকতে সূর্য¯œান। জনমানবহীন রাজ্যের স¤্রাজ্ঞী। স¤্রাটের মতোই আবির্ভাব শিমনের। হাসির কাঁচভাঙ্গা শব্দে নিজেকে ভুলে যায় শিমন।
সেদিন ডেজির সঙ্গ প্রথম সাক্ষাতে এভাবেই নিজেকে ভুলে গিয়েছিলো শিমন। তার শয়ন কক্ষের দক্ষিণের জানালা দিয়ে ঘরে ঢুকছিলো হিমেল বাতাস। আকাশে মেঘের সাথে অপূর্ণ চাঁদটির লুকোচুরি খেলা চলছিলো। ঘুম আসছিলো না তার একা ঘরে রাজ্যের হাজারো ভাবনা গিরে ধরেছিলো শিমনকে। মনে হলো একটা বাদুড় কিংবা পেঁচা ঘরের টিনের চালে এসে ডানা ঝাপটিয়ে চলে গেলো। ক্যাসেটে মৃদুলয়ে বেজে চলেছিলো- ‘শাওন রাতে যদি স্মরণে আসে মোরে... গানটি। ডিমলাইটের সবুজ আলোয় তখন হারিয়ে গিয়েছিলো। সে নিজের মধ্যে নিজেই।
সেই চৈতী রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙ্গেছিলো ডেজিই প্রথম। নির্ঘুম রাতজাগা একটি কোকিলের সাথে কন্ঠ মিলিয়েছিলো।
: এতো রাতে ঘুমোও নি?
: ঘুম আসে না।
: কেন?
: শূন্য ঘরে দিন কী আর রাত কী? একটি দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো ডেজির কন্ঠে।
: তোমার তো আছে সবই। পূর্ণিমার চাঁদ জানালা গড়িয়ে ঘরে ঢুকে। রাত স্বপ্ন দেখায়। যেখানে তুমি, তোমার স্বামী, তোমার সন্তান।
: কে বললো? আমার চোখের সামনে তো শুধু ফসলহীন বিরান জনপদ। আর কেবল তোমার চোখেই...
: আমার চোখ কি অন্য সবার চেয়ে আলাদা নাকি?
: নয়তো কী? তা না হলে কি আর এই বুকে তোলপাড় শুরু হয়?- ঢেউ এসে ধাক্কা দেয় শিমনের তপ্ত বুকে। প্রশান্তির ঠিকানা খুঁজে।
ডেজি শিমনের প্রতিবেশী। লাগোয়া ঘর। কথা হয় জানালায়। কখনও সশব্দে। কখনও নিঃশব্দে, ইশারায়, চোখে চোখে। গল্প হয় মনে মনে। লোকচক্ষুর আড়ালে আবডালে দু’জনের দেখাও হয় মাঝে মধ্যে। কিন্তু আজই প্রথম দু’জন মুখোমুখি চায়ের টেবিলে। প্রথম দিনের স্মৃতি রোমন্থন করতে করতে চায়ের কাপে চুমুক দেয় শিমন। পুলকিত হয় সে। শিমনকে অন্যমনস্ক দেখে কথা বলার অজুহাত বের করলো ডেজি।
: তোমাকে যে বললাম চা আর খাবে না? -টেবিলে কাপটি রাখে শিমন।
: তোমার কথাটা কি এমনই যে, অবশ্যই মেনে নিতে হবে?
: আমার তো মনে হয় তাই।
: তুমি কি মনে করো সেই অধিকার তোমার আছে?
: অধিকার তুমি না দিলেও আমি ছিনিয়ে এনেছি।
: শেষ পর্যন্ত অপরাধী সেজে গেলে তুমি? তাহলেতো শাস্তি তোমাকে দিতেই হবে।
: সে তো সৌভাগ্য। তোমার কাগজে যদি অপরাধী হয়েও আমার নাম ছাপা হয় তাহলে এর চেয়ে আর বড় পাওনা কী থাকতে পারে?
: জানো না হয়তো সেই পাওয়ার কষ্ট কতো?
: সকল যন্ত্রণার পাথর পায়ে মাড়িয়েই তো আমার সামনে এগুনো।
: সামনে তো দুর্গম প্রান্তর, বৈশাখের উত্তপ্ত দুপুর, জমি মিছিল, ব্যারিকেড, টিয়ার গ্যাস।- হাসে ডেজি আবারও। একটানা হাসি। থেমে যায় আকাশে গর্জন। বৃষ্টি¯œাত একটি বিকেল বুঝি অভিষেকের মালা নিয়ে বসে থাকে।
চোখে চোখ রাখে শিমন। মৃদু উত্তরি হাওয়া ছাড়া কোন দেয়াল নেই মাঝখানে। তবুও মাথা নিচে নামায় ডেজি। চোখ টেবিলে। হাতের আঙ্গুলে জলের রেখায় কিছু আঁকাজোকা। হয়তো কেঁপে উঠলো ঠোঁট। কোন অস্পষ্ট কথাও বেরুলো না। যেমন ছবি হয় না জলের রেখায়। ডেজির বা হাতে মৃদু ছুঁয়ে শিমন আরেক কাপ চা দিতে বলে বেয়ারাকে।
পড়ন্ত বিকেল। রেঁস্তোরায় মানুষের আনাগোনাও কমে গেছে। দুয়েকজন আসছে যাচ্ছে; কিন্তু প্রায় সব টেবিল শূন্য। একমাত্র তারা দু’জনই বসে আছে টেবিলের এক কোণে; জানালার পাশে। এই সময়টিতে কাস্টমারের আনাগোনা কমই হয়। বয়-বেয়ারা কিংবা ম্যানেজারও তাদের দিকে মাঝে মধ্যে একটু আড়চোখে তাকাচ্ছে। কিছুটা সংকোচবোধ হচ্ছে তাদের। কারণ তারা ঐখানে বসে আছে ঘন্টা খানেকেরও বেশি। এতোক্ষণ একই জায়গায় বসে থাকলে লোকজন তো অনেক কিছুই মনে করতে পারে? এতোকিছু ভাবনার মধ্যেই বেয়ারা চা নিয়ে এলো। নীরবতা ভঙ্গে শিমন।
: পাথর তো কখনও কথা বলে না?
: কেউ চেয়েছে নাকি কখনও?- লাজন¤্র রক্তাভ ডেজির দু’টি চোখ শিমনের মুখের ওপর।
: আমি তো চাই তোমার ঘরের সান্ধ্যতারাটি আমারই হোক।
: এই দিনদুপুরে সান্ধ্যতারা? পারোও তুমি পাগলের মতো বকতে।
: আমি পারি, তুমি পারো না?
: কী?
: আমি তো পারি একটি খর¯্রােতা নদী টপকে ভাসতে, সবুজ তেপান্তরের শেষে ছ্ট্টো একটি পাখির নীড় উপেক্ষা করে চলে আসতে, শরতের ঘুঘু ডাকা একটি পূর্ণিমার রাতকে পেছনে রাখতে।
চুপ থাকে ডেজি। সদা হাস্যোজ্জ্বল অনিন্দ্য মুখচ্ছবি মুহূর্তেই মলিন হয়ে গেলো। অতি চেনা চেহারা যেন অচেনা হয়ে গেলো। যে চোখ দু’টির পাতায় থাকে সারাক্ষণ শুধুই দুষ্টোমি, সেখানে এখন অন্তহীন সময়ের উদাসীনতা। রাজ্যের সব ভাবনা যেন ভর করে তার দু’চোখ জুড়ে। বাইরে তাকায়, পলকহীন। দমকা হাওয়ার সাথে এক পশলা বৃষ্টি। হাওয়ার ঝাপটায় আলতো ভিজিয়ে গেলো ডেজির মুখোমন্ডল, কপালে ছিটকে আসা একগোছা চুল, চোখের পাতা। বৃষ্টি আরও জোরে বইতে শুরু করলো। ভিজে একাকার হলো ডেজি। জানালা লাগাতে চাইলো শিমন। বাধা দিলো সে।
: আমাকে কাঁদতে দাও। বৃষ্টির একটানা কান্না আমাকে পাগল করে দিয়েছে। এখন এই কান্নার চেয়ে আমার কাছে বড় কোন সুখ আছে বলে মনে হচ্ছে না। বৃষ্টির শব্দে আমি ঠিকই শুনতে পাচ্ছি আমার পাঁচ বছরের ইরেনাও কাঁদছে। ঘরে সে একা হয়তো। ইমন কি ঘরে ফিরেছে এখন?

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT